পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০১৩

<<< সম্পাদকীয় >>>


০১ কালিমাটি অনলাইন / ০৩

সম্প্রতি আমরা পালন করলাম রবীন্দ্রনাথের ১৫৩ তম জন্মদিন। প্রতি বছরই ২৫শে বৈশাখ দিনটি আসে। আমরা নিজেদের মতো করে দিনটি ভরিয়ে তুলি রবীন্দ্ররচনা পাঠ, রবীন্দ্রসঙ্গীত, রবীন্দ্রভাবনায়। এবং শুধুমাত্র এই দিনটিই নয়, রবীন্দ্রচর্চায় সারা বছর অনেকেই থাকেন ক্লান্তিহীন। আসলে আমাদের সামগ্রীক জীবনচর্যায় রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে আছেন এমনই অন্তরঙ্গতায় ও আত্মীয়তায়, আমরা তাঁকে প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের নিজেদের মধ্যে অনুভব করি। তাঁর অনাবিল স্পর্শ ও সান্নিধ্যলাভের উপলব্ধিতে রোমাঞ্চ বোধ করি। আমরা সবাই শ্রদ্ধা করি তাঁকে। এবং তার থেকেও বড় কথা, আমরা বড্ড ভালোবাসি তাঁকে।

‘কালিমাটি অনলাইন’-এর এই সংখ্যায় ক্রোড়পত্রে আমাদের সশ্রদ্ধ নিবেদন : ‘রবি প্রণাম’। মোট আটটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ ও নিবন্ধে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত কিছু নতুন ভাবনার অন্বেষণ আছে। এছাড়া আছে তাঁর কিছু আলোকচিত্র এবং তাঁর কয়েকটি চিত্রশিল্প। গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো ছাড়া আমাদের আর উপায়ই বা কী!

‘কবিতার কালিমাটি’ ২৬তম সংখ্যায় মোট ৩০টি কবিতা আর ‘কালিমাটির ঝুরোগল্প’ ১১তম সংখ্যায় ১৮টি ঝুরোগল্প ছাড়াও ‘ছবিঘর’-এ ১১ জন শিল্পীর ১১টি আলোকচিত্র প্রকাশিত হলো। আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, প্রকাশিত কবিতা-ঝুরোগল্প-আলোকচিত্র সম্পর্কে আপনাদের অভিমত অবশ্যই জানাবেন ‘কমেন্ট বক্স’-এ। সেইসঙ্গে ‘কালিমাটি অনলাইন’কে আরও সমৃদ্ধ করুন আপনাদের স্বরচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক মননশীল কবিতা, ঝুরোগল্প ও আলোকচিত্র পাঠিয়ে।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা : kalimationline100@gmail.com

প্রয়োজনে দূরভাষে যোগাযোগ করতে পারেন :
0657-2757506 / 09835544675

অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ : Kajal Sen, Flat 301, Parvati Condominium, Phase 2, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India.




<<< বিশেষ ক্রোড়পত্র : ‘রবিপ্রণাম’ >>>

বিশেষ ক্রোড়পত্র : ‘রবিপ্রণাম’

বৈশাখীর পুণ্যলগ্নে ‘কালিমাটি’র সশ্রদ্ধ নিবেদন বিশেষ ক্রোড়পত্র –- ‘রবিপ্রণাম’। লিখেছেন আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ, আলতাফ হোসেন, রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, জাহ্নবী দাশ, শম্পা ভট্টাচার্য, সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ, আলী হোসেন এবং অনুপম মুখোপাধ্যায়।

০১ আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

সংঘের রবীন্দ্রনাথকে ত্যাগ করে কবি রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ


সংঘের রবীন্দ্রনাথ আর কবি রবীন্দ্রনাথ এক জিনিস নয়। যেমন এক নয়, রাষ্ট্রের প্রজানায়ক রবীন্দ্রনাথ আর কবিতার কবিনায়ক রবীন্দ্রনাথ। মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্র কাউকে এত তেল মারে না, যদি না রাষ্ট্র কিছু কামাতে পারে তার কাছ থেকে। তাহলে প্রশ্ন -- রাষ্ট্র এই কবির কাছে কী পায় যে, তাকে মানে এক কবিকে হঠাৎ একটা মহা উৎসব-আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলে! বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রবীন্দ্রনাথের ভাবগত বা চিন্তাগত মূল্যের চেয়ে তার বানানো-মূর্তিজাত উপস্থিতির বস্তুগত মূল্য তখন বড় বেশি দরকারি হয়ে পড়ে। কারণ সেটা সামনে রেখে রাষ্ট্র তার একটা কৃত্রিম মহৎ ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারে। সেটি করে রাষ্ট্র বোঝায় (ক) রাষ্ট্র কোনো নন্দনচর্চাজ্ঞানশূন্য, অনুভবহীন ভোঁতা প্রতিষ্ঠান নয়। (খ)তার বদৌলতে রাষ্ট্রের কবি-সাহিত্যকদের প্রতি একটা সামারাটিয়ান চরিত্র দাঁড় করায়। সাথে সাথে এটির বিপুল উদযাপনের ব্যয়ভারের অংশীদার হন ঠিকাদার থেকে শুরু করে(কোনোদিন একটি মাত্র রবীন্দ্রকবিতা না-পড়া বা গান না-শোনা) বিপুল কর্মীবাহিনী। এর বাইরে যারা আছেন, তারা কবির অতলান্তিক সৃষ্টিকাজের প্রাচুর্য বিষয়ে আধ-বোঝা বা পুরাতন ছোঁয়াচে আবেগের আগুনে পুড়ে সাময়িকভাবে বাঙালি সংস্কৃতির ভাগীদার হতে চান। অন্যদিকে যারা কবিতা-শিল্পের প্রকৃত সমজদার পাঠক -- তারা কবির কাছে কোনো দেনা পাওনার হিসাব নেয় না। আবার তার মর্যাদার হেরফের পাঠকভেদেও এদিক সেদিক হয় না। সে ততটুকুও নেয় যতটুকু কবি দিতে পারে বা যতটুকু মূল্য একজন কবি বা সাহিত্যক তৈরি করতে পারে পাঠকদের কাছে। এর মধ্যে কোনো বস্তুগত লাভের হিসাব নিকাশ নেই। প্রকৃতপক্ষে সংঘের রবীন্দ্রনাথ একজন নেতা রবীন্দ্রনাথ হিসাবেই আবির্ভূত হন -- যার ভেতরে সংঘকর্মীরা আবিষ্কার করেন এক অভূতপূর্ব কবি আর সংগীতের মর্মবাণী, যা দিয়ে একটা রাজনৈতিক শিক্ষার কর্মসূচি হাতে নেওয়া যায়। এর ফলে রবীন্দ্রনাথ যে একটি প্লুরাল সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব, সেটির কোনো অস্তিত্ব থাকে না, থাকে শুধু বাহুবলীয় সিংগুলারিটি -- যার মাধ্যমে চিন্তার স্বাধীন স্রোতটাকে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।

সংঘের রবীন্দ্রনাথকে যারা সঙ্গী করে, তাদের মানসিক জগৎ থেকে কবি সাহিত্যিক রবীন্দ্রসঙ্গ অনেক আগেই লুপ্ত। যা থাকে সে তো এক নাম না জানা বিস্ময়! যার আর এক নাম হতে পারে অজ্ঞ বা অন্ধ বিস্ময়। তারা তখন হাজার নেতার পাশাপাশি বা কখনো ছায়াতলে নতুন নেতা রবীন্দ্রনাথকে পায়। এখানে তাই প্রশ্ন আসে, রবীন্দ্রনাথ কিসের নেতা? রবীন্দ্রনাথের আইডোলজি কী? রবীন্দ্রনাথ কী করে তাদের সাথে? রবীন্দ্রনাথের মেসেজ কী? তার যে অন্যায় হিংসা বিদ্বেষহীন সমাজের ধারণা, সর্ব কল্যাণের চিন্তা, সর্বজনীন শিক্ষার চিন্তা, সেগুলি কোনো একটি দলের বা দলীয় নেতা কর্মীদের আইডোলজি নয়, এইগুলি ইউনিভার্সেল বিষয়। এইগুলি সংঘের লোকেরা নেয় না বা তারা এভাবে চিন্তাও করে না। কারণ সেগুলিতে তাদের কোনো ফায়দা নেই বরং তাতে কবি রবীন্দ্রনাথের বাণিজ্যবিহীন, নিরীহ কবিমুখটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিষয়টা ভেবে দেখা দরকার। রবীন্দ্রনাথ তো কারো নেতা নয়। কারণ কবির কাজ কোনো নেতৃত্ব বিধান বা কোনো নিদের্শ দান নয়। কবির কাজ মানুষের ভেতর মরে থাকা সৌন্দর্যবোধ জাগানোর মাধ্যমে জীবনকে একটা মিনিং দেওয়া, মানুষের ভেতর চিন্তাহীন, শুধু ভোগবাদী পশু সত্ত্বাটাকে বাদ দিয়ে তাকে মানুষের কাতারে আনার জন্য তৈরি করা।

সংঘের কোনো ফিক্সড চরিত্র নেই। নানান রকম মানুষ নিয়ে সে যে একটা কিছু হয়, সেটি আসলে একটা বহুরূপী বহুগামী স্থির আকারহীন চরিত্র। তার অবলম্বন বহিরাঙ্গনের নীচ রাজনীতি ও তৈলমর্দন। কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথ আসলে কোনো বহিরাঙ্গনের লোক নয়। তাই ঘটা করে মজলিসি কায়দায় রবীন্দ্রনাথকে -- রবীন্দ্রনাথের মুর্শিদ আর মুরিদ ধরে তার সংগীতের মজা পাওয়া যায় না। কারণ নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথই আসল রবীন্দ্রনাথ। কবিতাশিল্প বা নন্দনচর্চা ঠিক কোলাহল, প্রভাতফেরি, নেতা নেত্রী পাজামা পাঞ্জাবির বিষয়বস্তু নয়। এইগুলি লোকবল রাষ্ট্রবল সংঘছাড়া নিঃসঙ্গতাকে দাবী করে। সংঘবল আদতে একটি বাহুবলের চাতুর্যমাত্র। এর কারুকার্যময় পৃথিবীর ভেতরে বেচারা কবি রবীন্ত্রনাথ পালিয়ে বাঁচে যেন! সেইসূত্রে বলতে পারি, ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে পূজা করা আর তার সাহিত্যসৃষ্টিকে সমাদর করা এক জিনিস নয়। যারা ব্যবসায়িক, বা রাজনৈতিক কারণে তাকে পালন করে, তারা তার স্রষ্টা-সত্ত্বাকে হত্যা করে একজন বাজারি রবীন্দ্রনাথকে জন্ম দেয়। বাঙালির হাজার বছরের মনোভঙ্গি হিরো-ওয়ারশিপিং হওয়ার কারণে সমাজ চিন্তক, রিফর্মিস্ট মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের দর্শনেরও কোনো চর্চা হয় না। সাদা কাপড় আর সাদা গোঁফদাড়িওয়ালা কবিকে বৈশাখ আর শ্রাবণের রোমান্টিক দেবতা করে দাসেরা ফুলের মালা আর কথার ফুলঝুরিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এতে হয় না কোনো বিচার বিশ্লেষেণ, হয় না কোনো জীবনকে বোঝার বা জানার অন্বেষণ। তাহলে ক্ষতি কার, প্রজানায়ক রবীন্দ্রনাথের না কবিরাজ রবীন্দ্রনাথের? না সংঘবাদী এইসব ক্ষুদে নায়কদের?

আমার মতে ক্ষতি তিন দলেরই। কারণ এতে তারা কোনো কিছু বুঝতে পারে না। আর বুঝতে পারে না বলেই কোনো কিছু গড়তেও পারে না। এই একই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে স্টেজে, হলরুমে বা লম্বা করিডোরে কিংবা কোনো বাগান বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ছবি টাঙ্গিয়ে রবীন্দ্রচর্চার নামে তার নাম জপ করা ধর্মবাদীতার সমতুল্য। তখন এই ধর্মগুরুকে পাবলিক যীশুর মতো শৃঙ্খলিত করে লোকজনের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়। আটকে রাখে বড় বড় দালান কোঠায়। রবীন্দ্রনাথ ধর্মেও নেই অধর্মেও নেই। রবীন্দ্রনাথ আছে নিঃসঙ্গ ধ্যানে, মানুষের সমাধিভঙ্গিমায়। হিরো-ওয়ারশিপিং মানসিক পঙ্গুতার কারণে হিরোকে নানান ভাগে বিভক্ত করার প্রচলন বাংলাদেশে আছে। রবীন্দ্রনাথকে ভেঙে বিশ্বকবি, হিন্দু, বাঙালি, ভারতীয়, এপার- ওপার বাংলার নেতা বানানোর মাধ্যমে সৃষ্টিহীন লোকদের একটা হীন উদ্দেশ্য সফল হয় হয়তো। তাতে কবি সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের কিছুই হয় না। কবি রবীন্দ্রনাথ সব সময় এক এবং নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথই থাকে। তাকে পেতে হলে তাকে ঘরে বসেই তার সৃষ্টিশীলতাকে তথা তার টেক্সটকে পঠন, বিশ্লেষণ আর পূর্ণগঠনের মাধ্যমে পেতে হবে।

০২ আলতাফ হোসেন

রবীন্দ্রনাথ, আমার, আজকের
আলতাফ হোসেন


সেই কবে শৈশবে একদিন পড়েছিলাম ‘মানুষের মন চায় মানুষেরই মন’, আর বাঁধা পড়ে গেছিলাম রবীন্দ্রনাথে, মনে পড়ে। তারপর থেকেই একে একে তাঁর বইগুলি খুঁজতে এ লাইব্রেরি, সে লাইব্রেরিতে ছুটে বেড়ানোর শুরু। বেশ অল্প বয়সেই এভাবে পড়া হয়ে গেছে তাঁর অধিকাংশ বই। এই তো ভেসে উঠছে সন্ধ্যাসঙ্গীত, প্রভাতসঙ্গীত, রাহুর প্রেম, হেকেটি, কবিমানসী, জগদীশ ভট্টাচার্য, কাদম্বরী সে সময়ের। জীবন খুব ছোট মানুষের। অপঘাত যদি না-ও থামিয়ে দেয় শুরুতে বা মাঝপথে, দেখতে-দেখতে ফুরিয়ে যেতে থাকে। একবার পড়াতে যে হয় না, রুদ্ধশ্বাসে পড়া বই বা তার অংশগুলো আবারও যে পড়তে হয়, তা না হলে মন থেকে মুছে যেতে পারে, তা উপলব্ধি করেও আবারও পড়ার, প্রিয় চিন্তাগুলোয় আবারও ফিরে যাওয়ার সময় আমরা আর পাই না তো! দিনে-দিনে কত বই কত ভাবনা এসে ঘিরে ধরে। স্মৃতি ঝাপসা হতে শুরু করে। তবে অনেক-অনেক বইয়ের মধ্যেও যে দুটি বই সামনে থেকে অপসৃত হয়নি, সে দুটির নাম নিশ্চয়ই গীতবিতান ও ছিন্নপত্রাবলী। একদিকে একান্তভাবে আমার অসঙ্গতিময় বা নিরর্থক এক জগৎ, অন্যদিকে রবি-র গানের, চিঠিপত্রের ভুবন। অনেকদিন ধরেই পড়েছি ও মাঝে-মাঝেই পড়ি ভাইঝি ইন্দিরাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি, আর গীতবিতান আজ অনেকদিন প্রায় রোজ সকালবেলা খুলে-খুলে জানা, অল্প-জানা সুরের গানগুলো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাওয়ার নেশায় মেতেছি। বলে রাখি, তবু যে আর একটি বইয়ের দিকেও মন ছুটে যায় প্রায়ই। গল্পগুচ্ছ। বাঙালির গল্প পড়তে যখন চাই।

বলি এবার তবে গীতবিতান কেন! গান ছাড়া বাঁচতে পারি না এক কথা। আর গানেই যে রয়েছে, ‘পথ আমারে শুধায় লোকে, পথ কি আমার পড়ে চোখে’, সত্যিই তো পথ কোথাও দেখতে পাই না তো এ জগতে আসা অবধি। ‘চলি যে কোন্‌ দিকের পানে গানে গানে’। সুর ভালোবাসি, আর গানে-গানেই কোনও একদিকে ছুটে চলি না কেন। এরকম অন্তত শ’খানেক গান তো তিনি রেখে গেছেনই।

