পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৩

কালিমাটি অনলাইন / ০৬

সম্পাদকীয়


গত ১২ই আগষ্ট কলকাতায় ‘জীবনানন্দ সভাঘর’-এ বাংলা ভাষার লেখক, পাঠক ও সম্পাদকদের নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজিত হয়েছিল। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ইন্টারনেটে বাংলাভাষা চর্চা – সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ’। বিভিন্ন ওয়েবম্যাগ-এর সম্পাদক বা প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাঁদের কাজের সঙ্গে উপস্থিত শ্রোতা ও দর্শকদের পরিচয় করানোর জন্য। এই সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়ে ‘কালিমাটি’ পত্রিকা ও ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনের ‘পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’ সহ বক্তব্য রেখেছিলেন পত্রিকা-সম্পাদক। এছাড়া আমন্ত্রিত ছিল ‘আদরের নৌকা’, ‘অন্য নিষাদ’, ‘আসমানিয়া’, ‘বাক’, ‘কৌরব’, ‘পরবাস’, ‘গুরুচন্ডালী’, ‘জার্নি 90s’ ইত্যাদি আরও অনেক ওয়েবম্যাগ। ওয়েবম্যাগ পরিচিতির পাশাপাশি দুটি আলোচনায় বিশদ ভাবে বক্তব্য পরিবেশন করেন অধ্যাপক শ্রীতন্ময় বীর এবং শ্রীদেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তন্ময়বাবুর আলোচ্য বিষয় ছিল : ‘ওয়েবম্যাগের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’। এবং দেবজ্যোতিবাবুর আলোচ্য বিষয় ছিল : ‘আগামী প্রজন্মের সাহিত্য চর্চার মাধ্যম’। বলা বাহুল্য, দুটি আলোচনাই ছিল অত্যন্ত তথ্য ও তত্ত্বসমৃদ্ধ। আমাদের সঠিক জানা নেই, এর আগে এই ধরনের বাংলা ভাষায় ওয়েবম্যাগ সম্পর্কিত কোনো আলোচনা সভার আয়োজন কলকাতা বা ভারতের অন্যত্র হয়েছিল কিনা! আর তাই অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয় এই সেমিনারের উদ্যোক্তা ‘সৃষ্টি’র রোহণ কুদ্দুস, ‘ইছামতী’র মহাশ্বেতা রায় এবং ‘ও কলকাতা’র অভ্র পাল’কে। অবশ্য প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই সেমিনারে ‘সময়’-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ উদ্যোক্তাদের না থাকায়, কিছু ওয়েবম্যাগের প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাঁরা খুবই কম সময় পেয়েছেন তাঁদের বক্তব্য রাখার জন্য; আবার কেউ কেউ সময়ের টানাটানিতে তাঁদের বক্তব্য রাখার জন্য আদৌ কোনো সুযোগই পাননি। এটা সত্যিই খুবই দুঃখের এবং ক্ষোভের ব্যাপার। আশাকরি, পরবর্তীকালে উদ্যোক্তারা এই ব্যাপারে যথেষ্ঠ সচেতন ও সতর্ক থাকবেন। এবং সেইসঙ্গে আমরা আশাবাদী, বাংলা ভাষায় ওয়েবম্যাগ আন্দোলন ক্রমশই আরও বলবান ও বেগবান হয়ে উঠবে; এবং সঠিক দিশায় এই আন্দোলনকে পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন ওয়েবম্যাগের সম্পাদক, সদস্য ও লেখকেরা আগ্রহী ও সংঘবদ্ধ হবেন।

প্রকাশিত হলো ‘কালিমাটি অনলাইন’-এর ষষ্ঠ সংখ্যা। আপনাদের কাছে আবার আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনারা এই সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা-ঝুরোগল্প- কথনবিশ্ব-চারানা আটানা-ছবিঘর সম্পর্কে আপনাদের অভিমত অবশ্যই জানান ‘কমেন্ট বক্স’-এ। এবং সেইসঙ্গে ‘কালিমাটি অনলাইন’কে আরও সমৃদ্ধ করুন আপনাদের স্বরচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক ও মননশীল কবিতা, ঝুরোগল্প, ‘কথনবিশ্ব’র জন্য গদ্য ও ‘ছবিঘর’এর জন্য আলোকচিত্র পাঠিয়ে।


আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা : kalimationline100@gmail.com
প্রয়োজনে দূরভাষে যোগাযোগ করতে পারেন : 0657-2757506 / 09835544675

অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :

Kajal Sen, Flat 301,
Parvati Condominium,
Phase 2, 50 Pramathanagar Main Road,
Pramathanagar, Jamshedpur 831002,
Jharkhand, India.

<<< কালিমাটির কথনবিশ্ব >>>


০১ সমীর রায়চৌধুরী

হাংরি আন্দোলনের উত্তরাধিকার
সমীর রায়চৌধুরী


১৯৬১ থেকে ১৯৬৫, এই পাঁচ বছর ভয়ংকর প্রতিরোধের মুখোমুখি হাংরি আন্দোলন ঘটে। অথচ আজও এই আন্দোলনের প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসে, অর্থাৎ তার উত্তরাধিকারের জের আজও সক্রিয়। হাংরি আন্দোলনকারীরা প্রচলিত মেইন স্ট্রিম ধারা থেকে সরে এসে উত্তর ঔপনিবেশিক পর্বে প্যারাডিম শিফট্‌ ডিসকোর্সের বাঁক বদলের প্রসঙ্গ তোলেন এবং নিজেদের টেক্সটে তুলে ধরেন। বাঁক বদলের ডিসকোর্স।

