পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৩

সম্পাদকীয় - কালিমাটি অনলাইন / ০৫

সম্পাদকীয়


কিছুদিন আগেও বাংলা গদ্য সাহিত্যের একটি অন্যতম প্রধান ধারা ছিল ‘রম্যরচনা’। কেউ কেউ ‘রসরচনা’ নামেও অভিহিত করেন। সেই বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে বঙ্কিমচন্দ্র এবং তারপর ত্রৈলোক্যনাথ, কেদারনাথ, হুতোম প্যাঁচা কালীপ্রসন্ন সিংহ, বীরবল প্রমথ চৌধুরী, পরশুরাম রাজশেখর বসু, সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ ও আরও অনেকের লেখনিতে সমৃদ্ধ হয়ে শিবরাম চক্রবর্তী, পরিমল গোস্বামী, সৈয়দ মুজতবা আলী এবং আরও পরবর্তী কালে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়... কত মহান ও বলিষ্ঠ সাহিত্যিকদের হাতেই যে এই ধারাটি পরিপুষ্ট হয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পাতায় চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। কিন্তু ইদানীং যে কোনো কারণেই হোক, এই ধারাটি প্রায় স্তিমিত হয়ে এসেছে। হয়তো বর্তমানের গদ্য সাহিত্যিকরা এই ধারাটি সম্পর্কে তেমন আগ্রহ বোধ করেন না বা গুরুত্ব দেন না। হয়তো বেশ কিছু অযোগ্য সাহিত্যিকের হাতে এই ধারায় সূক্ষ্ম রসের পরিবর্তে অনুপ্রবেশ করেছে নিতান্তই স্থূলরস, যা পাঠকদের কাছে অপাঠ্য বলে মনে হয়েছে, আর তাই ধারাটি ক্রমশ শুকিয়ে এসেছে। আবার এমনও হতে পারে, রম্যরচনা বা রসরচনা লেখার মতো দক্ষ কলম এই সময় অনেকের কাছেই নেই। কারণ যাই হোক না কেন, এই ধারাটি দুর্বল হয়ে পড়ায় আদতে ক্ষতি হয়েছে বাংলা গদ্য সাহিত্যের। বাংলা ভাষা সাহিত্যেরও। তবু হাস্যরসের যোগান কমে যাওয়া এই দুর্দিনেও কেউ কেউ আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, যদি ধারাটিকে সজীব রাখা যায়। সম্প্রতি এই রকমই একজন বলিষ্ঠ লেখকের সন্ধান পেয়েছি আমরা, যিনি বেশ কিছুদিন ধরে রম্যরচনা বা রসরচনার ধারাটিকে বয়ে নিয়ে যাবার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। তাঁর নাম অমিতাভ প্রামাণিক। বলা বাহুল্য, সেই অমিতাভ প্রামাণিকের কলমেই আমরা এই সংখ্যা থেকে শুরু করলাম আর একটি নতুন বিভাগ ‘চারানা আটানা’। আমরা আশাবাদী, ‘কবিতার কালিমাটি’, ‘কালিমাটির ঝুরোগল্প’, ‘কালিমাটির কথনবিশ্ব’ ও ‘ছবিঘর’ বিভাগের পাশাপাশি ‘চারানা আটানা’ বিভাগটিও আপনাদের ভালো লাগবে। সেইসঙ্গে, যদি বাংলা গদ্য সাহিত্যের একদা খুবই জনপ্রিয় এবং মননশীল রম্যরচনা বা রসরচনার ধারাটিকে নতুন করে বা নতুন মাত্রায় পাঠক-পাঠিকাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে আমরা এই ভেবে খুশি হব যে, বাংলা সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতায় আমরা এখনও নিয়োজিত আছি।   

আপনাদের কাছে আবার আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনারা প্রকাশিত কবিতা-ঝুরোগল্প-কথনবিশ্ব-চারানা আটানা-ছবিঘর সম্পর্কে আপনাদের অভিমত অবশ্যই জানান ‘কমেন্ট বক্স’-এ। সেইসঙ্গে ‘কালিমাটি অনলাইন’কে আরও সমৃদ্ধ করুন আপনাদের স্বরচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক মননশীল কবিতা, ঝুরোগল্প, গদ্য ও আলোকচিত্র পাঠিয়ে। 


আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা : kalimationline100@gmail.com

প্রয়োজনে দূরভাষে যোগাযোগ করতে পারেন : 0657-2757506 / 09835544675

অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :

Kajal Sen, Flat 301,
Parvati Condominium, Phase 2,
50 Pramathanagar Main Road,
Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India.

<<< চারানা-আটানা >>>

কালিমাটি পত্রিকার কমিক সিরিয়াল


ইংরাজীতে যাকে চেঞ্জ বলে, বাংলায় তাকে বলে খুচরো বা রেজগি। এই খুচরো বা রেজগি আমাদের এক সময়ের নিত্যকালের সাথী ছিল। এক প্যাকেট বিড়ি কিনতে গেলে দেখা যেত, দাম পঁয়তিরিশ পয়সা, অর্থাৎ একটা আটানার কয়েন দিলে পনের পয়সা ফেরত পাওয়া যেত। ‘মাল নিজ দায়িত্বে রাখিবেন’ ইত্যাদির পাশাপাশি বাসের ভিতরে লেখা থাকত, ‘সঠিক ভাড়া দিবেন’। অর্থাৎ খুচরো নিয়ে কণ্ডাকটরের সঙ্গে হাতাহাতি করবেন না। ভিখারিকে দেওয়ার জন্যে খুচরো পয়সা আলাদা করে রাখা থাকত একটা বাটিতে, বাড়িতে দেখেছি ছোটবেলায়। এখন বাজারে আগুন, সব জিনিসের দাম বেশি বেশি, তাই খুচরো পয়সা দিয়ে আজ আর কিছু পাওয়া যায় না। চারানা আটানা-র গোল গোল চাকতিগুলো আজ অলমোস্ট ইতিহাস।

পরিবর্তনশীল সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই হারাচ্ছি আমরা, বিশেষ করে আমাদের রসবোধ। রবি-ভানু-জহর-সন্তোষ-উৎপল চলে গেছেন, বাংলা সিনেমাতে হাস্যরস পান আর? দাদাঠাকুর, সুকুমার, নারায়ণ গঙ্গো বা সঞ্জীব চাটুজ্জের তুল্য লেখকই বা কই? নতুন যুগের নতুন ধরণ থেকেই খুঁজে নিতে হয় হাসির খোরাক। সেই সবেরই খুচরো-খাচরা দলিল নিয়ে কালিমাটিতে এই সংখ্যা থেকে অমিতাভ প্রামাণিকের নিয়মিত প্রতিবেদন।

 

০১ অমিতাভ প্রামাণিক

চারানা-আটানা
অমিতাভ প্রামাণিক



১ ব্যাকরণ
ব্যাকরণ বিষয়ে আমি যে কিছু লিখিব, এত জ্ঞান আমার নাই। বস্তুত সুমিত যখন আমাকে কালিমাটি পত্রিকার প্রতি সংখ্যায় একটি করিয়া সরস লেখা দিবার জন্য ধরিয়া পড়িল, আমার ভিতর তৎক্ষণাৎ এই আশঙ্কার পরশপ্রাপ্তি হইল, যাহার প্রতি সরস্বতী বিরূপ, যাহার ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান নাই, সে কী করিয়া হরষপূর্ণ লেখা লিখিবে? গাঁইগুঁই করিয়া এড়াইয়া যাইবার তালে ছিলাম, কিন্তু সুমিতও নাছোড়বান্দা। সুতরাং স্থির করিলাম, ক্ষতস্থানে আঘাত করিয়াই শুরু করা যাউক, রস গড়াইবে হয়ত। অর্থাৎ, ব্যাকরণ।

কবি বলিয়া গিয়াছেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’। ইহা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা মরিতে বসিয়াছে, কিছুকাল পূর্বে ‘আমরি’ নামক কলিকাতাস্থ চিকিৎসালয়ে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, বোধকরি তাহাতে বিশেষভাবে দগ্ধ অর্থাৎ বিদগ্ধ হইয়া। আপনারা নিরীক্ষণ করিতেছেন, অদ্যকার স্বভাব-প্রতিবাদী বঙ্গবাসী মনুষ্যসন্তান মাতৃভাষা ভুলিতে বসিয়াছে, অথচ বিদেশী ভাষা যে কিছু উত্তমরূপে আয়ত্ত করিতেছে, তাহা প্রতীয়মান হয় না। রাস্তাঘাট হইতে মসনদ, সর্বত্র প্রতিবাদ করিয়া যাহারা দিন গুজরান করিতেছে, তাহারা প্রতিবাদ শব্দটিকেও শুনিতেছি ‘পতিবাদ’ বানাইয়া লহিয়াছে। মার্ক্স ও গান্ধীর নীতি যদি যথাক্রমে মার্ক্সবাদ ও গান্ধীবাদ হয়, তবে পতিবাদ নিঃসন্দেহে পতি-র নীতি। কিন্তু যাহারা পতি বিষয়ে অনভিজ্ঞা, তাহাদের ভাষ্যেও পতিবাদের ছড়াছড়ি। 

মাতৃভাষারই হাল এইরূপ, তবে অন্য ভাষায় দক্ষতা কিরূপ হইবে তাহা সহজবোধ্য। রাজভাষা শিক্ষা সহজ নহে, উচ্চারণ অতিশয় কঠিন, তাহা বঙ্গসন্তান দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর ইংরাজী বাক্যালাপেই পরিস্ফুট হয়। কী করিয়া হইবে? যে ভাষায় পি ইউ টি পুট, অথচ বি ইউ টি বুট নয়, বাট, তাহার শিক্ষা কি যাহার তাহার কর্ম? জি ডাব্‌ল্‌ ও ডি হইল গুড, অথচ ডি ডাব্‌ল্‌ ও আর ডুর নহে, ডোর, আবার পি ডাব্‌ল্‌ ও আর পুরও নহে, পোরও নহে, পুওর। কী ঝঞ্ঝাট! এই ভাষায় ‘হাউ ডু ইউ ডু’ শব্দের অর্থ ‘আপনি কেমন করিয়া করেন’-এর পরিবর্তে ‘আপনি কেমন আছেন’। অর্থাৎ যাহা বলা হয়, তাহা ‘মীন’ করা হয় না। আমাদের ভাষায়, ভদ্রলোকের এক কথা। সুতরাং এই দুরূহ ভাষা হইতে সপ্তহস্ত দূরে অবস্থান করাই বুদ্ধিমানের কাজ, বঙ্গজরা তাহাই করিয়া থাকে।

সহজ পাঠ দ্বারা বাংলা শিক্ষা শুরু হয়, সুতরাং বাংলা সহজ, বাংলায় এই সকল সমস্যা নাই। এই রকমই ভাবিয়াছিলাম, কিন্তু হায়, সে ভাবনাও ঠিক নহে। দেখিলাম, কবি বলিয়াছেন, ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর’। এই ধরম হইল ধর্ম, এই করম হইল কর্ম। বাংলা গ্রামারের চটি বহিতেও লিপিবদ্ধ আছে ইহা হইল চরম তুচ্ছ ব্যাকরণ, সর্বজনজ্ঞাত। তথাপি চরম মানে চর্ম নয়। কী অদ্ভুত, গড়বড় কেস!

চর্ম হইতেছে চামড়া। অথচ দামড়া ছেলেটিকে দর্ম বলিয়া সম্বোধন করিবার উপায় নাই। রাজ্যে কর্ম অপ্রতুল, কর্ম লইয়া কামড়াকামড়ি চলিতেছে বেশ কিছুকাল যাবৎ, কিন্তু কর্ম এবং কামড়া সমার্থক নয়, কামরা তো নয়ই। চর্মকে অনেকে চাম বলিয়া থাকেন, ঘাম যেমন ঘর্ম। কিন্তু আমকে অর্ম বলিলে বর্ম পরিয়া রে রে করিয়া তাহারাই উদ্যতখড়্গ হইবেন, সে বর্মও রাজনৈতিক সংগঠন বা ক্ষতস্থানে লাগাইবার ‘বাম’ নহে। আম হইল আম্র। তবে কি মধুময় সেই তামরস তবে তাম্ররস? না। তাম্র হইল গিয়া তামা। সেইজন্য মামাকে মাম্র বা জামাকে জাম্র বলিলে লোকে নিরক্ষর বলিবে, বলিবে ইহার তাল নাই। সংস্কৃতে ‘তমালতালিবনরাজিনীলা’র তালি বাংলায় হইল তাল, লোকে আজকাল জালি করিতেছে, তাহা যেমন জাল, গালি দিলে যেমন গাল দেওয়া হয়। কিন্তু মুখের গাল যদিচ গণ্ড, গৃহিণী চণ্ডমূর্তি ধারণ করিলে তাহাকে চাল বলা যায় না, যাহারা ভণ্ড তাহাদিগকে ভাল বলিলে ঠিক হইবে না। অধিকতর গুবলেট কেস!

বাল্যে আমরা যখন বাংলা পাঠাভ্যাস করিতাম, তখন পরীক্ষায় বিবিধ প্রশ্নাবলির একটি ছিল একই উচ্চারণবিশিষ্ট দুইটি শব্দের অর্থের পার্থক্য প্রদর্শন। একবার পরীক্ষায় আপন ও আপণ শব্দদ্বয়ের পার্থক্য নিরূপণের উপর প্রশ্ন আসিল। পরীক্ষাভবনে আমার এক বন্ধু দূর হইতে আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর বলিবার জন্য সঙ্কেত করিতে লাগিল। আমি ভাবিলাম আপন শব্দের অর্থ সে নিশ্চয় জানিবে, তাই আপণ শব্দের অর্থ যে দোকান, তাহা বুঝাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। জোরে শব্দ উচ্চারণ করিলে শিক্ষক মহাশয়ের কর্ণগোচর হইবে, উনি আমার কর্ণ পাকড়াইয়া হল হইতে নিস্ক্রমণের রাস্তা দেখাইয়া দিবেন, এই ভয়ে হাঁ করিয়া ওষ্ঠাধর প্রকম্পিত করিয়া যথাসাধ্য দোকান বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম। সে কিছুতেই বোঝে না। বাধ্য হইয়া দুইটি অঙ্গুলি ও কান প্রদর্শন করিয়া চুপি চুপি কহিলাম – দো কান। সে এতক্ষণে বুঝিল। খাতায় লিখিয়া আসিল, আপণ শব্দের অর্থ দুইটি কর্ণ!

ভুল বুঝিলে শব্দের অর্থের হানি হয়, ইহা স্বাভাবিক। কিন্তু আজকাল এস এম এসের যুগ, সমস্ত কিছু সংক্ষেপে ব্যক্ত করিবার যুগ। এই সংক্ষেপকরণ সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপণে, বিশেষ করিয়া পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপণে বহুকাল ধরিয়া প্রচলিত। ‘অস চলিবে’র অর্থ যে অসবর্ণ বিবাহে আপত্তি নাই, বা ‘কে স চা’-র অর্থ যে কেন্দ্রীয় সরকারে চাকুরিরত বা -রতা, তাহা বিশদে বলিবার প্রয়োজন নাই আর। তথাপি কিয়ৎকাল পূর্বে একটি বিজ্ঞাপণের বর্ণনায় বিশেষ চমৎকৃত হইয়াছিলাম। পাত্র-পাত্রী কলমেই বিজ্ঞাপণ ছিল – “সুন্দরী, শিক্ষিতা পাত্রীর জন্য উপযুক্ত পাত্র চাই। পাত্রী ৩২ ব্রা পরা কন্যা, নিয়মিত মাসিক ২৫, হাতে হাজা উঃউঃ”। যাহারা এই বিবরণে যুগপৎ বিস্মিত ও উত্তেজিত হইতেছেন, তাহাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ৩২ কোন সাইজ নহে, বয়ঃক্রম। ব্রা পরা কন্যা হইল জাতিতে ব্রাহ্মণ, পরাশর গোত্র, কন্যারাশি-র সংক্ষিপ্ত রূপ। নিয়মিত মাসিক ২৫ হাজার টাকা আয়, তদুপরি হাতে হাজার টাকার উপরি উপার্জন, এই হইল পরবর্তী অংশের অর্থ। আপনারা বোধকরি অন্য কিছু ভাবিতেছিলেন!

যাহা লেখা হয়, তাহাই ‘মীন’ না করার তালিকায় বাংলা আপ্তবাক্যের সংখ্যা কম নহে। এ বিষয়ে নূতন-পুরাতন বহু গল্প চালু আছে। আমি একটি স্ব-অভিজ্ঞতালব্ধ ঘটনা ও একটি শ্রুত কাহিনী পেশ করি। 

ঘটনাটি সেই সতীর্থকে লইয়া যে দুইটি কর্ণ ব্যবহার করিয়াও আপণ শব্দের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করিতে পারে নাই। পরবর্তী জীবনে সে কাব্যরচনায় প্রয়াস পাইয়াছিল, কিন্তু সে পৃথক কাহিনী। সম্ভবতঃ নবম শ্রেণীর ষাণ্মাষিক পরীক্ষায় প্রশ্ন আসিয়াছিল, ‘খয়ের খাঁ’ শব্দবন্ধ দ্বারা বাক্য রচনার। ষাণ্মাষিক পরীক্ষার উত্তরপত্র ছাত্রদিগকে ফেরত দেওয়া হইত, এই স্থলে দিবার পূর্বে গুরুমহাশয় তাহার উত্তরপত্র খুলিয়া ক্লাশে পাঠ করিয়া শুনাইলেন। সে লিখিয়াছে, ‘পান খেয়ে তোর মুখটা ঠিকমত লাল হয়নি, তুই আর একটু খয়ের খাঁ’!

শ্রুত গল্পটি যে আপ্তবাক্য লইয়া, তাহা হইল, ‘সাবধানের মার নেই’। এইস্থলে উত্তরকর্তা সৃজনীশক্তির চরম নিদর্শন প্রয়োগ করিয়া লিখিয়াছে, ‘সাবধানের বাবার মুখভর্তি গোঁফদাড়ি, কিন্তু সাবধানের মার নেই’!