অবাক যে, অল্প বয়সে, মাত্র বত্রিশ বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের ছিল এমন পরিণত ভাবনা, আজকের ভাবনা। ছিন্নপত্র থেকে তুলে দিচ্ছি : ‘যার সঙ্গে দুটো কথা কয়ে প্রাণসঞ্চয় করা যায় এমন মানুষ দশ-বিশ ক্রোশের মধ্যে একটি পাওয়া যায় না। কেউ চিন্তা করে না, অনুভব করে না, কাজ করে না...। ...সমস্ত মানুষগুলো যেন উপচ্ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, আপিস যাচ্ছে, ঘুমচ্ছে, তামাক টানছে, আর নিতান্ত নির্বোধের মতো বকর বকর করছে। ...যথার্থ মানুষের সংশ্রব পাবার জন্য মানুষের মনে ভারি একটা তৃষ্ণা থাকে। কিন্তু সত্যকার রক্তমাংসের মানুষ তো নেই -- সমস্ত উপচ্ছায়া, পৃথিবীর সঙ্গে অসংলগ্নভাবে বাষ্পের মতো ভাসছে।’

এই রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে সঙ্গে না রেখে পারি না।

০৩ রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি
রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়


সেই ছাতিমতলা যেখানে উচ্চারিত হয়েছিল ‘আনন্দম অনন্তং শুভম’। যার অলখদুয়ার থেকে মহামানবের যাত্রা। যিনি শিল্প আর জীবনকে মিশিয়েছিলেন অভূতপূর্ব রসায়নে। সেই জীবনশিল্পী রবীন্দ্রনাথ।

আমি আনন্দের কবি –- এমনটাই ভাবতে ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথ। তাই উপনিষদের সেই শ্লোকটি –- ‘আনন্দাদ্ধেব খল্লিমানি ভূতানি জয়তে’ বারবার ধ্বনিত হয়েছে তাঁর কাব্যে তাঁর গানে। আনন্দধারা বহিছে ভুবনে / দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে। হয়তো আনন্দবাণী ছাড়িয়ে গেছে দুঃখের পরিসংখ্যানকে। তবু সত্যি কি তিনি শুধু আনন্দের বাণী বহন করেছেন? কিছুই তো হল না / সেই সব সেই সব সেই হাহাকাররব / সেই অশ্রুবারিধারা, হৃদয়বেদনা। আনন্দধারা থেকে সরে সরে তাঁর সেই রোমান্টিক অ্যাগনি; প্রেমের প্রাপ্তিতে পূর্ণ হৃদয় তীব্র বিষাদেও হাহাকার করেছে।

>

‘শান্তং শিবম অদ্বৈতম’ –- এই মন্ত্রটিকে রবীন্দ্রনাথ গেঁথেছিলেন তাঁর কাব্যে তাঁর গানে। শান্ত অর্থাৎ যেখানে সকল বিরুদ্ধগতি শান্তির মধ্যে দিয়ে ঐক্যলাভ করে। শিবম অর্থাৎ যার মধ্যে দিয়ে সকলের স্বার্থ মঙ্গলে নিহিত। আর অদ্বৈতম হলো সে, যেখানে তুমি আমি চেতন অচেতন এক দেহে হলো লীন। আর তাই বুঝি আশৈশব ঈশ্বরবিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথের দুঃখবাণীতে কোথাও বিশ্ববিধানের প্রতি বিদ্রোহের আভাস নেই। বরং অন্ধকার ভেদ করে জেগে থাকে এক স্নিগ্ধ আলোর কিরণ। দুঃখের মধ্যে আনন্দকে ছুঁয়ে ফেলার দুর্বার কল্পনায়; যাপনের মধ্যে সত্ত্বাকে স্পর্শ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় নিরন্তর নিরবধি তাঁর চলন। হয়তো কখনো সত্য-শিব-সুন্দরের পথে নিরুদ্বেগ আস্থার তরীখানি হঠাৎ ডুবে যায়। আপন অন্তর্যামীর কাছ থেকে নোঙর তুলে নেওয়ার যন্ত্রণায় উত্তাল হয়ে ওঠে হৃদয়। তবু গান উঠেছে আকাশভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ। সংশয় থেকে বিশ্বাসে আর বিশ্বাস থেকে সংশয়ে অবিরাম যাতায়াত তবু প্রাণ নিত্যধারা হাসে সূর্য চন্দ্রতারা।

উপনিষদের অধ্যাত্মরস রবীন্দ্রকাব্যেও। নির্ভার স্বচ্ছতা ছন্দের মদিরতা দিয়ে দীর্ঘ রাবীন্দ্রিক যুগ। মুগ্ধ করে রাখলেন পথিককে তাঁর অন্তর্লীন শিক্ষা আর সংযমের মন্ত্রে। কাব্যরূপে তিনি দুর্গম গিরি রচনা করেননি। পার হতে চাননি কোনো বৈতরণীও। মোহিনী মায়ায় রিনিঠিনি ছন্দ বাজলেও সেই আপাত সরল জলধর্মী কাব্যের গভীরে বিরাজ করত আবর্তের নিত্যমন্থন। সেই মোহিনীমায়ায় ঘর ছেড়ে কূল হারানো নয়; অসহায় উচ্ছ্বাসের চোরাবালিতে নিমজ্জন নয়, বরং প্রাণ ও মনের দ্বন্দ্ব, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব নিয়েও সত্য-শিব-সুন্দরের সন্ধান করতে হবে। আঁধার থেকে ক্রমশ আলোতে উত্তরণের জীবনদর্শন নিয়ে আধুনিক যন্ত্রণাকে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে উচ্ছ্বসিত করতে হবে। তবেই সার্থক হবে রবিসম্মিলন।

০৪ জাহ্নবী দাশ

ফ্যাশনেবল বাঙালি, আজকের শৈশব এবং রবীন্দ্রনাথের মাতৃভাষা চিন্তা
জাহ্নবী দাশ

বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা –- UNESCO থেকে কিছুদিন আগে প্রকাশিত এই খবরে জয়োল্লাসে মেতে উঠেছিল বাঙালি। তবে এই তথ্য কিন্তু মোটেই পালটে দিচ্ছে না আমবাঙালির মানসচিন্তাকে। ইংরেজির একাধিপত্য এবং হিন্দি বলয়ের অসাধারণ মার্কেটিঙের ফলে বাংলা কিন্তু কোণঠাসাই। না, দোষটা ইংরেজি বা হিন্দির নয়। নিজেদের অস্তিত্বকে নড়বড়ে করে দেওয়ার দায় নিতে হয় আমাদেরই। মধ্যবিত্ত বাঙালি বিশ্বাস করে, বাংলা মাধ্যম স্কুল আসলে বাড়ির ঝি-এর ছেলেমেয়েদের জন্যই। বাঙালি মা তার ছেলেকে ডাকে –- ‘বাবা, come, come, grapesকটা খেয়ে নাও!’ আর তাই “দিনের আলো নিবে এল, সূয্যি ডোবে ডোবে” কিংবা “বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এল বান”-এর সঙ্গে আজকের শিশুমন পরিচিত নয়।

আসলে আজকের দিনটাই show of করার। তাই reality showতে প্রতিযোগীর ট্যালেন্ট বিচার্য নয়। সে রোগা না মোটা, cool না hot, সেটাই হয়ে দাঁড়ায় মুখ্য আলোচনার বিষয়। ছাঁচে ঢালা মনুষ্যত্ব কখনও টেঁকে না, বলেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রাশিয়ার চিঠি’তে। অভিভাবকদের বোধহীনতায় আজকের শৈশব শুধু “ভয়ে ভয়ে যাই, ভয়ে ভয়ে চাই / ভয়ে ভয়ে শুধু পুঁথি আওড়াই” (‘শিক্ষা’)। আমরা ভুলে যাই, সিংহের চামড়া দিয়ে গৃহসজ্জা সম্ভব হলেও চামড়া বদল কিন্তু সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন –- “ আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা যেমন মাতৃক্রোড়ে জন্মেছি, তেমনি মাতৃভাষার ক্রোড়ে আমাদের জন্ম। এই উভয় জননীই আমাদের পক্ষে সজীব ও অপরিহার্য” (‘সভাপতির ভাষণ’)।


আর এখানেই অত্যন্ত জরুরী হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’। খোলা আকাশের নিচে শিশুদের সঙ্গে হাত মেলায় তাদেরই মাতৃভাষা –- “ছোট খোকা বলে অ আ / শেখেনি সে কথা কওয়া” অথবা “হ্রস্ব উ দীর্ঘ ঊ / ডাক ছাড়ে ঘেউ ঘেউ”। কিংবা “ঘন মেঘ বলে ঋ / দিন বড়ো বিশ্রী”। রবীন্দ্রনাথ জানতেন, শিশুদের সমস্ত কিছুই গেলানো হয় তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। ফলে বাধাপ্রাপ্ত হয় তাদের মনের স্বাভাবিক বিকাশ। ‘তোতাকাহিনী’তেও একথাই বলেছেন তিনি। চেয়েছেন শিশুদের জন্য এমন একটা আকাশ, যেখানে ইচ্ছেডানা মেলে দিয়ে প্রয়োজনীয় ওড়াটুকু শিখে নেবে তারা আনন্দের সঙ্গে –- স্বেচ্ছায়। যেখানে সিন্ডরেলার গল্প শুনিয়েও মায়েরা গাইবে ঘুমপাড়ানী গান –- “হাট্টিমাটিম টিম / তারা মাঠে পাড়ে ডিম / তাদের খাড়া দুটো শিং / তারা হাট্টিমাটিম টিম”। “Baba black sheep have you any wool” আজকের শিশুরা নিশ্চয়ই আওড়াবে, কিন্তু একইসঙ্গে শিখবে –- “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে / বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে”।

শুদ্ধ মাতৃভাষা নয়, ভুলভাল ইংরেজি বা গোঁজামিল হিন্দি বলাটাই আজকের বাঙালির ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। স্বজাতীয় নাড়ীর যোগ থেকে বাঙালির জেনারেশন ‘Y’ আজ তাই বিচ্ছিন্ন। এই প্রসঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, --“আমার ভাবা যখন আমার নিজের মনোভাবের প্রকৃষ্ট বাহন হয়, তখনই অন্য ভাষার মর্মগত ভাবের সঙ্গে আমার সহজ ও সত্য সম্বন্ধ স্থাপিত হতে পারে” (‘সাহিত্যের পক্ষে’)। একটি শিশু তার সব রকম দুরন্তপনার পর ফিরে আসে তার মায়ের কাছে। মায়ের স্পর্শ, মায়ের গন্ধ শিশুর জীবনীশক্তি। যার সে-মা নেই, কথা শেখার প্রথম শব্দে যে নির্দিষ্ট কাউকে সম্বোধন করতে পারে না, সে শিশু বড় অসহায়। এই ফাঁককে –- অপূর্ণতাকে কেউ কখনো পূর্ণ করতে পারে না। কারণ মায়ের তো কোনো বিকল্প নেই! মাতৃভাষারও হয় না।

০৫ শম্পা ভট্টাচার্য

বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারে
শম্পা ভট্টাচার্য

সে এক মহা সংগীত। হৃদয়ে তার মন্দ্র ধ্বনি। সেই ধ্বনিতে চিত্তের হারিয়ে যাওয়া, মেঘের মাঝখানে। নীল নব ঘনে আষাঢ় গগনে “তিল ঠাঁই”দেখতে না পেয়েই মহাকবি গেয়ে ওঠেন “ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে”। ১৩০৮ বঙ্গাব্দে শ্রাবণ মাসে লেখা “নব বর্ষা” প্রবন্ধটিতে কবি ব্যক্ত করেন, “আষাঢ়ের মেঘ প্রতি বৎসর যখনই আসে তখনই আপন নূতনত্বে রসাক্রান্ত ও পুরাতন তত্ত্বে পুঞ্জীভূত হইয়া আসে”। কবির ভাষায় সে মেঘ পথিক, “আসে যায়, থাকে না”। তাই প্রতিদিনের ব্যবহারে যে চির পরিচিত পৃথিবী -- কখনও যা জীর্ণ, কখনও বা পুলকিত, সেই জীবনের দৃষ্টিতেও যখন একফোঁটা কৃষ্ণবর্ণ মেঘের আগমন ঘটে, তখন ‘শত বরণের ভাব উচ্ছ্বাস’ কলাপের মতো বিকশিত হয়ে ওঠে; কারণ মেঘ প্রতিদিনকার মানুষকে নিয়ে চলে অভ্যস্ত গণ্ডীর বাইরে। এই নব আগত মেঘের সঙ্গে সেই নৈমিত্তিক জীবনের নেই কোনো যোগ; সে মেঘ নবীন, তার বিদ্যুৎ-দীপ্তি, তার গর্জন, বর্ষণ সবই নিত্য নূতন রূপে প্রতিভাত হয় দর্শক চিত্তে। আসলে জানা জগতের মধ্যে থাকে না কোনো রহস্য, কিন্তু -- “পূর্ব দিগন্ত স্নিগ্ধ অন্ধকারে আছন্ন করিয়া কোথা হইতে সেই শত শতাব্দী পূর্বেকার কালিদাসের মেঘ আসিয়া উপস্থিত হয়। সে আমার নহে, আমার পৃথিবীটুকুর নহে; সে আমাকে কোন অলকাপুরীতে, কোন চির যৌবনের রাজ্যে, চির বিচ্ছেদের বেদনায়, চির মিলনের আশ্বাসে, চির সৌন্দর্যের কৈলাসপুরীর পথ চিহ্নহীন তীর্থ অভিমুখে আকর্ষণ করিতে থাকে”। তখন মন ছুটে যায় শূন্যে, অনন্তে। কালিদাসের কাব্যের শিপ্রা, অবন্তী, বিদিশা, উজ্জয়িনী উপস্থিত হয় মানবমনের মানসলোকে, আর হৃদি ভেসে যায় ‘যার পায় নি দেখা তার উদ্দেশে’ । যে দেশ চলে গেছে রাজার পুরে, তেপান্তরের শেষে।


এই বর্ষা পূর্ণতা পায় কেকা ধ্বনিতে, ভেকের মিলিত আনন্দসঙ্গীতে, কখনো বা ঝিল্লির ঝঙ্কারে। কিন্তু এই নব বর্ষায় লুকিয়ে আছে এক অন্তর্বেদনার ভাষ্য। আর সেজন্যেই কি রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ বর্ষণ সঙ্গীতের মধ্যে লুক্কায়িত মনের বেদন? বর্ষার আগমনে কবিচিত্ত মত্ত মদির বাতাসে শতেক যুগের গীতিকা রচনা করেছেন, কিন্তু এই মেঘ ব্যক্তিমনকে নিয়ে যায় সুদূরে, অলকাপুরীর পথে। তাই বৈষ্ণব কবিও রাধিকার বিরহকাল হিসেবে এই বর্ষা কালকেই নির্বাচন করেছেন এবং বিশ্বের বিরহী কণ্ঠের আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছে রাধিকার ক্রন্দনগীতির মধ্যে দিয়ে –- “মত্ত দাদুরী ডাকে ডাহুকী / ফাটি যাওত ছাতিয়া” কিংবা “এ ভরা বাদর মাহ ভাদর / শূন্য মন্দির মোর”। রবীন্দ্রনাথ ‘মেঘদূত’ প্রবন্ধে লিখেছেন -- প্রতিটি মানুষই অনন্ত বিরহী। বিরহী মন তখন মেঘকে সঙ্গী করে পাড়ি দিতে চায় সেই ঊর্ধ্বলোকে, কিংবা নিজের মানস প্রিয় বা প্রিয়ার কাছে, কারণ বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে সব কিছু মিলিয়ে একটা ঘনঘটা উপস্থিত হয়, তখনি মনে হয় ‘সে আসিবে আমার মন বলে’, বেজে ওঠে বেদন বাঁশি, গোপন ব্যথা ছড়িয়ে যায় সকলখানে ‘গানে গানে’, আর মন চায় অশ্রু লবণাক্ত সমুদ্রকে পেরিয়ে বন্ধুর হাত ধরতে ; গেয়ে ওঠে গান --

“বন্ধু, রহো রহো সাথে
আজি এ বাদলে, আকুল হাওয়ায় রে
কথা কও মোর হৃদয়ে, হাত রাখো হাতে”...