আজও মেইন স্ট্রিমের বাইরে এই ধরনের ডিসকোর্সকে যাঁরা গুরুত্ব দেন, তাঁরা মেইন স্ট্রিমের বাইরে থাকতেই পছন্দ করেন। ‘কবিতার কালিমাটি’, ‘কালিমাটির ঝুরোগল্প’, ‘কালিমাটির কথনবিশ্ব’ যা আজও বলতে চাইছে। বাঁক বদলের ডিসকোর্সের নিজস্ব পরিসর প্রত্যেকে নির্মাণ করে চলেছেন। কে কতটা সচেষ্ট সে বিষয়ে পরষ্পরের সৃষ্টিকর্মকে মর্যাদা দিচ্ছেন। এভাবেই ‘কালিমাটি’, ‘কৌরব’, ‘বাক’, ‘ক্ষেপচুরিয়ান্স’, ‘পরবাস’, ‘সৃষ্টি’, ‘আদরের নৌকা’, ‘জয়ঢাক’, ‘গুরুচন্ডালী’, ‘জার্নি 90s’ ইত্যাদি সাম্প্রতিকতম যাঁরা, তাঁরা প্রত্যেকেই এই উত্তরাধিকারের অভিমুখ। ডিসকোর্সের নবীনতম বাঁক বদলের দিশারী, নিত্য নতুন ক্যারিশমার বিহিত।

এমন কী যাঁরা হাংরি আন্দোলনে ছিলেন, আবার হাংরি আন্দোলন থেকে বেরিয়ে গেছেন, অর্থাৎ যাঁরা সংক্রমিত হয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই এই উত্তরাধিকারকে পরবর্তী ক্রমে মান্য করেছেন। যেমন উৎপলকুমার বসু বা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রিয় কবি ও গদ্যকার। এই সংক্রমণ থেকে কারও রেহাই নেই। আর এখানেই হাংরি আন্দোলনের সার্থকতা। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে হাংরি আন্দোলনের দ্বিতীয় খন্ড। সেখানে এই বিষয়গুলিকে অনেক বিশদে তুলে ধরা হয়েছে। কেননা আদতে উত্তর ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের প্রধান লক্ষ্মণ থেকেছে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। কেননা স্বাধীনোত্তর পর্বে আত্মবিচ্ছেদের চিহ্নগুলি রাতারাতি মুছে যায়নি। তাছাড়া আধুনিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ডিসকোর্সের বাঁক বদলের মাধ্যমে যে নতুন পরিসর অর্জিত হয়ে চলেছে, তার নামকরণ করতে গিয়ে অধুনান্তিকতা, নতুন কবিতা ইত্যাদি নানা শব্দে সেই বাঁক বদলের প্রসঙ্গকেই নানা ভাবে ব্যক্ত করে চলেছে।

০২ শ্রাবণী দাশগুপ্ত

রেখো মা দাসেরে মনে
শ্রাবণী দাশগুপ্ত





এই রকম একটা কিছু দেওয়ার জন্য আঁকুপাকু বেশ কিছুদিন ধরে, যদিও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রচুর সন্দেহ, দ্বিধা এবং ভয়ও একেবারে যে নেই, তাও কি বলা যায়? মার খাওয়া, তাই বা আটকাচ্ছে কে? ‘নমো যন্ত্র’ যুগে হাতে না হোক্‌ ভাতে- পাতে না হোক্‌, মনে তো মার খাবই... গালি শুনব। তখন ভাবব কেন যে অযথা, বোকার মতো!

ভাষা বাঙলা মরেছে। মরছে। উদারচরিতানাম্‌ তু বসুধৈবকুটুম্বকম্‌ -- এই রোগে। এত উদারতা? দূরকে করিলে নিকট বন্ধু / পরকে করিলে ঘর। আধুনিক হতে হতে, সকলের কথা ভাবতে ভাবতে, বেনোজল ঢুকছে সেই অনেকদিন আগে থেকে, তবু সমৃদ্ধ করেছে, ফসল ফলিয়েছে মাঠ ভরে। বাঙালি সার্থক সাহিত্য দিয়েছে পৃথিবীকে। সংস্কৃতের গা-ভরা ভারি অলঙ্কারে নড়েচড়ে বসার সুযোগ অপ্রতুল, আর চর্যাপদও কি তেমন করে পালন পোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল?

প্রথম আধুনিক মানুষটি গয়না-টয়না খুলে দিয়ে প্রথম চেষ্টা করে দেখেছিলেন ভাষাটা নিশ্বাস নিতে পারছে কিনা, তা তুমুল কষ্টসাধ্য হলেও অন্তত খানিকটা নড়েচড়ে পাশ ফিরে...। তারপর উণিশ শতকের শেষে যিনি বর্ণপরিচয়ের আলো নিয়ে দোরে দোরে ঘুরে আমাদের চোখ খুলছিলেন, তাঁর শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা কিম্বা ভ্রান্তিবিলাস আর মনে পড়ে কই? ভাষাসম্রাট তাকে রাজকীয় ঐশ্বর্‍যে পালন পোষণে, কমলাকান্তের দপ্তরে হাজির হওয়ার মতো সপ্রতিভ করে গেলেন। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক বাঙলা মায়ের এ্যাংলো তালপাতার সিপাইরা ক্যাট-ম্যাট-ফ্যাট-ব্যাট লড়াই করতে করতে নতুন যুগ। বেপথু কবিও শেষ অবধি “মধুহীন কোরো না গো তব মনঃ কোকনদে” ক্ষমাটমা চেয়ে নতুন ছাঁদের গয়নাগাঁটি গড়িয়ে দিলেন। বাঙালাভাষা শ্বাস ফেলে নতুন কায়দায় চুল বাঁধল, ফুরফুরে সুগন্ধ মাখল। ওদিকে বাঙলার আটপৌরে ঘরোয়া হুল্লোড়ে আলালের দুলাল, কিম্বা রসকলি হুতোম প্যাঁচার নতুন নক্সায়...! তারপর? নোবেল-মুকুট পড়ল বাঙলা। অতিবৃষ্টি বহুসৃষ্টির সরস বানে সোনার তরীর পালে হাওয়া। পথের নতুন পাঁচালি কিম্বা পদ্মানদীর মাঝির হোসেন মিঞার স্বপ্ন বা দিগন্তজোড়া নক্সী-কাঁথার মাঠ আমাদের বুকের মধ্যে। বিশ শতকের পুরোটাই বাঙলার সোনার ফসল... প্রাণ ভরে সেই সুস্বাদু সুগন্ধিত জলপান আপনি, আমি, আমরা সবাই। ভাষা আড়মোড়া ভেঙেছে নতুন সাজ করতে চেয়ে -- কিন্তু তখনো ‘আ মরি বাঙলাভাষা’।


ঔপনিবেশিক বেনোজল বিদেশি হলেও তার সারাৎসার ছিল এবং বাঙলা তখন নিজের ফসলের গন্ধ নিতে ব্যস্ত বলে তৎসম, তদ্ভব আর বিদেশি বিষয়ে সচেতন। কত শব্দ, তাদের স্পর্শ ও রূপ নতুন অভিধান ভরল... বাঙলা অভিধান। আমাদের সমৃদ্ধির অহঙ্কার কূল ছাপিয়ে গেল!