ছাত্রছাত্রীরাই ভবিষ্যতের নাগরিক। তাহাদিগের ভুল উত্তর লইয়া হাস্য অনুচিত। হাস্য করিতে হইলে তাহা লইয়া করাই যুক্তিযুক্ত যাহারা ভবিষ্যতের নাগরিক বানাইবার জন্য ভারপ্রাপ্ত। কিন্তু তাহাদের কার্যাবলি নিরীক্ষণ করিলে প্রথমেই যে আপ্তবাক্যটি স্মরণে আসিবে, তাহা হইল, ‘পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়’।

দুর্ভাগ্যক্রমে আপামর বঙ্গসন্তান ইহাকেও শাশ্বত সত্য হিসাবেই মানিয়া লহিয়াছে। সত্য, পাগল বাক্যবাগীশ, তাহার পক্ষে শ্রবণযোগ্য ও অশ্রাব্য সকল ভাষাতেই অজস্র বাক্যবর্ষণ সম্ভব। যদিও প্রকৃত পাগলের কণ্ঠে আমি অদ্যাপি মন্দাক্রান্তা, মেঘনাদবধ কাব্য, নাইজেরিয়ার পর্যটন ব্যবস্থা, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ, ডারুইন তত্ত্ব, গ্লোবাল ওয়ার্মিং থিওরি – প্রভৃতির কিছুই শ্রবণ করি নাই। ভাবিয়া দেখিলে এইরূপ প্রতীয়মান হয় যে, এই সকল বিষয়াদি পাগলের পাগলামির মহৌষধ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারে। হয়তো এই কারণেই বাল্যকালে এই সকল গুরুত্বহীন বিষয়ের কিয়দংশ পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে, যাহাতে বালক-বালিকাগণ শিক্ষিত হউক না হউক, অন্ততঃ সম্পূর্ণরূপে পাগল হইবে না।

পাগলের পাগলামি হইতে ছাগলের ছাগলামির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যাউক। ছাগল সর্বভুক, ইহাও সর্বৈব মিথ্যা। ছাগল তৃণভোজী, সে চিকেন, মাটন, বীফ, পর্ক, মৎস্য, ডিম্ব প্রভৃতির কিয়দংশও স্পর্শ করে না, ভক্ষণ তো দূরের কথা। বিপাকে পড়িয়া কদাচিৎ সে প্লাস্টিকের প্যাকেট, পূজা সংখ্যার দেশ, হাওয়াই চটির স্ট্র্যাপ, শাড়ির আঁচল, শিশুর ডায়াপার বা বাজারের ফর্দের ন্যায় সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য গলাধঃকরণ করিয়া থাকে সে কথা সত্য। কিন্তু সাধারণভাবে তৃণ ও পনসপত্রের প্রতিই তাহার মনোযোগ বেশি ন্যস্ত থাকে। এ বিষয়ে সে মনুষ্যের ন্যায় খুঁতখুঁতে নহে। যে সকল মনুষ্য পনস বা কাঁঠাল আগ্রহ লইয়া ভক্ষণ করে, তাহারাও হয় খাজা নতুবা রসালো, এই দ্বয়ের একটিকেই অধিকতর পছন্দ করে। ছাগবৎস কাঁঠালপত্র পাইবামাত্র উদরস্থ করে, তাহা খাজা না রসালো কাঁঠালের পত্র, ইহা পরীক্ষা করিবার প্রয়োজন বোধ করে না। 

শুধু এই কারণেই ছাগকে সর্বভুক বলিয়া গালি দেওয়া অতিশয় অন্যায্য। হিন্দুগণ গো-জাতিকে লইয়া প্রয়োজনের অধিক মস্তকে তুলিয়া নৃত্য করে, অথচ ছাগকে গালি দেয়। সম্যক অবলোকন করে না, ছাগল গরু অপেক্ষা অধিকতর সংস্কৃত প্রাণী। তৃণ, কাঁঠালপত্র, পালং চারা, প্লাস্টিক, আনন্দবাজার রবিবাসরীয়, সে যাহাই ভক্ষণ করুক, পশ্চাদ্দেশ হইতে হজমোলার গুলির ন্যায় সমান মাপের ট্যাবলেট নিস্ক্রমণ করিয়া থাকে। ছাগলের নাদি অনাদিকাল হইতেই প্রযুক্তির এক অসীম বিস্ময়। গরু হাজার জীবনেও এইরূপ গোবর ক্যাপসুল প্রদানে অক্ষম। সে ক্ষমতা যদি তাহার থাকিত তবে বড় বৌ ও মেজ বৌ-তে মিলিয়া ঘরের প্রাচীরে ঘুঁটে দিবার প্রয়োজন অনুভূত হইত না।

ছাগের প্রতি এই বিমাতৃসুলভ আচরণ শুরু হয় প্রাথমিক বাংলা পাঠাভ্যাসের শুরু হইতেই। প্রথম পৃষ্ঠাতেই শিশুদিগকে শিক্ষাদান করা হয়, ‘অ-এ অজগরটি আসছে তেড়ে’ বলিয়া। আপনারাই বলুন, কয়টি শিশু বাল্যে অজগর দেখিবার সুযোগ পায়? যাহাদের অজগর কী, সে সম্বন্ধে কোন ধারণাই নাই, তাহাদিগকে প্রথম হইতে এইরূপ কুশিক্ষা প্রদানের জন্যই ভবিষ্যতে তাহারা রাজনৈতিক নেতা বনিয়া অজগরের ন্যায় সর্পিল হইয়া জনগণের প্রতি ধাবমান হয়। অজগরের অর্ধেক হইল অজ অর্থাৎ ছাগ, যাহা বহু শিশুদিগের নিকট অতিপরিচিত প্রাণী, যাহা ক্ষুদ্রতর শব্দ, যাহার উচ্চারণ অজগর অপেক্ষা সহজতর। অজকে উপেক্ষা করিয়া অজগরকে প্রাধান্য দেওয়া বাংলা শিক্ষার এক চরম ভুল, ইহা অস্বীকার করিলে বলিতে হইবে বঙ্গবাসীর চর্ম পুরু। 

বাংলা ছাড়িয়া ইংরাজীতে দৃষ্টিপাত করা যাউক। রাজভাষায় আলোকপ্রাপ্ত মনুষ্য গরু অপেক্ষা ছাগলের সহিত নিজেকে অধিকতর সন্নিবিষ্ট জ্ঞান করে বলিয়াই আপন এবং অপরের সন্তান-সন্ততিদিগকে ‘কিড্‌’ বলিয়া সম্বোধন করে। অভিধানে স্পষ্ট লিখিত আছে, কিড শব্দের আক্ষরিক অর্থ ছাগবৎস। এক্ষেত্রে মনুষ্য-ছাগ মিলিয়া মিশিয়া একাকার। বালক-বালিকাদিগকে ‘কাফ’ জাতীয় সম্বোধন অদ্যাপি কর্ণগোচর হয় নাই। সুতরাং ইংরেজ মতে গরু আউট, ছাগল ইন। এই অতিরিক্ত জ্ঞানের সুবাদেই তাহারা বঙ্গভূমি দখল করিয়া দুইশত বৎসরকাল শাসন করিয়াছিল বলিলে অত্যুক্তি হইবে না।

বস্তুত গরুর নিকট হইতে অর্থহীন হাম্বা-হাম্বা জাতীয় উৎকট বলিউডি সঙ্গীতের লিরিক ব্যতীত আর বিশেষ কিছুই মনুষ্য লাভ করে না। যদিচ মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সহিত তুলনা করিয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আজকাল ফিগার-সচেতন বঙ্গমাতা আপন সন্তানের জন্য মাতৃদুগ্ধপান অপেক্ষা ফর্মূলা মিল্কের উপরই বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করিতেছেন। মাতৃদুগ্ধের অভাবে শিশুর মাতৃভাষার শিক্ষাও সম্যক লাভ হইতেছে না। যাহারা ফর্মূলা সংগ্রহে অক্ষম, তাহারা গোদুগ্ধ পান করাইয়া থাকেন, ফলে শিশুটি বড় হইয়া গরুতে পরিণত হয়। হয় ষাঁড় হইয়া অন্য গরুর প্রতি ধাবমান হয়, অথবা গরু হইয়া ষাঁড় দ্বারা নির্যাতিতা হয়, সংবাদপত্রে নিয়মিত আপনারা তাহা পাঠ করিতেছেন। গোদুগ্ধ অপেক্ষা ছাগদুগ্ধ অধিক উপকারী জ্ঞান করিয়াছিলেন মহাত্মা গান্ধী, রোজ প্রাতে এক ঘটি ছাগদুগ্ধ পান না করিলে তিনি সত্যাগ্রহে মনোনিবেশ করিতে পারিতেন না। ছাগের প্রতি বিরূপতার কারণেই সত্যের প্রতি আগ্রহ অদ্য স্থিমিত, যৎপরোনাস্তি ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করিয়া ভোটপ্রার্থনায় ব্যস্ত আজ নেতৃবৃন্দ, তাহা আপনারা নিঃসন্দেহে স্বীকার করিবেন।

কিন্তু ইহা হইতেও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হইল ছাগধ্বনি। অজগণ ব্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যা করিয়া যে শব্দ বায়ুমণ্ডলে ধ্বনিত করে, তাহাতে হিন্দুস্তানী ও কর্ণাটিক বেশ কয়েকটি রাগ-রাগিনীর মিশ্রণ বর্তমান, যাহার কিয়দংশও হাম্বা’তে নাই। শুদ্ধ ব্যা-এর উপরেই ছাগ শব্দমালা, স্বর ও ব্যঞ্জন লইয়া স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। ব্যা-ধ্বনি শুদ্ধ না হইলে ছাগমাতা আপন বৎসকে পুনঃপুনঃ তাহা রিহার্সাল করাইয়া শুদ্ধ করিয়া দেয়। 

ইহাই ব্যা-করণ। যতই ছাগকে অবজ্ঞা করিয়া ‘ছাগলে কী না খায়’ বলিয়া থাকুক, মনুষ্যও ছাগের ন্যায় ব্যাকরণচর্চা প্রক্রিয়াতেই আপন ভাষা শুদ্ধরূপে শিক্ষা করিবার প্রয়াস পায়।  

<<< কালিমাটির কথনবিশ্ব >>>


০১ আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

কবির জাতীয়তা আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

লিখি কবিতা। প্রশ্ন জাগে, তাহলে আমার জাত কী? জাতীয়তাই বা কী? কবি-জাত আমি কবিতা-জাতীয়তা আমার? উত্তরে যদি হ্যাঁ করি তাহলে একটি জটিলতা আসে। কারণ মানুষের নানা রকমের পরিচয়-চিহ্নের মতো কবিও একটি পরিচয় আর কবিতা একটি শিল্প-শাখার নাম। কবি বলতে এখানে ঠিক মানুষ হিসাবে তার জাত বা জাতীয়তা আসে না। কিন্তু যে মনে প্রাণে এই শাখটিকে জাগিয়ে রাখে, একে নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসাবে বেছে নেয়, তাহলে হ্যাঁ করাকে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। আমার জাতীয়তা যদি কবিতা হয় তাহলে আমি কোনো ইস্যুকে হাইলাইট করে আমার জাত ও জাতীয়তা প্রকাশ করি। ভাব আর স্বপ্নধ্বনি -- এমন থোকা থোকা আত্মমগ্নতার এক একটা ছবি, রঙ রেখার বীজ তার মাথায় শেকড় গাড়ে বলে কবির কোনো দেশ থাকে না। পুরো পৃথিবী পুরো ইউনিভার্সই, সমস্ত সীমানা সমস্ত দেওয়াল একাকার করে তার চিন্তা আর ধ্যানে একটি চলন্ত মুভি-বাক্স হয়ে আছে। এসব থেকে কবি নিজেকে কীভাবে ছাড়িয়ে আনবে? তার ভাষাবোধ তার আত্মপরিক্রমণের আর এক ট্রান্সপারেন্ট জলপিঠ যেন। যেখানে নুড়ি পাথরের মতো ভেসে বেড়ায় তার অভিনিবেশ, তার ধ্যান। দেশ একটা থাকলেও জন্ম গ্রহণের কারণে সেটি একটা আলাদা জন্মস্থান, ভূখণ্ড মাত্র। এটিও আবার তার স্ব-নির্বাচনের আওতায় থাকে না। এটি তার নিয়ন্ত্রণহীন, অন্যের স্বেচ্ছাচারী প্রয়োজনে গড়া। মানে তার এই জাত বা জাতীয়তার পরিচয় অনেকটা নিয়তি তাড়িত। কিন্ত যে জিনিসটা নিয়তি তাড়িত নয়, সেটি হলো তার কবি হওয়া। যেটি তার স্বাভাবিক হওয়ার মধ্যে আছে, যেটি তার ‘বিঙ’, সেটি তার কবিজীবন। এই জীবন যেখানেই থাকুক না কেন, তার ভাষা, তার প্রতি মুহূর্তে হয়ে ওঠার ভাষা, কোনো রকমের সামাজিক ভাষার কর্তৃত্ব ছাড়াই এটি নিজেকে জানান দেয়।

কবির যাত্রা তার জন্ম-ভূখণ্ড থেকে নিজের ভেতরের নিজস্ব হওয়ার দেশে। সেখানেই সে রচনা করে প্রকৃত তাকে। তার চারদিকের বস্তুরাশি তাকে যে প্রণোদনা দেয়, তার থেকে সে তার কাব্যভাষার দরকারি মাল মসলা তুলে নেয় শুধু। কবির ঠিকানা কবির শারীরিক অবস্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা, তার মন আর মননের আয়নাভূমি। সেখানে কবি তার আপন চেহারা প্রতিষ্ঠিত করে। তাই যে কোনো ভাষায় লেখা হোক না কেন, কবিতার একটি নিজস্ব মুখ থাকে। সত্যিকারের কবির কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই, দেশ নেই, জাতির পিতাও নেই। তার চিন্তাস্ফূরণ, তার ভাববিন্যাস অনেকটা বস্তু বা অবস্তু হয়ে, ভাব ভাবনার মূর্ত প্রকাশ থেকে ক্রমশ একটা না-হওয়া, না-ফোটা দেশের দিকে ধাবিত। সেখানে যারা থাকে সেটি এক একটা মানুষের কণ্ঠ, মানুষের চেহারা, এক সাথে পৃথিবীর মানুষের বিবিধ মানসিক আর সামাজিক কারেক্টার-ট্র্যাণ্ড। তাই তার ভাষা বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ বা আরবি যাই হোক, এইগুলি তাকে শেষ পর্যন্ত একটি বিশেষ ভূখণ্ড বা দেশের কোনো কনক্রিট ভাষাবোধে জারিত করে না। লিখছি কবিতা, এমন কিছু অনুভব জ্ঞানকে নিয়ে যে, এগুলির কোনো জাত নেই, জাতীয়তা নেই। নারীর সৌন্দর্য, শীতের বিচবালি, উড়ন্ত এই পাখির ওপেরা, ঘুমিয়ে থাকা কচ্ছপের শান্তি, এমন কি এই যে সত্য-মিথ্যা, ভালোবাসা বা এই রাত্রি তাড়িত যৌনতার মাতৃভাষা কী? এইগুলো কি বাংলা? ইংরেজি, ফরাসি, আরবি? এইগুলি কোনো জাতির একক ভাষাবোধ নয়, এগুলি কবির কবিতাবোধ, অন্ধকারে, ঘুম জাগরণ, স্বপ্নের চোরাগলিতে কবির জন্য ইশারা নিয়ে বেড়ায়। এইগুলি আমি লিখি আমার ব্রেইনে প্রোথিত, আমাকে দেওয়া আমার স্ব-ভাষায়। আমি লিখি স্বপ্ন-কবিতা। স্বপ্নের ভাষা কী? এর জাতীয়তা কী? পৃথিবীতে সব স্বপ্ন এক রকমই। তাদের ভাষাবোধও এক। শুধু প্রকাশ ভিন্ন চিহ্ন রেখায় ব্রেইনে প্রোথিত, চাপিয়ে দেওয়া স্ব-ভাষায়। 

০২ অমিতাভ প্রহরাজ

অমিতাভ প্রহরাজ 

যে কোনো লেখার আগে একটি নিখাদ পাঠকের মতো কলম পোড়াও
বুক আর দুটি বৃন্ত দিয়ে রেডিও বানাও
তরঙ্গ ধরো তরঙ্গ খাও তরঙ্গ ধরো তরঙ্গ খাও
তলপেটে কিছু তরঙ্গ নাও
তারপর একটা আচরণ করো
ফোন নম্বরে বেঁচে থাকা শূন্যদের মতো
দু একটা পতঙ্গ নিয়ে বাজে ভাবে বেজে ওঠো, ব্যাস।।



দ্বিচাবাদ রিজার্ভ ফরেস্ট


যে মুহূর্ত হতে লেখাকে জীবিত বস্তু ভাবা শুরু করেছি, সেই মুহূর্ত থেকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অভয়ারণ্য আমার কাছে নির্দ্বিধায় চলে এসেছে তার সমস্ত জংলি সহকারে। আমার যে কোনো নিকটই জংলা জাতীয়, এই বোধ খুব সহজে মনের একটি মাধবী হয়ে থাকবে, এতটা আশা করা অন্যায়। মানুষ থেকে অরণ্য হয়ে উঠতে সময় লাগে, একেক জনের একেক তরিকা থাকলেও কয়েকটা পদক্ষেপ একইগন্ধী থাকে সবার ক্ষেত্রে। এই সব একইগন্ধের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আমরা শিশিরের মতো একটু একটু করে জমে থাকি একসাথে। একসাথে শিখি একেকটা গন্ধের উচ্চারণ, লেখা তো শেখানোর জিনিস নয়, শিখিও না, শিখি এইসব। এইসব, গন্ধ উচ্চারণ, শব্দ আস্বাদন। শিখি নেপোলিয়নের মতো একটি ‘লি’কার, শিখি সে যে নির্বাসিত কখনো যেন ভুলে না যাই। এইভাবে বর্ণমালা থেকে বাক্য ঘটানো শিখে যাই, যেন সেটি একটি দু’পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানো শেখা, বা ধারালো পাথর দিয়ে বরাহ শিকার।

চারদিকেই অরণ্য, তার মধ্যে এই বেড়ে ওঠা বেশ লাগে। মাঝে মধ্যে হাল্কা ওয়াটার কালারের প্রশ্ন জাগে বটে, আমরাও কী অরণ্য না আরণ্যক ঘটনা কোনো? তবে তা থাকে না, ওয়াটার কালার তো, উঠে যায়। আজ এখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বোধ করি, আমরাও কোনো ব্যতিক্রম নই, কোনো আরণ্যক ফারণ্যক নয়, মোদ্দা কথা অরণ্যে দাঁড়িয়ে গোপনে আমার মন নিজেকে ভাবতে ভালোবেসেছে টারজান বা অরণ্যদেব, সেই সনাতন শ্বেতচর্ম অরণ্যের রক্ষাকর্তা, ও সেই গৌরব উপভোগ। সেই সনাতন নরম জেলির মতো ক্ষমতাখন্ড আমার হাতের মধ্যে দপদপ করে কাকুতি মিনতি করছে, আর সেই সুখানুভূতি আঙুল থেকে ছড়িয়ে পড়ছে পায়ের মৃত কড়াটিতেও।

এই লেখাটি লেখার কথা বহুদিন আগে, এতটা দেরি হলো, কারণ এই প্রসঙ্গজন্তুটি বেশ খানিকটা জান্তব পটভূমিকা দাবি করছিল, আর সময়ের চেয়ে সহজলভ্য জান্তব আর কিই বা আছে? বলে ফেলেছিলাম, গত তিরিশ বছর ধরে একটা দ্বিচারিতা সুসজ্জিতা বারাঙ্গনার মতো জঙ্গলের গাছে ঠেস দিয়ে খদ্দের ধরেছে প্রতিদিন। খদ্দের মানেই তো সভ্যতার সন্তান, তা এই জঙ্গলে সভ্যতার সন্তান??!!! হ্যাঁ, কিলবিল করছে, তারা কোনো শিকারী নয়, তারা শুধুমাত্র চোরা। এই চোরাজগতের মধ্যে আমরা সকলে থেকেছি, ঘুরেছি, চড়ুইভাতি করেছি, দাদ্‌রা- কাজরি-ঠুমরি করেছি, শুধু খেয়াল করিনি। একে আমি বলেছি দ্বিচাবাদ। লেখাকে এই বাদ আমরাই দিয়েছি।