০৬ সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

কবিগুরুর নোবেল বিজয়ের শতবর্ষে : লহ সালাম
সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ


দুই শ্রেণীর মানুষের সাহচর্যে আমাদের চলতে হয়। এক শ্রেণীর সাহিত্যমনা এবং অন্য শ্রেণীর সাহিত্যবিমুখ মানুষ। সাহিত্যবিমুখ মানুষদের নিয়ে আলোচনার কিছু নেই। সাহিত্যমনা মানুষদের মধ্যেও আবার দুই শ্রেণী আছে। এক শ্রেণী যাঁরা সাহিত্য নিয়ে কাজ করেন, সাহিত্য বোঝেন, সাহিত্যের গভীরে বসবাস করেন। তিনি কবি হোন বা লেখক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক কিংবা পাঠক অথবা সমালোচক। আর এক শ্রেণী আছে যাঁরা কোনো কিছু না বুঝেই সাহিত্যকে ভালোবেসে যান। যাঁরা সাহিত্য বোঝেন না কিন্তু ভালোবাসেন, তাঁদের নিয়েও কোনো কথা নেই। যাঁরা সাহিত্যের ঘাটে পেতেছেন শয্যা, তাঁদের মধ্যে আবার দুই শ্রেণী আছে। এক শ্রেণী অসম্ভব রবীন্দ্রভক্ত। প্রাত্যহিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তাঁরা কিছুই বোঝেন না। তাঁদের গোটা জীবনটাই রবীন্দ্রময়। আর এক শ্রেণীর মানুষ আছেন, যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করেন না। সব সময় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধাচারণ করাই তাঁদের একমাত্র কাজ। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির মর্যাদা বা কবিগুরু বাংলা সাহিত্যকে কতটা ওপরে নিয়ে গেছেন, সেটা বোঝার জ্ঞান তাঁদের নেই। তাঁরা মূর্খ, তাঁরা বুরবক, তাঁদের নিয়ে আলোচনা করে কাগজ কালির অপচয় নিছক অর্থহীন। কিন্তু যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ের গভীরে লালন করছেন, তাঁদের মধ্যেও দুই শ্রেণীর রবীন্দ্রপ্রেমী আছেন। এক শ্রেণী রবীন্দ্রনাথকে পড়ে, জেনে, বুঝে রবীন্দ্রভুবনে বসবাস করছেন; আর এক শ্রেণী ঠিক ততটা রবীন্দ্রনাথের গভীরে ঢোকেননি, তবে নিজেকে আঁতেল হিসেবে জাহির করার জন্যে রবীন্দ্রভক্ত সেজেছেন। তাঁরা কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের দু’একটি কবিতার লাইন ঝেড়ে দেন, গুনগুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গান করেন, বন্ধুমহলে ‘শেষের কবিতা’র অমিত বা লাবণ্যের সংলাপ আওড়ে বাহবা কুড়ান।


২০১৩ সাল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয়ের শতর্ষ। ঠিক একশো বছর আগে কবিগুরু তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কবিগুরুর সেদিনের নোবেল বিজয়ে বিশ্বের কোটি কোটি বাঙালি, বাংলাভাষাপ্রেমী আনন্দের সাগরে ভেসেছিল। খুশিতে উদ্বেলিত, উদ্ভাসিত হয়েছিল গোটা বাঙালি জাতি। তবু কিছু মানুষ রবীন্দ্রনাথের নোবেল বিজয়ে খুশি হতে পারেনি। তারা নোবেল বিজয়ের গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল তাদের জ্ঞানের অভাবের কারণে।

রবীন্দ্রনাথের সেদিনের নোবেল বিজয় ছিল গোটা বাঙালি জাতির নোবেল বিজয়। নোবেল জয়ের মাধ্যমে কবিগুরু বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে সম্মানের সাথে তুলে ধরেছিলেন। আজও বিশ্বে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে আমাদের পরিচিত হতে হয়। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ আজও বাংলাদেশের নাম জানে না, পশ্চিম বাংলার নাম জানে না, আসাম বা ত্রিপুরার নামও জানে না। কিন্তু তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম জানে। আর সেই কারণে জানে বাংলা ভাষার কথাও। আর এই কারণেই সব বাংলাভাষীকে আজীবন রবীন্দ্রনাথের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে; তাঁকে ভালোবেসে হোক বা ভালো না বেসে।

যে রবীন্দ্রসুধা পান করেনি, সে অধম। যখন ক্লান্তি আর অবসাদ জীবনটাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ। কবিগুরুর গান আর কবিতা মুহূর্তের মধ্যে মনটাকে ভালো করে দেয়। কবিতা, গানে কবিগুরুকে বাংলা সাহিত্যের শীর্ষস্থান থেকে সরানোর ক্ষমতা কারও নেই। তুলনামূলকভাবে কম উপন্যাস লিখলেও সেখানেও শীর্ষ সারিতেই তাঁর অবস্থান। চিত্রাঙ্কন বা ইংরেজি লেখাতেও পিছিয়ে ছিলেন না। মোদ্দা কথা, বাংলা সাহিত্য যতদিন থাকবে, ততদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচে থাকবেন স্বমহিমায়। আর তার প্রমাণ, তাঁর জন্মের দেড়শো বছর পরেও রবীন্দ্ররচনার প্রতি পাঠকদের আগ্রহ। যত দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে তাঁর বই বিক্রি। পাঠকেরা আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়ছে তাঁর প্রতি। এক সময় গোটা বাংলা সাহিত্যই হয়ে উঠবে রবীন্দ্রময়। নোবেল বিজয়ের শতবর্ষে গুরুদেব তুমি লহ সালাম!

০৭ আলী হোসেন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন
আলী হোসেন


যদি প্রশ্ন করা হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী? মনে হয় অনেকেই ঘাবড়ে যাবেন। কেউ বলবেন, তাঁর বাবা যখন ব্রাহ্ম ছিলেন তাহলে তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্ম। যাঁরা লেখাপড়া জানেন না, তাঁরা বলবেন, কেন! উনি তো হিন্দু ছিলেন। আবার কেউ কেউ তথ্য সহযোগে বলার চেষ্টা করবেন, উনি নাস্তিক ছিলেন। না হলে কেউ বলতে পারেন, ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো!১

তাহলে সঠিক উত্তরটা কী? আসলে এর কোনোটাই সঠিক উত্তর নয়। চিন্তাশীল মানুষ সারা জীবন ধরে ভাবে, ভাবতে ভাবতে তার উপলব্ধি বাড়তে থাকে ক্রমশ প্রগতির পথে। জগৎ ও জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একে একে গড়ে তোলে নিত্যনতুন জীবনদর্শন। তাই এ ধরনের মানুষ আজীবন এক এবং অখণ্ড জীবনদর্শনের বার্তা বহন করে না। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় তার পথচলার গতিমুখ। মানুষ রবীন্দ্রনাথও তাই পাল্টে ফেলেছেন তাঁর জীবন ও ধর্মদর্শন, সময়ের বয়ে যাওয়াকে অনুসরণ করে।

১৮৬১ সালের ৭ই মে সোমবার রাত্রি ২টা ৩৮ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এর ঠিক ১২ বছর ৯ মাস ১৮ দিনের মাথায় তাঁর প্রথম স্বাক্ষর করা কবিতা ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, যা তিনি ‘হিন্দুমেলা’র দশম বার্ষিক অধিবেশনে আবৃত্তি করেন। অর্থাৎ হিন্দুমেলার মতো হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে বাল্যকালেই। সুতরাং হিন্দুধর্ম এবং এই ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগসূত্রতা প্রতিষ্ঠা করে তাঁর ধর্মদর্শনের চরিত্র। যদিও এই চরিত্র তাঁর সচেতন মনের অভিব্যক্তি মোটেই নয়, নিশ্চিতভাবে আরোপিত। কিন্তু তাঁর কিশোর মনের উপর যে এই ঘটনা প্রভাব ফেলবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। বলা যার তার প্রভাবের সুদূর প্রসারী উপস্থিতির কথা। ‘ব্রাহ্মচর্যাশ্রম’এ কায়স্ত শিক্ষক কুঞ্জলাল ঘোষকে ব্রাহ্মণ ছাত্ররা প্রণাম করবে কিনা এ প্রশ্নে অখুশি হয়েও তিনি লেখেন, ‘যাহা হিন্দু সমাজ বিরোধী তাহাকে এ বিদ্যালয়ে স্থান দেওয়া চলিবে না’। এটা ছিল তাঁর ধর্ম চেতনার প্রাথমিক পর্যায়।

আসলে ইউরোপীয় নবজাগরণ, দ্বারকানাথের কর্মযোগ, সৃষ্টিশীলতা, সতর্ক উদ্যম, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞান এবং দেবেন্দ্রনাথের নিরাসক্তি, ঐতিহ্যবোধ, পরিশীলিত সাংস্কৃতিক চেতনার শোণিত ধারায় রবীন্দ্রনাথের জন্ম।২ তাই তাঁর চেতনার বিভিন্ন স্তরে আন্তর্জাতিক মানবতাবাদ, বিজ্ঞান মনস্কতা, সর্বভারতীয় ঐতিহ্য, সষ্টিশীল প্রজ্ঞা, আত্ম চেতনাশ্রয়ী ধর্মবোধ দৃঢ়বদ্ধ ছিল। এই পর্বে দেখতে পাচ্ছি রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন, তত্ত্ববোধিনী সভা, তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন। এই পর্বে ব্রাহ্মসমাজের ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন হিন্দু পুনরুত্থানবাদের এক শক্তিশালী স্রোতকে। তাই এ সময়ের ধর্ম-ভাবনার গতিমুখে কিছুটা বিপরীত স্রোতের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে গভীর দৃশ্যটিতে দেখলে বোঝা যায় তাঁর এই চিন্তার গতিমুখ ছিল প্রগতিমুখি। কেননা, যিনি কেশব সেনের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মসমাজের সচিব পদে বসে ব্রহ্ম মন্দির ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত উপাসনা করে চলেছেন, তিনিই আবার ধর্মকে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক শোষণের অন্যতম অস্ত্র বলে অভিহিত করছেন।

মানুষের জীবনে চল্লিশ বছর খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সময়। মহামানবদের জীবনে তো বটেই। বয়স চল্লিশ পেরোলেই চেতনার মান সর্বোচ্চে পৌঁছায়। মহামানব হজরত মহম্মদ নবুয়ত পেয়েছিলেন চল্লিশ বছর বয়স পার করেই। রবীন্দ্রনাথের জীবনেও এই সময় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯০৫ সালে পিতার মৃত্যুর পরই তাঁর ধর্মভাবনায় আসে আবারও পরিবর্তন যা তাঁর ধর্মভাবনায় বিবর্তনের তৃতীয় পর্যায়। বিপ্লবোত্তর সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের চেতনা প্রবাহে নতুন শক্তি সঞ্চার করে। রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-চেতনার ক্রমবিকাশে রাশিয়া ভ্রমণ কী যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করে, তা তাঁর রাশিয়ার চিঠির পরতে পরতে বিধৃত হয়েছে। এই পর্বেই তিনি লিখেছেন, যে-রাজা প্রজাকে দাস করে রাখতে চায়, সে-রাজার সর্বপ্রধান সহায় হয় সেই ধর্ম, যা মানুষকে অন্ধ করে রাখে। ধর্মমোহের চেয়ে তাই নাস্তিকতা অনেক ভালো। লক্ষ্যণীয়, রবীন্দ্রনাথ তথাকথিত বিশেষ বিশেষ ধর্মের কথার ইঙ্গিত করেছেন।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, তিনি সাধারণ বা বিশেষ কোনো অর্থেই নাস্তিক ছিলেন না, ছিলেন বিশেষ ধর্মে বিশ্বাসী। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘অবশ্য ধর্মমত আমার আছে, কিন্তু কোনো সম্প্রদায় আমার নেই’। আর সে কারণেই তাঁকে ব্রাহ্মও বলা যাবে না। এবারও তাঁর উক্তি, ‘আমি নিজেকে ব্রাহ্ম বলে গণ্যই করিনে’ আমাদের ভাবনাকে সমর্থন করে।

তাহলে কী সেই বিশেষ ধর্ম? তিনি মনে করতেন, ধর্ম হচ্ছে সভ্যতা। মানুষের যা কিছু প্রয়োজনীয় গুণ, যে গুণ সভ্যতাকে নির্মাণ করে, তাকেই তিনি ধর্ম বলে অভিহিত করেছেন। মানুষের এই প্রয়োজনীয় গুণ হচ্ছে মনুষ্যত্ব। তাই ধর্ম তাঁর কাছে আচার-অনুষ্ঠান নয়, প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা হিন্দুধর্ম বলি, সে তাও নয়।৩ সে ধর্ম হচ্ছে সেটাই যা --

শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,
শাস্ত্রে মানে না, মানে মানুষের ভালো।
তাই, হিন্দু নয়, ব্রাহ্ম নয়, নয় নাস্তিকও। তিনি হলেন মানব ধর্মের অনন্ত পথ যাত্রী।
------------------------------------------------------------------------
১. রাশিয়ার চিঠি
২. অনুনয় চট্টোপাধ্যায় -– বর্ণ, ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ
৩. কমলেশ সেন -– রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম
৪. পরিশেষ / ধর্মমোহ



০৮ অনুপম মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথ
অনুপম মুখোপাধ্যায়


এই যে একটা গদ্য লিখতে বসলাম, আমার বয়স আর ৩৪ থাকল না, ১৬ হয়ে গেল... পাঠক, এক কিশোরের লেখা পড়ুন।

শীর্ষেন্দুর ‘ঘুণপোকা’ উপন্যাসের সেই চরিত্রটার মতো অবস্থা আমার। সে লোকটা রবীন্দ্রনাথকে তার আস্তিকতার এক নাম করে তুলেছিল, আমি আমার সকল মুগ্ধতা তাঁকে দিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে বসে আছি। এ কি একরকম সর্বনাশ! হতে পারে। সেই ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে লোকটাকে খুঁজে চলেছি, নিজের সঙ্গে মেলাতে চেয়েছি কতরকম ভাবে... কত যে লোভ হয়েছিল সেই শান্তিনিকেতনে গিয়ে ওঁর ওই বিরাট জুতোজোড়ায় একবার পা গলাতে, কাচের ঘেরাটোপে ঝুলে থাকা জোব্বাটা গায়ে দিতে, ওই চেয়ারগুলোয় বসে পড়তে একবার চুপিসাড়ে... যদি পারতাম, কে জানে আর হয়তো কবিতা লিখতে পারতাম না, কিংবা... লিখে ফেলতে পারতাম কবিতা।


যে আগ্রহ নিয়ে একদা ‘ছিন্নপত্রাবলী’ পড়েছি, মনে হয় না আর কোনো বই পড়ছি, বা পড়ব। ছাত্রজীবনে পরীক্ষার সকালে একদম না পড়া বইগুলোও ওভাবে পড়িনি। যে কৌতূহলের সঙ্গে পড়েছি প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’... শার্লক হোমসকেও পড়িনি, আগাথা ক্রিস্টিকেও না। ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’... বারবার মনে হয়েছে ওই মহিলা কত ভাগ্যবতী! পৃথিবীতে মৈত্রেয়ী দেবী যা পেয়েছেন, আর কেউ পেয়েছেন কি! কিংবা... ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, রাণু...। রবীন্দ্রনাথ চাইলে হয়তো আমি সমকামীও হয়ে যেতে পারতাম!

‘তবু মনে রেখো...’ স্বকন্ঠে ওঁর ওই গান আমার মোবাইলের রিংটোন। কলার টিউনেও রবিবাবু। কেউ হয়তো স্টাইল স্টেটমেন্ট ভাববেন। সেটা নয়। তবে স্টেটমেন্ট তো অবশ্যই। ওঁর গান... একমাত্র ওঁর ছবির সঙ্গে ওঁর গান মেলে, আর কিছুর সঙ্গে নয় স্বয়ং জীবন ছাড়া।

রবীন্দ্রনাথের অমৃত শুধু নয়, আমি নিজের গরলকেও মিলিয়ে নিতে চাই বারবার ওনার বিষের সঙ্গে। রবিদাদা আমার কালোর কৈফিয়ত। নিজের শয়তানের সাফাই। এটা অবশ্য আপনাদের সঙ্গে আলোচনা না করাই ভালো। যদি কখনো আত্মজীবনী লেখার কোনোরকম দুর্যোগ আসে, তখন আর এড়ানো যাবে না।

আর... আমি রবীন্দ্রনাথের হয়ে লিখতে যাবো কেন? উনিই তো আমার হয়ে অনেক কিছু লিখে গেছেন! ভাগ্যিস একটা ‘চতুরঙ্গ’ আমাকে আর লিখতে হবে না! ভাগ্যিস...