বিশ শতকের শেষে বিশ্বায়িত বাঙালি কী যে ভাবল জানি না... বোধকরি বাঙলা ভাবল এবার মরা গাঙে বান... যে তরীটা শুধু বাঙলার ঘাটে ঠেকে আছে, তাকে দেওয়া যাক সবর্জনের কর্‌ যাতে তরতরিয়ে বয়! কিনা, যাতে জাতে ওঠে। এ মোহ আবরণ বড় ঘোর অমানিশা! বিশিষ্টতা বজায় রাখলে ব্রাত্য, বহুজাতিকের মার্কা না পরলে জমানায় কে কদর করে? তাই বাঙলা নিজেকে বদলাতে উঠে পড়ে খড়ভূষি, এঁটোকাঁটা, কাকের পালকটালক যা পাওয়া যায়; বাছাবাছি ধোয়াধুয়ি সংস্কারের দরকার রইল না, গুঁজে দিলেই আধুনিক! বাঃ! কী ঔদার্‍য, কী ঔদার্‍য! স্বচ্ছন্দে ঢুকিয়ে দেওয়া অর্গাজম্‌, ইক্যুইপমেন্ট, ফেসিলিটি কিম্বা এপিসোড (তালিকা বড্ড লম্বা), ধামাকা, মস্তি, একা ছেড়ে দাও, আওয়ারা, (এখানেও বড় বিশদ তালিকা)! ব্যতিক্রমী ভাষায় বাঙলা লেখা আগেও ছিল, কিন্তু বাঙলাই।

যদিও সংবিধানে জাতীয় ভাষা বলে নেই কিছু, কিন্তু ওই দেশি ভাষাটি ক্রমাগত উদারতার ভাঙা বেড়া টপকে ঢুকছে তো ঢুকছেই। অসহ্য ভুলে-ভরা বাঙলায় কথা বললে বাঙালিরা বিগলিত হেঁ হেঁ, সুচিত্রা মিত্রের একলা চলো রে ছাপিয়েছে মেগাস্টারের হেঁড়ে গলায় একলা চলো রে... আমরা হলাম বারোয়ারি থুড়ি সার্বজনীন, আহা হা হা হা! উর্দূভাঙা জাতপাতহীন সেই ভাষার ভাষাভাষী সহজেই বলে, “বাঙ্‌লা একটি অতি শ্রুতিকটু ভাষা।” ওই সেই ভাষাটাই এখন আকণ্ঠ গিলছে বাঙলার বর্তমান পুত্রকন্যারা। বাঙলায় বাক্যালাপ লজ্জার বিষয়, সত্যজিত রায়ের ইংরেজি অনুবাদে “কী চাইছি/কী পাচ্ছি না” বোঝে। বিস্ময়! এখন বাঙালির কাছে সাধুভাষা ‘অতীত ভাষা’। হোক্‌ না তাই... সুন্দরী সুসজ্জিতার আভিজাত্য তাও গেল বুঝি?

পৃথিবীর আর কোন্‌ ভাষা এমন দুর্ভাগিনী? কোনো একদিন কোন্‌ এক ধূসর সন্ধ্যায় চাপা পড়ে যাবে এই ভাষা, তার খবর পেতে চাই না আমি। তবে আলো নিভে আসছে, কবর খোঁড়া দ্রুততর, দেখছি। অনুপায়, নিরুপায় কষ্টভয় তীব্রতর, হাতে রয়েছে বর্ণপরিচয়-এর আলো! হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন, তা সবে অবোধ আমি...!

০৩ আরশাদ উল্লাহ


হাইকু কবিতা ও কিছু কথা
আরশাদ উল্লাহ


ক্ষুদ্রতম কবিতা বলতে হাইকু কবিতাকেই বোঝায়। ক্ষুদ্র হলেও হাইকু কবিতার মাঝে বড় একটি কাহিনী লুক্কায়িত থাকে, আর সে কাহিনীটির মধ্যে থাকে সময়ের উল্লেখ। একটি ঋতুকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দেখিয়ে হাইকু লেখা হয় শুধু একটি মাত্র বিষয় বা ক্ষণকে কেন্দ্র করে। হাইকুটি অর্থবোধক হতে হবে, তাতে থাকতে হবে চমক, নইলে তা প্রকৃত হাইকু হবে না। বাংলাদেশে কিছু সাহিত্যিক হাইকু নিয়ে গবেষণা করেছেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত 'কালি ও কলম' সাহিত্য পত্রিকাতে হাইকু সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ পড়েছি। তাতে বিভিন্ন জনের লেখা বেশ সুন্দর কিছু হাইকু ছিল। হাইকু কবিতা ৫-৭-৫ অর্থাৎ ১৭ টি অক্ষরে তিনটি ক্ষুদ্র লাইনে লেখা হয়। জাপানী ভাষার আদি 'হিরাগানা' অক্ষর মোট ৪৮টি এবং এই হিরাগানা অক্ষর গণনায় হাইকু লেখা হয়। আবার, বাংলাতে ৪৮টি ব্যাঞ্জন বর্ণ জাপানি হিরাগানা বর্ণের সমান বলে হাইকু একই পন্থায় বাংলাতে লেখা যায়।