বলেছি কবিতার কোনো বিষয় হয় না। জংলী বললে তবু একটা চেহারা ভাসে চোখে, সেটা ছোটবেলা থেকে সভ্যতার শেখানো বদভ্যেসের দরুন। আমরা কবিতাকে বলেছি বিমূর্ত, জঙ্গুলে। জঙ্গলে হায়না ঘটে, হায়নার হাসিও ঘটে। হায়নাও কবিতা, হায়নার হাসিও কবিতা। জঙ্গলের কোনো দরজা হয় না যা খোলা রাখা যাবে, ফলে এসেছে সবাই। আমরা কোনো ফারাক করিনি তার মধ্যে, রাখিনি কোনো মাপদন্ড, বলেছি সৎ ও অসৎ। ফলে চোরাশিকারী কখনোই কবিতা হতে পারেনি, ট্যুরিস্টও পারেনি কবিতা হয়ে উঠতে। এতদূর অবধি ঠিক চলছিল, কবিতাকে সভ্যতার (প্রথাগত শিক্ষার) মেকী পোশাক আশাক, যেমন প্রথাগত ছন্দ, মাত্রার বন্দিশ, ইত্যাদি ছাড়িয়ে করলাম নতুন ও আরণ্যক। বললাম, কবিতা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র, কবি শুধু তাকে খুঁজে এনে লিপিবদ্ধ করেন। খুব ঠিক কথা, জঙ্গলে অবিশ্রান্ত ঝোরার মতো জঙ্গুলে ঘটনা ঘটে চলেছে। কখনো শিমূল গাছের ডালে উড়ে এসে বসলো ব্লু ম্যগপাই, আর ঠিক তক্ষুনি একটা শিমূল ফল ফেটে তুলো উড়ে এসে পড়লো নিচ দিয়ে প্যারেড-রত কাঠপিঁপড়ের দলের রাণীর মাথায়। রাণী পিঁপড়েদের ভাষায় বললো "বাঞ্চোত"! হয়ে উঠলো একটা আগে না ঘটা নতুন ঘটনা, তার জন্য বরাদ্দ হয়ে গেল কয়েকটি শব্দ... কখনো সকাল থেকে দুপুর অবধি খুঁজে খুঁজে পাওয়া মৌ-টসটস ফুলটি হঠাৎ হারিয়ে ফেলা প্রজাপতির চীৎকার... কখনো নদী পেরোবার সময় গায়ে ঠান্ডা জল লেগে হরিণশরীরের রোমাঞ্চ। এইবার এলো দ্বিচারিতা। আমরা মুখে বলেছি এদের মধ্যে তুলনা হয় না। সত্যিই হয় না। কিন্তু মনবাবু বানিয়ে ফেলছে লিস্টি। সে লিস্টিতে প্রজাপতির আর্তনাদ বসছে হরিণের রোমাঞ্চের আগে। সে বলছে কুমীরের হরিণশিকার এমন কী?? কমন, কমন... তার থেকে সকালের প্রথম ঘাসের দিকে হরিণের এগিয়ে যাওয়া মুখের এক্সপ্রেসান দেখেছ... মুখে বলছি সর্বত্র ঘটছে কবিতা, কিন্তু মনে আনছি তার মধ্যে তারতম্য... সল্ট লিকে নুন চাটতে আসা বাইসন দেখে বলছি এতো ট্যুরিস্টদের জন্য, ওই জন্যই তো সল্ট লিক আছে, এর থেকে অনেক সূক্ষ্ম শজারুর অকারণে রুমঝুমি নাচ... গাছ থেকে অদ্ভুত এ্যাঙ্গেল করে নেমে আসা পাতাটি লিপিবদ্ধ করাকে বসাচ্ছি গাছে উড়ে এসে বসা বিরল প্রজাতির পাখিকে লিপিবদ্ধ করার নিচে... জলদাপাড়ায় ঢুকে এক্সপেক্ট করছি গণ্ডার, আর যদি বাইচান্স দেখে ফেলি বিষাদ আক্রান্ত একলা স্ত্রীগণ্ডার, বলছি কেয়াবাত... আর ঢোকার সময় যে বাছুরটা রাস্তা ছেড়ে দিল তোমাকে, সে পড়ে রইল তলানিতে। এবং এই কর্ম চোরাপথে কবিতায় সাপ্লাই দিচ্ছে বিষয়, আমাদের অজান্তে। এই এক ফলাফল। আর দ্বিতীয় ফলাফল হলো, সকলেই খুঁজছে বিরল নমুনা, ফলে এন্তার জংলী বিরল আমাদের চোখের সামনে, প্রত্যেকটি ওয়াও। চতুর্দিকে জংলী বিরল, এর ফাঁকে যে লিপিবদ্ধ করেছিল উদাসীন জংলী বিড়াল, তাকে বললাম, দেখো দেখো, আরো দেখো, কত কী নতুন দেখতে পাবে এই অরণ্যে। জঙ্গলে শুধু শুকনো পাতার খসখস আর উপুড় পূর্ণিমা না দেখে চোখ চালাও, কতো কী নতুন সমারোহ দেখতে পাবে, তার ইয়ত্তা নেই। এই শুনে পাশের গুণধর বললে, জানো তো খসখস ঘর ঠান্ডা রাখে। ব্যাস, অসাধারণ, এই হচ্ছে দেখা, অন্য চোখে দেখা। ছেলেটি আর মুখ ফুটে বলতে পারল না যে, সে কিন্তু জংলী বিড়ালটির মধ্যে লাবণ্য পেয়েছে, সেই প্রাণীটির আঙ্গিক অবিকল ছিল তার পুরনো প্রেমিকার মতো। এবং এই অবস্থার কারণ আর কিছুই না, মনের নিজেকে টার্জান বা অরণ্যদেব ভাবা। কেউ দেয়নি, তবু তুমি নিজে নিয়ে নিয়েছ এই জীবিত বস্তু ভরা অরণ্যের রক্ষণাবেক্ষণের ভার। তুমি পুষে ফেলেছ দু’খানা ডলফিন, নাম দিয়েছ তাদের সলোমন আর নেফারতিতি। কী নতুন হলো এই জীবিত ঘটনা!! আর যে নতুন কিশোর টার্জান, যে স্বপ্ন দেখেছে আর একটানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে একটা প্যাঙ্গোলিন পোষার, যার নাম দেবে সে হরিমাধব, তাকে বলছো নাজুক, নাজুক। তুলে দিচ্ছ প্রণতি নামক শালগাছটির ডগায়, বলছো দেখ্‌ পাখির চোখে দেখা, দেখা বদলে যাবে তোর। আর যে জংলী বিড়ালকে "ওয়ে জংলী বিল্লি কাটনা মত্‌" বলে দেখেনি বরং গিলেছে তার ভ্রুকুঞ্চন, তাকে দিচ্ছ মার্কশীট, ভালো রেজাল্ট করার এনথু। যে হরিণকে হিরণ বলে ডেকে দেখছে তার পালানো দ্রুততর হয় কিনা, তাকে দিচ্ছ উপদেশ, অন্তত কেমন ধ্বনিতে হরিণের চোখে আসে জল, তা দেখ বেটা। কবিতার ক্লাশ হয় না বলে তাকে বলছো হরিণার চঞ্চলতা তো সবাই দেখে, তুই দেখ্‌ অন্য কিছু, দেখ্‌ না হরিণের ল্যাদ, যদি খুঁজে পাস। এটা কি??? এটাই চলছে গত তিরিশ বছর। মুখে বলছি, সবাই সবাই, সব সব। কিন্তু জঙ্গলে প্রথম পা দেওয়া ক্যামেরা হাতে মেয়েটিকে বলছো, ক্যামেরা ছুঁড়ে ফেল, চোখ দুটোকে পিঠের ওপর রেখে তা বইতে বইতে হাঁট, পায়ের পাতা ঘুরিয়ে নিয়ে পর, আঙুলগুলো চুলের সাথে বাঁধ, দিয়ে বেরো... একটু ভেতরে গেলে ব্রায়ের দাগ ছাড়া কিছুই পরিস না বুকে... তুমি জানতেও চাওনি, তাই জানোই না, ও কিন্তু ওর ক্যামেরাটাকে পোষা জন্তু বলে ভাবে, যে জন্তু খচাস শব্দে ডাকে। 

নতুন যদি, কেন তবে শাহেনশা তারতম্য খান এর দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ? কেন তার কর দিতে হয়? যদি সত্যি কেউ সৎ ভাবে লেখে, তবে সে খারাপ লিখতে পারে না... তুমি তার লেখার মধ্যে অপুর ভালোনাম খুঁজে পাচ্ছো না, শুধু খুঁজে পাচ্ছো নিশ্চিন্দিপুর, আর তাকে বলছো, বড্ড ফ্ল্যাট আগে প্রচুর হয়েছে, এটা তোমার মঞ্চে স্পটলাইট দেখার অভ্যেস, পাশের হাল্কা অন্ধকারে কীভাবে চেয়ার টেবিল সরিয়ে সেট বদল হচ্ছে, সেটা দেখার অভ্যেস তোমার নেই, এটা তোমার দূরবীনের দেয়াল। তোমার বায়নোকুলার দিয়ে পাখি বড় করে দেখার অভ্যেস, হঠাৎ খালি চোখের সামনে বাজপাখি এসে বসলে, তোমার ‘অন্য’ খোঁজা চুলোয় যায়... ভাবো চোখে এতদিনে অদৃশ্য দূরবীন গজিয়েছে, আত্মহারা হয়ে দুরান্ত নামক ল্যাবরেটরিতে তোমার সাপ্লায়ারকে নানান ধ্বনি ও শব্দের ফরমাইশ করো।

(বাদবাদ) ইজমিজমে তুমি নেই... কোনোরকম বাদ তুমি রাখোনি জীবনে (তোমার হাত নেই, তবুও বাক্যটি পিঠের রুকস্যাকে আরেকটি মানে এনে ধপ করে নামিয়ে রেখেছে)... এবার পৃথিবী দু’ভাগ, তুমি আর অ-তুমি। সেই অ-তোমার পৃথিবী তোমাকে নোইজ্‌মে (no-ism) বিশ্বাসী দেখে। এতে তুমি কিছুই করতে পারো না। সকালে তোমার কাকটিকে বাদ দিতে ইচ্ছে হয়, দোয়েলকে নয়, এও কি বাদ নয়?

খেলতে যাওয়া কেউ তোমাকে শেখায়নি, পড়তে বসা রীতিমতো অনুষ্ঠান, হাতে খড়ি ঘটে সে ঘটেছে।

একই রকম ত্রুটি খোঁজা শিখতে হয়নি, কিন্তু ভালো খোঁজা একটা আর্ট যার রেওয়াজ প্রয়োজন নিয়মিত। ভালো খোঁজা অরূপতালে বাজে। সে বাজনা শুনতে শোনাতে এক কাবিলিয়ৎ লাগে। এক অজানা পাড়াতে ঘোর দুপুরে তুমি প্রত্যেকজন দরজায় কড়া নেড়ে যাও, প্রতিটি অভ্যর্থনা সে যেমনই হোক তোমার কাছে চরম উত্তেজনা আনে, কেননা এরাই রাত্রে খাতায় নেমে আসবে আগে কখনো না হওয়া হুরী, পরী, নটী হয়ে, ঘাড়ধাক্কা হয়ে উঠবে এক অভূতপূর্ব শিরস্ত্রাণ, স্লাইট নামানো নিচে...  


একটি ছোট্ট ব্যাক্তিগত/ফুটনোট-কালিমাটি
 (লেখাটির পরে কয়েকটা কথা বলার আমার আগ্রহ ঘটেছে খুব। না, লেখাটি নিয়ে নয়। কথাটা কালিমাটি নিয়ে। এটি কালিমাটিতে আমার প্রথম লেখা। যেদিন প্রথম কালিমাটিকে চিনি, সেদিন তার বয়স জেনে আমি খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম। পরে অসংখ্যবার একটা নীরব মনে হয়েছে ভেতরে, যে কি অদ্ভুত, এতগুলি বছর ধরে এইরকম কনসিসট্যান্সি নিয়ে একটা পত্রিকা বেরোচ্ছে!! কি ডিসিপ্লিন!! আমি নিজে এই বস্তুটির প্রবল অভাবে ভুগি বলে আর নিজে একটি পত্রিকার সাথে যুক্ত বলে এই ব্যাপারটা এক মহাঅবাক হয়েছিল আমার কাছে, আছেও। ভেতরের স্যালুটবোধ আরো তীব্র হতো এই দেখে যে, এরকম বিশাল একটি কাজ কী নিঃশব্দে, বিনা হইচইতে হয়ে চলেছে। আমরা তো দু’একটা সংখ্যা করেই ঢাক, ঢোল, কাড়া, নাকাড়া, চীৎকার অমনিবাস নিয়ে ময়দান তোলপাড় করে দি।  

এই কথাগুলি একটি পত্রিকায় লিখছি বলে তার গুণগান, এরকম যেন প্লিজ ভাবা না হয়। কথাগুলি আমি লিখবো ভেবেছিলামই, কখনো কোথাও। তাই যখন কালিমাটিতেই লেখার ডাক এলো, আমি কথাগুলি উগরে দিলাম। এই লেখাটি দেওয়া নিয়ে আমি কাজলদার সাথে অভব্যতার চূড়ান্ত করেছি। নিজেরই ঘোর লজ্জা লাগে ভাবলে, অসংখ্য দিন, আক্ষরিক অর্থে অসংখ্যদিন আমি কাজলদাকে দিচ্ছি-দেব করে ঝুলিয়ে রেখেছি। দিনের পর দিন কাজলদা বারবার ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন পাঠিয়েছি নাকি, আর আমি বাহানার অবিশ্রান্ত সরবরাহ দিয়ে গেছি (যেন আমি এক বিশাল সেলিব্রিটি লেখক, ফুরসৎই পাচ্ছি না, রঙ্গ কতো!!)। তবুও কাজলদা বলেই গেছেন। আর আমি রহস্যভেদ করেছি কালিমাটির এই অবিশ্বাস্য ইনিংসের। এই স্বীকারোক্তিটা খুব প্রয়োজন ছিল। কারণ কালিমাটির আরেকটা পরিচয় আছে আমার কাছে। এখান থেকেই স্বদেশ সেনের ‘ছায়ায় আসিও’ বেরিয়েছে।)
  


০৩ স্বপন রায়

কাওয়ালিওয়ালাস্বপন রায়

 

এক শীতের রাতে আমি চললাম কাওয়ালি শুনতে। আমার কাওয়ালি তখন আজিজ নাজা আর জানি বাবু কাওয়ালে সীমাবদ্ধ। শাবরি ব্রাদারস, ফতে আলি, আবিদা পারভীন ইত্যাদিদের নামই শুনিনি! আজিজ নাজা’র “ঝুম বরাবর ঝুম শরাবি” মনে আছে? আমি গান বা কবিতাকে কোনো নান্দনিক ‘চিলমনে’ বা ‘চিকে’র আড়ালে খুঁজতে যাইনি, অশিক্ষিত হলে যা হয়! আমার তো আটকে যাওয়া এই উচ্চারণেই। “আজ আঙুর কি বেটি সে মুহব্বত কর লি / সেখ সাহাব কে নসিহত পে বগাবত কর লি / উনকি বেটি নে উঠা রক্ষি হ্যায় সর পে দুনিয়া / ইয়ে তো আচ্ছা হুয়া আঙুর কো বেটা না হুয়া... আঙুর কি বেটি” যে মদালসার হয়ে ওঠার কারণ, জানা হয়ে গেছে আমার, সেই কারণটি অর্থাৎ ‘কারণবারি’র কারণে এই কাওয়ালি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। 


তো রাউরকেলার হননাবৃত শীতে আমি গা ছম ছম জড়িয়ে নিতে গিয়ে কালো জ্যাকেটে লুপ্ত হয়ে যাই! আর কাওয়ালির আহ্বানে সাইকেলের চাকায় ছড়িয়ে দিতে থাকি অষ্টম শতাব্দীর ‘সমা’কে পারস্য থেকে (ইরাণ এবং আফগানিস্তান) এনে এই রাউরকেলার অতিসক্রিয় শীতের মেহফিলে! আমীর খুসরু পারস্য থেকে ‘সমা’র ঘরাণা নিয়ে এসে ভারতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে এক অপূর্ব ফিউশনের মাধ্যমে শুরু করলেন ‘কাওয়ালি’র জয়যাত্রা। ঊর্দুর মতো কাওয়ালিও ভারতমাতার সন্তান। 

আজ আজিজ নাজা এবং পরভীন সাওয়া’র কাওয়ালি-যুদ্ধ, সেক্টর-৬এর স্টেডিয়ামে আমি আর আমার ২৬ বছর চলেছে শীতের পিনিং না মেনে, শীতকে তার দাঁতের দান্তেপনায় আটকে রেখে ক্রমশ ‘সমা-এ-মেহফিল’ কাওয়ালি’র দিকে, একাই। কারণ, আমি ছাড়া কাওয়ালিওলা বাঙালি বন্ধুদের মধ্যে কেউ ছিলো না। 

পৌঁছে দেখলাম স্টেডিয়ামে ভালোই ভিড় আর আমি একা! একা আমি কাওয়ালি’র ঊর্দু বিরাসতে ঢুকবো কী করে? আমার ঊর্দু এখনো তেমন কিছু নয়, আর তখন তো ইকরার, ইজহারই গুলিয়ে যেত! তবে কাওয়ালিতে পাঞ্জাবি শব্দের প্রয়োগ প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ থাকায় আম জনতার কাছে তার বোধগম্যতা বরাবরই বরকরার ছিলো। কিন্তু আমার কী হবে রে কালিয়া? একজন ইন্টারপ্রিটার ছাড়া এই সারারাতের কাওয়ালি তো আলুনি হয়ে যাবে!

কাওয়ালির পরিসর নদীর মতো ক্রমশই বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু এই প্রবাহের চলনেও আছে একটি গঠনপ্রবাহ। কাওয়ালি এগারো শতক থেকেই এই দেশের দরগাগুলিকে কেন্দ্র করে গীত হতো। এই ধারার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ হলো চিস্তি(সুফি) ঘরাণার কাওয়ালি। তবে কাওয়ালি শুধু দরগায় থেমে থাকেনি, একে একে অনুভূতির প্রায় সবকটি অভিঘাত কাওয়ালিতে মিশে গেছে। কাওয়ালির শুরুতেই আল্লাহ’র বন্দনা করা হয় ‘হমদ’ দিয়ে (“খুগর-এ-হমদ-সে থোড়া সা গিলা ভি শুনলে / ইকাবাল”; কথাটা ‘হমদ’ অর্থাৎ আল্লাহর উদ্দ্যেশে বলা -- “তোমার পূজায় যে অভ্যস্ত / তার কিছু অনুযোগও না হয় শুনলে!)

এরপর মসিহা মহম্মদের স্তুতি করা হয় ‘নাত’এর মাধ্যমে। এই প্রাথমিক স্ট্রাকচার এখনো অনুসরন করা হয়... কিন্তু আমি কী করবো? সারারাত কাওয়ালি শুনে বুঝতে হলে একজন বুঝদার শ্রোতা খুঁজতে হবে। আমি মাথার টুপি ঠিক করে, জ্যাকেটের কলার উঠিয়ে চারদিকে দেখতে থাকি। চোখ সেই রাতের স্টেডিয়ামে এমন একজনকে খুঁজতে থাকে, যার মধ্যে সমঝদারি রয়েছে আর পেয়েও যায়। মেহেন্দি রাঙানো চুল, দাড়ি। কুরতা আর চোস্ত পাজামায় মুঘলত্ত্বের খানদানী আবেশ, হাসিটাও শাহজাহান টাইপের, যাত্রায় যেমন দেখেছি আর কি! 