০৯ টেগোর ম্যানুস্ক্রীপ্ট





১০ টেগোর পেন্টিংস










<<< কবিতার কালিমাটি / ২৬ >>>

কবিতার কালিমাটি / ২৬

কবিতা লিখেছেন সমীর রায়চৌধুরী, ভূমেন্দ্র গুহ, বারীন ঘোষাল, আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ, সোনালি বেগম, কাজল সেন, অনুপম মুখোপাধ্যায়, সুমিতরঞ্জন দাস, অথির শেরপা, লিপিকা ঘোষ, অমিতাভ মৈত্র, রঞ্জন মৈত্র, ধীমান চক্রবর্তী, সাজ্জাদ সাঈফ, সাঁঝবাতি, স্বপন রায়, অলোক বিশ্বাস, উমাপদ কর, প্রণব বসুরায়, কচি রেজা, তন্ময় ভট্টাচার্য, কিরীটি সেনগুপ্ত, সুবীর সরকার, অজিত দাশ, ঊষসী ভট্টাচার্য, খালেদ চৌধুরী, দেবরাজ চক্রবর্তী, ইন্দ্রাণী সরকার, দেবযানী বসু এবং দীপঙ্কর বরাট।

০১ সমীর রায়চৌধুরী

ব্রাক্ষ্মণ ব্রাক্ষ্মণীর দাম্পত্য কাহিনী
সমীর রায়চৌধুরী



ভাষাদেশের দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে এই প্রেম কাহিনী
বরফ বরফি
ব্রাক্ষ্মণ ব্রাক্ষ্মণীর জমাট বাঁধা দাম্পত্য
বরফির মিষ্টি স্বভাব
বরফ চায় সংরক্ষণ
দাম্পত্যের উষ্ণতায় সে গলে যায় অনায়াসে
দুজনেই অবস্থানপন্নতায় অভ্যস্ত
আমাদেরই মতো ক্ষণস্থায়ী
এই আছি এই নেই
জন্মান্তরে অবিশ্বাসী
রূপান্তরে তার রূপের কদর...
নির্লিপ্ত নিয়তি...




০২ ভূমেন্দ্র গুহ

অনেক শহর
ভূমেন্দ্র গুহ



অনেক শহর আমি দেখেছিলুম আমার ছেলেবেলায়,
তাদের কোনও একটার ভিতরে তুমিও ছিলে, সে-সব
শহর আমি হারিয়ে ফেলেছি, আজ আর মনেও করতে
পারি না।

সে-দিন খুব বৃষ্টি হয়েছিল, উঠোন-ভরা জল-কাদা-ব্যাঙ
তুমি সেই বৃষ্টির জলে ভিজে বৃষ্টির ভিতরে খুব নেচেছিলে,
একবারও পিছলোওনি, নাচছো বোধহয় আজও; আজও
খুব বৃষ্টি হচ্ছে, -- কিন্তু তুমি মৃত।

আমি খুব দৌড়তে পারতুম, জানো তুমি। দৌড়োলুম—
দৌড়োলুম যতক্ষণ না আমি আমার ছেলেবেলাকে
অনেকটাই পিছনে ফেলে রেখে এসে পৌঁছলুম হাঁফাতে—
হাঁফাতে বুড়ো বয়েসের এই সাদা প্রাসাদে, দেখলুম
বিশালতা, দেখলুম শূন্যতা –- কেউ কোথাও নেই।

যে-রাস্তাটায় দৌড় শুরু করেছিলুম, তার শুরুটা আজ আর
দেখতে পাই না; তোমাকে দেখতে পাই না, আমাকে
দেখতে পাই না –- যে-রকম দেখতে ছিলুম আমি, তাকে।

গত-কাল, কাল, আসছে-কাল –- ক্ষণ-কালের এই
মরুযাত্রীদল কত কাল ধ’রে-যে কত দূর থেকে-যে চলেছে
এক কিছু-না’র থেকে আর-এক কিছু-না’য় –- প্রগাঢ়
একক শূন্যতাকে ছুঁয়ে থেকে-থেকে : মরুভূমির পথের
এক চটি থেকে আর-এক চটিতে আমি শুধু গড়িয়ে ফিরেছি।

যে-চটিতে আজ আছি আমি, অনেকটাই বুড়ো বয়েস;
যে-চটিতে ছিলে তুমি অল্প-বুড়ো বয়েস –- ছিলে এবং
শেষ-পর্যন্ত ম’রে গিয়েছিলে, সেই চটিতে আমিও ছিলুম
পথের ও সময়ের নিয়মাধীন : তোমাকে দেখিনি; মনে হয়,
দেখিনি আমাকেও, -- তাকে, যে দেখতে আমার মতো ছিল।



০৩ বারীন ঘোষাল

টেবিল টপ
বারীন ঘোষাল



এত অন্ধ কার
টেবিল টপে কনক খনক যা যা আলো
যাকে পুঞ্জ বলতে তোমরা
জ্বর
           তাসা      রোম    রোম
আয়নায় পারা মোছা হাই
                        নাচ পাগল               দলে নাচ
                                            সস-না ছড়ানো
বসন্তের ছবিতে এই সব স্যাবোটেজ করা হলো
ট্রেনের লাইন ফসকে যাবার বিরাম স্প্রিংগীতে

টেবিল টপ পাহাড়ে চেয়ার পেতে বসে দেখছি
বিমানের ছায়া গড়িয়ে যাচ্ছে টিলার কন্টুরে
         ৪ + ২         ৩ + ৩        ৩ + ৪     বোল
এই মাত্র কিনায় পত্রমোচন হয় না ধরো
এই ফাগুনে

হেহোলি ভাষায় ঝরাপাতার যা মানে
                      লাইন পাতানো খুলে রেখেছে জঙ্গি
                      যাচ্ছে ট্রেনের আলোকিত জানালারা
জানালা ছেড়ে দুদ্দূর পশ্চিম শিখায়
টেবিল টপের মোম গড়িয়ে থামলো 


০৪ আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

বিদেশি কবিতার দিকে তাকিয়ে
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ



ঝুলন্ত এই ভাইন ট্রির দিকে
একটি অবসর একটি ভীরু চোখ।
থোকা থোকা আঙুর ফলে
ছেলেমেয়েদের হাসিস আর হানিমুন।
ভাষার এই নকটার্ন জাগিয়ে তোলে
                            ঘুমন্ত ঘরছাড়াদের।

গ্লাইডিং
সুইমিং এক একটি স্ফুর্তিরেখা
হাওয়া আর সাওয়ারে আনছে
                            ঠাণ্ডা বিয়ারের স্টোরেজ।
পোড়া বাদামী কফির যোনিগন্ধ
আগুন লাগায় হিম পাতাল দমকলে।

যারা লিখছে তারাও বে-ভিউ খেলছে
হাতের মিনিজাল থেকে কবে সটকে পড়ছে
                             সোনালি ডানার স্যালমন!
সেইদিকে হারানো ট্যুরিস্টের মতো
তাকিয়ে আছে মৃদু বাংলা।
হাতে পালকি -- হাতে শীতভোরের
নৌকা এসে থামছে লাইব্রেরির ক্যাটালগে।


০৫ সোনালি বেগম

মুক্তি
সোনালি বেগম


আন্দোলিত মহাকাশ রাত্রির নট-বেহাগ সরোবর
বিনীত প্রার্থনা তবে সেরে নেবো আজ
ভস্মীভূত আগুন দৃষ্টিপাত নতমস্তক ।
ট্র্যাপিজ-ট্রাফিক এত মৃত্যু-শোক!
মাতৃভাষায় পুষ্পমালা ও চন্দন অভিষেক
হে মুক্তিযোদ্ধা! এসো ভোরের নট-ভৈরব সাজে --
সমস্ত অপশক্তির বিনাশ
বেদনার্ত হাত তরঙ্গিত নীল আকাশ


০৬ কাজল সেন

নীল মাফিয়া
কাজল সেন



কখন যে আকাশ থেকে থোকা থোকা নীল নেমে এসে
ঘিরে ধরেছে আমার ফেজ টু আবাসনের ৩০১ নম্বর ফ্ল্যাট
আর খোলা ব্যালকনির হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছে
আলট্রা ভায়োলেটের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন
সেই ছোটবেলা থেকে শুনেছি
চোখ নাকি খুব ভালো থাকে পর্যাপ্ত ভিটামিন এ-র দৌলতে
আর নাভিতে খুব কষে সর্ষের তেল দিলে
একদিন খুলে যায় দিব্যদৃষ্টির চোখ

পাশের ফ্ল্যাটের লছ্‌মী একদিন খুব মিষ্টি করে বলেওছিল
দাদা আপনার চোখদুটো না দারুণ সুন্দর
অনেকটা সেই যে গো
তরুণকুমারের দাদা অরুণকুমারের মতো

ভিটামিন বি আর সি-র অভাবে ভুক্তভোগী আমি
সেকেন্ড ফ্লোর উচ্চতার ব্যালকনি থেকে দেখি
শরীরের মাপজোক কীভাবে বদলে যায় রিখটার স্কেলে
আর সাদা মার্বেলের গুঁড়ো জমতে জমতে
কীভাবে একলা পায়ে একদিন আস্তিক ঈশ্বর

আকাশের নীল এভাবেই একদিন
আমাদের ফেজ টু আবাসনের সব পর্দায় আর বিছানায়
ঝুলিয়ে দেয়
নীল মাফিয়ার আশকারা আর বকোয়াস্‌


০৭ অনুপম মুখোপাধ্যায়

তেষ্টা
অনুপম মুখোপাধ্যায়



কাচের গেলাসটা ছেড়ে দিলাম হাত থেকে। মেঝে লাফিয়ে উঠল। জলমেশানো কা চ ভা ঙা র শ ব্দ... জানালা ফুঁড়ে ঢুকে এসেছে ক্যাম্বিসের বল।

ধরে নিই, জানালাটা দিব্যি আছে। ভাঙেনি। খেলাও জারি আছে। ভাঙেনি।

এই সব চাহিদা। মেটানোর মতো নয়।

কাচের নামে... বেদনা। কাঠের নামে... প্রেম। বৃষ্টির নামে... তোমার ওই মুখ।

তেষ্টার হোক একটু
আগ্রহ এবার



০৮ সুমিত রঞ্জন দাস

সুইসাইডিয়াল
সুমিত রঞ্জন দাস



রক্তে মিশে আছে সব সমানুপাতিক হারে --
বাল্যকাল স্নেহ মায়া মমতা...

আর ঈর্ষা?
মুহূর্তে ভেঙে গেল নৈঃশব্দের মৌনমুখরতা,
খোলা দরজা দিয়ে ছুটে এলো উত্তুরে হাওয়ার ডাকে
ড্রেসিং টেবিলে মাসকারার দাগ, পরিচিত ঘামগন্ধ
দুরদার শব্দে জানান দিল বসন্তরঙিন দিন;

আজ কোনো সূত্রেই তাদের মেলাতে পারি না।

জল থেকে তুলে এনে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম জীবনের
রোমে রোমে সেই অশ্রুসিক্ত আত্মসত্ত্বাই আজ বিদ্রোহী
ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে মৃত্যুঋণ, চাইছে হিসাব

কী করে বোঝাই, বড় হবার আর এক নাম আত্মহত্যা!

০৯ অথির শেরপা

আশ্চর্য এক বেদনা
অথির শেরপা



আশ্চর্য এক বেদনার সঙ্গে প্রতিশ্রুত আমি, মৃত্যু থেকে অবসর নিয়ে
আবার মৃত্যুর দিকেই বাড়িয়ে রেখেছি দীর্ঘ হাত...
হঠাৎ থেমে যাবে জানি পায়ে বাজা ঝিঁঝিঁর সেতার। হাতের জ্বলন্ত
সিগারেট আর তীব্র নীল শরৎকালের আকাশ জানে একটি অসমাপ্ত
জীবনের পান্ডুলিপি পড়ে আছে কোথাও –- মধ্যমণি হয়ে আছে নিঃসঙ্গ
টাওয়ার! আমি জানি টাওয়ারের মৌন অভিজ্ঞান
পৃথিবীতে বেঁচে থাকার শ্রেষ্ঠ দিনগুলোও একসময় আপেক্ষিক হয়ে
ওঠে

প্রেম তো শীতের কোকিল –- কুয়াশার হাওয়াই মিঠাইয়ে
থাকে লুকিয়ে... আর দ্রোহ বাঘ তথা হলুদ তুফান
মৃত্যুকে সম্পাদনা করে রেখে যাব আমি দুটি জ্বলজ্বলে চোখ
তাকিয়ে থাকবে যারা প্রেম ও দ্রোহের আকুতি নিয়ে...

১০ লিপিকা ঘোষ

কোশিশ
লিপিকা ঘোষ



খুব ভালবাসার মতো ক’রে ডাকলে
তোমাকে আদৌ ছোঁওয়া যাবে কি না
তা জানা না জানার মধ্যে দিয়েই
হেঁটে যাচ্ছে ডুব-সূর্যের আবীর মেঘ –-
ও মেঘে বিন্দু বিন্দু জমলে জমাট বাঁধবে,
এই যে ভর সন্ধ্যে মাথায় নিয়ে ফেরার পথ খুঁজছি
অথচ কিছুতেই কোনো হদিশ না মেলা গাঢ়,
তার এলোমেলো কোশিশ নিয়ে যে পাখিটা উড়ে গেল --
ডানা থেকে খসা পালকের টুপ আর
শিস দেওয়া তাগিদ ডাকছে তোমাকে।

১১ অমিতাভ মৈত্র

ইস্কাপনের রাজা
অমিতাভ মৈত্র


এই যুদ্ধমোরগ যখন হেরে ফিরে আসে আমি ভয় পাই
সেই ভয়ের চাপে আমার দুপুরের দোলনা হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে যায়
আর কাদা পায়ে উঠে আসে কালো অপেক্ষাহীন একটা গাড়িতে

গাড়ি চলতে শুরু করে
আমার হেরে যাওয়া যুদ্ধমোরগ লাল হয়ে যায়
রক্ত তেমন নেই, হেরে যাওয়া যুদ্ধমোরগ তবু লাল হয়ে যায়

১২ রঞ্জন মৈত্র

মেসেজ
রঞ্জন মৈত্র


বৃষ্টি নোকিয়া ওহো বৃষ্টি নোকিয়া
যে তুমি তাকিয়ে নেই
তার ফুল চেয়ে আছে
তার খোলা ছাতা
বেরিয়ে পড়েছি আর
বিরান তরঙ্গ ভেঙে ঝাঁঝরি হলো

পথের শিহর
এই পন্থী
ঘন দেরাজের গায়ে শার্সির বুদবুদ
সবুজ চলছে
তার স্নিকারের রুণ
তুমি চেয়ে নেই
ওয়ার একটু আগে শিরশিরে মেসেজ
একটু নড়ে ওঠা বাস
বেরিয়ে পড়েছি
আর চলাসড়কের চলা
আর পথগুলি ওহো বৃষ্টি নোকিয়া



১৩ ধীমান চক্রবর্তী

প্রত্যহ
ধীমান চক্রবর্তী


জীবনযাপন বৃষ্টি শুনতে চেয়ে
খুব –- চেকনাই। যতবার
যন্ত্রের সামনে দাঁড়াই, আমার ওজন
ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসে।
পিছন পিছন ঘুরে বেড়ানো বিবাহবাসর।
সে ফিরে যায় গড়ানো জলের
প্রথম দিনে। রঙিন
মোজা পরে হেঁটে গেল ইচ্ছেরা।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে প্যারামবুলেটর
আজ গাইছে মধ্যবয়সী ইস্কুল।
হাসিখুসি কবুতর বসন্ত, আহা!
সন্ধ্যালাগা একতারা।
জীবনের কিছু কিছু প্রত্যাখ্যান,
                           প্রাজ্ঞতা জাগিয়ে তোলে।
এই রাত্রিবেলা কফিকাপ হাতে –-
না চাওয়া কালপুরুষ। আর
ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি দুলে দুলে
                                উঠছে হাততালিতে।

১৪ সাজ্জাদ সাঈফ

কিশোর
সাজ্জাদ সাঈফ



রাফখাতা অব্দি সবুজ ছিল আমাদের স্কেচ, সন্ধ্যে নামার তোড়জোড় কুয়োর পাড়ে রেলগাড়ির পিষে যাওয়া পাথর জমিয়ে এক অনুবাদহীন বেদনার খড়চাপা দিনদুপুরে মতির মুদিতে রেডিও শুনি, একটানা নাক ডাকা শব্দ যেমন গড়াগড়ি খায় খিস্তিতে, ঠিক সে রকম উগলানো ঢপ; হাতে-নাতে জোটে আপিস ফেরত বাপের ধোলাই, উহ, দিনটা ছিলো ঘুম তাতানো বৃষ্টি জলের, আমরা তখন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট খেলি; হিজল পাতার ঘূর্ণিপাকে রুক্ষ দুপুর, আজ, অনুভূতিহীন মনের শেষে দাগ টেনে দেয় বৃষ্টিজমা চিঠির রুলিং; আমাদের কাচাঘরে জন্ম, তিলে তিলে মাটির আঁচড়; সুপুরি তোলার উত্তেজনায় ক্যারোটিড পালস্‌, নুড়িতে বাকলে জমা উহ্য লিপি, ধানের ছড়ায় পাই সবুজঘেঁষা এক রোমিও কিশোর!