হাইকু কবিতার প্রবর্তক হলেন জাপানের বিখ্যাত কবি মাৎচুও বাশো। তাঁর হাইকুতে নাটকীয় ভাবাবেশ, মানসিক বিভ্রান্তি, বিষণ্নতা ও হতাশা লক্ষ্য করা যায়। বাশোর সাহিত্যকর্মে যতই মানুষের কৃতিত্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত রয়েছে, তার বিপরীতে মানবজাতির ক্ষুদ্র অবস্থান ও অস্তিত্ব ব্যক্ত করার মাধ্যমে তিনি প্রকৃতির ক্ষমতা ও মহত্বকে আরও ঊর্ধে দেখিয়েছেন। নিচে বাশোর হাইকুটিতে তা বোধগম্য হবে।

“ভ্রমণ ক্লান্ত
অসম্পূর্ণ স্বপন
শুকনো মাঠ…”

বাশো একজন পরিব্রাজক ছিলেন। তিনি জাপানের দক্ষিণ থেকে উত্তরে পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করেছেন। স্থানে স্থানে বাসা করে তাঁর ছাত্রদের নিয়ে থাকতেন ও হাইকু লিখতেন। এক সময় ভ্রমণে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি। তিনি বুঝতে পারেন যে, বেশিদিন আর বাঁচবেন না। তখনকার পরিস্থিতির ভাব হাইকুটিতে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর জীবনের যে স্বপ্ন পূর্ণ হবে না, তা তিনি বুঝতে পারেন। বিশাল শুক্‌নো মাঠের কথায় তিনি ঋতু ও বিশাল শক্তিধর প্রকৃতির কথা ব্যক্ত করেছেন। শীতকালে মাঠ শুষ্ক থাকে।

কবি বাশো ১৭ অক্ষরে লেখা কবিতাকে 'হাইকা' নামকরণ করেছিলেন। পরে তাঁর উত্তরসূরি কবি মাসাওকা শিকি (১৮৬৭ – ১৯০২) ‘হাইকা’ নাম বাদ দিয়ে 'হাইকু' নামকরণ করেন। হাইকু সম্পর্কে অনেকে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। কারণ, বাঙালিরা ইংরেজিতে যতটুকু পারদর্শী, জাপানীতে ততটা নয়, বিধায় ইংরেজি হাইকু অনুকরণ করতে গিয়ে এই অসুবিধায় পড়েন। ইংরেজ সাহিত্যিকগণ 'হাইকু' কবিতাকে মূল্যায়ন করেছেন। হাইকুর রহস্যটুকু অনুধাবন করে তাঁরা ইংরেজিতে লিখতে থাকেন। কিন্তু ইংরেজিতে ৫-৭-৫ অক্ষরে বা বর্ণতে হাইকু লেখা যায় না। তাই তাঁরা সিলেবল্‌-এর মাধ্যমে হাইকু কবিতার চর্চা করেন। জাপানী হাইকুতে সিলেবল্‌ নেই। তাঁরা ধ্বনিকে প্রাধাণ্য দিয়েছেন, তাকে 'অন্‌জি' বলে। উদাহরণ, 'কা কি কু কে ক'-এর মতো হিরাগানা ৪৮টি বর্ণের ধ্বনিকে 'অন্‌জি' বলে। একই ভাবে বাংলা ব্যাঞ্জনবর্ণকে 'অনজি' বলা যেতে পারে। তাই বাংলায় জাপানী হাইকুর সাথে মিলিয়ে বাংলাতে হাইকু লেখা যায়।

নিচে আমার লেখা তিনটি হাইকু উদ্ধৃত করলাম

“উজ্জ্বল-রূপ
লন্ডন-অলিম্পিক
পদকযুদ্ধ...”

“আম্র কানন
স্নিগ্ধমুকুল-গন্ধ
বসন্ত রূপ...”

“রজনীগন্ধা
দিয়ে গেল তরুণী
সুরভি মাখা…”

এছাড়া প্রাসঙ্গিক ভাবে তিনটি হাইকুর অনুবাদ এখানে উদ্ধৃত করলাম।

Rinka Ono-এর তিনটি হাইকু

“ডিনার সেরে
লোকটি যুদ্ধে যাবে
কোষে জোনাকি...”
“বর্ষা বরষণ
মনে হয় গৃহিণী
পিছনে দাঁড়ানো...”
“বরফ পথ
কৃত্রিম পায়ে হেঁটে
গির্জাতে কুঠো...”

সহজ হাইকু, কিন্তু ভাবটুকু গভীর। প্রথম হাইকুটিতে ভুরিভোজন শেষে লোকটিকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে। 'কোষে জোনাকি' কথাটিতে লোকটির ভবিষৎ পরিণতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। কবি যুদ্ধ বিরোধী ছিলেন। দ্বিতীয়টিতে, একনাগাড়ে বৃষ্টির কারণে গৃহস্বামী কাজকর্ম ফেলে বাইরে চোখ রেখে ভাবছেন। ঠিক সেই সময়ে তাঁর মনে হচ্ছে তাঁর স্ত্রীও পিছনে দাঁড়িয়ে একই ভাবনা ভাবছেন। সার্থক দম্পতির ক্ষেত্রেই এমনটি ভাবা যায়! তৃতীয় হাইকুটিতে কুষ্ঠ রোগীর কথা ব্যক্ত করেছেন। রোগীটির পা ক্ষয় হয়ে গেছে, প্রভু তার জীবনের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছেন। নির্দিষ্ট স্থানটিতে জীবনভর সে কারাগারের বন্দিদের মতোই থাকবে। অথচ সে কৃত্রিম পা লাগিয়ে গির্জাতে গিয়ে তার সেই প্রভুর কাছে প্রার্থনা করতে এসেছে, শীতের দিনে বরফপথে হেঁটে!