মঞ্চে এসে গেল কাওয়াল আর কাওয়ালিনের বাজনদাররা। আমি সেই মুঘলাই ব্যক্তিটির কাছে যাই, হেসে বলি, “জনাব,ম্যায় ক্যা আপকে পাস বয়েঠ সক্তা হুঁ?”

জনাব, জনাবে-আলি হাসলেন, শাহজানীয় একেবারে, আমি ঈত্ত্বরের (আতর) গন্ধও পাছিলাম। এখন হলে হয়তো বলতাম, “তাব লায়ে-হী বনেগী, গালিব / বাকেয়া সখত হ্যায় ঔর জান আজীজ” (পারতেই হবে, গালিব / সঙ্কটে পড়েছি আর প্রাণও তো প্রিয়)... যাইহোক হাসির লাই পেয়ে বসে গেলাম ওই শাহজাহানের পাশে, যে পরে নাম জিগগেস করায় বললো, জাহাঙ্গীর!

আজিজ নাজা আর পরভীন সাবা মঞ্চে আসা মাত্র শীতের হিমে হাততালির ওম পড়তে শুরু করলো। দুজনে বসেই আদাব জানালেন, আজিজের চেয়ে পারভীনেই তখন চোখ অপলক হয়ে একাকার, সারারা আর চোলি আর কী সব গহনার চাকচিক্য, আমি দৃষ্টান্তমূলক ভাবে হাঁ, জাহাঙ্গীরও তেহজীব ভুলে হাঁ! যাইহোক আজীজ এবং পারভীন প্রথমে নিজেদের হাজিরি জানান দিলেন হামদ, নাত, মনাকিব, মারসিয়া এবং গজলের নানা আঙ্গিক পেশ করে। তারপর তাঁদের দ্বৈরথ শুর হলো। আমি এর মধ্যেই খাবি খেতে আরম্ভ করেছি। ওরা দুজনে যত একে অপরকে ছোট করার চেষ্টা করেন, আমি ততই বোকাস্য বোকা হতে থাকি। মাথার ওপর দিয়ে ‘খুদদারি-এ শাহিল’, ‘উকদহ-এ-দিল’, ‘রুখসত’, ‘কারফরমাঁ’, ‘অশক’, ‘দরমিয়াঁ’, ‘অদাবত’’, ‘কফস’, ‘গুলফাম’ ইত্যাদি শব্দগুলো সাঁই সাইঁ করে বেরিয়ে যেতে লাগলো। আমি আমার পাশে বসা মুঘলিয়তের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীরকে যতবার জিগগেস করি, “মতলব ক্যা?” জাহাঙ্গীর ততবারই জাহাঙ্গীরি হাসি হাসে আর বাদাম খায়...। ওই বাদাম চিবোনোর ফাঁকেই সে আলগোছে বলে, “মু তো ভাই ওড়িয়া লোকো, মু কেমিতি ভাই তুমহকু মানে বুঝেইবি?” (আমি তো ভাই ওড়িয়া, আমি তোমায় মানে বোঝাবো কী ভাবে?)

-মানে? তমে ঊর্দু জানিণ? (মানে? তুমি ঊর্দু জানো না?)  

-না

- তেভে মু যেতে বেলে পচারিলি ঊর্দু জানিছ কী? তমে হঁসিল কাহিঁকি? (তাহলে আমি যখন জিগগেস করলাম, ঊর্দু জানো কিনা, তুমি হাসলে কেনো?)

-ভদ্রলোকো হসিব নুহে তো কণ করিবো? (ভদ্রলোক হাসবে না তো কী করবে?) 

এরপরে আমার আর কী বলার থাকতে পারে! আমার কাওয়ালি অভিযানের এহেন করুণ রসের শৈত্যে হঠাৎই আমার এক পুরনো বন্ধু আমায় ডাক দেয়, বন্ধুর নাম মজিদ। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। বাকি রাতটুকু ঊর্দু জানা মজিদের সৌজন্যে জমে ওঠে ক্রমশ... কাওয়ালির মেহফিলে ধীরে ধীরে রাত বাড়ে... শেষ রাতে আজিজ নাজা স্বরক্ষেপণের চূড়ান্তে গিয়ে রাতের শেষযাত্রাকে মহিমান্বিত করে গেয়ে ওঠেন, “ঝুম বরাবর ঝুম শরাবী...” 

আমার দীক্ষা হয় কাওয়ালিতে ভোর ঝুমিয়ে আসে রাউরকেলায় আড় ভাঙে গানের দুনিয়া...
 

০৪ কাজল সেন

বিস্ময় কারে কয় কাজল সেন



বিস্ময়! খুব ছোট শব্দ। কিন্তু শব্দটি যে কতটা গভীর ও ব্যাপক, তা আমরা মাঝে মাঝেই বিস্মৃত হই। এবং ইদানীংকালে নতুন ও নতুনতর প্রজন্মের কাছে শব্দটির গরিমা যে ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কখনও কখনও মনে হয়, আর কিছুদিন পর শব্দটিকে হয়তো বাতিল কাগজের ঝুড়িতে পাচার করে দেওয়া হবে। কেননা, আজকের ছেলেমেয়েরা কোনো ব্যাপারেই আর তেমন ভাবে বিস্মিত হচ্ছে না। বিস্ময়ের ঘনত্ব ও আপেক্ষিক গুরুত্ব কমে যাচ্ছে তাদের কাছে। আমরা, মানে তথাকথিত প্রবীণরা, যখন কোনো ব্যাপারে বা বিষয়ে বিস্মিত হই বা অবাক হই, তখন নবীনরা প্রায় ধমক দিয়েই বলে –- ‘এতে এ্যাতো অবাক হওয়ার কী আছে? যত সব আদিখ্যেতা!’

আজকের ঘোষিত বাক স্বাধীনতার যুগে অবাক হওয়ার সত্যিই কোনো মানে নেই। তবু ‘বিস্ময়’ শব্দটির মানে ও প্রতিশব্দ খুঁজতে বসে শ্রদ্ধেয় অশোক মুখোপাধ্যায়ের ‘সমার্থশব্দকোষ’এ অনেকগুলি শব্দ খুঁজে পেলাম, যেমন –- চমকানো, হকচকানো, ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া, থতমত খাওয়া, আক্কেলগুরুম হয়ে যাওয়া, তাজ্জব মানা, গালে হাত দেওয়া, মুখে রা না কাড়া, হাঁ হয়ে যাওয়া, চোখ কপালে তোলা, চোখ ছানাবড়া হওয়া, চক্ষু চড়কগাছ হওয়া, চক্ষু স্থির হওয়া, ধাঁধিয়ে যাওয়া, ভেবড়ে যাওয়া এইরকম আরও কত কী! এছাড়াও আছে –- অলৌকিকতা, অবাস্তবতা, যুক্তিহীনতা, ভেলকিবাজি, ভোজবাজি, আজগুবি, অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় এবং সেইসঙ্গে আরও আছে –- অবাক, হতবাক, নির্বাক, মূঢ়, বিমূঢ়, হতভম্ব ইত্যাদি ইত্যাদি। না, প্রতিশব্দ বাড়িয়ে আর লাভ নেই। মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, আমরা আমাদের ছেলেবেলা থেকে প্রতি পদে পদে অনেক কিছু বুঝতে না পেরে, মানে খুঁজে না পেয়ে, সপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যা লিখতে না পেরে চমকে চমকে উঠতাম, ঘাবড়ে যেতাম। বোকার মতো স্বপ্নমাখা চোখদুটো বড় বড় করে মেলে ধরে বলতাম –- ‘তাই তো, কী করে হলো ? এমনও কি হয় ? কেমন করে হয় ?’ আজকের ছেলেমেয়েরা কিন্তু আমাদের মতো ছেলেমানুষী করে না। তারা বলে –- ‘হয়। এমনই হয়। কার্য-কারণ সূত্র মেনেই হয়। প্রকৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিয়ম মেনে সব কিছু হয়। এতে অবাক হওয়ার তো কিছু নেই। চোখ কপালে তুলে চোখের অবস্থান পাল্টানোও ঠিক নয়। তাতে চোখ ও কপাল, দু’য়েরই বিড়ম্বনা।’
       


খুব কম বয়সেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’ পড়ার সুযোগ হয়েছিল। কম বয়স মানে, অপুর থেকে খুব একটা বড় ছিলাম না তখন। তা সেই বয়সে অপুই ছিল আমার হিরো। অপুর মতো চোখ অবশ্য আমার ছিল না। ক’জনেরই বা থাকে! তাছাড়া আমি থাকতাম শহরে, অপুর মতো গ্রামে নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও অপু যখন গ্রামের ও অরণ্যের সৌন্দর্য এবং রহস্যময়তা দেখে সমানেই বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল, আমিও তখন তা পড়তে পড়তে উপন্যাসটির আর কিছু বুঝতে না পারলেও কেমন যেন রোমাঞ্চিত, শিহরিত, সম্মোহিত হয়ে পড়ছিলাম, সে কথা আজও মনে করতে আছে। উপলব্ধি করতে পারি, ঠিক তখন থেকেই হয়তো বিস্মিত হওয়ার বা অবাক হওয়ার মনটা একটু একটু করে আমার বুকের ভেতর জায়গা করে নিয়েছিল। পরবর্তী জীবনে যেটুকু পড়াশোনা করেছি, যেটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি, তাতে প্রকৃতি ও জীবনের অনেক রহস্যই জানা-বোঝা হয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই অবাক হওয়ার বা চমকে ওঠার পালা শেষ হয়নি আজও। হয়তো হবেও না কোনোদিন। নবীন প্রজন্ম যতই খোঁটা দিক না কেন!

একথা ঠিক যে, আমাদের জীবন প্রতিদিনই সমৃদ্ধ হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়যাত্রা এবং কল্যাণে। সাইবার যুগের এই কালখন্ডে বাস করে আমরা বিশ্ব ও ব্রক্ষ্মান্ডকে একটু একটু করে আমাদের মুঠোয় ধরতে পারছি। এবং এই সামগ্রীক ব্যাপারটাই আমাদের মনকে করে তুলছে আরও আধুনিক, উত্তর আধুনিক। যার আন্তরিক প্রভাব পড়ছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, কলা, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি সব কিছুর ওপর। তথ্য ও প্রযুক্তির সমকালীনতায় বাস করে তাই আর কারও কাছে কোনো উপায় থাকছে না কিছু না জানার, না বোঝার। যে চায়, সে নিজের জ্ঞানভান্ডার বাড়িয়ে নিতে পারে, যতটা সে চায়। আর তাই তো নবীনরা অনায়াসে বলতে পারে –- ‘বিস্মিত হবার কী আছে? যা জানো না, তা জেনে নাও, তাহলেই তো হলো! অবাক হবে কেন?’  

একদম ঠিক কথা। বর্তমান জীবনযাত্রায় বিস্ময়বোধ ব্যাপারটাই কেমন যেন ব্যাকডেটেড হয়ে যাচ্ছে। কেউ আর অবাক হচ্ছে না, কারও চোখ আর চড়কগাছ হচ্ছে না, সব কিছু ঠিকই হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যেন এরকমই হয়, এটাই বাস্তব। সবচেয়ে বড় কথা –- অসম্ভব বলে কিছু হয়, এটা মেনে নিতে পারছে না নতুন প্রজন্ম। তাদের কাছে সব কিছুই সম্ভব। 

কিন্তু কথা হচ্ছে, বিস্ময়বোধ যদি আমাদের জীবন থেকে একেবারেই বিদায় নেয়, তাহলে কি এমন একদিন আসবে, যেদিন একে একে বিদায় নিতে চাইবে এর আনুষঙ্গিক আরও কিছু বোধ, যেমন –- সৌন্দর্যবোধ, রমণীয়তাবোধ, মুগ্ধতাবোধ ইত্যাদি? সেদিন কি ভাটার টান ধরবে না আমাদের কল্পনাপ্রিয়তায় ও রোমান্টিকতায়? এমন দিনও কি আসবে, যেদিন তরতাজা ছেলেমেয়েদের পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে শরীরে জাগবে প্রেমের শিহরণ, কিন্তু মনে জাগবে না তার অনুরণন? সৃষ্টির সব রহস্য জেনে বুঝে আমরা কি তবে থাকব সৃষ্টির প্রতি একান্ত বিস্ময়বোধহীন এবং উদাসীন?  

কিছুদিন আগে ঘুরে এলাম ভূস্বর্গ কাশ্মীর। অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল, একদিন যাব, দু’চোখ মেলে দেখব তার অপরূপ রূপ ও সৌন্দর্য। কিন্তু শখ থাকলেও সব সময় সুযোগ হয় না। সুযোগ থাকলেও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনুকূল থাকে না। তাছাড়া পাহাড়ের রাজনৈতিক টানাপোড়েন তো ছিলই। তা গত ২০০৯ সালের মে মাসে হঠাৎই সপরিবারে যাওয়ার সুযোগ হলো আমার এক বিশিষ্ট বন্ধু পূর্ণেন্দুশেখর মিত্রর আমন্ত্রণে ও আতিথেয়তায়। পূর্ণেন্দু ছিল ‘Ircon’এর ফিনান্সের জেনারেল ম্যানেজার। এই ‘Ircon’ই কাশ্মীরে দীর্ঘতম রেলওয়ে টানেল তৈরি করেছে পাহাড়ের বুকের ভেতরে প্রবেশ করে। যাইহোক আমি ও শিল্পী ভূদেব ভকত, সপরিবারে, কাশ্মীর গেছিলাম। আর গিয়েই উপলব্ধি করতে পারলাম, কেন কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলা হয়। সবটা যে উপলব্ধি করতে পারলাম, তাও নয়। অনি:শেষ রূপ ও সৌন্দর্যের সম্পূর্ণ উপলব্ধি কেউ কি করতে পারে! আমি শুধু দেখেছি, প্রাণ মন ভরে দেখেছি, আর বিস্ময়ে চমকে চমকে উঠেছি। এ্যাতো রূপ, এ্যাতো সৌন্দর্য –- এও কি সম্ভব! কেমন করে সম্ভব! 

তা সেই ভূস্বর্গের রূপ ও সৌন্দর্যের কথা একদিন কথায় কথায় বিগলিত মনে বলেছিলাম নবীন প্রজন্মের এক প্রতিনিধিকে। সে আমার সব কথা শুনল, মন দিয়েই শুনল, তারপর নেহাৎই সাদামাটা গলায় বলল –- ‘হ্যাঁ, শুনেছি কাশ্মীর খুব সুন্দর জায়গা। শুনেছি সুইৎজারল্যান্ডও খুব সুন্দর জায়গা। পৃথিবীতে এরকম অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। তা কোনো সুন্দর জায়গা দেখতে তো সুন্দর লাগবেই, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে? সৌন্দর্য দেখে চমকানোর কোনো যুক্তি তো খুজেঁ পাচ্ছি না আমি!’ যা: বাবা! আমার বিস্ময় ও বিহ্বলতার এপিসোড শুনে শেষপর্যন্ত এই প্রতিক্রিয়া! এবং এই যে নবীন প্রজন্মের এক প্রতিনিধি, যে আমার অভিজ্ঞতা শুনে একটুও বিস্মিত হলো না, চমকে উঠল না; তার এই বিস্মিত না হওয়া দেখে বা চমকে না ওঠা দেখে আমি খুব বিস্মিত হলাম এবং চমকে চমকে উঠলাম। মনে হলো, তাই তো, অনেকদিন হলো, অপুর সাথে দেখা হয়নি আমার। অপুর কাছে যাওয়া হয়নি বহুদিন। একবার যাওয়া দরকার। খুব দরকার। আমি ঘরে ফিরে কতদিন পর যে আবার ডুব দিলাম ‘পথের পাঁচালি’তে!

জীবনে রেলগাড়ি তো কতই না দেখেছি। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। কিন্তু অপু আর দুর্গার হাত ধরে রেলগাড়ি দেখতে যাওয়ার রোমাঞ্চ ও আনন্দটাই তো আলাদা! আলাদা তার মাত্রা! সেখানে বিস্ময়ের প্রবল ঘনঘটা। বিস্ময়ে বারবার চমকে চমকে ওঠা। আমার সত্যিই ভেবে খুব কষ্ট লাগে, অপুরা যেন ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চারপাশ থেকে!  

<<< কবিতার কালিমাটি / ২৮ >>>


০১ বারীন ঘোষাল

অণু কবিতা বারীন ঘোষাল

 

(১)
পর কলানো জল
হাইড আউট থেকে ওয়াটার হোলে
চেম্বার্সের চাঁদ
খাচ্ছে হরিণটাকে আতসহারারারারা


(২)

ট্রাউজারের ভেতরে এক জঙ্গল
টেনে ধরছি সৈনিকটাকে
ভাবীজীর ছবিটি দেখিও
লারেলাপ্পা গানান মৃতদের

(৩)

এই যে আমি অণু ফণু কবিতা লিখছি
মানবিক পারমাণবিক ঘোলানো শব্দদের
নিউট্রন অক্ষর
গুলি গুলো ফাটবে না তো

০২ প্রণব বসুরায়

রাত্রি এখানে ঘোর অমা নয় প্রণব বসুরায়



(সৌজন্য : মধুরা)

শব্দবিহীন শিশির ঝরছে, রাত্রির পায়ে পায়ে
মন্দ বাতাস আজ কিছু নেই, চাঁদের চাদর গায়ে
পাশে আছে যে সেই তো আমার, অবাক জোছনায়...

বসেছি যেখানে, রাজার আসন, রত্নে খচিত তাহা
সুবচনী আজ সেই কথা বলে, বলে নাই কভু যাহা 

রাত্রি এখানে ঘোর অমা নয়, আলোকোচ্ছল বন্যা
এই কথা আজ কাহারে শোনাই, কোথা আছে সেই ধন্যা!