রাফখাতা অব্দি এখন বাড়তি ডিজেল, বেড়েছে ভাড়াও, সে তো কম বেশি দু'শ কিলো হবেই, যেতে!


১৫ সাঁঝবাতি

দহনের দিন
সাঁঝবাতি


লাল রঙেরা বেজে উঠছে এস্রাজের তারে
সকালের মতো সিঁদুরে মেঘে
রেওয়াজে রেওয়াজ মাখামাখি
আমার গরীব আকাশমহল্লার।
তুই গা ভেজাবি বলেই
আমার স্নানঘরের গান
আমার মেঘমল্লার, তোর চান ছুঁয়ে বাজে
গমগমে চৌষট্টিকলায়।
চুম্বন দূরত্ব জমে থাকে তোর
ঠোঁটের ওপর। নরম ঘাম।
দুষ্টু রোদ্দুরে আমায় আকুল করে পুড়তে দে
আমি তোর নামেই শীৎকার নিয়ে
ঘুমোতে যাবো,
খালি, খালি শরীরে...

১৬ স্বপন রায়

আবহাওয়া
স্বপন রায়



রঙ নিয়ে মনে হলো আজ আর ফুটবে না! যে অন্ধকারে শিথিল খুব শুয়ে শুয়ে থাকে
আর আমার ট্রিঙ্কাস... চিলড্‌ কিন্তু শাড়ি না পরার অবহেলায় ঠেসে ধরা মার্জিন, পুরু টেন্টে
লাগানো বঙ্গীয় চাঁদ, চাঁদু

রঙ এক ধারণায় এসে জিরোন, তাতে শ্যাম ঘন হয়ে শাড়িকে উদার লীলা, টপ টপ
কোনো এক বিস্ময়ের আড়াল দিয়ে বৃষ্টিঘের মৌসিন যেন, ব্রাম রাম বৃষ্টি আর ঘুরে
বসবে না, রং তো সেই স্টিলেটোর হাই, আজ সোঁদা গন্ধে মেশানো, আজ আর ফস্কাবে না
শেষ লোকাল

চাঁদের ফাটাফাটিতে ঢুকছে বারাসতের লম্বা মেয়েলি ভয়...








১৭ অলোক বিশ্বাস

অতনুর নামগন্ধ
অলোক বিশ্বাস



হায়হায় : সন্ত্রাস দিয়েছে যে জল, সেই জল স্বাভাবিক নয়... সেই জলে ডুবে কারা পাথর তুলেছে আর ভুলে গেছে তাহাদের আশ্রম যারা সজনে ডাঁটার চচ্চড়ি খাইয়েছিল... ভোলার কথা নয় যারা ছানার মালপো খাইয়েছিল আর ব্যাকুলতায় জাগিয়ে দিয়েছিল রৌদ্ররসের পিপাসা... হু হু করে সন্ত্রাস ঢোকার পর আমাদের বড়বেলাগুলো উলটেপালটে গেল... পরিস্রুত জলও স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে খুব সন্দেহ হয়


বলা : আমি আর ইঞ্জেক্সন নেবো না... শাকপাতা খেয়ে যাবো... শাকপাতা খেতে খেতে বিষাদ পাল্টে কল্পনাজ্বর বালক হয়ে যাবে... উপমায় দুঃখ বেশি বললে হৃদয় হাল্কা তো হয়ই না, বরং ওভেন ধরাতে গিয়ে আঙুল পুড়ে যায়... আমি চাই না ডাক্তার খুঁটিয়ে প্রশ্ন করুক, যা বলার নিজেই বলবো... কমিয়ে বলব যাতে খাদ্য তালিকায় ডাক্তারের হাত বেশি না পড়ে... মাত্র একটু মিথ্যার যদি প্রতিধ্বনি বজায় থাকে বললে ক্ষতি কি ভাষাতীত সঙ্গীতের




১৮ উমাপদ কর

তিনটি কবিতা
উমাপদ কর


(ক)

ধরাযাক তোমার কাছ থেকে নিলাম খোঁপার কাঁটা... বিঁধতে জানে। তুমি নিলে আমার জামার বোতাম আর বললে –- চলো ফুল হই। বাজনা বাজছে, ধামসা... এবং বাঁশি... আমাদের কোমর দুলতে লাগলো সাগরঢেউ... আরও কয়েকজন পা মেলাচ্ছে... কয়েকজন প্রস্তুত...

শাড়ির পাড় লাল... ব্লাউজের রঙ লাল... শিমূল লালে লাল... পলাশ... এবং বুকের ভেতরটা... দেখতে পাচ্ছি বেশ... তুমি আর লাল না হলেও চলবে... বাদামি হাতে এই তোমার খোঁপায় লাল কাগজফুল গুঁজে দিলাম... পা চালাচ্ছে মহুয়া...

অন্ধকারের ভেতর থেকে দুজনে ছিটকে আলাদা হলাম... অন্ধকারের ভেতরেও এত লাল... বললে –- চলো, আরও লাল হই...

(খ)

কতই বা আকাশি বয়স তখন কত নীল উড়ু উড়ু। কতক প্রাচীন নবীন কাক একটুকরোয় ‘মধুর ধ্বনি বাজে’ –- শেষ হতে চেয়ে একসময় ভীষণ মৃদু... গন্ধ লুকোতেও জানে না...

হাইজাম্পের সুতোয় সবাই আটকে যাচ্ছে পায়ে পিঠে... দৌড় শুরু করার আগেই ভাবনা কাম বাসনা সেলফোন মোড়া ভাসছে... আগুন লাফিয়ে লাফিয়ে চলে আসছে দোরগোড়ায়... আগলের পাশে সামগান আর সমিধের সূত্র ধরে তদন্তে আসে বিপন্ন কাক... কিছুতেই যে অবসাদ মোছে না তার গালে মেচেতার দাগ...

কোনো কুহু নেই, ডাহুক নেই, কিন্তু সময়টা সমলয়ে... কিছু ফিসফাসের ছায়া। কিছুতেই ছুঁতে দিচ্ছ না তোমার শরীরের আমচুর আর স্তনভার জনিত ব্রীহা... সময়ের মধ্যে সময়হীনতার ব্ল্যাকহোল...

(গ)

গামছার বদলে পরানকে রোপওয়েতে বাঁধি। মুক্তি মুক্তি খেলা। আড়ালকে বললাম ন্যাংটো হও... নাঙ্গাকে বলব আরও খোলো অধরিমা...। অপ্রকাশের সামনে হুমড়ি পড়া কৌতূহল... ভালো থেকো শবনম্‌... ও হো পরান...

তিরি উড়লে পরী। ওর উড়ো নীল গাউনের ঢল প্যারাসুট হয়ে যায়। তিরি আকাশের নীল থেকে নামতে থাকে... শুধুই নামে... আজ তাকে অমরতা দেওয়ার চাঁদ-রোদ কাকাতুয়াদের শরম...

গাছতলায় ম্যাজিক বাবার রিয়েলিজম... সরলার জন্য সার সার মানুষের উদ্‌ গ্রীবা... আলো উৎসর্গ করো অহংকার... যা দেবী সর্বভূতেষু... মোচাফুল ফুটে ওঠো না-পলাশ পাগল বিদ্যাস্থানেভ্য এবচঃ...

১৯ প্রণব বসুরায়

কিষাণ-কথা
প্রণব বসুরায়



পেয়ে গেছো কাটাকুটি স্বর
কোথায় বসতি আছে, কোথা তোর ঘর?
                              নদীর কিনারে থাকি আমি
                                                          সবুজ নিশান
উড়িয়ে দিয়েছি উঁচু করে
মগডালে যেন কোনো পিঁপড়ে না ধরে
কিষাণীর পান্তা খেতে আমি
                              বসেছি কিষাণ

দুই হাতে পদ্মফুল তুলেছি এখন
মাল্য গেঁথে পরাবোই রাত্রি যখন...

২০ কচি রেজা

দাবার ঘর
কচি রেজা



বর্ষার আগেই
পুরোদস্তুর পুড়ে যায় দাবার ঘর
তখন শীতকালের ঘোড়াগুলো, ইতিহাসের পৃষ্ঠা

হাততালিতে যে রাজা মাৎ হলো,
রানীগুলোর সামনে লাল মাঠের নামতা,
মুখস্থের ভঙ্গি নকল করে ধারালো হলো
কত না পেনসিল

জানি, রাজধানীর সব রাবারই এবার নতুন
লালনের মাজার, আব-হাওয়া অফিস ঘোষিত নৈঋতে

মালা আর নাচ
মাপছে বোষ্টুমীর 'পা

২১ তন্ময় ভট্টাচার্য

দোনামনা...
তন্ময় ভট্টাচার্য



শরীর ধুলিস্যাৎ করে টাঙিয়ে রেখেছো
একজিবিশান হলে হাততালি নিশ্চিত

গড়িয়ে পড়বে সব চোখ

পাপড়ির দাম নিয়ে নিলামে হাতুড়ি ঠোকে
অবাধ্য জরায়ু

অথবা একেই বুঝি সুন্দর বলে

মুখ ফেরানোর আগে
একবার ঘনিষ্ঠ হবো





২২ কিরীটি সেনগুপ্ত

হোম
কিরীটি সেনগুপ্ত



অবধারিত শরৎ-এ এলে তুমি। গেরুয়া হয়ে। সন্ন্যাসের শুরু বোধহয় এখন। ছেড়ে আসা সংসার সাদা। গাছের পাতাগুলো সাদা হয়ে মুখভার। ফুঁ দিলে উড়ে যাবে গুঁড়ো যা কিছু; জমে গেলে অন্য কথা।

সাদা চিতায় শুয়ে আছে কস্তুরী। সন্ন্যাসী হবে; ভেবেছে গায়ের রোমটিও সাদা হোক। সহজে ছেড়ে আসা গন্ধ লেগে থাকুক গেরুয়াতে।

মখমলি গেরুয়া শুষে নিচ্ছে সব ……. লাল আগুনে জেগে ওঠে বিরজা। পড়ে থাকে শুধু কালো ছাই।

সাদা তিলকে কস্তুরী ঘর ছাড়ে একতারা হাতে।


২৩ সুবীর সরকার

এপিটাফ
সুবীর সরকার


(১)
নদীর ভিতর নদী শুয়ে থাকে। নদীর মধ্য থেকে তুমুল এক নদী উঠে আসে। হাই তোলে। পায়ে পায়ে গড়িয়ে যায় রাস্তা। গলি। তস্য গলি বস্তির বাচ্চারা গান গায়। গানের গায়ে জড়িয়ে যায় খিস্তিখেউড়। আবার এক একদিন সীমাহীন এক প্রান্তর হয়ে ওঠে পৃথিবী। বাতিদান বেয়ে রক্ত গড়িয়ে নামে। রক্তের দাগ অনুসরণকারী পাখিদের ডানার নিচে কাচপোকা, ফড়িং। জীবন কাঁটাগাছের দিকে পাশ ফেরে। দেশাচারের নকশির ভেতর হরেকরকম মানুষজন। বিলাপরত স্কুলবালিকা। গান বাজনার তাড়সে সংকরমনতায় ফাঁকা হয়ে যাওয়া মাঠ প্রান্তর থেকে উড়ে আসে প্রজন্মপীড়িত কথকেরা। তারপর লোককথার ঢঙে গল্প এগোতে থাকে। অন্ধকারে নদীর পাশে তখন ভূতুড়ে ভাটিখানা। আর চোখে জল আসতেই মাতালেরা সব প্রেমিক হয়ে যায়। প্রান্তবাসীর হাতে হাতে বাঁশি ঘোরে। বাঁশি বেজেও ওঠে আচমকা। তখন হেরম্ব বর্মন উঠে দাঁড়ায়। মহামানব হতে পারার সুযোগ হেলায় সরিয়ে দিয়ে সে ধুলো-মাটি আর মানুষের আখ্যানমালা সাবলীল বলে যেতে থাকে। অবিরাম তাঁতকল ঘোরে। আর নদীর মধ্যে থেকে তুমুল এক নদী উঠে আসে।



(২)
ভালো ভালো গান শুনে বড় হয়েছি। নানা রঙের মানুষ দেখে দেখে বেড়ে উঠেছি আমি। অপমানের পর অপমান, গলাধাক্কা ডিঙিয়ে আমি এসেছি খোলা আকাশের তলে। আর নতুন শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে উলুধ্বনি ভেসে আসে, রাজবংশী মেয়েদের দলবদ্ধ নাচ। বিবাহ উৎসবের দিকে যাত্রা শুরু করল একটি নিঃসঙ্গ পালক।

এতসব টুকরো, ছেঁড়াখোঁড়া সময় যাপন অভিজ্ঞতা আমাকে সবসময় ঘিরে থাকে। এই বহুমাত্রিক জীবনই তো পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। আমি ইতিমধ্যেই দেখে ফেলি সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম মানুষটিকে। আর গাছের পাতায় আঠা মাখিয়ে সারাদিন ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করত বাবুলাল বাঁশফোঁড়। অন্ধকারে শতশত জোনাকি পোকা। আমার তরুণ বন্ধুরা সব গোল হয়ে বসে থাকে। বাঁশের সাঁকো থেকে দীর্ঘতম সুড়ঙ্গপথ -- সমস্তটাই আমার কবিতাজীবন। লোকায়ত ভুবন, যার ভিতর থেকে আমার আর কোনওদিনই বেরিয়ে আসা হবে না। অথচ ব্যাধ যুবকেরা সব একদিন ভুলে যাবে প্রলাপকথন। আর মাটির উঠোন থেকে অনিবার্‍য কিছু গান, গোটা জীবন আমার সঙ্গে থেকে যাবে। আর জীবনের বৃত্তে ঘনঘন আছড়ে পড়বে উড়ন্ত ঘোড়া, হস্তচিহ্ন। এবং উৎসব গাথা।



২৪ অজিত দাশ

দুটি কবিতা
অজিত দাশ



শিকড়ের মতো চোখ

(শায়লা হক সুমনাকে)

তোমার অন্তরালের
নাভিমূল ছিঁড়ে
বিষণ্ন আলো তুলে আনি,
মেধাবী আঙুলের
সূক্ষ্ণ সুতোয়
বুনে দিই অজস্র
কাদা-মাটি-জল।
শহর ঘেঁষা
মানুষের পর মানুষ,
ফাঁক ফোঁকরে গজিয়ে ওঠা
শিকড়ের মতো চোখ
গুমোট ঘোরে তাকালে
বুকের ঈষৎ ছলছলানি
সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকে।


মায়া


আলগোছে টান দিও
বেণি পাকালে সর্বনাশ হবে
এই জন্ম পাওয়া
এক চুমুক শেষ করে
আরেকটু নেশা হলে
ফণা তুলে দাঁড়াবো ভাবি।


২৫ ঊষসী ভট্টাচার্য

মোহনা ছাড়িয়ে
ঊষসী ভট্টাচার্য



সেদিন যখন আমরা দুজন গভীর দেহে যেতাম,
একটা দুটো ইচ্ছেপরী, নীল শামুকে গা ঢেকেছে
রোদ মেখেছে যখন ফড়িং
আমরা তখন দুই বুকেতে সোঁদা গন্ধ পেতাম
আমরা যখন গভীর দেহে যেতাম।

আমরা যখন হাত ধরেছি, কান পেতেছি বুকে
একটা মরচে ধরা জংলা পাতা
লালচে হলো, খোলস পেলো
কান্না মোছার আলতো নরম সুখে
আমরা যখন কান পেতেছি বুকে।

আমরা যখন পথ চলেছি, গান ধরেছি প্রেমে
একটা কোকিল ঘর বেঁধেছে, পালটে গেছে
পালটে যাওয়ার মানে
শুকনো পথে বৃষ্টি এলো নেমে
আমরা যখন গান ধরেছি প্রেমে।

আমরা যখন বাঁক খুঁজেছি, পথ করেছি ভিন্ন
একটা বুকে মোচড় লাগে,
বারুদ বাষ্পে আকাশটা হয়
ভীষণ রকম ঘৃণ্য,
আমরা যখন পথ করেছি ভিন্ন।

২৬ খালেদ চৌধুরী

দুটি কবিতা
খালেদ চৌধুরী



জার্নাল-২০১১

মানুষের জ্যামিতিক ব্যবহার
এবং একরোখা যান্ত্রিকতায়
আমার দিন-রাত অবশ
দেহ−তামা মন−কয়েদ।

হৃদয় এবং মগজের
পরিবর্তে আমার−
অন্য কিছু থাকতে পারত;
আমার নাম মানুষ না-হয়ে
অন্য কিছু হতে পারত!