আশাকরি, হাইকু সম্পর্কে মোটামুটি কিছু ধারণা পাঠকদের দিতে পেরেছি। হাইকুর রীতিনীতি ঠিক রেখে লেখা গেলেও, তাতে কিন্তু চমক থাকতে হবে। কোনো একটি বিশেষ দৃশ্যকে হাইকুতে ফুটিয়ে তোলা হয়। তাতে একটি কাহিনী লুপ্ত থাকে মাত্র সতেরটি বর্ণের মিনি কবিতায়।

০৪ অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী

আজকের বাঙালির মননবিশ্বে বঙ্কিমচন্দ্র
অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী


যে কোনো যুগের সমাজনীতি ও মূল্যবোধ ইত্যাদি যে সে-যুগের সাহিত্য সমালোচনাকে চালিত করে, তা বলাই বাহুল্য। বিগত সাত আট দশকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিবর্তন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অগ্রগমন ও সমাজ-মনস্তত্ত্বে তার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া এ-যুগের বাঙালি মূল্যবোধে তাই অনিবার্যভাবেই বৈপ্লবিক বদল এনেছে। ফলে আজকের গরিষ্ঠ পাঠক বা সমালোচক ‘বিধবার প্রেম’ বা ‘গণিকার প্রেম’ – এই জাতীয় সমস্যা নিয়ে খুব একটা ভাবিত নয়। কথাটা মনে এলো যে উদযাপনকে উপলক্ষ করে, তা হলো বঙ্কিমচন্দ্রের ১৭৫তম জন্মবার্ষিক স্মরণ।

বিগত শতকের শুরুতে বা তার আগের শতকে সাহিত্য-সমালোচনার নীতিটি কেমন ধারা ছিল, তার নমুনা আমরা পেয়েছি ডঃ সুকুমার সেনের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ বইটি থেকে। সেকালের নীতিদুরস্ত সমালোচক যতীন্দ্রমোহন সিংহ বাংলাসাহিত্যের দোষগুণ বিচার প্রসঙ্গে বিধবার প্রেম, কুমারীর প্রেম, সধবার প্রেম, গণিকার প্রেম ইত্যাদি কয়েকটি শ্রেণীনির্দেশ করেছিলেন। তাঁর কিছু সংক্ষিপ্ত মন্তব্য এখানে উদ্ধার করা যেতে পারে ;-

“...১। বিধবার প্রেম। বঙ্কিমচন্দ্র হইতে এই দুর্নীতির সূত্রপাত। পরিণতি রবীন্দ্রনাথে (চোখের বালি), শরৎচন্দ্রে (বড়দিদি, পল্লীসমাজ), হরিদাসে (কর্মের পথে)।

২। সধবার প্রেম (কুমারী অবস্থায় সঞ্জাত)। এই দুর্নীতিরও উৎস বঙ্কিমচন্দ্রে। পরিণতি শরৎচন্দ্রে (দেবদাস, স্বামী)।...”

আজকের বাঙালি পাঠকের মনস্তত্ত্বে ঐ অনিবার্য পরিবর্তনের ফলে তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুও স্থানচ্যুত হয়েছে অন্যান্য ব্যাপারের মতো বঙ্কিম-সাহিত্যের প্রেক্ষিতেও। তাই ‘বিষবৃক্ষ’ বা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর নীতি-দুর্নীতি, আখ্যানবিন্যাসের ঔচিত্য ইত্যাদি প্রশ্ন এ-যুগে ততটা মনোযোগ পায়নি। বিগত সাত আট দশকে ভারত তথা বিশ্বের ইতিহাসের প্রধান দিকচিহ্নগুলো, যেমন উপনিবেশবাদ-বিরোধী মুক্তিসংগ্রাম, নানা আর্থ-সামাজিক কারণঘটিত বিভিন্ন গণবিদ্রোহ, নারীপ্রগতি, দেশবিভাগ ও বিভক্ত জাতীয়তা, বাস্তু হারানোর সমস্যা, আঞ্চলিক রাজনীতি, সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র ও আন্তর্জাতিকতাবাদের আদর্শ ইত্যাদিই এ-যুগে বাঙালির বঙ্কিমচর্চার প্রবণতাকে চালিত করেছে। ফলে এ-যুগে সেই প্রবণতার ভারকেন্দ্র সরে এলো বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সাম্য’ নামক প্রবন্ধে, কমলাকান্তের নকশাগুলোয় এবং অবশ্যই ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবীচৌধুরানী’, ‘সীতারাম’, ‘রাজসিংহ’ প্রভৃতি ইতিহাস-আশ্রিত কাহিনীগুলোয়। নিছক প্রণয়ের নৈতিকতা বা রোমান্টিক সার্থকতা বিচারে আগের যুগের মতো আগ্রহ আর রইলো না। শ্রমজীবী উত্থান ও অর্থনৈতিক বিচারের আলোকে (এবং কিছুটা সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিচারেও) তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও এর মতো রচনাগুলোতে আগ্রহের আলো এসে পড়লো।

অবশ্য ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ নিয়ে আলোচ্য সময়কালে একেবারেই আলোচনা হয়নি, এমন নয়। সার্ধশতবর্ষেও দেখা যাচ্ছে, রোহিণীর পরিণতির ন্যায্যতা নিয়ে আলোচনা করছেন সুমিতা চক্রবর্তী [আনন্দবাজার পত্রিকা], বা জয়দেব বসু আন্দাজ করতে চাইছেন, শরৎচন্দ্র ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ লিখতে বসলে কী করতেন [‘কলকাতা পুরশ্রী’]। তবে স্বীকার করতেই হবে, এ-সব প্রশ্ন আজ আর বাঙালির মনের আকাশ ছেয়ে বিরাজ করছে না। এ-যুগে ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘ইন্দিরা’ বা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ নিয়ে কয়েকটি রচনা আমাদের চোখে পড়লেও সংখ্যার দিক দিয়ে তাঁর যে উপন্যাসটি এ-কালের আলোচনার সিংহভাগ অধিকার করে রেখেছে, তা অবশ্যই ‘আনন্দমঠ’। এই বইটি প্রসঙ্গে যে-সব প্রশ্ন এইকালে বারবার চর্চিত হতে দেখা যায়, সে-গুলো হলো -- ‘আনন্দমঠ’এ বিবৃত ঘটনার ঐতিহাসিক ভিত্তি বা মূল প্রেরণা কী ছিল, ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতের রচনাকাল, এই গান এবং / অথবা এই গ্রন্থ সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা বা পৌত্তলিকতা প্রচার করে কিনা, বইটি ইংরেজবিরোধী বা মুসলিমবিরোধী কিনা এবং বঙ্কিম তাঁর মনিব অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের চাপে এই গ্রন্থে রদবদল করেছিলেন কিনা বা কতটা করেছিলেন এবং সেই সূত্রে গ্রন্থের আদিপাঠ কেমন ছিল ইত্যাদি। বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলিম সমাজ বিষয়ে এ-বঙ্গে উল্লেখযোগ্য লেখক ছিলেন রেজাউল করিম ও সাম্প্রতিক কালে ও-বঙ্গের সারোয়ার জাহান।