০৩ আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

স্পর্শ আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ



পানশালার পাশে বাড়ি
স্মৃতিরা চোর হয়ে ঢুকে পড়ছে নেশাখোরদের মগজে
              যেমন কোনো তরুণ কবি তৈরি কারো ভাষায়।
তাদের হাতে মোম -- এই ঘন শীতের বারুদখানা
ঝাপটে আসছে সেনা আর বুট জুতার বায়স্কোপ।

তাই দেখে কার্তুজ লাগছে আমার হিম রাইফেলে
নিশানা স্থির -- জিরো হয়ে বসে আছি বন্ধুর কফিনে।
দূরে তাঁবুগুচ্ছ। খোলা পিপুলভাষায় পাখি হয়ে আছে
                                 সন্ধ্যার এই হিংসা-গ্রেনেড।

ধর্মহীন হলে পালাই পালাই করতাম
আজ ব্রেইন ধরে ঢুকে পড়ছি নেশাখোরদের গ্রামে।
আর অবস্থান চাইছি। শেকল খুলতে খুলতে
গোলাপ আর চামেলিতে ধুয়ে দিচ্ছি মানুষের রক্তখানা। 




০৪ প্রণব পাল

ফাইনিজের ধুন্‌ প্রণব পাল


মেলোডিয়াসের কড়ানাড়া।
এলো’র মেলোডিয়াস। স্থিরনৈতিক সকালের গায়ে
অস্থির খোদাইয়ের লিপিয়ার। কেরিয়ার খোয়ানো ফালতুমির বায়োডাটায়
স্টেডিয়ামের বাইরে ফোটে আলোর ছায়াভাষ।
ফুল নিজেকে খুলছে।
অনন্তের নিচে আলো পড়ছে
                পড়েই যাচ্ছে পাউন্ডহারা এজরায়িত পাউন্ডে।
আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে চাঁদ
বুক পকেটের সবুজ সিগন্যালে।
ছুটন্ত দিকেদের হারানো বিদিক
বালিস্কর্য্যে কচিরোদের চিত্রকলা।
সাদাপাতায় ছুটির ড্রইং
গৃহপালিত নিসর্গের ব্যক্তিগত সর্বনাশ জুড়ে।
জীবন্ত পৃথিবী মরে যাচ্ছে প্রতিদিন
আর অন্য ভুবনের অসংখ্য কুঁড়ি ফুটছে অদৃশ্য কোথাও।

একার একশ কথায় একাকার
ডানাহীন দোলনডাঙার
                   উড়নচন্ডী চপ্পল উড়ে যায়
                   ফোটনাভার উজ্জ্বল তরঙ্গে।
কে কার জন্য প্রতীক্ষিত!
কবে ও কোথায়হারা
কেন হীন অক্ষম জ্বলে যাই।
অজস্র সম্ভাবনায় দিকছুট স্থবিরালাইসিস্‌।
অসার যুগের সন্তান
হস্তমৈথুনে হত্যা করে প্রাণের চিৎকার।
জারজের লাশবাহী মগজে
নিজের চিতায় জ্বলে নিজস্ব ছায়াদের
                           না ফোটা আহ্লাদ।
অক্ষম জাগরণে ভোর ফুটছে
প্রাইভেট আকাশের নিচে।
অজস্র আর্তনাদ ছাড়ানো
সন্ন্যাস লিখছে খুনহারা ফাইনিজের ধুন্‌।

০৫ তন্ময় ভট্টাচার্য

দাবানল তন্ময় ভট্টাচার্য



রৌদ্রস্নাত অবয়ব... ঘোলাটে... কালচে...
স্নিগ্ধ, বা স্নিগ্ধা, অতএব সিক্ত।
হারিদ্রাভ বর্ণ, মলিন... তবু মিলন
ঘটাতে না পারা, এক যন্ত্রণা।
সরীসৃপ-এর মতো বুকে ভর দিয়ে,
উদগ্রীব সেই বেদনা ‘রেসিস্ত’ করতে গিয়ে
উলম্ব কোণে ঢাকা পড়ে সেই থেমে থাকা  
আগন্তুক সমস্যা... জ্বলে ওঠা দাবানল।

       

০৬ বেবী সাউ

শুরু থেকে শূন্য কিংবা... বেবী সাউ




দরজা খুলতেই তোমার হলুদ ফোটোফ্রেম। গোপনীয়তার যা কিছু প্রস্তাব তোমার স্টাইপ ছাঁট শার্টের পকেট থেকে লাফিয়ে বেরোচ্ছে। জানালা থেকে ছুটে আসছে, কমলা রোদ, স্টিল প্ল্যান্টের কালো কালো ধোঁয়া। আমি ফ্রক ছেড়ে শাড়িতে। হঠাৎই। প্রচন্ড অসুখ ছেড়ে, ধরা যাক, এমনই হলো। শূন্য থেকে শুরু হোক। শুরু থেকে শূন্য কিংবা। সেদিন সন্ধ্যেবেলায় তুমি ইম্পসিবল বোঝালে। বোঝালে, চোখে মুখে ডিমনার জলছবি। ঝুপড়ির গন্ধ। আর ভেঙে পড়া এন এইচ থার্টি থ্রী–এর না লাল না কালো, ধুলো। ঘুরে বেড়াচ্ছ, বয়ে বেড়াচ্ছ। বোঝালে কী অসহনীয় কবিতার ভার! সেদিন, ঝগড়া করে বুঝতে পারিনি কত পারসেন্ট প্রেম তোমার কালকুঠুরির বারান্দায়। বুঝিনি তোমার হঠাৎ গায়েব প্রণালী প্রকরণ। আসলে তোমাকে ছুঁইনি সেভাবে। আসলে আমি ছুঁতাম নিজেকে, সকালে দরজার সামনে, বিকেলে একুশ বছরের অপেক্ষায়। অথচ, দ্যাখো, দরজা আসার জন্যে, বিদায় তো ক্ষণিকের। এই আশা নিয়ে আমি স্তম্ভিত। নীরবতা কী আশ্চর্য নির্মাণ! হাত মুড়ে, পা মুড়ে আমি কুণ্ডলী কেন্নো। তখন। তুমি দরজায়। এই অপেক্ষায় কেটে যাচ্ছে ঘড়ি, বছর কাল আর তোমার আমার তিন জন্ম।





০৭ কাজল সেন

যুদ্ধ কাজল সেন



অনেক যুদ্ধ দেখা হলো
মাউসে হাত রাখলেই মনিটরের পর্দায়
একে একে নেমে আসে পৃথিবীর সব যুদ্ধবাজ
আর এভাবেই কখন যেন দেখা হয়ে গেল
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর পলাশীরও মাঠ

নাকছাবি ছাড়া এখন আমার ভালো লাগে না কোনো তত্ত্বতালাশ
হাততালি দিলেই এখনও ছুটে আসে নদী নামের কেউ
আর যদি আজ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবার সময় হয়
তাহলে দেখে আসতেই পারি সদ্যজাত যত অপোগন্ড পাপ

তেমনি একদিন যেদিন খুব ঝুলোঝুলি হলো ক্যাটরিনার জন্য
ঊরুভঙ্গ হলো গোবেচারা দুর্যোধন তোপদারের
তখনও কিন্তু শোবার ঘরে ছিল হাল্কা নীল আলো
কফিমগে উড়নচন্ডী নীল অন্তর্বাস 

তাহলে কি আজ বউ আসবে তোমারও বাসায়
পালকি ছেড়ে হাঁটাপথে পদাতিক হয়ে
সোনা আমার সোনা
আদরের সোনা
আমি বলি কী নিজেকে ভাগাড়ে ফেলার আগে
আরও একবার অন্তত টেনেটুনে যুদ্ধ করে যাও 

০৮ ধীমান চক্রবর্তী

কতবার ধীমান চক্রবর্তী


অবেলায় বৃষ্টি জানি এক মাতোয়ারা।
খামার বাড়িতে সংখ্যা গোনা রঙিন পালকি।
দু’দিকেই হাসাহাসি। আলোর সামনে
হেঁটে যাওয়া পানশালা বুনে নিল
রবিবার। প্রার্থনা নদীজল।
অভিবাদন জানিয়ে দোপাট্টা
মুখের চারদিকে আঙুল হলো। কেউ
কাউকে যেতে দিতে না চাইলেও,
ছেঁড়া রোদ উঁকি দেয় লাবণ্যে। আমার রক্তে
ভালোবাসা জানানো ক্যাম্পফায়ার।
হারিয়ে ফেলি পিকনিক আঁকা সাদা দেওয়াল।
একটু ঝুঁকে জেনে নেয় কাঠবেড়ালির
সেতুবন্ধন। পোষ মানানো বিভিন্ন রঙ
ও বটগাছে লেপে রাখা সিঁদূর, --
প্রতিদিন জল দেয় চিঠিদের বাবা-মা’কে।
জল দেয় মন খারাপের কেমন কেমন রঙে।

 

০৯ ফকির ইলিয়াস

পাঠগামী পাঁজরের প্রমাদ ফকির ইলিয়াস



জলপাঁজরে প্রচ্ছন্ন মুদ্রণ প্রমাদ। চোখেমুখে লেগে আছে নেশা। শব্দের,
সঙ্গমের, সহবাসের। সমুদ্রের কাছ থেকে সাবধানতা শিখে বহু
দূর পর্যন্ত বাড়িয়েছি বিস্তার। নিস্তার নেই জানি, তবু প্রথম পাপড়ি
কিংবা পাতা ছেঁড়া ভোর সংগ্রহ করে হেঁটেছি গ্রহণ গন্তব্যের কাছে

সব গন্তব্যই একদিন শেষ হয়ে যায়। সব কথাও মিলায় মন্তব্যে।
যারা পাঠগামী, কেবল তারাই রক্তকল্পে লিখে রাখতে পারে সব
সম্ভাব্য আলোলিপি। চন্দ্রভঙ্গিমায় এপর্যন্ত আলোচিত অনুনিদ্রায় 
যেভাবে 'বইমেলা' হয়ে যায় 'বইবেলা' মু্দ্রণের আদি প্রমাদছায়ায়।



তালুতে জমিয়ে রেখেছি কটি পিনপতনের শব্দ। হাতে আছে কফির
গরম ধোঁয়া। নিম্নগামী তারা ছুঁয়ে যাচ্ছে যে টিয়েপাখি, তাকে
প্রশ্ন করছি গন্তব্য জানতে চেয়ে। মাঝে মাঝে আমি এমন অনেক
কিছুই জানতে চাই বৈশাখী তান্ডবের কাছে, শ্বেতাঙ্গ সমুদ্র
আর কালো পাহাড়ের কাছে। মর্ত্যমনন এসে আমাকে বোধ
হয় সে জন্যই দেয় পাহারা। যাতে উন্মত্ত না হই। কিন্তু তার
পরও তো আমাকে কেউ থামাতে পারে না, যখন বলি তোমাকে--
বিছিয়ে দাও উত্তপ্ত জমিন। কয়েকটি মধ্যাহ্ন চাষ করে যাবো।



১০ স্বপন রায়

বিচ্ছিন্ন স্বপন রায়

 

কী নিয়ে ভাবি ব্রেখট মনে পড়ে
রোদ অবিলম্বের আমার কী
চুরুট খুঁজি ভিড়ে কমপ্যাক্ট ডিস্ক দেখছে মেয়েটা আর আমাদের শাক সবজি ঘিরে হাই ভোল্টেজ রোদ
মেয়েটার যা যা মেয়েলি সেখানে বা একটু দূরে ভুনা ভুনা আহ্বান
কে?
বা কারা?
নাকি আমিই ভাবছিলাম খুব ভালো সমাজ হবে আমাদের
                                   হাসির নাম হবে আবার মধুবালা











                                                            







                                     

১১ উমাপদ কর

যেখানে আঁধার নিয়ে আসে উমাপদ কর



যেখানে আঁধার নিয়ে আসে মেঘ নামে প্রতিক্রিয়া
যেখানে তুমি চলে গেলেও আঁধার নেমে আসতে পারতো
যেখানে মেঘের আসা তোমার যাওয়া সমার্থক
বাতাসের গায়ে ভর দিয়ে পাতা নড়ছে শাখা নড়ছে
হয়তো তুমুল নড়ে উঠছে কান্ড আর মূল শেকড়
নিজেকে তখন দেশলাই জ্বেলে দেখতে হয় অন্ধকারের দ্বিধা
দেখতে হয় দল্মার হাতিগুলো কোথায় হারিয়ে যেতে পারে
বিষ্ণুপুর আর কতদূর...
একটা নকল দাঁতের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশের কী কৌতুক!
কী আলসেমি ভরে থাকে সতর্কতায় স্মোকারের ফুসফুসে
এখনও যাওয়া মানে যাওয়াই, যেমন আসা কিংবা অন্ধকার মানে
আসতে আসতে মেঘের প্রতিক্রিয়ায় আরেকবার শেকড় ভিজে গেল... 

১২ সাঁঝবাতি

একটা সাদাকালো মৃত্যু বিষয়ক কবিতা সাঁঝবাতি



জামার বোতাম ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে।
মেয়েদের আকার ইকার স্বপ্নগুলো চৌকাঠ
পেরিয়ে ঢুকে পড়ে মরচে মাখানো যোনিদেশে।
আমার নিঃসঙ্গতা তো এক হেরে যাওয়া নারী।
সমর্পণের মতোই তার চূড়ান্ত সঙ্গমের লোভ 
সামলে উঠতে উঠতে অযৌন ধূপ নিভে যায়।
কাকে জ্বলে ওঠা বলে ভাবতে ভাবতে
যুবতী অপরাহ্ন পার করে নেয়।
মরে যাওয়া রাতগুলোয় আত্মহত্যাগুলো
বেছে নেয় নির্বাচিত মৃত্যুর কবিতা।


১৩ রমিত দে

তিনটি কবিতা রমিত দে


জুতোর ঘরে ঢুকতেই
প্রত্যেকটি জোড়া জুতোয়
দেখা যাচ্ছে মোজা এক জোড়া
----
----
পথিকের দেখা নেই
মাঝে মাঝে পা গেছে নিঃশব্দে


ফেরার রাস্তা
কোন দিকে…?


ডিমভাগ

১৩ খানা মুরগি
সাতাশ খানা ডিম
ধরা পড়ার ভয়ে একজন গড়িয়ে চলেছে
ভিজে ভাগশেষ নিয়ে…

 

১৪ বিশ্বজিৎ লায়েক

দুটি কবিতা বিশ্বজিৎ লায়েক



স্রোত

অফিস থেকে ফিরে
নিজের শরীর খুলে রাখি

তুমি চামড়ায় মাখাও হলুদ, নুন                          
                        সরষের তেল।
আগুন জ্বলে
ঝলসানো মাংসের নতিমাত্রা রোধ কমে
মনে মনে খিস্তি ঝাড়ি                   
                        মার শালা -- রক্তমাংস, লাথি। 

বিছানায় শুকোতে দিই                    
              ঝলসানো চামড়া                                   
                            সারারাত
বিছানা জুড়ে জল -- জল -- জল                                  
                            সারারাত
বৃষ্টির দাবানল।



সময়
স্রোতে স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছ
                             মদ
ভাসিয়ে দিচ্ছ
               নুন
               আমরা নেড়িকুকুর
ভাবছি কাজ পাবো
ভাবছি স্বাস্থ্য পাবো
                            নধর শরীর
এই ক"দিনেই জ্যামিতির ঢঙে বদলে যাচ্ছে
                                             তোমার চলন
                                                              ঘূর্ণন

অনেক দূরে আটকে যক্ষের হাত

১৫ কামাল রাহমান

একাকী সন্ধ্যা কামাল রাহমান



শরতের শেষ মেঘে
মাংসময় ঊরুর জৌলুস!
নেমে আসে উত্তুরে পাখিরা।

ডানায় লুকানো
শীতল ঝর্ণার কলস্বনে
নিভে যায় পুষ্মমুখর আকাশ।

সান্ধ্যরাগের আলাপ কণ্ঠে জড়িয়ে ঘুমোয়
পৃথিবীর দীর্ঘতম রাত,
কবচসিদ্ধ কুণ্ডল জ্বেলে জেগে থাকে
নিঃসঙ্গ প্রদীপ।

প্রকৃতির সুষমা ছাড়িয়ে
চাঁদের পলতে পুড়তে পুড়তে
অবশেষে
গলে যায় আকাশের
ঐ নষ্ট ও নিদ্রাহীন রাত।




১৬ অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়

যাপনের সাক্ষ্যপ্রমাণ অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়



ধ্বনিত হাতের আশায় ছাপার অ্যাডমিরাল।
পড়তে পড়তে ভুলে যাচ্ছি আজ শ্রাবণের বেলা।


কাল ছিল প্রথম মেতে ওঠা পিঁড়িদের একটানা বন্ধঘর।
তুমি বন্ধ হয়ে উঠছো। আমরা পোস্টারে কোলাজ হাঁটলাম।
আর বিবাহের দাবি নিয়ে কেউ ঘুমোচ্ছে পাতার বিশ্রামে।
শরীরে আহুতি মেখে নিতে।

এইসব দোষগুণ ধরেবেঁধে রাখছি যত্নে।
সকলেই যা খুলে গেছে আসলের নামে।
ফিতের বানানে...
                                                পিতাহি পরমং তপ্‌
পিতৃত্বের জেহাদে ব্যতিব্যস্ত গ্রাম
আহ্লাদ নিবারণের প্যারেড ঠেলে উঠে আসছে সকলের মাথায়।

মগজের অবশিষ্ট পরিধি নিয়ে

পত্রবাহক জুড়ে যাবে লালার গন্ধে,
অবসর বিনোদন-এ অঙ্গীকারের মাসুল ওড়ালাম।

আমাকে ছোট্টই ভেবো দূরের ঘুড়িটার পাশে।

তার আলোময় চোখে ঢেলে দিও ঠোঁটের বিরাম।

 

১৭ অরূপরতন ঘোষ

মাথানগুড়ি অরূপরতন ঘোষ



এবারের ছুটিতে ছিল হাওয়াবদলের সহস্র কারণ—
শ্রমের দিকগুলি উঠে এসেছিল এই ছুটিতে
দেখা গিয়েছিল রঙের প্রাচুর্য, ক্রমিক নদীতীর
ধনেশ পাখির এক সংক্ষিপ্ত উড়ে যাওয়া—

অন্যদিকে, যেহেতু এই ছুটি ছিল অতি ক্ষণস্থায়ী
(গ্রীষ্ম সন্ধ্যার সুবাতাস-এর মতোই) –- তার রূপ
অনেকাংশেই অধরা থেকে যায় এইবার

এরই ফলে এই ছুটির মাহাত্ম্য বেড়েছে
মাথানগুড়িতে বসে
নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে কথাবার্তা হয় এপ্রিল মাসে 

১৮ চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়

উপহার চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়



সোনাঝরা এক নতুন সকালে
তোমাকে দিলাম উপহার
আলো ঠিকরানো একমুঠো হীরে,
তুমি দু’হাত বাড়িয়ে নিলে--
অনুচ্চারিত হাসি আর মৃদু ভাষায় বললে
‘তোমারটা রইল পাওনা’

বেলা যায়
সিঁধেলচোর মন, মানে না বাগ
তোমার ঘরে সিঁধ কেটে পেলাম
দু’চারটে মুক্তো আর পান্না

বিকেল হলো
দরজা ঠেলে তুমি এলে ভেতরে,
বাড়িয়ে দিলে আমার দিকে একটা মোড়ক
ব্যগ্র ব্যাকুলতায় খুললাম—
দেখি, রক্তজমাট নিটোল এক চুনী,
বিস্মিত আমি চেঁচালাম –- ‘এ কি!’
দরজা খোলা –- তুমি গেছ চলে।

সন্ধ্যে হলো
আলগোছে আঁচল ঠেলে নিজেকে ওঠালাম
ছুঁচসুতো বের করে গাঁথলাম মালা
রক্তজমাট চুনীর লকেট বুকের ঠিক মাঝখানে

এখন তোমার মালা পরে বসে আছি আমি--
‘কবে আসবে তুমি আমাকে দেখতে?’ 