আমার আষ্টেপৃষ্ঠে অনেক অবুঝ
মনভোলা স্বভাবী থেকে আরশোলা।


অনল অসুখ

বিশুদ্ধ পাপ থেকে আদম হাওয়ার সপুষ্পক
গল্প। আদমের মোম থেকে মানুষ একটু
একটু আগুন বয়ে বেড়ায়। দেওয়াল ঘড়ির
পেন্সিল ব্যাটারির মতোন আমার হৃৎপিন্ড
স্থানান্তর করি তোমার হৃৎপিন্ডে। তোমাকে
মনে রেখে স্নায়ুর হায়াত ক্ষয় যদি প্রবঞ্চনা
না হয়। নদী সাগরে পৌঁছলে কৈলাসকে
কতটুকু মনে রাখে? ঘুমের বড়ির প্রতিভায়
চারপাশ অবশ হয়ে আসে। প্রিয় বান্ধবী
স্বামীর ঘরে গেলে কতটুকু জানতে চাইবে
কেমন আছি?

২৭ দেবরাজ চক্রবর্তী

মানুষ পাখির মতোন উড়তে পারে না
দেবরাজ চক্রবর্তী



বাড়ির পাশের গাছগুলি
কেটে ফেলার পর
বিষণ্ন পাখিগুলো
পাশের পুকুরে ডুব দেয়।
এমন একটি দৃশ্য দেখে ফেরা
পুরুষদের দল, সন্তানের গালে চুমু খেয়ে
লাল বাতিওয়ালা কোনো বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
অজস্র আশ্রয়ের মাঝে একা।
তবে সেই রাতের মতোন
তাদের উলটো দিকের, স্তনের ভারসাম্য
পৃথিবী নিতে পারে না।
তাদের ঘুমে তখন শুধুই
জঙ্গল আর জঙ্গল।




২৮ ইন্দ্রাণী সরকার

পরাকাষ্ঠা
ইন্দ্রাণী সরকার



নক্ষত্রবীথির নীলিমা থেকে আজ
খুঁজে এনেছি রত্নহার, যদিও তা
অতি নগন্য তোমার এই অভিনব
ঐশ্বর্য্যের মৃগনাভি পরাকাষ্ঠায়।
সাগর সেঁচে ডুবুরি মুক্তো কিছু
তুলে এনে রেখেছি ধুলোমাটিতে
যত্ন করে তোমার আকাশ ছোঁয়া
প্রাসাদ সাজাবো বলে এই প্রজন্মে।
কুঁড়েঘরের দুয়োরানী আমার কি
সম্পদ তোমার রাজকোষ ভরাতে
মুর্খ আমি, যে শূন্যতায় আমাদের
সম্পর্ক সূচনা সেখানে প্রত্যাবর্তনের
অহর্নিশ চেষ্টায় দুর্বিষহ জীবন কাটে।
অত:পর মেঘের বালিশে মাথা রেখে
গভীর কোনো সুষুপ্তিতে স্বাতী নক্ষত্রে
মিলিত হই শুকতারাকে সঙ্গী করে।


২৯ দেবযানী বসু

দুটি কবিতা
দেবযানী বসু



টেনপ্লাস মুসাম্বিপিলিং - ১৭

ফুলদানি থেকে জমা পয়সার সঙ্গে সন্দেহ বেরিয়ে আসছে। বাকলমুক্ত গাছেদের সাধুতা একটু বেশি হয়। পাতা ডললেও সৌরভ। ফুলদানির শাঁখালু বগলে নউসিয়ান্যাসবিন্যাস। ফলের ম্যাক্রোপরিচিতি। আমাদের প্রবাদ দানা খায়, দানা ছড়ায়। বড়ো শহরের বিবাহিতা গ্রাম পাতলা শালের ভিতর প্রিয়হাত টেনে নেয়। ডলফিনচেরা বাতাস আর কলাপাতাচেরা বাতাসের কালাডাল চেনাচিনি, তাতে কর্পোরেট রান্নার ব্যঞ্জনা... ব্যঞ্জনের ব্যঞ্জোসুর ইত্যাদি... ইত্যাদির অসীমতা... শীতকালীন খেলকুঁদে মাঠে মাঠে বায়োঘোষণার গ্যাসমন্ত্র ও বিশ্বরসনায়ন......



টেনপ্লাস মুসাম্বিপিলিং – ১৮

সবাই কনুই দেখাদেখি পর্বে অভ্যস্ত। সিংহের কাঁধে কিংবা হাঁসের পিঠে কেয়াফুল কেশর ছড়াছড়ি। মনসাই বাগানের নয়না পানবাটির টানে পুরাতন কথা উঠে আসে, খসায় আবরণ। মিনি হেলি চড়ে আঙুরবালার আয়নাজমিন দেখতে আসা। জল মদে নয় বিনিজলে কোম্পানির আচারবিচার শুধরে নেওয়া । অনুর্বর বীজথলি বহন করছে গাধা ও খচ্চরে। ওদের দুশ্চিন্তা কমাও। গাধাদের যৌন ডাক না শোনাশুনিতে নিজেদের যৌনতা সতেজ প্রসাধনী তৈরিতে অপারগ।


৩০ দীপঙ্কর বরাট

তিনটি কবিতা
দীপঙ্কর বরাট


সুইসাইড নোট -১


ইচ্ছেদের মৃত্যুটাও অদ্ভুত
শয়ে-শয়ে মৃতদেহগুলি শায়িত থাকে
কিন্তু
মুখাগ্নি দেওয়ার কেউ নেই
কোনো সুইসাইড নোটের শেষে
তাদের ডেথ সার্টিফিকেট লেখা থাকে


সুইসাইড নোট -২


সুইসাইড নোটের ফরমেট জানা আছে?
স্থান, কাল, কারণ ভরার শূন্যস্থানগুলি আছে তো?
উদ্দেশ্যও লিখতে হয় বুঝি?
সব কারণের তো প্রমাণ হয় না, সেটাও দিতে হয় বুঝি?
কোথায় পাব ফর্মটি?
আগে জমা করলে তবেই তো আর
মৃতদেহগুলির পিছন ধাওয়া করবে না হাজারো উঠে আসা প্রশ্নগুলি...



সুইসাইড নোট -৩



ধীরে ধীরে তারা সরে যেতে থাকলো আমার কাছ থেকে

আমি তখন সব পাওয়ার নেশায় আত্মহারা

সব হারানোর সংকেত বুঝতেই পারিনি

আমাকে ঘিরে অপার্থিব সব কিছুর বলয়টা ঘনীভূত হতে থাকলো



দাম্ভিক খুশিতে বাহ্যিক জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল –-

আমার হুঁশ নেই, নেশায় মেতে আছি



তারপর এলো সব হারানোর পালা,

স্বপ্ন, শব্দ, এমন কী কলমের কালিও শেষ হয়ে এলো



উদভ্রান্তের মতোন আঁকড়ে ধরতে গেলাম, পারলাম না

বুঝলাম, সব শেষ

প্রতিটি মুহূর্তে উপলব্ধি করছি ফুরিয়ে আসা

খাঁ খাঁ করছে ভেতরটা হতাশায়



রন্ধ্র রন্ধ্র থেকে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সব

নিজেই নিজেকে শেষ করে নেওয়াকে কী বলবো?





<<< কালিমাটির ঝুরোগল্প / ১১ >>>





কালিমাটির ঝুরোগল্প / ১১


ঝুরোগল্প লিখেছেন সমীর রায়চৌধুরী, অনিশ্চয় চক্রবর্তী, রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, বারীন ঘোষাল, অরূপরতন ঘোষ, শ্রাবণী দাশগুপ্ত, কাজল সেন, সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়, সোনালি বেগম, অর্ক চট্টোপাধ্যায়, শমীক ষান্নিগ্রাহী, অলোকপর্ণা, অরুণাভ ঘোষ, তপনকর ভট্টাচার্য, লিপিকা ঘোষ, পিনাকী সেন, ভূদেব ভকত এবং রুচিস্মিতা ঘোষ।

০১ সমীর রায়চৌধুরী

আশ্চর্য প্রদীপ
সমীর রায়চৌধুরী




ভোর না হতেই হঠাৎ অরবিন্দর ফোন :

‘পেয়ে গেছি... ঘরের ঠিক বাইরে কার্নিশে মস্ত মৌমাছির চাক। দুটো স্ট্র যোগ করে পৌঁছে গেছি মৌমাছিদের মধুভান্ডে... টানছি... আমার ঠোঁট দুটো কাঁপছে মৌমাছিদের গুঞ্জনের স্পন্দনে... মিষ্টতার নির্ভেজাল স্বাদ... ফুলে ফুলে ওরা ছড়িয়ে দিয়েছে আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি... শব্দব্রক্ষ্মের বিজিবি ধ্বনিবার্তা... নিষিক্ত হওয়ার অর্গাজম... সেও তো গুঞ্জন স্পন্দন... চার মাত্রার ছকের মায়ানাচ...



মনে আছে নিশ্চয়ই, সূর্যের মাঝখানে জ্বলন্ত পিন্ড... তার তেজ বা তেজস্ক্রিয়া চারপাশের ফোটোস্ফিয়ারে পৌছায় হাজার হাজার বছরে, অথচ সেখান থেকে পৃথিবীতে পৌঁছায় মাত্র আট পয়েন্ট থ্রি সেকেন্ডে...



সূর্যের বিষয়ে আমরা অনেক কিছুই জানি... জানি কণা সংসারের জন্মলগ্ন ওই সূর্যে... আর কণা থেকেই তো আমরা পেয়েছি বর্ণমালা...



পিন্ডকে আমরা বলতে পারি কোর এরিয়া, যেখানে হাইড্রোজেন জ্বলছে... আর বেরিয়ে আসছে প্রোটন... অথচ নিউট্রন সেখানে অনুপস্থিত... আর ফোটন কণা থেকেই তো বেরিয়ে আসছে ইলেকট্রন...



সমীরদা, আরও অনেক কথা আছে কণা সংসারের, সে বিষয়ে আপনিও অনেক কিছু জানেন... কাল ভোরে আবার সে সব নিয়ে কথা হবে...’

০২ অনিশ্চয় চক্রবর্তী

ধর্ষণের ক্রমাগত খবরে যা হয়ে থাকে
অনিশ্চয় চক্রবর্তী



(১)

সকালের প্রত্যাশিত ডোরবেলের শব্দ শুনে, তবু শব্দের তীব্রতা ও আকস্মিকে চমকে উঠে, তার একক ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দেয় অনিশ্চয়। দেখে, তার প্রতিদিনের রান্নার ও অন্যান্য কাজের মেয়ে আদৌ নয়, সামনে দাঁড়িয়ে তার বোন, মামন। শেষ ডিসেম্বরের শীতের সকালে এসেছে আসানসোল থেকে কলকাতায় তার দাদার বেঁচে থাকার খবর নিতে, বেঁচে থাকার চেহারাটা যেটুকু পারা যায় গুছিয়ে দিতে। প্রতিবেলার টেলিফোন যোগাযোগের মধ্যেও সেই বেঁচে থাকার চেহারা ও মনের সবটার নাগাল যে পাওয়া যায় না কিছুতেই! টেলিফোনে আত্মপ্রকাশ যেমন থাকে, তেমনই, আত্মগোপনও তো থাকে সকলেরই! সে কথা সকলের মতোই এই ভাই-বোনও জানে। সে গোপনতার চেহারা আর চরিত্রটা বুঝতেই যে একেবারে দাদার দরজায়!

বোনকে দেখে অনিশ্চয় যেমন অবাক হয়, তেমনই তার জীবনের, যাপনের, আকাঙ্ক্ষার, আড়াল খসে যাওয়ার আশঙ্কায়, একটু বিরক্তও হয়। সেই বিরক্তি উপেক্ষা করে বা মেনে নিয়ে মামন ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে পড়ে। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রাখে অনিশ্চয়ের বইয়ের র‍্যাকের পাশে। খাটের ওপর তখনও ছড়ানো সেদিনের খবরের কাগজগুলি।

(২)

ক্রমে নীরবতা গাঢ় হয়, স্থায়ী ও দীর্ঘতর হয়। ভাই-বোনে এতদিন পর দেখা হলেও কেউ কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে যে যার নিজের কাজ করে যায়। অনিশ্চয় তার খবরের কাগজের গোছা খুলেও দেখে না। ভাই-বোন দুজনেই এক চরম অস্বস্তিকর নীরবতা ও আত্মগোপনে সময় কাটায়, প্রাত্যহিকে ব্যস্ত হয়। কাজের মেয়ে এসে কাজ সেরে, রান্না করে দিয়ে চলে যায়। মামন সে-সব তদারক করে, দাদার এলোমেলো সংসার গোছায়। স্নান করে, খায় দুজনেই, তবু ঘরে কেউ কোনো কথা বলে না। কেন বলছে না, তা নিয়ে ভাই-বোন কেউ কাউকে প্রশ্নও করে না।

(৩)

অনেক ভোরে উঠে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় ক্লান্ত মামন বিছানায় গা এলিয়ে দেয় দুপুরে। অনিশ্চয় চেয়ার-টেবিলে বসে ভাঁজ করা খবরের কাগজের বোঝা নিয়ে। মামন ঘুমিয়ে পড়েছে, এমন অনুমানে নিশ্চিত ভরসা রেখে।

‘দাদা, ঘুমোবি না? সকালে কাগজ পড়িসনি?’

‘না, অফিস যেতে হবে তো! কাগজগুলো একটু দেখে না নিলে কাজ করব কী করে? তুই ভালো করে শো’।

‘এই তো অনেকটা জায়গা রয়েছে। জায়গার জন্য তুই দুপুরে না ঘুমিয়ে রাত্তিরে আবার অফিস করবি? তোর কী হয়েছে বল তো?’

মামন বিছানা ছেড়ে উঠে বসে প্রায় ভৎর্সনার সুরে জানতে চায়। ‘সকাল থেকে কথা বললি না একটাও। কী হয়েছে তোর?

‘কেন জানি না আমার নিজেকে একজন ধর্ষণকারী মনে হচ্ছে, কয়েকদিন ধরেই। আসলে না হলেও, বাসনায়-আকাঙ্ক্ষায় নাউ আই অ্যাম এ রেপিস্ট’।

‘সে তো আমারও মনে হচ্ছে, আমি যে-কোনো সময় দিল্লির সেই মেয়েটির মতো এভিল ডিজায়ারের ভিকটিম হয়ে যেতে পারি। কিন্তু তার সঙ্গে তোর দুপুরে না ঘুমোনোর কী সম্পর্ক?’ মামনের স্বরে ও উচ্চারণে যেন সহস্রাব্দীর জিজ্ঞাসা ও বিপন্নতা।

‘তুই কি জানিস না যে,আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সমস্ত সম্পর্ক নির্ভর করে পুরুষের বাসনা চরিতার্থতা আর আধিপত্যের ওপর? তোর পাশে শুয়ে ঘুমোনোর সাহস আজ দুপুরে আমার অন্তত নেই। আর কী বলব, বল? নিজের ওপর বিশ্বাসটাও যে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের মর্গে আরও অনেক মৃতদেহের সঙ্গে পড়ে আছে!’