বঙ্কিমসাহিত্যের আর যে-সব দিক নিয়ে এই সময়ের বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা আলোচনা করেছেন, তাতেও বৈচিত্র্য প্রচুর। তাঁর সাহিত্যে নারী ও গার্হস্থ্যজীবন, প্রকৃতিবর্ণনা, বিজ্ঞানচেতনা, হাস্যরস, মাতৃভাবনা ইত্যাদি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বহুবিধ নিবন্ধ চোখে পড়ে। আবার তাঁর ধর্মচিন্তা সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলিতে যুগপৎ তাঁর উপন্যাস ও প্রবন্ধসাহিত্যের সূত্র অবলম্বন করে হিন্দুত্ব, তাঁর কৃষ্ণচিন্তা ও হিন্দু পুনরুত্থানবাদের প্রভাব নিয়ে এ-সময়ে একাধিক আলোচনা হয়েছে।

আবার সাহিত্যের মতো বঙ্কিমজীবনও যখন এ-যুগের মনোযোগের বিষয় হয়েছে, তখনও দেখা যায়, সাম্রাজ্যবাদী শাসকের অধীনে কর্মরত বঙ্কিমের চাকরিজীবনের তথ্যাবলিতেই যেন সন্ধানী আলো পড়েছে বেশি। সাদা চামড়ার ওপরওয়ালাদের হাতে বঙ্কিমচন্দ্রের সমাদর পাওয়া না-পাওয়া [না-পাওয়ার কারণ হিসেবে ‘আনন্দমঠ’এর কথাও এসেছে], বিচারক হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিধানে বঙ্কিমের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও নানা ভূমিকার কথাও আলোচিত হতে দেখা গেছে, যা আমাদের আলোচ্য সময়পর্বের প্রথম থেকেই সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক পরবশ্যতার কারণে। বঙ্কিমজীবনের অন্যান্য বহুল আলোচিত বিষয়গুলি হলো বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবার, বিশেষ করে তাঁর পিতা, তাঁর কলেজজীবন, রাজনীতিচর্চা, সম্পাদকজীবন, শেষজীবন ইত্যাদি -- সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে তাঁর চাকরিজীবন নিয়ে আলোচনায়। অন্য ধরনের একটি সাম্প্রতিক আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ চরিত্রটির মডেল হিসেবে বঙ্কিমের সম্ভাব্যতা বিচার করা হয়েছে তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনার উল্লেখ সহ [অভ্র বসু, ‘বিশ্বভারতী পত্রিকা’] বঙ্কিমজীবন নিয়ে এই পর্বে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি লিখেছেন গোপালচন্দ্র রায়।

বঙ্কিমের ছাত্রজীবন সম্পর্কে একটি বিতর্কিত জনশ্রুতি হচ্ছে যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.এ. পরীক্ষায় তিনি নাকি প্রথমে বাংলায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি এবং বিদ্যাসাগর নাকি ছিলেন বাংলার পরীক্ষক। পরে গ্রেসমার্কের কল্যাণেই তিনি এ-দেশের অন্যতম প্রথম স্নাতক হবার গৌরব অর্জনে সক্ষম হন। এ-কারণেই তিনি নাকি পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগরের সমালোচনা করে গেছেন, এমন মন্তব্যও কোনো উৎসাহী লেখক করেছেন। এ-নিয়ে দীনেশচন্দ্র সিংহ একটি আলোচনায় [‘দেশ’, ১৯৮৮] বলতে চেয়েছেন যে, বঙ্কিম ঠিক কোন্‌ বিষয়ের পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন, তার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঐ পরীক্ষার বাংলা প্রশ্নপত্র উদ্ধার করে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, এত সহজ প্রশ্নপত্রে অকৃতকার্য হওয়া অসামান্য মেধাবী ছাত্র বঙ্কিমের পক্ষে স্বাভাবিক নয়, তিনি সম্ভবত অন্য কোনো বিষয়ে ফেল করেছিলেন।

জীবন ও সাহিত্য মিলিয়ে যে বঙ্কিমচন্দ্র, তাঁর সেই সামগ্রিক ভাবমূর্তি নিয়েও নানা আলোচনা এই বাংলার সারস্বতসমাজে দেখা গেছে, সে-তুলনায় পূর্ববাংলার বিদ্বৎমন্ডলীর বঙ্কিমচর্চার পরিধি যেন কিছুটা সঙ্কুচিত বলে মনে হয়। ও-বাংলার লেখালেখির যতটা হদিশ আমরা পেয়েছি, তার ভিত্তিতে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বাঙালি প্রজন্মের কাছে বঙ্কিম যতটা জীবিত বা অনুপেক্ষণীয় ভাবে চর্চিত, বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে ততটা নন। স্বাধীন বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, এমন কী মাইকেলের তুলনায়ও বঙ্কিমকে নিয়ে আগ্রহ ও চর্চা নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর, এ-কথা স্বীকার করেছেন সে-দেশের অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ। তাঁর মতে, এই অনাগ্রহের কারণ বঙ্কিমকে হিন্দুগৌরব ও মুসলিম-কলঙ্ক প্রচারক বলে অভিযুক্ত করা, যার “দায়ভাগ কলকাতারই”। অপর পক্ষে ভারতের বাঙালি বঙ্কিমকে দেখেছেন আরও বিশাল প্রেক্ষাপটে, তাঁর সম্পর্কে অনায়াসে যুক্ত করেছেন ‘যুগপ্রবর্তক’, ‘যুগস্রষ্টা’ ইত্যাদি বিশেষণ, নিজেদের রচনার শিরোলেখে বা গ্রন্থনামে ব্যবহার করেছেন ‘বঙ্কিম-ঐতিহ্য’, ‘বঙ্কিম-মনীষা’, ‘বঙ্কিম সরণি’, ‘বঙ্কিম বিদ্যা’, ‘বঙ্কিম ভাবনালোক’, ‘বঙ্কিম যুগ’ ইত্যাদি শব্দাবলি। তাঁরা বঙ্কিমকে দেখেছেন বঙ্গসংস্কৃতির নেতৃপুরুষ হিসেবে।