১৯ প্রদীপ চক্রবর্তী

প্রবাসীর গাছ প্রদীপ চক্রবর্তী



বেশ তো ভালোই ছিল গাছ। রং রোয়া হলো ভিড়ে
পাতায় দূরে
           সুরে ভাঙে
শীর্ণতম আলোর আঘাতে সন্তত পিপাসা
           প্রবাসীর বৃষ্টি যেন ঘরছবি আঁকে

তাকে ছুঁলাম। ছোট ছোট হাতে পাখি
না-ফোটা হেম, এক-একটি ফিরিওয়ালার দুপুর
গাছের নিবিড় গন্ধে পথ সাফাই হচ্ছে ও সমান

পল পলকের পিয়াশাল। ভরাডুবি গন্ডগ্রাম জাতীয় সড়ক।
আত্মতাহীন গাছটুকু ছাড়া সবই হিন্তাল।
পার হচ্ছে ধু ধু হাওয়া
                 প্রসন্ন মনে জলভারে সিঁধকাটা ঘর
একা একটা সাদা প্রজাপতি উড়ছে কেবল ভবিতব্যে...

 

২০ সব্যসাচী হাজরা

ক্রিংটোন সব্যসাচী হাজরা



(১)

নেপাল ভৌমিক চলেছেন পালনের রাস্তায়
যদিও দুপুর
একদল মেয়ে মাথা গলায় বিদ্যুতে
সমস্ত শব্দ সরকারি আওতায়
                   গৃহপালিত রিদিমে, ক্রিংটোন হাতে বাবুগান
পাখিটোনে “কী ধ্বনি বাজে”
মহাশয় গ্রুপোন খুলে দেখুন,
                   আপনার হাতলে গ্যালপিং
                                আপনার বোতলে পাহাড় পরিচয়

(২) 
স্বাস্থ্য-দা আর শিল্প-দির ডুয়েট গান ‘টিক-ট্যাক-টো’   
যাদের অটোমেটিক ছেলে হয়
             তারাই অটোম্যান
                       মেয়েদের টমেটান করে...
তারাই রেকর্ড কেনে
                      ‘ট্যাক-টিক-টো’

(৩) 

অবাধ ডারমি দেখেছি, নতুন কবিতাও
লীনতাপ আ তস্ বাজিরাও
             মামনি হোঁচট খেয়েছে মামু-তে
                                 ওই খানে,
 ৩০ মিনিটে আমি উড়জানি পেয়েছি
                     লিঙ্কার সাজ হানা
                                 ওই খানে,
সাহা জেদি যত আমার ফুবারে ঝরেছে
                     খোক্কস শুনেছে কি?
        খস্ হস্ পাতারাও পাত নেড়ে খেয়ে গেল কত!
                 সূর্য-১০০
                           রাহু কেতু ওই খানে
                                     দেখেছে কি?













২১ রুদ্র শায়ক

দুটি কবিতা রুদ্র শায়ক


প্রান্তিকতার স্বপ্নবেড়ি খুইয়েছি বিজ্ঞাপনীমেধায় 
ভাঙা ক্ষেতের আল ধরে ঘুড়ির পিছে ঘুরে ঘুরে চন্ডিদাস পাঠ নিতে জবরদস্ত শহুরে। ক্যানভাস ব্যাগ কাঁধে মনে পড়ে মোক্তারের মায়াহরিণীর গোপন বৃন্তে রেখে আসা দৃষ্টির বীজতলা, পোঁতা কথারা ডালপালা গজিয়েছে। ইথারে এম.এম.এস পাঠিয়েছে বর্গাচাষী প্রান্তিকজন। পিতামহের বেতনভোগী ইঁদুর পোষা ছিল শখ, ঋষিতুল্য দৃষ্টি তুলে হুক্কার টানে সাঁঝের মায়া ভুলে যেত দেহতত্ত্বের গান। মহীরুহ ছিল ব্রাত্যজন।

প্রান্তিকতার স্বপ্নবেড়ি খুইয়েছি বিজ্ঞাপনীমেধায়


ফুটেজ প্রেম : বিনয় ও গণিত 

অসমাপ্ত অ্যালজেব্রা পালিয়েছে প্রেমের টানে, বহুদিনের আঁকা পিথাগোরাসের উপপাদ্যটি মুছতে মায়া লাগে। ভূ-বিদ্যা ভালো নই বলে দখলবাজ হইনি। মস্তিষ্কের ছিটকিনি খুলে শিখিনি স্তন চাষ। ডায়াল করি কবিতা ডিজিট মুঠোফোনে কবিতা, কন্ঠভর্তি তোমার উন্মাদনা। কারণ তুমি কবিতাই বোঝ না। তোমার কাছে কবিতা মানে বুকের কালো তিলজুড়ে জেগে ওঠা আলোকস্ফূরণ। অথচ আমার কাছে মামুলি জ্যামিতি। গণেশ পাইন কলমের আঁচড়ে মেকআপ করেছে অঞ্জনের ভারতবর্ষ জুড়ে, প্রেমাবতী সুভা পাঁজরের গিঁটে কবিতা বলেই; চিরকুমার বিনয় গণিত রেখে যৌন অ্যামবিশনে ভোগে ঈশ্বরীর বেদী জুড়ে; পোস্টকার্ডে উড়ে পাখি, পাখি উড়ে গায়েত্রী, গায়েত্রী উড়ে ঈশ্বরী, ঈশ্বরী উড়ে জানিয়ে দেয় বিনয়কে কোনোকালে দেখিনি...!  



২২ পার্থ কর

দ্বিজ পার্থ কর



ত্রিসুতায় পণ বেঁধেছি, কল্প কাটে...
আসবে ?
জারুল-রঙা ওড়না অক্ষত বুকে তবে
অক্ষমালায় লেগে থাক দুপুর-ফাগুন ।
বসবে খানিক?
গেরুয়া ধুলার ভূষণ, আটপৌরে-কমন্ডলু রাখো দাওয়ায়, পা ছড়িয়ে — 
ভাস্বরী, তোর চোখে আগুন!
যাবে?
বলতে নেই!
এসো নরকপালিনী
আবারও কল্প পরে। দুঃখ নেই।
তিনসুতোর পণ জপি।
আর
প্রসবিনীর ফুলেল হাসিতে
জারুল-নীল স্বপ্নে
নাচে সন্ধ্যার শিবানী।



২৩ রঙ্গীত মিত্র

দুটি কবিতা রঙ্গীত মিত্র



বিনায়কদার লেখা

বিনায়কদার লেখা পড়ে অবাক হয়ে যাই।
কী করে এইরকম লেখো বিনায়কদা?
বার বার প্রশ্ন করি, দেবতুল্য মানুষটিকে।

তার মুখের পবিত্রতা আমাকে টানে
সূর্য যেভাবে পৃথিবীকে টানে।
তাই আমি অন্ধকারের ডাকে সাড়া দিই না;
খারাপলোকদের ইগনোর করি।
কিন্তু সবাই যে অভিনয় করে!
বার বার ওদের ভয়
                      চমকে গিয়েও ভাবি

কী করে তোমার মতো ভালোমানুষ এবং সৃষ্টিশীল মানুষ হতে পারবো, বিনায়কদা ...



এইসব দিন
সমস্ত বস্তি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উঠে এসেছে।

আমরা খুব চুপ করে ওদের মস্তানি দেখে আসছি।

আমাদের ভয় ভয় রাত পাড়ার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করে। এদিকে গালাগালি গোঙানির শব্দকোষ এবং অশ্লীল নারীদের ভিড় । আমাদের বয়স্ক এবং আপাত ভদ্রতার উপর মালিশ করে দেয়; যদিও এইভাবে আমাদের ভিতরে লুকোনো জন্তুটা জেগে ওঠে। অবশ্য পুলিশের থেকে অসৎ কেউ নেই; তারা সব দূরবর্তী মানুষ হয়ে অন্ধকার মানুষ করে... এইভাবে কী করে বঁটা সনতেরা হাতকাটা কানকাটা হয়ে যাওয়ার রাত্রিরে নৃশংস উপত্যকায় ভদ্রলোক অভদ্রলোকের রিভারসিব্যাল ইক্যুয়েশানে ধাঁধার মতো লাফ মারে।

২৪ নভেরা হোসেন

ভ্রমণ নভেরা হোসেন



গ্রামের কুমোর মাটি ছেনে বানাচ্ছে মাটির পুতুল,
তোমরা গ্রাম দেখো,
বাজার হতে সওদা করো বড় দেশি মুরগি
লাঞ্চে লাউয়ের পাতা, সরষে ফুল টেবিলে মুচকি হাসছে
রাতটা শিশিরের শব্দ শুনেই কেটে গেল
ঘুমোলো বেলা দেড়টা পর্যন্ত,
ঠাণ্ডা জল, ঘাট বাঁধানো পুকুর,
পুরনো ভাঙা মন্দির
একটু আগালে খড়ের গাদা
বুড়ি এক চলেছে পিঠে বোঝা নিয়ে
তার ছেলেটাও কাস্তে হাতে মাঠে চলেছে ফের
নাতিও লাটিম হাতে
দূরে গরুর গাড়ি বোঝাই লাকড়ি,
বাতাসে মাঘি পূর্ণিমার ঘ্রাণ
খেজুরের গুড় আর ধুপি পিঠার উৎসব
পোশাকটা পুরনো, হাতে আঁশটে গন্ধ
একটা বেজি ছুটে গেল বাঁশঝাড়ের আড়ালে
তুমি শাটার টিপে চলেছ
একটা খয়েরি ডানা শকুন ধরা পড়ল ফ্রেমে
পাশেই মোবাইল হাতে মেয়ে চলেছে স্কুলে
পেছনে ছেলের দঙ্গল........

গ্রাম এখনও গ্রামই রয়ে গেল
আর তুমি ভাবছো
গ্রামখানা কেমন এক আজব বান্দিশ।

 

২৫ মনোতোষ আচার্য

দুটি কবিতা মনোতোষ আচার্য



নূপুর 
ক্যানভাসে আঁকা মুখ, শরীরের গন্ধ লেগে আছে
তুলির লিখনগুলি ফুটে আছে জলরঙের স্বপ্ন জাগিয়ে
গালের ব্রণ, আঁচিলের দাগটিও স্পষ্ট শিল্পের প্রসাদে...
আবেগে জড়ানো মায়া ছন্দের ক্লাসঘরে
বেজে ওঠে খরার নূপুর
বাতাসে বুনো কোরকের গন্ধ...
মৃদু মন্দ নির্জন দুপুর। এসেছি জলের কাছে
বসে আছি নিবেদিত খেলা
বঁড়শিতে বিঁধে থাকা হৃদয়ের উষ্ণ অবহেলা...


পাখিদল 

অনন্তের ড্রাইভার হতে চেয়ে নানা গাণিতিক চিহ্ন
এঁকে দিলে যাপনের রোদে...
অভিযান বারবেলা মানে না বলেই পরিযায়ী পাখিদল
শূন্যতার মহাবিস্ফোরণে
তাঁবু ফেলে আত্মরক্ষা চায়...
তোমার কলম জুড়ে ‘অহং’রা খেলা করে দেখানেপনায়
ময়লা মুখোশ পরা সাদা গুন্ডারা
জলপোকা দেখে দেখে সময় কাটায়...
ওগো সময়ের দেবী, আঁচলের ছায়া দিও
ভাত থালায়, এঁদো নর্দমায়, স্বপ্নের আঁতুড়ঘরে... 

২৬ সন্দীপন দাশ

হঠাৎ যেন ফর্সা হয়ে উঠেছিল সন্দীপন দাশ



হঠাৎ শব্দটা ঠক করে পড়ল আকাশের লোমকূপে
যার মাত্রাপতন একটা রঞ্জিত চিৎকারে মুখ ফেরালো পেচ্ছাপখানা থেকে
ঠাকুরের প্রদর্শনীতে কানে কানে যে কথা বলেছিলে
ঘুমিয়ে পড়েছে সে বাসে আসতে আসতে পরের স্টপ অনিন্দিত
অথবা অনিন্দ্য ডাকবাংলোর পাতা বিছানা পাতা
দরজা খুললেই টাক মাথা আর তোমার প্রেম
এমারজেন্সির সামনে দাঁড়িয়ে রোগী গেছে আমি যাব না
ই.সি.জি-র মতো ঠোঁট যার চুম্বন তার জন্য বোরোলিন
যদিও বাস হয়ে অটো শান্তিকামী
মলের ঠান্ডা মেঝে আমি লাশবাহক
ভয়ের দীর্ঘতায় ঘুমহীন তারা রাতের টর্চে চোখ মারে
শোবার আগে প্রেম রাত ২টোর হস্তমৈথুন
সবার আগে ডাকল প্রার্থনাকে উঁকি মেরে দেখে নিতে প্রতিটা দিন 

বসন্ত জাগ্রত জানালার কাছের ঐ ছায়ার কাছে
ছায়া নয় পূর্ণাঙ্গ পুণ্য অপেক্ষায় ছায়াবীথিকার
অতীতের এই জানালাতেই তো ছিল চাঁদ
আর সময়ের পিছন দিকে দাঁড়িয়ে আছেন
সত্যির কাছায় সতী
কুলের কাছে পড়ে আছে যে সকাল
হঠাৎ যেন ফর্সা হয়ে উঠেছিল
ঝিনুকের গর্ভে লুকোনো দুপুর
খুলে দিয়েছিল পালের হাওয়া
পাশাপাশি কথা দুটোকে
তাই ঘাসফুলের বুকে লেগে থাকা হলুদের এক নাম চুম্বন
ঘুমাতে পারবে না তুমি
উঁচু থেকে ডাকের ঝড়ে খসে পড়া পলেস্তরা
জল দাও ছিটেফোঁটা যদি সাদা ঘরের ছায়ামানবী
যাওয়ার আগে বলে দিই এই হলো ঠিক চোখ ঠিক মুখ 

থামো থামো ছোটবেলার স্কুলবাড়ি বানভাসি দিতে আশ্রয়
রিমোট ছিটকে গেলে জগন্নাথের শাক সমুদ্রের ফেনায় বাতাসকুসুম
সবুজ পাড়
জাহাজের ধাক্কায় দুলে যায় সবুজ শাড়ি
তবু খড়ের চাল ওড়েনি, ওড়েনি নাগরদোলা
শুধু হারিয়ে গেছি
আমি আর বাবা –- বন্ধু আর চিরজীবী নই
জীবনাকাঙ্ক্ষায় ডেকেছি প্রাণ ভরে
ভরে উছলে গেছে, তবু না ছেড়ে আরো গভীরে
এখনও অনুভব
স্মৃতির বাহির দুয়ার খুলে ভবিষ্যতের কাছে চিনে নিতে চেয়েছি
চেয়েছি স্থলপদ্মের আশৈশব
লালিত সব ইচ্ছা, এখনও আরো আরো
এই জোর 
জোড়ের মতো জানালা উল্টিয়ে দিয়ে
মুখশ্রী নয়, পাহাড়ের পাদদেশে হেঁটে চলা শৈলশিরা
জাগতিক জাগতিক আলোর শিখর চুঁইয়ে পড়ছে দৃষ্টি
থালাসাগরের চাঁদ
অনামিকা নামে
ডাকছে মেঘেদের
ছবির ফ্রেমে না-যাদুর জন্য।


২৭ ঋষি সৌরক

ক্লাসঘর ঋষি সৌরক

 

(৪১)

অতিকায়ছাদেছাদএকালারকন্ট্রাস্টঘাত
মুহূর্তসিজনালপাপমুষড়েছেপাপড়িশিবির 
দাগেরসাবালকিটিপ্লেটোনিকছোঁহাওয়াভিনমুখিতা
যেভাবেআহতঘুমচোখথেকেমিথশুষেনেয়


(৪২)

ব্যস্তবিকেলশেষে ক্লাসঘরঘরে ফেরতপ্রবণ 
বেচারা কলমগুলি পোর্টেবল্‌ মুখ খুইয়েছে
কালিদের একাধিকত্ব লোনতার বৈধতাহীন 
আস্তিন চাপা আছে পদবীর সহপাঠি নীরা

(৪৩)

সারি সারি বাতাসে সযত্ন হেয়ারকাট
অপার্থিব ছুঁয়ে যায় কসমিক রে
ক্লাসঘর স্যাঁতস্যাঁতে আলেয়ার চর
জোলো তরঙ্গে ফেরে ফ্র্যাক্‌শান অতীত

(৪৪)

খুঁটের আবেশ থেকে ভূপতিত শিশু গ্র্যাভিটি
আল্গাতর বন্ধন আদর্শ স্বাদের ভাগ বিতরণ
বিবিধ চয়েস ঘেঁটে অন্ধকার বেছে নিলাম
চলন পুরনো হলে প্রতিধ্বনি হাতড়ায় পেরিফেরি 


২৮ স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায়

কেচ্ছা স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায়



হাত বেরিয়েছে হাত
জামা জুতো আর প্যান্ট –- ভ্যানিশ
চকচক করছে দাঁতগুলো
টিকিট হবে দাদা? টিকিট?
জিভ বেরোচ্ছে যে –- হ্যা হ্যা হ্যা
বেদানার রস খাব
লাল হবে মুখ
বাঁদর হব না তবু
গরিলার মতো বুক বাজিয়ে বলব— 

কলেজে না পড়েও আমি ‘বঙ্গবাসী’ (শিয়ালদা শিয়ালদা)।





২৯ দেবরাজ রায়চৌধুরী

স্বীকারোক্তি দেবরাজ রায়চৌধুরী



‘তোমাকে কমলালেবুর কোয়ার মতোই সতেজ দেখাচ্ছে’—
এই প্রণয় বাক্যে উদ্ভাসিত হয়ে
উঠতে দেখলাম তোমাকে,
যদিও কবিতা না লেখা সময় থেকে
কবিতা লেখা সময় পর্যন্ত,
ইতিহাস না লেখা সময় থেকে
ইতিহাস লেখা সময় পর্যন্ত,
নারীকে এক প্রকার খাদ্য হিসেবেই
দেখে এসেছে পুরুষ।
আর তার পাকস্থলীর নিচ থেকে
উঠে এসে, জিভ থেকে, ঠোঁট বেয়ে
ফোঁটা ফোঁটা ঝরেছে লালা।
গ্রামের স্কুলে না পড়া কৃষক থেকে
নোবেল প্রাইজ প্রাপ্ত ঝকঝকে বিজ্ঞানী,
গোঁড়া মৌলবাদী ইমাম থেকে
আগুনখেকো বিপ্লবী,
নারীকে এক প্রকার খাদ্য হিসেবেই দেখে এসেছে।
দেখে এসেছে আমার মতো ‘ভন্দ’ আঁতেল
আর ‘অদের’ মতো কবি।

৩০ অদিতি সরকার

দ্বীপান্তর
অদিতি সরকার



ন্যাকড়ার পুতুল নিয়ে খেলা করি প্রতীক্ষার চরে
মেঘের রিবন বেঁধে অচেনা আকাশ ঝুঁকে চায়
গাংচিল মাছ খোঁজে চর্কিপাক লুব্ধ অবিশ্রাম
গরম বালির গর্ভে শীত ভুলে বসে থাকি অনন্ত আশায়
কখন পুতুলওলা আসে

নীল মশারির মধ্যে খোপ খোপ সাদা কালো আর
তার মধ্যে ক্রোশব্যাপী নিদ্রাহীন অপ্রেমবিস্তার
ন্যাকড়ার পুতুল হাতে অন্ধচোখ হলুদ রমণী
ঘাড় গুঁজে খেলা করে বুকজ্বলা প্রতীক্ষার মাঠে
পুষ্পপাত্র ভরা রক্তঘাসে

বেআদব হাওয়ার তাড়াতে লাট উঠোন চৌকাঠ
মুন্ডহীন অঙ্গহীন পুতুলের শয্যা হাড়িকাঠ
গাংচিল কর্কশ ঘুরে ঘুরে ফিরে ফিরে যায়
ধু ধু প্রতীক্ষায় চর নগ্ন নোনা বুক পেতে ডাকে
অলীক পুতুলওলা হাসে

 

৩১ সুকুমার চৌধুরী

মহিমা সুকুমার চৌধুরী



টান মেরে নাবিয়েছি যথেচ্ছ কাদায়।
পদ্ম তুমি।
পদ্মের মহিমা দিতে পারিনি তোমায়।
টান মেরে নাবিয়েছি যথেচ্ছ কাদায়।

কবি তো ঈশ্বর নয়।
রক্তমাংস, লোভী, সুকুমার।
তারা তো সর্বস্য চায়।
কাদাবিছানায় পদ্মকে প্রতিষ্ঠা করে
সে কোন্‌ মুক্তির কথা বলে?
শরীর শরীর তোর মন নাই কবি।

টান মেরে নাবিয়েছি যথেচ্ছ কাদায়





৩২ ইন্দ্রাণী সরকার

স্নিগ্ধ পরশ ইন্দ্রাণী সরকার



ছুঁয়ে নাও না মনের আকাশ আমার!
বিবর্ণ স্মৃতির মলাটে এখনো তোমার নাম,
সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া কথা
তুলে রেখেছি কলঙ্কিত নামের ফলক
জানালার কাচে লাগা নিশ্বাসের বাষ্প
পাঁজরের নিচে অভিমানী হিমের স্পর্শ
শুনেছি রুমালে না কি জল মোছা যায়,
জলে ভেজা এ আমার মুখ, গলা, বুক
পারো কি সব জল শুষে নিতে তোমার
ওই রুমালের স্নিগ্ধ পরশে বহু সন্তর্পণে?