০৩ রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

শব্দেরা ডাকছে
রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়



তরঙ্গহীন নদীতে নৌকোটা ছিল আপন খেয়ালে। হঠাৎ টালমাটাল, যেদিন জানা গেল অমৃতা লিখছে। ছোটদের পত্রিকায়। গল্প। পরিমলকে চমকে দেবে ভেবে অ্যাড- ইন্টারভ্যালের ফাঁকে পত্রিকাটা নিয়ে লাজুক মুখে অমৃতা --

--অ্যাই দেখো, আমার গল্প বেরিয়েছে

--তোমার গল্প মানে? তোমাকে নিয়ে আবার কে লিখল?

--আমাকে নিয়ে লিখবে কেন?

--তবে?



গলাটা একটু কেঁপে যায়। তবু জোর করে শব্দ বের করে অমৃতা -–

--আমার লেখা

--তুমি লিখেছ? মানে?



মুখ নিচু করে আঁচলের খুঁটটা হাতে নিয়ে জড়াতে থাকে অমৃতা। পরিমলের ঝাঁঝটা কানে বাজে। গুমরে থাকা ডিনার শেষে পরিমল বারান্দায়। চেনা মার্লবোরোর গন্ধেও অচেনা লাগে পরিমলকে। অমৃতা আস্তে আস্তে চেয়ারের পিছনটা ধরে দাঁড়ায়।

--রাগ করলে?

কঠিন একাক্ষর শব্দ ওঠে --

--না
--তবে যে কিছু বললে না...

--কী বলব? তুমি কি আমার বলার জন্য অপেক্ষা করেছিলে?

--না আসলে...

--আসলে পৃথিবী শুদ্ধু লোককে জানাতে চেয়েছিলে, দেখো আমি কেমন লিখতে পারি!



আমূল কেঁপে উঠল অমৃতা। তবে কি... তবে কি...



কী যেন ক্লান্তি জড়িয়ে ধরে অমৃতাকে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সাইড টেবিলে রাখা তার পত্রিকাটা চোখে পড়ে। প্রচ্ছদে একটা দুষ্টু ছেলের মুখ। সামনের উঁচু দাঁত দুটো নিয়ে তখনও সমানে হেসেই চলেছে। মাথার ভেতরটা চলকে যায়। বিছানা থেকে ধাঁ করে উঠে প্রচন্ড বিদ্বেষে পত্রিকাটা টুকরো টুকরো করে ফেলল অমৃতা। কিন্তু টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়তেই কেমন একটা মায়া গ্রাস করলো যেন। চোখ ভরে আসছে জলে। নিচু হয়ে পরম মমতায় টুকরোগুলো তুলে নিচ্ছিল একটা একটা করে --



--রাত্তিরবেলা এ আবার কি নাটক শুরু করলে?



চমকে উঠল অমৃতা। কাগজের টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেময়। পাখার হাওয়ায় একটা দুটো উড়তে লাগল। তাদের ডানায় স্বপ্নমাখা উড়ান। অমৃতা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে টুকরোগুলোর দিকে। পরিমল তখনও কিছু বলে চলেছে। একনাগাড়ে। কিন্তু কোনো কথাই আর অমৃতার কানে ঢুকছে না। সমস্ত ইন্দ্রিয় জুড়ে শুধু কাগজ ওড়ার শব্দ। চোখে ভাসছে লক্ষ লক্ষ শব্দের ঢেউ। ডুবছে আর ভাসছে। যেন এক আশ্চর্য জগতের ভেলা। শূন্য ভেলায় এক অচিন পাখি। ডাকছে ডাকছে ডেকেই যাচ্ছে।



০৪ বারীন ঘোষাল

ফিদায়েঁ
বারীন ঘোষাল



অরুণের ডাকে শেষপর্যন্ত রওনা দিলাম। সেই কোন্‌কালে একসাথে কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। এখনো খোঁজখবর রাখে। কলকাতায় এলে দেখা করতে বলে। থাকে মধ্যমগ্রামে। টিকিট কেটে ট্রেনে চাপার আগে জিজ্ঞেস করলাম –-

‘মধ্যমগ্রামের আগের স্টেশনটা কী রে?’

‘কেন?’

‘নামার জন্য তৈরি হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে পারবো’।

‘দূর ব্যাটা! কামরার মধ্যে লক্ষ্য রাখবি, যে স্টেশনে সমস্ত সুন্দরী মেয়েদের নেমে যেতে দেখবি, সেটাই মধ্যমগ্রাম। তুইও পেছন পেছন নেমে যাবি’।

আমি সিটে বসে চোখ বোলাতে থাকি চারপাশে। অরুণের পরামর্শ স্মরণ করে মনে মনে হাসি। মনে মনে হাসলেও আমার মুখে হাসি ফোটে। আমি হাসিমুখে লক্ষ্য করি, কামরায় স্কুলের ছাত্রী থেকে শুরু করে থুত্থুড়ে বুড়ি পর্যন্ত অনেক মেয়ে। তাদের বয়স, পোশাক, সামাজিক আর আর্থিক অবস্থা বিভিন্ন। তবু সুন্দরী বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবার উপক্রম হলো। তারা স্টেশনগুলোতে নেমে যাচ্ছে, আবার উঠেও পড়ছে অনেকে। তক্কে তক্কে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠলো ক্রমশ। অরুণই বা কী! খালি ফাজলামি।

হঠাৎ নোটিশ করলাম, সবাই আমার দিকে চেয়ে আছে। দেখে সন্ত্রস্ত হলাম। হাসিমুখটা স্টিল ছবি হয়ে আছে হয়তো! আমার এই এক ব্যামো। হাসিমুখের মানুষ দেখলে লোকের তো ভালোই লাগে ভাবি। না কি আমার মুখের নার্ভের সমস্যা? হাসলে মুখ সোজা হতে দেরি হয়। সেবার আমার হাসির মধ্যেই যখন দুদা মারা গেল, সবার মুখ অন্ধকার, আমি হাসছি। কী বিপদ! এই যে সবাই আমাকে দেখছে জেনেও নর্মাল হতে পারছি না, লোকে ভাববে কী? তার চেয়ে ওসব না দেখাই ভালো। মুখ ঘোরালাম জানালার দিকে।

জানালার পাশেই বসা একজন মহিলা, রীতিমতো সুন্দরী। কচি বয়স। বিবাহিতা। ফর্সা। পাশে বসা বোধহয় তার বর। মহিলা বলছে –-

‘আমার না আইঢাই করছে। গ্যাস হয়েছে, জানো? কাল রাতে কাকার ওখানে অত খাওয়া ঠিক হয়নি। তুমি ম্যানেজ করলে কীভাবে? তোমার হচ্ছে না?’

‘বউয়ের পেট খারাপ হলে বরেরও হতে হবে বুঝি? সিম্প্যাথেটিক?’

‘ইয়ার্কি হচ্ছে, না?’

মহিলা পুরুষটিকে চিমটি কাটলে পুরুষটি কঁকিয়ে মুখ ঘোরাতেই আমার চোখে। আমি মন দিয়ে কূজন শুনছিলাম। টাইম পাস আর সুন্দরীকে নজরে রাখা। লোকটা কটমট করে তুলল তার চোখ। আমি থতমত খেয়ে বুঝলাম আবার হাসি আটকে গেছে মুখে। এতক্ষণের সুগন্ধী পারফিউমের বদলে একটা উৎকট গন্ধ এলো নাকে। জিজ্ঞেস করলাম –- ‘মধ্যমগ্রাম কদ্দূর?’

‘এই তো এসে গেলাম’ –- ব’লে ওরা দুজন উঠে দাঁড়ালো।



বাড়ি পৌঁছতেই অরুণ ড্রইংরুমে বসিয়ে বলল –- ‘কী রে, চিনতে অসুবিধা হয়নি তো? নে জল খা। কই শুনছো, বারীন এসেছে, চা-টা আনো!’

আমি কোনোমতে ট্রেনে আমার অস্বস্তির কথা গল্প করে বললাম –-

‘আচ্ছা অরুণ, সুন্দরী মহিলারা পাদে?’

‘ছিঃ বারীন, তুই না কবিতা লিখিস! ওটা কি ভাষা হলো? মহিলা না! পাদে বলতে নেই। বায়ু-বিদায় বলতে হয়’। অরুণ খিলখিল হাসতে হাসতে বলল।

‘ফিদায়েঁ?’ আমার সেই হাসিমুখের স্টিল।

‘হো হো হো হো –- তুই সেরকমই বাচাল থেকে গেছিস। লাইট কথা আর সিরিয়াস কথা মিশিয়ে ফেলিস। শোনো শোনো বারীনের কথা...’

অরুণের বউ হাসির লহরা শুনে ঘরে ঢুকেছে –- ‘ফিদায়েঁ! মানে কী?’

এবার আমার হাসির পালা। লুটোপুটি এক্কেবারে।








০৫ অরূপরতন ঘোষ

অমরত্বের আশা প্রত্যাশা
অরূপরতন ঘোষ



শীতের রাত্রি। অনেক ঘন হয়ে এসেছে।

অবশ্য কলকাতা শহরের দক্ষিণপ্রান্তের ১১ তলার এই ঘরে কী-ই বা শীত, কী-ই বা রাত! মিসেস গগৈ আমাকে যখন হিসহিসে গলায় বললেন যে, তাঁর ভয় লাগছে, তখন আমি ঘড়ি দেখি। দেখি, রাত ১১-৪৫ বেজে গেছে।



মিসেস গগৈ –- আপনার ভয় লাগছে না?

আমি –- না, না। আপনিও ভয় পাবেন না।

মিসেস গগৈ –- কিন্তু এরা যে সবাই বেশ মাতাল হয়ে পড়েছে!

আমি –-



এইবার আমি বিমলের পাশে গিয়ে বসি। বিমলকে বলি –- বিমল, তুমি তোমার কবিতার বই চিকাগোয় পাঠিয়ে দাও। অনেক নাম কিনবে।

বিমল –- একথা আপনাকে কে বললো?

আমি –- শোনো, ইংরেজিতে অনুবাদ না করে তোমার বাংলায় লেখা কবিতার বইটিই পাঠাবে। ওখানে বাংলা ডিপার্টমেন্ট আছে। তাদেরকেই পাঠাবে। বিনয় মজুমদার তাঁর একটি লেখায় চিকাগোর ঠিকানা দিয়েছেন। একটা কাগজ বের করো...

বিমল –- এই তো! আমার সঙ্গেই কাগজ আছে।

আমি –- তবে লেখো। The Director of Orient Studies (Department of Bengali), University of Chicago, Chicago City, U.S.A

বিমল ঠিকানাটা জলদি টুকে নেয়। আমি বলি –- তোমার খুবই নাম হবে বিমল। শিগগির পাঠিয়ে দাও। ওরা তোমার বই ১০০০ বছর রেখে দেবে। অর্থাৎ তুমি অমর হয়ে যাবে।



লাইট্‌স্‌ অফ। মুহূর্তের মধ্যে বাজনা বেজে ওঠে। রুবি তার নাচ শুরু করে। কেউ কেউ তাকে গোলাপও ছোঁড়ে। রুবি উড়ন্ত গোলাপের মধ্যে নাচতে থাকে। অনেকেই তার সঙ্গে নাচে।

এরা নাচের সঙ্গে গোলাপও খেলবে জানলে আমি এতক্ষণ অপেক্ষাই করতাম না! গোলাপ দূর থেকে দেখতেই ভালো, এই বিশ্বাস নিয়ে ছুটে বেরিয়ে যাই রুবির পাশ ঘেঁষে। মাতাল নৃত্যরতদের সঙ্গে ধাক্কাও লাগে দু’একবার।



বেরোতে বেরোতে দেখি, মিসেস গগৈ একটি গোলাপ ফুল তুলে নাকে শুঁকছেন। মিউজিকে তাঁর কোমর দুলছে অল্প বিস্তর।



পরের দিন সকালে নকুড়ের চায়ের দোকানে একাই বসেছিলাম। লোকজন নেই। ফলে কাগজটি টেনে নিয়ে দেখি। দেখি প্রথম পাতাতেই বিমলের একটি ছোট ও চৌকোণো ছবি সমেত বক্তব্য ছাপানো হয়েছে। বিমল সম্প্রতি রাজ্যে উদ্ভুত একটি বিশেষ রাজনৈতিক বিষয়ে কবি হিসেবে তার মন্তব্য জানিয়েছে। অর্থাৎ বিমল অমরত্বের দিকেই এগোলো। বিমলের পাশাপাশি আরো দু’তিনজন ছবি সহ বক্তব্য রেখেছেন ঐ একই বিষয়ে। তাঁরা প্রত্যেকেই প্রখর সমাজ সচেতনতার পরিচয় রেখেছেন তাঁদের বক্তব্যে।

দেখেই মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। উত্তেজিত হয়ে উঠি। নকুড়কে বলি –- নকুড় তুমি অমর হবে?

নকুড় –- হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই! কিন্তু কী উপায়ে?

আমি –- উপায় আমার হাতেই আছে। শোনো, কলকাতার বড় বড় ও অমর মানুষদের মধ্যে কয়েকজনকে আমি খুব ভালো ভাবেই চিনি। তাদেরই মধ্যে একজনের ছবি তুমি আজকের খবরের কাগজেও পাবে। তুমি যদি বলো, আমি তাকে তোমার দোকানে এনে চা খাওয়াতে পারি। তুমি তখন তোমার দোকানে তার চা-পান-রত একটি ফটোগ্রাফ তুলে রাখবে। তারপর বড় বড় করে তার সেই ছবি সমেত দোকানের ওপরে দোকানের একটা নাম দিয়ে বিজ্ঞাপন করবে। পিছনে আলোর ব্যবস্থা করতে পারলে আরো ভালো হয়। তোমার দোকানে কত বড় বড় লোক এসে চা খেয়ে যান তা ঝলমল করে দেখা যাবে সন্ধের পরেও। এতে তোমার দোকানের বিক্রি বহুগুণে বাড়বে। অর্থাৎ কিনা বছরে এখন যা লাভ করছো তার ৫০ শতাংশ বেশি লাভ করতে পারবে। তার পরের বছর সেই অতিরিক্ত টাকার একাংশ ব্যবহার করে তুমি আরো বিজ্ঞাপন দেবে আশে পাশে। তাতে তোমার আয়, ধরা যাক, আরো ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ফলে তখন তোমার কাছে আরো বিনিয়োগের সুযোগ। এইভাবে হিসেব করলে দেখা যাবে, তুমি আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই পানিহাটি অঞ্চলে আরো ২/৩টি চায়ের দোকান খুলে ফেলতে পারবে। তোমার সন্তান সন্ততিরা তার সুফল পাবে। দোকানের সংখ্যা আরো বাড়বে ‘নকুড় এন্ড সন্স’এর। এইভাবে মৃত্যুর পরেও তোমার কদর থাকবে। অর্থাৎ তুমি অমর হয়ে যাবে।

নকুড় বলল –- আমি অমর হতে চাই। আপনি কিছু একটা করুন!