<<< চারানা-আটানা >>>


০১ অমিতাভ প্রামাণিক

চারানা – আটানা
অমিতাভ প্রামাণিক


২. আহ্বান, শোনো আহ্বান...

চারানা-আটানা-র প্রথম কিস্তির লেখা পড়ে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বলছেন, আমি যা লিখেছি সব নাকি অযৌক্তিক, বিশেষ করে গরু-ছাগল নিয়ে প্রলাপটা। আমি প্রথমে ভাবলাম, ‘অজ’ বিষয়ে ‘উক্তি’ করেছি, তাই হয়তো ওরা একে ‘অজৌক্তিক’ বলছেন। কিন্তু না, তা নয়। যাঁরা ‘গার্হস্থ্য’ পালন করছেন, তাঁরা ‘গরু’-র গৌরব ‘অস্ত’ যাওয়া নিয়ে মন্তব্য একেবারেই পছন্দ করছেন না। ‘গ্রামের মাটি’ থেকে ‘ক্যাল’কাটার ধুলো, সব নিয়ে যারা দুর্ধর্ষ পঞ্চায়েতী রাজনীতি করছেন, তাঁরা আমার ব্যাকরণচর্চায় ‘গ্রামাটিক্যাল’ মিস্টেক দেখতে পাচ্ছেন। যদিও তাঁরাও ছাগলের মতোই ‘ব্যা-অ্যা-অ্যা’ করছেন ‘লট’-এ, যাতে ‘ব্যালট’বক্সে তাঁদের প্রতীকে ছাপ মারা কাগজটাই ঢোকে।

এইসব ছিদ্রান্বেষীদের জন্যে বাণী দেওয়ার মতো আমার স্টকে কিছু নেই। আমি তো আর রামকৃষ্ণ পরমহংস বা বিবেকানন্দ নই! খিদে পেলে রাম বা কৃষ্ণ কী করতেন, তা নিয়ে আমি ভাবি না; পরম আনন্দে হংস চিবিয়ে খেয়ে ফেলি, তাতে আমার বিবেকে খুব আনন্দ হয়। ব্যাস্‌, এইটুকুই যা মিল।

আমার লেখায় ছিদ্র খুঁজছেন, অথচ ছাগছিদ্রপথে যে বস্তু নিস্ক্রান্ত হয়, নাদি নামক সেই ইঞ্জিনীয়ারিং বিস্ময়টি নিয়ে বহুকাল ধরে যে চর্চা হয়ে আসছে, তা তাঁরা মানতে পারছেন না। ‘আসুন, বসুন, কী খাবেন, বোঁদে? / বাটি নিয়ে চলে যান ছাগলের ইয়েতে’, মানে বোঁদের সঙ্গে যার সুসংবদ্ধ অন্ত্যমিল হয় তাতে। এই রসোত্তীর্ণ ছড়াটি শোনেন নি, এমন বাঙালি কি একটিও আছেন? কিন্তু দিনকাল যা পড়েছে, এখন এসব বললে লোকে অসংস্কৃত বলে। ভাবে অসভ্য, ইতর, নিরক্ষর, গ্রাম্য। বাংলা সাহিত্য থেকে পেচ্ছাপ-পায়খানা উঠেই যাচ্ছে, তার বদলে এসে যাচ্ছে টয়লেট-পটি জাতীয় শব্দগুলো। যেন ইংরেজি করে বললে প্রস্রাব মনে হবে আমপোড়ার সরবৎ, পূরীষ থেকে হাস্নুহানার সুগন্ধ বেরোবে!

ইংরেজরা বলে, ‘নেচার্স কল’। তা থেকে বাংলা করা হলো, প্রকৃতির ডাক। এই সংখ্যার চারানা-আটানার বিষয় এটাই – আদি, অকৃত্রিম, প্রাকৃতিক আহ্বান। বাজে গন্ধ বেরোতে পারে, নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পড়ুন।

মনে করুন, একটা ফুটফুটে বাচ্চা দেখে আপনার খুব কোলে নিতে ইচ্ছে হলো। কী নরম নরম তার গাল, কী বড় বড় গোল গোল তার চোখদুটো, কী মিষ্টি তার হাসিটা। আপনি তাকে কোলে নিয়ে এসব দেখছেন, তার নাকের ডগায় নাক ঘষে চর্যাপদ বা তারও পুরনো ভাষায় আদর করছেন, সেই ফাঁকে সে কখন নিঃশব্দে নামিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ খেয়াল হলো, তাই তো, জামাটা ভিজে ভিজে, কেমন যেন সন্দেহজনক গন্ধ বেরোচ্ছে! হাসিমুখেই বাচ্চাটাকে স্থানান্তরিত করার চান্স খুঁজছেন, আর মনে মনে ঝাল ঝাড়ছেন, ভারি অসভ্য বাচ্চা তো!