৩৩ সুতপা মুখোপাধ্যায়

অপরাহ্নের আলোয় সুতপা মুখোপাধ্যায়



অপরাহ্নের শেষ আলোয়
ছন্দভাঙা শিথিলে
হতাশার কবিতা থেকে সরে আসি
শত যোজন দূরে,
আমার চারিপাশে তখন
লতাপাতা-ঘাস-ফুল-পখির অপূর্ব কোরাস,
বিদ্বেষ ও ঘৃণার কবিতা থেকে
আড়াল করি নিজেকে,
মনকানন জুড়ে শুধু দারুণ উচ্ছ্বাস।
জীবনের চরম মুহূর্ত ও সৌজন্যকে
পাশাপাশি রেখে হাঁটি--
দেখি নিজের অন্য ছায়া,
আমার একান্ত বিকেলের কবিতা-পাঠক
নিঃশব্দে কাঁধে রাখে হাত,
দু’চোখের তারায় পূর্ণতার ঝিলিক--
নীরবতার প্রবহমান জলে দুলে ওঠে
স্বস্তির খেয়া।



৩৪ সুবীর সরকার

গান সুবীর সরকার

 

(১) 

শুরুটা খুবই সাদামাটা 
কাহিনীর যথাযথ
                     বিস্তার
হাসির হিড়িক।
হাতুড়ি ও
           পেরেক
মুদ্রাদোষের মতো গান


(২) 

ঢুকে পড়ি ঘটনাগুলির
                       মধ্যে
নাচের সামান্য মুদ্রা
ভঙ্গিগুলো থেকে যায়
যেমন বিকেলমেঘের
                    আলো





<<< কালিমাটির ঝুরোগল্প / ১৩ >>>


০১ বারীন ঘোষাল

একদিন অ্যালবামেবারীন ঘোষাল



পুরনো মেকানিক্যাল আগফা ক্যামেরাটা পড়েই আছে। আগেকার তোলা ছবিগুলো। এখন সবার ডিজিটাল। বাবলুরও তাই। সে যখন কণিকা আর টিঙ্কুকে নিয়ে বেড়িয়ে ফিরে আসে, আবু পাহাড় বা জয়সলমীর বা মন্দারমনি থেকে, অ্যালবামে রাখার মতো কিছুই থাকে না সঙ্গে। কী যে ওইটুকু ক্যামেরাতে দেখায়, হাতে ধরা যায় না, মন মানে না। কখনো বাবলুর দয়া হলে কম্পুটারে। ওই, ছোঁয়া যায় না। মন ভরে? অ্যালবামে হাত বোলাতে বোলাতে স্মৃতিতে ডুবে থাকতে কী ভালো লাগে! বাবলুরা বুঝবে না।


যত্ন করে অ্যালবামটায় সাবধানে ফুঁ দিয়ে তাকে তুলে রাখতে গিয়েও তুলল না আনন্দ। কোলে নিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। মাঝখানটা খুলে ধরল। বউয়ের বিয়ের পরের ছবি। সদ্য শ্বশুরবাড়ি এসেছে আধো পায়ে। আনন্দ ছবিটা তুলেছিল। তাতে মিচকি হাসছে সানন্দা। লোকে আনন্দ বলে ডাকলেই সে চমকে উঠতো। কী সুন্দর ছিল সানন্দা। কখন যেন বাবলুর মা হয়ে গেল। দূরে সরে গেল। আর তেমন করে কাছে আসতো না। ছবির গায়ে হাত বোলাচ্ছিল আনন্দ, হঠাৎ টিঙ্কু এসে এক টান দিল। আনন্দ হাঁ হাঁ করে উঠল –- দ্যাখ দ্যাখ, করে কী, এই টিঙ্কু, টিঙ্কাই, ছাড়, ছাড় বলছি, মারব কিন্তু ----


খিল খিল করে হাসতে হাসতে টিঙ্কু জোরে টানতে আধখানা খুলে বেরিয়ে গেল। টিঙ্কু দৌড় দিল আধখানা নিয়ে চিঠি বিলি করতে করতে। পেছন পেছন আনন্দ ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে গোঁগাতে থাকল –- আঁ আঁ আঁ আনুনাসিক স্বরে ----


প্রচন্ড ঝাঁকুনি লাগাতে আনন্দ চোখ চেয়ে দ্যাখে সে আরামচেয়ারে শুয়ে, আর বাবলু ঝাঁকুনি দিচ্ছে তাকে –- বাবা, বাবা –-


 

০২ শ্রাবণী দাশগুপ্ত

পরী
শ্রাবণী দাশগুপ্ত



নীলাব্জ পরী হইয়া গিয়াছে। বেগুনি বেগুনি আকাশ, অদূরে গোলগাল চাঁদ, মাঝখানে বিধিসম্মত কৃষ্ণকলঙ্ক। পরী হইয়া আরাম লাগিতেছিল। হাত দুইখানার উপর হইতে ডানা পাতলা চামড়ার চাদরে পালকের ন্যায় সাঁটা। একটু ভারি ভারি ঠেকিতেছিল প্রথমটায়, যেন বাড়তি বোঝা। উঠিয়া আসার পরে মন্দ লাগিতেছে না। কুঞ্চিত থাক্‌থাক্‌ মুক্তকেশের ঢল -- যেমনটা কার্টুনে হয়। রেশমকোমল হাতের দীর্ঘ আঙুল। আপাতত এটুকু সে দেখিতে পাইতেছে। মাথায় টায়রার ন্যায় মুকুট। ছুঁইয়া বোধ হইল, দামি পাথর গাঁথা। এ্যাই নীলু, তুই পরী না পরা? তুই পরী না পরা? শ্রমণা বলিতেছে, মানে প্রাক্‌কৈশোরে বলিত। পরীর গল্প খুব হইত তখন, লালপরী নীলপরী মেঘপরী ফুলপরী। পদ্মডাঁটা শ্রমণার হাত, ফ্রক উঠিয়া গেলে মাখন পা। নীলাব্জর হাফপ্যান্টের বাহিরে শ্যাম ও শীর্ণ, কিছু অমসৃণ পা। বড় লোভ হইত ওইরকম...। শ্রমণা বলিত, দিম্মাকে বলে দেব কিন্তু। ছেলে না তুই...! ছেলে? কে বলিয়াছে? লুকাইয়া শ্রমণার ফ্রক পরিয়া দেখিয়াছিল, তাহার বৈচিত্রবিহীন রেখাঙ্কিত শার্টের চেয়ে ঢের মানাইতেছে। সরস্বতীপূজায় তের বছরের শ্রমণার কদমফুলরঙা তাঁত শাড়িটিতে অতর্কিতে প্রথম নারী হইবার চিহ্ন... পুষ্পাঞ্জলি পারিল না। আহা, বড় কাঁদিয়াছিল। নীলাব্জ বিষণ্ণতা বুঝিবার প্রয়াস করিতেছিল। নদীটির যেইখানে নীলাব্জ সেখানে শ্রমণা নাই। শ্রমণার মতো কেহ নাই। নীলাব্জর মতো কষ্ট শ্রমণার নাই। শ্রমণার মতো অন্য কাহারও নাই। বহমানা স্রোতস্বতীর পাড়ে অন্তর্জলি বালুচর। মধ্যকার আঠালো কদর্মাক্ততায় আকণ্ঠ তৃষ্ণা ও অতৃপ্তি। আজ পরী হইয়া তাহার চোখে জল আসিয়া পড়িতেছে। ইহাই কি আন্তরিক ইচ্ছা ছিল? কলেজে প্রথমদিন গভীর বাসনা ঘিরিয়াছিল বর্ণিকাকে দেখিয়া। কোত্থেকে কিনিস্‌ কুর্তি?... খুব সুন্দর... চমৎকার। উরে বাবারে... কেন রে? পরবি? না গার্লফ্রেন্ডের জন্যে? নীলাব্জর সামনে অকস্মাৎ ধৈবত। ফাস্টট্র্যাকের বৃহত্তম ডায়ালশোভিত চওড়া কবজি নীলাব্জর হাতের পাতা দেখিতেছিল। হুঁ... ছবিটবি আঁকিস্‌? শোন্‌ বর্ণিকার সাথে এগোলে বিপদে পড়তে পারিস। আজ যাঃ। দেহ জুড়িয়া অবণর্নীয় ঝঙ্কার... ধৈবত... ধৈবত... পুরুষালি গন্ধস্পর্শ! বণির্কার ভাগ্য। ইমনের সাগ্নিক, ফাল্গুণীর শীর্ষ...। ধৈবতের বাহুতে বর্ণিকা! ধৈবত কি তাহার হইতে পারিত? শ্রমণা একদিন সুপর্ণর সঙ্গে পরিচয় করাইল। নীলু, একটা গার্লফ্রেণ্ড জোটাতে পারলি না এ্যাদ্দিনে? সে নীলবর্ণ হইয়া গিয়াছিল এমন শ্বাসরোধী প্রশ্নে। পরী নীলাব্জ দেখিতে পাইতেছে না বক্ষোদেশে চিরাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যঙ্গ ধারণ করিতেছে কিনা! নবনীতকোমল পদদ্বয়ের মধ্যবর্তী... কে জানে! সমস্তটি জুড়িয়া ছায়াময় আচ্ছাদন তাহাকে দ্বিধাগ্রস্ত করিয়া রাখিয়াছে। আজও শ্বাসে পুরুষালি ধৈবত...। পেলব বাহুতে মণিময় গহনা দেখিয়া এখন সে ফুলিয়া উঠিতেছে, আহা! প্রকাশ করিতে কতবার শরম আসিয়া ঘেরিয়াছে... মা-কেও বলে নাই। নীলু তুই পরী না পরা? পরী না পরা? সে মনে মনে বলিল, অপরা।

০৩ রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

চিয়ারলিডার
রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়



মেয়েগুলোকে মর্ত্যের কুন্ডীতে নেমে আসা পরীদের মতো মনে হয়। যখন হাঁটে, হেঁটে যায়, মঞ্চে ওঠে, তারপর ফুলেল শরীর মেলে দেয়, ফের নামে, হাঁটে, হেঁটে যায়, বসে, আবার ওই শিরশিরে আওয়াজটা বেজে উঠলে চকিতে ওঠে… সবটুকু…

এত দূরের গ্রামে, কেবল ট্রান্সমিশান ডিজিটালাইসড হয়ে যাওয়ার পরেও ছবি কাঁপে, কেঁপে কেঁপে ওঠে। হতে পারে পুরনো সেট। মান্ধাতার আমলে বললেও কম বলা হয়। জেঠিমণির ওপরের ঘরে কবে ফুল বেলপাতা চড়িয়ে বসে পড়েছিল। নড়াচড়ার নাম নেই। এখনো পর্যন্ত কেউ ঘাঁটেনি, সে-ও কাউকে ঘাঁটায়নি। খালি মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে।

সে তো গেল দৃশ্য, কিন্তু বিচিত্র এই শব্দ প্রক্ষেপের সাথে এই ছোট্ট মেয়েটার কানও সম্পৃক্ত হয়ে উঠেছে। সেও জেনেছে, এটা বাজলে ওটা হয়। ধ্বনি-মাধুর্য নয়, ধ্বনি-চাতুর্য, যা বিচিত্র এই IPL-র আবিষ্কার কৌশল। প্রথমে মুখে মুখে, উত্তেজনায় শ্বাস চেপে, 10-9-8-7-6-5-4… বলতে ছোট্ট বুক দুটো হাঁপর ঠেলত।

প্রথম যেদিন অনেকক্ষণ চেয়ে চেয়ে থেকে সে দেখল, সেইসব ফুলপরীদের, তাদের হাতে রেশম রুমাল বাঁধা, হাত নাড়ে… যেন তাকেই নাড়ে… আর শরীরগুলোকে ছুঁড়ে দেয়, বাজনা দ্রুত বেজে ওঠে, ধোঁয়া ওড়ে। যেন মনে হয় প্রতিমা-প্রতিম। চণ্ডীমণ্ডপে দণ্ডায়মান দেবীর মতো। তবে চোখগুলো তত টানা নয়, আর নাকগুলো যেন একটু বেশি তীক্ষ্ণ মনে হয়। শরীরগুলোও তত সুডৌল, পেলব নয়। তবে ফুলপরীদের মতো।

--খুকি, অত কাছে যেও না, চোখ খারাপ হবে…

--কী নামে ডাকে ওদের?

--চিয়ারলিডার

সব দলের আলাদা আলাদা ওরা, রেশম রঙে চোখ জুড়নো যেন সেইসব উড্ডীন প্রজাপতি, এই সবুজ ঘাসের দেশের কোণে কোণে সংঘবদ্ধ থাকতে শিখেছে।

আর নীল মশারির নিচে তার ছোট্ট নীল শরীরটাকে সে ঠিক সেইরকম মুচড়ে মুচড়ে ওঠায়। এ সময় তার মা বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শোয়ায়, তারপর নিজে ওঠে, নীল আলোয় দেখে, শাদা দাগটা আস্তে আস্তে ছড়াচ্ছে।

--ডাক্তারবাবু, এটা কী, শ্বেতীর দাগ, মেয়ে বলে কথা...

--হুম, অ্যালবিনো, কিছু করার নেই, তবে দেখতে হবে আর যেন ছড়িয়ে না পড়ে…

আরো একটা IPL যেতে না যেতেই ঠোঁট থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল, আর মেয়ে কিনা অনুচ্ছেদ রচনা লিখে এল, তার জীবনের লক্ষ্য চিয়ারলিডার হওয়া!

পুনশ্চঃ স্পট ফিক্সিং-র পর, অন্তর্বর্তীকালীন হাল আমলে অন্যতম নীতি নির্ধারিত হয়েছে যে, আগামী IPLগুলোতে চিয়ারলিডার বলে কিছু থাকবে না।


 

০৪ রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

নেহা আমারও রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

-নেহা কে তুমি?

-ভালোবাসার রঙ ও বেরঙ

-কোথায় তুমি?

-রাইট অন দ্য টপ অফ লাইফ

-কার সঙ্গে?

-রুয়ামের সঙ্গে, এই তো কিছুক্ষণ

-রুয়াম পুরুষ না নারী?

-কোন্‌ বিচারে, লিঙ্গ না সত্তা?  

সেদিন তুমুল বৃষ্টিতে নেহার কাছাকাছি। অসময়ে দরজায় এসে দাঁড়াল অফিসফেরত অরুণাভ--  

-কোন্‌ জগতে থাকো? এতক্ষণ কড়া নাড়ছি 

-স্যরি, শুনতে পাইনি

-কার ধ্যানে মগ্ন?

এখন অনেকক্ষণ বকে যাবে অরুণাভ। ও বোধহয় ফেরার পথে মনে মনে একটা ছবি আঁকছিল -– ওর আশায় পথ চেয়ে জানালায় এক ধূসর অবয়ব, যাকে সে আদরে আদরে মুহূর্তে রঙিন করে তুলবে।

আমি জানতাম, বাড়ির কলিংবেলটা বিগড়েছে। বেশ লাগে ভাবতে। কেউ আমাকে ডাকছে অথচ আমি শুনতে পাচ্ছি না। আসলে চাইছি না। খুব গভীরে ডুব দিয়ে থাকে এই চাওয়াগুলো। ছোট ছোট চাওয়া। অথচ প্রায়শই অপূর্ণ থেকে যায়। আমার এই পাগলপণ কেন জানি ছুঁতে পারে না অরুণাভ। 

অরুণাভর বিরক্ত মূর্তিটা ভুলে থাকতে চাইছি। ভীষণভাবে চাইছি। চাইতে গিয়ে দেখি কেবলই মনে আসছে অরুণাভর প্রেম আর অধিকারবোধ। অরুণাভর ভালোবাসা আর অধিকারবোধ। অরুণাভর যৌনতা আর অধিকারবোধ। 

আমি বুঝতে পারি, অফিসফেরত ক্লান্তি নিয়ে অরুণাভ যখন দ্যাখে আমি নিজের ভাবে বিভোর, তখন আমাকে ঘিরে ওর সারাদিনের উৎকণ্ঠা হঠাৎ নিভে যায়। আর এই নিভে যাওয়া সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। কিছুতেই না।

রাতে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দুটো মুখ। খুব ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের ঘ্রাণ। অরুণাভ আলতো হাত রাখে আমার স্তনবৃন্তে। এক অচেনা হাসির তরঙ্গ গড়িয়ে পড়ে আমার ঠোঁট থেকে সারা ঘরময়। খুব আলতো কেঁপে ওঠে অরুণাভর আঙুল। পরক্ষণেই দৃঢ় হয়ে ওঠে। এক পুরুষসত্তার আগমন দেখি আমার আশ্লেষহীন বিষণ্ণতায়। তখনও কোনো প্রজাপতি বাসা বাঁধে না আমার ঘরে।

আমার উন্মাদ হাসির লহরে উল্লাস খোঁজে অরুণাভ। প্রতিদিনের মতো আবার, আবার মেতে ওঠে হিমাঙ্কের নিচে রাখা আমার শরীরে আকাশের খোঁজে। ক্রমশ ক্লান্তি নামে। নিরাভরণ পতনের শব্দ শুনতে পাই আমি। আর নিঃশব্দে বাজে অরুণাভর করুণ আর্তি –- কেন, কেন জাগে না এই নারী? তবে কি অন্য কেউ? অন্য কোনোখানে?