আমি –- আমি অবশ্যই যত শীঘ্র সম্ভব এক প্রয়োজনীয় ও উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা নেবো।



এই বলে নকুড়কে ১ কাপ চায়ের দাম ৩ টাকা দিয়ে আমি উঠে পড়ি। বিমল অমর হয়েই গেছে। বিমলের সূত্রে নকুড়ও অমর হয়ে যাবে। এর পেছনে মূল মাথা হিসেবে কাজ করব আমি। ফলে জনজীবনে বিমল ও নকুড়ের যৌথ প্রভাবে আমিও অনেকাংশেই অমর হয়ে যাব, এই প্রত্যাশা করে বটতলা বাজারের ভিড় যথাসম্ভব এড়িয়ে আমি আমাদের প্রফুল্ল পল্লীর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করি।






০৬ শ্রাবণী দাশগুপ্ত

ধ্বন্যাত্মক
শ্রাবণী দাশগুপ্ত



মা... নিবার্ন্ধব পরবাসে আমি স্বেচ্ছাবন্দী। তোমরা ফোন করে পাগল –- দেখছি, শুনছি, ধরছি না। একটা মহাদেশে তোমরা, একটায় আমি। সুবিধেটা কী বল তো? ইচ্ছে হলেই কেউই যেতে আসতে পারি না। এ্যাসাইনমেন্টগুলো এনে জমা করেছি, শেষ হলে মেইল করছি। জানি না এভাবে কতদিন! সেদিন রাত্তির অবধি বসে তীর্থর সঙ্গে ফেসবুকে লিখে গল্প... কী দ্রুত লিখছিলাম! তীর্থ তো বটেই, নিজেও আমি অবাক। তখনই ধ্বনির ফোন। কতদিন পরে শুনছি ওর গলা “হ্যালো কেমন আছো?” আলাপ হলে বুঝতে মা, ও খুব সপ্রতিভ, ন্যাকামোর ধার ধারে না। আমার কাজকর্মের বিষয়ে কিছু, তাছাড়া দেশে ফিরলেই যে ওকে তোমার সাথে পরিচয়... বলতে মুখ খুলেছি, জিভটা নড়ে উঠে গুটলি পাকিয়ে গেল। ব্যাপারটা বোঝার আগেই ওপাশে ধ্বনি ক্ষেপে উঠল, “হ্যালো! কী করছ বল তো? আইএসডি কল রিসিভ করেও কথা না বলা, নতুন স্টাইল? ইন বেড উইদ সামওয়ান?” জবাব দিতে গিয়ে জিভ নড়ল সামান্য, তারপর গুটিয়ে গেল। মনেই করতে পারলাম না, কথা বলার প্রক্রিয়া বলতে যা বোঝায়, সেটা কেমন! তক্ষুণি ওয়াশরুমের আয়নায় গিয়ে মুখ হাঁ করলাম যতটা পারি। জিভ টান করলাম। সুস্থ স্বাভাবিক। ব্যথা জ্বালা অস্বস্তি জড়তা কিচ্ছু নেই। এই স্টুডিয়ো এ্যাপার্টমেন্টে আমার রুমমেট ফ্রান্সিস মাস দুয়েকের জন্য অন্যত্র গেছে। ডায়াল করতেই ধ্বনির ফোনে অসমীয়া লোকগান। এখানে রাত সাড়ে এগারো, ভারতের ক’টা খেয়াল রাখিনি। ঘুমজড়ানো গলা শুনলাম, “বলো।” বলতে গিয়ে সেই পুনরাবৃত্তি! ও গালি দিয়ে ফোন কেটে দিল। আমার মাথায় বিপ বিপ, দু’হাতের উপশিরা ধমনীতে তরঙ্গ। হাতের আঙুলগুলো নাচছে দ্রুত। মোবাইলে মেসেজ লিখতে গিয়ে অনুভব করলাম, শব্দগুলো অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় নামছে আঙুলে ভর করে। আমি বৈদ্যুতিন? গলা ফাটিয়ে চীৎকার করব, দেখি জিভ গুটিয়ে গলা আটকে দিয়েছে। মা, সম্পূর্ণ একা বাড়িটায় অসম্ভব ভয় করছিল, তীব্র আতঙ্ক। ল্যাপটপ খুললাম, ফেসবুকে কতজন তখনো... আমি কথা শুরু করলাম। আঙুলেরা বলছে, লিখছি আমি, ঝড়ের মতো টাইপ করছি। জানো মা, অনেক ডলার গচ্চা দিলাম ডাক্তারে। টেনে টিপে খুঁচিয়ে হাজারখানা পরীক্ষা, কিচ্ছু পেল না। দেখলে বুঝতে আমার কলেবরের শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে এবং খুব আনন্দে আছি। যেটা অকথ্য, সেটাও নির্দ্বিধায় লিখে বলছি। শুধু, এই বিজনবাসে তোমার শেখানো কবিতাগুলো গলা খুলে বলতে ভুলে গেছি। ধ্বনি ভুল বুঝেছে, তোমরাও কী যে ভাবছ...! আমার অভিযোজন হচ্ছে মা... অহঙ্কার করে বলছি, আমিই প্রথম...।




০৭ কাজল সেন

সম্পর্ক
কাজল সেন



সম্পর্কটা বোধহয় আর টিকিয়ে রাখা গেল না! ছাড়াছাড়িটা অনিবার্য হয়ে উঠছে ক্রমশ। অনেক চেষ্টা হয়েছে মেরামতের। যত রকম ঠোকাঠুকি ও ঝাড়াঝুড়ি, সব রকমই। বিস্তর কথা চালাচালি ও কথা কাটাকাটি, সব কিছুই। তবু সম্পর্কটা কিছুতেই ধরে রাখা যাচ্ছে না তার পুরনো ট্র্যাকে। লাট খাওয়া ঘুড়ির মতো ক্রমশই তা নেমে যাচ্ছে এক বিপজ্জনক অর্বাচীন মাত্রায়।

শ্বেতা কখনও বিদেশে যায়নি। যাওয়ার তেমন কোনো সুযোগও আসেনি। শ্বেতার সান্ত্বনা, নিজের দেশটাই তো পুরো ঘুরে দেখা হয়নি এখনও! আগে তো স্বদেশ দেখি, তারপর না হয় বিদেশ! অমিতাভকে অবশ্য ইদানীং স্বদেশ থেকে বেশি সময় বিদেশেই কাটাতে হয়। এবং তা কখনই নতুন দেশ দেখার আয়োজনে নয়, বরং কাজের প্রয়োজনেই তাকে ছুটে বেড়াতে হয় বিভিন্ন দেশ।

এবং এটাই যে শ্বেতা ও অমিতাভর সম্পর্ক টিকিয়ে না রাখার একটা জবরদস্ত কারণ, তাও কিন্তু নয়। আসলে শ্বেতার জরায়ুর ভেতর যে প্রাণকণা সম্প্রতি খুব বেশি মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে, তাকে কীভাবে বৈধ করা যায়, তাই নিয়েই বেশি চিন্তিত অমিতাভ। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় যে কোনো সন্তানের বৈধ বায়োডাটা ঠিকঠাক তৈরি করতে হলে, একজন বৈধ বাবার নাম থাকা খুবই জরুরি। অথচ অমিতাভ ঠিক এই যুক্তিটাকেই এর আগে কখনও আমল দিতে চায়নি। বিবাহ নামের প্রতিষ্ঠানকে সে বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। আর শ্বেতারও এই ব্যাপারে কোনো দ্বিমত ছিল না। এবং এখনও নেই। অমিতাভ কর্মসূত্রে বিদেশ থেকে স্বদেশে ফিরে আবার বিদেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত সে এবং শ্বেতা যথেচ্ছভাবে শরীরী খেলায় বুঁদ হয়ে থেকেছে। আর যাতে অন্য কোনো বিপত্তি না ঘটে, তাই তারা যা কিছু রক্ষাকবচ আছে, মানে কন্ট্রাসেপটিভ পিল, কন্ডোম, গর্ভনিরোধক জেলি, সেফ পিরিওড, উইথড্রয়াল প্রোসেস –- সব কিছুরই সীমান্ত উপযোগিতা কার্যকরী করেছে। অথচ কখন যে তাপ ও রস বিনিময়ের খেলায় নতুন প্রাণের এমন বিস্ফোরণ ঘটল! আর এইখানেই বড় নাড়া খেয়ে গেল অমিতাভ। তার এত দিনের সযত্ন লালিত বিবাহ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত ভাবনা চিন্তাগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। অথচ শ্বেতা এখনও পর্যন্ত নাছোড়। সে প্রসব করতে চায় তার অবৈধ সন্তান।

অনেক ঠোকাঠুকি, ঝাড়াঝুড়ি, কথা কাটাকুটি, কথা চালাচালি –- কত কিছুই না হয়েছে তারপর! সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য মেরামতের সব রাস্তাই খতিয়ে দেখা হয়েছে। অমিতাভ শেষপর্যন্ত সন্তানের স্বার্থে তার নিজের আদর্শগত স্বার্থ বিঘ্নিত করে বৈধ বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবারও প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু শ্বেতা অবিচল তার অবৈধ সন্তানের মায়ের ভূমিকায় রূপদান করতে।

আর বোধহয় টিকিয়ে রাখা গেল না সম্পর্কটা। ক্রমশই অনিবার্য হয়ে উঠছে ছাড়াছাড়িটা। শ্বেতা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, তার কখনও বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আদৌ আসবে কিনা!

০৮ সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

রাণু বউদি
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়



সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফেরার পর অন্ধকার ঘরে জল জমতে থাকে। জলের পছন্দসই অন্ধকার নিঃশব্দে হাওয়াই চপ্পল, খালি বোতল ভাসিয়ে তোলে। খাটের পায়া বেয়ে এসে গায়ে ঠাণ্ডা হাত রাখে। ঘরের লাগোয়া বারান্দা; বাইরে একফালি ঘাস, পাঁচিল, নয়ানজুলি। পার হয়ে হাইওয়ে; ওপারে নোনাজমি, খাড়ির সমুদ্র। সোডিয়াম ভেপারের আলো ঘরের মধ্যে চলকায়। জলের জামার সামান্য ছেঁড়া, আঙুল দিয়ে টেনে বাড়িয়ে দেয়। ঘাসের ওপর এলো চুলে ফ্ল্যাটবাড়ির এক মেয়ে নিচু হয়ে কী কুড়িয়ে নিলো; বকুল ফুল, নাকি আংটি হারিয়েছে, নাকছাবি! মেয়েটি কি বুঝতে পেরেছে, কেউ তাকে দেখছে? নুনের মতো গুঁড়ো সোডিয়াম উড়ছে হাওয়ায়। সেই ছায়ামানুষীর শরীরের চারপাশে ফুটে ওঠা আলোর দানা; অবয়বের অপার্থিব সৌকর্য; দেখে দেখে জলের সংস্রবে অন্ধকার ঘরে, আমার শরীর জেগে ওঠে। তীব্র আত্মরতির লিপ্সায় অস্থির হয়ে উঠি, ছটফট করতে থাকি।

মেয়েটি আমার খোলা জানালার দিকে হেঁটে আসে; গরাদে হাত রেখে আমার শীত শরীরকে প্রায় ছুঁয়ে যায়। ‘একি অন্ধকারে ভূতের মত বসে কী করছ?’ রাণু বউদি ঘাসের থেকে জবাব চাইছে। রাণু বউদির মুঠো থেকে টিকটিকির লেজের মতো সাদা ফিতে ঝুলে আছে। দোতলার বারান্দা থেকে উড়ে এসে ঘাসে পড়েছিল সাদা জামা; পায়রার মতো দানা খুঁটে খাচ্ছিল। তাই কুড়োতে নিচে এসেছিল রাণু বউদি।। বলে, ‘চাবি ভুলে গেছি। বাপ ছেলে বেরিয়েছে। তোমার ঘরে একটু বসি?’ আলো জ্বেলে দরজা খুলে দিই। ঘরে ঢুকে নির্দ্বিধায় আমার বিছানায় বসে পড়ে রাণু বউদি। আঁচল দিয়ে ঠোটের ওপরের ঘাম মোছে। কথা খোঁজে; এটা সেটা বলে। আস্তে আস্তে জিভ জড়িয়ে আসে; পুরু সর পড়ে। ‘বাইরে হিমের মধ্যে থেকে ঘরে এসে গরম লাগছে’। রাণু বউদি ওঠে; বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। আমাকেও ডাকে। ‘যাই’ বলে সাড়া দিয়ে পাশে গিয়ে দাঁড়াই।

এমন সময় জোর হাওয়া ওঠে। অনবরত খোলা জানালার পাল্লা পড়ে। ঝড়ের মতো হাওয়ায় আমার হাফশার্ট ফুলে ওঠে। একটার পর একটা বোতাম ছিঁড়ে যায়। রাণু বউদির সম্বিত ফেরে। শাড়ির আঁচল ধরে রাখতে পারে না। হিমশিম খায়। শহরতলীর আলোর ওপর, অন্ধকার আকাশে জাপানী ঘুড়ির মতো রাণু বউদির শাড়ি উড়ে যায়। উড়তে উড়তে ঝড়ের মেঘের মতো আকাশ ছেয়ে ফেলে। ব্লাউজের হুক ছিঁড়ে সাদা জামা বারান্দার কার্ণিশে আটকে যায়। তারপর নতুন উড়তে শেখা সীগালের মতো খাড়ির দিকে ভেসে যায়। দু-এক বিন্দু বৃষ্টি ওড়ে। হঠাৎ হাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে দরজায় কারো করতল বেজে ওঠে। বারংবার একই মাত্রায় বাজতে থাকে। স্থানু হয়ে দুজনে দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ গিয়ে দরজা খুলে দিতে পারি না।




০৯ সোনালি বেগম

গ্যাস-লাইটার
সোনালি বেগম



ফ্রেঞ্চ-এ একটা কথা আছে, ‘পার্তির সে তুজুর তাঁ প্য মুরীর’ –- প্রত্যেক বিদায় গ্রহণে এক একটি খন্ডমৃত্যু জড়িয়ে থাকে।

সেদিনটাকে সকলেই ‘শুভ’ বলে। শুভবিবাহ শুভদৃষ্টির বজ্রাঘাত!

জয়নাব ও তৌফিক রহমান-এর সংসার ধীরে ধীরে পুরনো হতে থাকে...

‘বুবুনের পায়ের বয়েলটা বেশ পেকেছে’ -- উদ্বিগ্ন জয়নাব।

‘সাফ করে দিও। যাক গে এখন আমাকে বেরোতে হবে’ –- তৌফিক সাহেব কোনো অনির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে গেলেন।

তিন বছরের বুবুন কিছুদিন ধরে বেশ ভুগছে। বৈশালী সেক্টর চার-এ একটি বেসরকারী হাসপাতালে বুবুনকে নিয়ে বসে আছে জয়নাব। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বাজে। রোজ এই সময় ড্রেসিং করা হয়। সঙ্গে আন্টিবায়োটিকস্‌ তো চলছেই।



ডিসেম্বরের উত্তরপ্রদেশে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় একটি রিক্সা ধরে ওরা। বুবুনকে বেশ ভালো ভাবে গরম কাপড়ে জড়িয়ে কোলের কাছে চেপে ধরে বসে থাকে সে। ছুরির মতো শীত ফালাফালা করে কাটতে থাকে তাদের। বৈশালী সেক্টর চার ছাড়িয়ে রিক্সা পুল ধরে এগিয়ে চলেছে ইন্দিরাপুরম। দূরে স্ট্রিট লাইটের আলোয় স্বপ্নপুরী জেগে উঠছে। জয়নাবের বারবার যিশু খ্রিস্টের বাণী মনে পড়ছে –- ‘দি ফক্সেস্‌ হ্যাভ হোলস্‌ অ্যান্ড দি বার্ডস অফ দি এয়ার হ্যাভ নেস্‌ট; বাট দি সান অফ দি ম্যান হ্যাজ নট হোয়্যার টু লে হিজ হেড’।



বেঁচে থাকার আনন্দ-বিষাদ ঘিরে জয়নাব ক্রমশ উদাসীন হয়ে যাচ্ছে কি! সে অনুভব করে, অন্যের কথা না ভেবে নিজেকেই আগে পালটানো জরুরী। ইদানীং আব্বাজানের কবরের সামনে দাঁড়ালে জীবিত-মৃত ফারাক সে অনুভব করতে পারে না।



বাড়ি পৌঁছোতে রাত সাড়ে আটটা হয়ে গেল। কোলে চড়েই কলিংবেল বাজালো বুবুন –- ‘এসে গেছি পাপা!’

তৌফিক সাহেব দরজা খুলে দিলেন।

‘রাত কটা হলো?’ গলায় বিরক্তির চড়া সুর।

‘এই অড্‌ টাইমটাই ড্রেসিং করে ওরা’। ধীরে ধীরে বলল জয়নাব।

‘যত্ত সব নখ্‌রাবাজি!’



বুবুনকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে হিটারটা অন করে দেয় জয়নাব।

‘মম্মি, খেতে দাও, তাড়াতাড়ি!’

‘অল্‌হম্‌দুলিল্লা’ মানে ‘খোদাতালাকে অসংখ্য ধন্যবাদ’ দিতে দিতে রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাস-লাইটার খুঁজতে থাকে সে।