আমি ঘুমহীন চোখে সারারাত অরুণাভকে উল্টেপাল্টে দেখি। শ্বসনের আগে ও পরে লিপ্ত থাকা বয়ানগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে কাটাকুটি করি। উত্থান ও পতনের তীব্র আর্তনাদ শুনতে পাই। আর আমার ভেতর জেগে ওঠে আরো এক আমি, যে দিগন্ত হাতড়ে বেড়ায় এক পেলব সত্তার খোঁজে। কোনো অবয়বে থাকে সেই রমণীয় ভ্রূণ যেখানে অসম সমের দ্বিমাত্রা দেওয়াল ভাঙে কামনার। 

[স্বীকারোক্তি -- নেহা শুধু স্বপনের নয়, আমারও]

 

০৫ অনুপম মুখোপাধ্যায়

গোল্ডফিশ
অনুপম মুখোপাধ্যায়



‘খুব কেয়ারফুলি একটা গোল্ডফিশকে ধরতে হয়, সোনা।’


‘তারপর?’


‘তারপর... আঃ, কী করছ... সেটাকে জারের বাইরে নিয়ে আসতে হয়! আবার কী! দেখো বাইরের বাতাসে তার একটুও যেন অসুবিধা না হয়, সেটা কিন্তু তোমাকেই খেয়াল রাখতে হবে!’


‘সত্যি, জলের মধ্যে বেচারি মাছটা কী কষ্টই না পায়, বলো?’


ওদের কথা আমি বুঝতে পারছিলাম না। খোলা বাতাসে একটা মাছের কী অসুবিধা হতে পারে? সুন্দর নির্মল ঝরঝরে সকালের বাতাস। তাতে সকালের রোদ গন্ধ হয়ে আছে। এমন বাতাসে একটা সোনালি মাছের অসুবিধা হবে, এ তো জাস্ট ভাবাই যায় না।


তবু সোনা আর অভিষেক এইসব কথা বলছিল। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরা বুঝতে পারছিল কি, আমার ওদের কথাগুলো কতখানি বোকা বোকা লাগছিল?


সম্ভবত না।


ওরা আমার কথা ভাবে না। আমার উপস্থিতির তোয়াক্কা করে না। আমি একটা কাচের প্রাণী হয়ে আছি ওদের মধ্যে। ঘরের মধ্যে কিছুদিন আগেও শুধু চুমুটুকুই খেত। সঙ্গমের সময় ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেত। রাস্তায় গিয়ে কাজটা সেরে আসত। আজকাল তো ঘরের মধ্যেই সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে থাকে সারাদিন। এমনকি নিজেদের চাটাচাটিও করে। একটু আগেই তো সোনা বেহায়াপনার হদ্দ করে দিল। ঠোঁটে-চিবুকে-নাকের ডগায় অভিষেকের একরাশ বীর্য নিয়ে আমার দিকে ফিরে বলল, ‘এই ছাগল, কী দেখছিস তুই অমন হাঁ করে! তোয়ালেটা একটু এনে দিতে পারছিস না! কান্ডজ্ঞান কি হবে না রে তোর জীবনে?’


অথচ কাছেই তোয়ালেটা ছিল। হাত বাড়ালেই পেতে পারতো।


এখন অভিষেক উদাসীনভাবে সোনার যোনির আশেপাশে বিলি কাটছে। সোনার ধূসর চোখ এবিপি আনন্দে।


এ এক আশ্চর্য অবহেলা ওদের আমার প্রতি। মায়ার খেলা।


যেমন আমাদের চার দেওয়ালে এই মুহূর্তে কোনো গোল্ডফিশ নেই। তবু এই আলোচনা কেন? আমাকে শোনাবে বলেই কি নয়? অবশ্যই আমি না থাকলে ওরা এখন এটা নিয়ে কথা বলত না। হয়ত বেরিয়ে পড়ত। পার্কে গিয়ে মৈথুন করত। ঠিক যেমন... আজকাল ওরা যখন আমার সামনে ওরাল করে, বোঝা যায় দু’জনেরই চার দেওয়ালের মধ্যে সেক্স তুলতে বেশ সমস্যা হচ্ছে, নেহাত আমার জন্যই করছে। সেদিন অ্যানাল করতে সোনার খুব কষ্ট হচ্ছিল, মুখ লাল হয়ে চোখে জল এসে যাচ্ছিল। তবু নিজেই অভিষেককে বাধ্য করল ও, হয়তো জীবনে প্রথম করল... আমার জন্যই। ও জানে, আমি চেনা লোকের গু-কে পৃথিবীতে সবচেয়ে ঘেন্না করি।


কিন্তু...


খোলা বাতাসে একটা গোল্ড ফিশের কোনো অসুবিধা হতে পারে, এটা ওরা ভাবছে কী করে? কী করে ভাবছে, ওদের এই আলোচনা শুনে আমি বিশ্বাস করবো!


বরং

 

০৬ সোনালি বেগম

স্কার্ফ
সোনালি বেগম



মোমবাতি-আলোয় ঝলমল করে উঠছে জন্মদিনের কেক। শুধুই অপেক্ষা...
‘হ্যালো, কখন আসবে? সকলে অপেক্ষা করছেন’, উদ্বিগ্ন ঝর্না

‘অপেক্ষা করো’ নিস্তেজ কণ্ঠস্বরে আবীর ‘কতক্ষণ...’ ঝর্নার ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বর উন্মাদগ্রস্ততায় মোমবাতি জ্বেলে দিয়েছে ঝর্না, গলে পড়ছে গরম মোম কেকের নরম শরীরে ----

বেঁচে থাকার সামগ্রীগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ---- আলু পেঁয়াজ রসুন খাট পালঙ্ক মোবাইল... চোখের প্রান্ত ঘিরে তছনছ রাজনীতি সমাজনীতি ধর্মনীতি। একসময় নাম-করা নায়ক আবীর হুইস্কির বোতল শেষ করে পড়ে থাকে বিছানায়। ‘শোনো, নিজেকে এভাবে শেষ কোরো না,’ ঝর্নার কণ্ঠে উদ্বেগ ‘আমাকে বার বার বিরক্ত কোরো না, প্লিজ’ ‘তোমার ফ্যান্স তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান’ ‘মারো গুলি, ফ্যান্স, হাঃ হাঃ হাঃ...’ আকাশে মেঘ গর্জন শুরু হয়ে যায়, অঝোর বৃষ্টির জলে ভেসে যায় জানালার কাচ। ঝর্না ছুটে এসে জানালা বন্ধ করে দেয়। অসহ্য গরমে বৃষ্টির দাপট ভালো লাগে। গ্রীষ্ম-বসন্তে পুরুষ কোকিলের কুহু-কুহু ডাকে ভরন্ত বাতাস। কোকিলের অনেক জাত আছে। নিউজিল্যান্ডের সাইনিং কোকিল ফ্লাইক্যাচারের বাসায় ডিম পেড়ে পালিয়ে যায় হাজার হাজার মাইল দূরের দ্বীপে। বাচ্চারা প্রতিপালিত হয় পালক পিতা-মাতার কাছে। তারপর সহজাত প্রবৃত্তির জোরে আবার ফিরে যাওয়া ---- পাখির ডানায় ভর দিয়ে ঝর্না উড়ে যায় দেশ দেশান্তর। জীবনটা যদি নিজের মতো সাজানো যেত! ভুল শত শত ভুল! গাড়ির হর্ণ শোনা যায় বাইরে। ‘চলো, একটু ঘুরে আসি,’ নরম গলায় ঝর্না ‘কোথায়?’ বিরক্তির চরম প্রকাশে আবীর ‘তোমার একটু ট্রিটমেন্ট দরকার’ ‘ছাড়ো তো-----’ চেহারায় একটা স্কার্ফ জড়িয়ে নিল আবীর। বছর আশির আবীর আর পঁচাত্তরের ঝর্নার সংসারে তৃতীয় জন আর কেউ নেই।                                                

মনোবিদ ডক্টর ঘোষ নানান খুঁটিনাটি প্রশ্ন করলেন ঝর্নাকে। এই নিয়ে বেশ অনেকগুলি সিটিং ইতিমধ্যে হয়েছে। ডক্টর ঘোষ আশ্বস্ত করলেন, ‘চিন্তার কিছু নেই। নায়ক আবীর তাঁর বর্তমান বৃদ্ধাবস্থা সহ্য করতে পারছেন না। যৌবনের সৌন্দর্যকে উনি অসম্ভব ভালোবেসেছেন। বয়সকে মেনে নিতে না পারা, ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায়, একে বলা হয় নার্সিসটিক পার্সোনালিটি। তাই উনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছেন।’

ঝর্না শক্ত করে আবীরের হাত ধরলো। গাড়ির কালো শার্সি উঠিয়ে রাতের অন্ধকারে ছুটে যেতে থাকলো তারা...                                                                                 

০৭ সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

ফোন
সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ
 

লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। নানাবিধ কারণে অনেকদিন লেখা হয়নি। অনেকগুলো লেখার চাপ ছিল। লেখা পাঠানোর জন্যে বারবার ফোন আসছে।

আমি যখন লিখি তখন অন্যদিকে মন থাকে না। লেখার মধ্যে ডুবে যাই। অনেক সময় সেলফোনের কথাও মনে থাকে না। চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ থাকে সময় সময়। 

আমার লেখার চাপ, স্ত্রী শাহানা পারভীন বোর্ডের খাতা দেখায় ব্যস্ত; সেলফোনটা পাশের রুমে। রাত তখন সাড়ে বারোটা কী পৌনে একটা হবে। পাশের রুমে সেলফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বাজছে। অবাক হলাম না। এ সময়ে আমার প্রচুর কল আসে। শাহানা গিয়ে ফোনটা ধরলো। আমার আগেই বলা ছিল, খুব জরুরি ফোন না হলে আমাকে না দিতে। ফোনে কথা বলে শাহানা আমার কাছে এলো।  

আমি জিজ্ঞেস করলাম : কার ফোন?

শাহানা উত্তর দিল : তোমার এক বন্ধু ফোন করেছিল। 

কী নাম?  

কী যেন নাম বলল, কায়সার হামিদ না হামিদ কায়সার। 

কেন ফোন করেছিল? 

বলল এই মাঝরাতে তোমার সাথে গল্প করতে নাকি ওনার খুব ইচ্ছে করছে।

তুমি কী বললে?

আমি বললাম, উনি এখন লেখায় ব্যস্ত আছেন, কাল সকালে ফোন করতে। 

কী করেছো তুমি? 

কেন? তুমিই তো বলেছিলে, জরুরি ফোন না হলে তোমাকে না দিতে। 

হায় আল্লাহ! এর চেয়ে জরুরি ফোন যে আমার জীবনে আর নেই, সে কথাটা আমি তোমাকে কী করে বোঝাবো! ও আমার জীবনের সেরা বন্ধু। কতদিন ধরে ওর ফোন নাম্বার খুঁজছি। ওর সাথে কথা বলার জন্যে মুখিয়ে আছি।

ভালো কথা, এখন তো উনি জেগেই আছেন, তুমি ফোন করে কথা বলো! 

শাহানার কথাটা পছন্দ হলো । হাতের লেখাটা শেষ করে ওই নাম্বারে ফোন করলাম। ফোন সুইসড অফ। বারবার ফোন করলাম। একই উত্তর,`দিস নাম্বার ইজ নট এ্যাবেলএ্যাবল নাও, প্লিজ ট্রাই লেটার’।

রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারলাম না। কেন ফোন করেছিল, সুপ্ত? কী কথা বলতে চেয়েছিল? ওকে বলার জন্যে কত কথা জমে আছে বুকের ভেতর। নাম্বার যখন পাওয়া গেছে, আর অসুবিধে নেই। সকালেই কথা বলা যাবে।

অনেক রাতে ঘুমাতে যাবার কারণে সকালে একটু দেরিতে আমার ঘুম থেকে ওঠার অভ্যেস। সাড়ে ছ’টার দিকে সেলফোনটা বাজতে থাকলো। এত সকালে কেউ ফোন করলে আমি খুব বিরক্ত হই। ঘুমের মধ্যেই ফোন ধরলাম।

হ্যালো, আমি পাভেল বলছি। খবর শুনেছিস?

কী খবর?

কাল রাত তিনটের দিকে সুপ্ত মারা গেছে।

এক ঝটকায় উঠে বসলাম। সারা শরীর কাঁপতে থাকলো। কে যেন বুকের ওপর একখানা দশ টনের ভারি পাথর চাপিয়ে দিল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার। সুপ্ত মানে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হামিদ কায়সার। যে কাল রাতেও আমাকে ফোন করেছিল। আমার কথা বলতে খুব কষ্ট হলো। তবু মিইয়ে স্বরে জিজ্ঞেস করলাম : কীভাবে? 

হার্ট এ্যাটাক।

আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। আমার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো গালে। গাল বেয়ে কপোলে। ভাসিয়ে দিল বুকের উষ্ণ চরাচর। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে থাকলো। তীব্র থেকে তীব্রতর।


 

০৮ লিপিকা ঘোষ

ব্যালটলিপিকা ঘোষ




‘চল্লাম’
‘কোথায় আর যাবি?’
‘নো ম্যান ল্যান্ডে’
একটু চুপ করে থেকে ঋজু আবার জিজ্ঞেস করে ‘যাবি ই ?’
‘হ্যাঁ’
‘শোন্’
‘বল’ গুছোতে গুছোতে বলে তোর্সা ।
‘যাস না , থেকেই যা না হয় আমার সঙ্গে’
খুব অবাক-চুপ হয়ে থাকে তোর্সা কিছুক্ষণ । বোঝার চেষ্টা করে, এটা কি ঋজুর প্রবল অধিকার বোধের দাবি, নাকি মহুয়ার ঘোরে পাওয়া মৌ-নেশার প্রলাপ।
‘তুই ভালো লিখিস’ ঋজু বলে।
হাসে তোর্সা। জাস্ট ঘোর ছাড়া আর কিছু না। ‘ধুর, ওসব লেখা নাকি? ছাইপাঁশ’
‘যাস না’
তোর্সা কি থাকবে আরও কিছুক্ষণ? আরও কিছুদিন?
ছাপাখানার ঘুপচি আঁধারে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে রাশি রাশি ব্যালট পেপার চেক করতে করতে ভিড় করে আসছে সে সব অতীত। চারপাশে সাদা, গোলাপী, হলুদ ব্যালট রাশি রাশি। সামনে ত্রি-স্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের সর্ব-স্তরীয় প্রস্তুতিতে সহকর্মীদের সঙ্গে তোর্সাও লেগে পড়েছে। এ এক বিচিত্র পর্ব। সব চাপান উতোর শেষ হলে আর সময় থাকবে না ওদের।
আঞ্জুমানারা খাতুন বিবি, ফুল্লরা মন্ডল, সুরুজ্জামান সেখ... পর পর প্রার্থীদের নামের তালিকা চেক করে চলেছে নিশ্বাস ফেলার থেকেও দ্রুত গতিতে।
ব্যালট পেপার নম্বর অনুযায়ী সাজানোটা শেষ থেকে শুরু, না শুরু থেকে শেষ, তা নিয়ে জোর বিতর্ক তুলেছিল তোর্সার এক সহকর্মী ভাই পলাশ। তোর্সার অভিজ্ঞতা বড়ই কম। ও শুধু ভাবছে, শেষ থেকে শুরু আর শুরু থেকে শেষ যা-ই হোক না কেন, ‘শুরু’ আর ‘শেষ’টা তো রইল। ব্যালট আর ব্যালট চারদিকে। প্রশাসনিক ঘেরাটোপের মধ্যে ওরা ক’জনা দম ফেলার আগে কাজ শেষ করছে। তোর্সা গুনে চলেছে রূপনগর ১, রূপনগর ২, রূপনগর ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ বুথের ব্যালট। এরপর বাক্সবন্দি করে সব ব্যালট চলে যাবে পদ্মা-পাড়ে। সেখানে পদ্মার ভাঙ্গন, সেখানে পদ্মার পানি, সেখানে চর জেগে রয়। ভয় হয় তোর্সার, ও পানিতে আগুন লাগবে না তো, ও পানিতে লহু মিশবে না তো! ‘দিদিমনির মন কোনদিকে?’ আদিত্যদা জিজ্ঞেস করে মাঝ থেকে। ঠিক টের পেয়েছে। উত্তর দেওয়ার আগেই চৌধুরীদা ধমকে ওঠে, ‘লাঞ্চ করবে না তোর্সা?’
‘নাহ, আপনারা যান’
‘রাখো তোমার ব্যালট পেপার গোনা’, ধমকে ওঠেন।
এ ধমকে একটা স্নেহ জড়িয়ে আছে।
তোর্সা বারবার মোবাইল খুলে দেখছে কোনো মেসেজ এল কিনা –- “মোবাইল খোল্, কল রিসিভ কর্”। তোর্সার মোবাইলে কল ডাইভার্ট করা থাকে একটা সুইচড অফ নম্বরে। ঋজু বিরক্ত হয়ে এই এক মেসেজ করতে থাকতো। নাহ, কোনো মেসেজ নেই। ধমক খেয়েও তোর্সা ওঠে না। ‘আমি পরে লাঞ্চ করব, আপনারা খেয়ে আসুন’
‘থাকো পড়ে’, গজগজ করতে করতে গাড়িতে গিয়ে বসেন চৌধুরীদা। তোর্সা হাসে।
পঞ্চায়েত ভোটের পরই যদি তোর্সা সত্যিই কোনো নো ম্যান ল্যান্ডে চলে যায় আর ফিরে না আসার জন্য!
‘তুই যেখানেই যা,আমি ঠিক খুঁজে নেব তোকে, গিয়ে দ্যাখ’, ঋজুর জোরালো দাবি।
হাসে তোর্সা। একটু তাহলে থেমেই থাকুক ও, ভেবেছিল। থেমে থাকতে থাকতে কখন কত দিন পেরিয়ে, বছর পেরিয়ে কত সময় বয়ে গেছে। তোর্সা টেরও পায়নি।
যখন টের পেল, তখন তোর্সা সত্যিই এক নো ম্যান ল্যান্ড-এ দাঁড়িয়ে। এই ছাপাখানা, রাশি রাশি ব্যালট, সহকর্মীদের হৈ হৈ রৈ রৈ, ওই ঘূর্ণি লাগা পদ্মার পানি, বি এস এফ ক্যাম্প, সব কিছুর মধ্যেই তোর্সা এক নো ম্যান ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। তার বেদম হাসি পায়। ব্যালট ব্যালট, অন্তহীন ব্যালট গুনে চলেছে সে। গুনতে গুনতে তোর্সাও হঠাৎ একটা ব্যালট হয়ে গেল। মেরুন পাড় সাদা শাড়ির এক আশ্চর্য ব্যালট। এক মানুষ বিহীন দ্বীপে উড়ছে সে। সে-ই ব্যালট, সে-ই প্রার্থী, ভোটার কই?
ছাপাখানার বৃদ্ধ মালিক হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছেন, ‘ সিস্টার নিবেদিতা, তুমি কোথায় উড়ে চলেছো, তুমি তো ব্যালট। বাক্সবন্দি হও। তোমার উড়তে মানা’।
তোর্সা হাসে। এ ব্যালটের উড়তে মানা নেই, ছিঁড়তে মানা নেই, পুড়তে মানা নেই। নো ম্যান ল্যান্ডে উড়ছে ব্যালট।
উড়ুক তবে, মেরুন পাড় সাদা শাড়ির এ ব্যালট অন্তহীন উড়ুক...!