শহুরে বাচ্চাদের এর হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে আছে ‘হাগিস’। মানে, ঠিক আছে বাবা, হাগা পেলে তুই এর মধ্যেই হাগিস। যে মহিলারা নিজের বাচ্চাদের এই বস্তু পরিয়ে রাখেন, তাঁরা নিশ্চয় খেয়াল করেছেন, অদম্য প্রতিভায় বাচ্চাটি এটি এমনভাবে ব্যবহার করে যে, ওটা খোলার সময় দেখা যায় নিষ্ক্রান্ত বস্তুসমূহে বাচ্চাটির পশ্চাদ্দেশ একেবারে মাখামাখি হয়ে আছে। তবে শহুরে বাচ্চারা নিজেদের পটি নিয়ে হাত দিয়ে চটকে সারা গায়ে মাখামাখি করার বিশেষ সুযোগ পায় না। ঘা এবং পটি ওদের থেকে ঘাপটি মেরে দূরে থাকে বলে ওরা অন্যপ্রাণীর পটি-ও সহ্য করতে পারে না। গরুর পটি গোবর এবং গোমূত্র যে পঞ্চগব্যের অন্তর্গত, ব্রাহ্মণসন্তানদের উপনয়নের সময় যে ওই বস্তুসমূহের কন্‌কক্‌শন মুখে ছোঁয়াতে হয়, বলে দেখুন এইসব বাচ্চাদের, ভির্মি খাবে।

যেমন আমাদের গাবলু। টিপিক্যাল শরৎচন্দ্রের নতুনদার ন্যানো সংস্করণ। কলকাতার অভিজাত পল্লী থেকে বেড়াতে এসেছে তার পিসির বাড়ি, ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে। এখন তো অনেকটা অবধি বাস চলে আসে, লাইটের পোলও পোঁতা হয়ে আছে বছর দশেক। হুক মেরে কেউ কেউ ইলেক্ট্রিসিটিকে পৈতৃক সম্পত্তি গণ্য করে টিভিও দেখে বাড়িতে। সেখানে রাস্তার পাশে প্রাচীন মহীরুহের কাণ্ড বেষ্টন করে শুঁয়োপোকার মতো সেঁটে আছে –- সারি সারি ঘুঁটে! গাবলু এসব আগে দেখেনি, এখানে দেখে তার গা ঘিনঘিন করতে লাগল।

গাবলু ছেলে খারাপ নয় মোটেই। বেশ চালাক-চতুর, শহরের বাচ্চারা যেমন হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে আর রাত্রে শুতে যাবার আগে সে ব্রাশ করে, খাওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়। তার জামার কলারের ভেতরে দামী ব্র্যাণ্ডের লেবেল। রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ আর ‘অঞ্জনা নদীতীরে চন্দনী গাঁয়ে’ তার মুখস্থ, সে স্টেজে উঠে তার বালকসুলভ গলায় বেশ আবৃত্তি করে দিতে পারে।


কিন্তু পায়খানার ব্যাপারটা অন্যরকম। গাবলুর তিনটে সিচুয়েশনের উদাহরণ দেওয়া যাক। যারা ভাবছেন, কী ছাইপাঁশ গদ্য লিখছে, এর চে’ লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়াও ভালো, তাদের সুবিধার্থে এই উদাহরণগুলো পদ্য বানিয়ে দিলাম, পাঁচ লাইনের লিমেরিকে।

গাবলু-১

শহুরে বালক গাবলুচন্দ্র, কী চঞ্চল, কী নটি।
গ্রামে এসে এক বাচ্চা মেয়েকে বলে, “তুই খুব হটি!”
খাবে না কিছু সে, সবে হতবাক।
চেপে ধরি; বলে সিঁটকিয়ে নাক,
“ওদের বাড়িতে হাত দিয়ে মাখে কাউ-বাফেলোর পটি!”

‘ওদের’ বাড়িতে, বুঝলেন তো? যাদের বাড়ি বড়-বৌ আর মেজ-বৌ মিলেমিশে থাকত। ঘরের পাঁচিল থেকে মেহগনির প্রকাণ্ড কাণ্ড, সব ভরিয়ে রাখত ঘুঁটেতে, দেখলে মনে হতো দেওয়ালের গায়ে দাদ-রা যেন দাদরা বাজাচ্ছে! ওরা তো পাশের বাড়ি, গাবলুকে ডেকে দুধকলা চটকে গুড়-মুড়ি দিয়েছিল হয়তো। গাবলু তো পালাতে পারলে বাঁচে! যে হাত দিয়ে গরুর পটি চটকে মাখে, সেই হাত দিয়ে –- ম্যাগো!

নেক্স্‌ট!

গাবলু-২

দাঁড়িয়ে গলির মোড়ে গাবলুটা কাঁদছিলো, ভ্যাঁ!
“কী হয়েছে, কাঁদছিস! কে বকেছে? কে মেরেছে, হ্যাঁ?
পেটে ব্যথা? বিকু খাবি?
বাজারে বেড়াতে যাবি?”
“দ্যাখো না গো, চটিটাতে লেগে গেছে কুকুরের অ্যা!”

গ্রামের ছেলে হলে পাত্তাই দিত না, চটি ঘাসে ঘষটে বা কোনো পুকুরের জলে ধুয়ে নিলেই সাফ। গাবলু তো মহা মুশকিলে পড়ে গেছে, এত সুন্দর ওর বাহারি চটিতে কুকুরের পটি! এখন কী হবে? চেনা চেনা মনে হচ্ছে, এই দৃশ্য?

যাই হোক, পিসির বাড়ি বেড়ানো শেষ করে গাবলু নিজের বাড়ি ফিরে এল, কলকাতায়। এর কিছুদিন পরের ঘটনা এটা।

গাবলু-৩

গাবলু ফিরছে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে, স্কুল থেকে বাড়ি এমন কী দূর!
বলি, “কী রে, পা’টা টেনে হাঁটছিস, কামড়েছে নাকি নেংটি ইঁদুর?
না কি প্যান্টখানা গেছে তোর ফেঁসে?
ফোঁড়া উঠেছে কি দেওয়ালটা ঘেঁষে?
এ কী রে, পেছন ভিজে ভিজে দেখি, সমীরণ বড় গন্ধবিধুর!”

ওয়েল, এই ব্যাপারটাতে গ্রাম-শহরের ভেদ নেই। যার এই কাণ্ড হয়েছে, সেই জানে! ওঃ, কী অসম্ভব লম্বা মনে হয় পথ তখন!

একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে এইসব আজেবাজে রসিকতা করে পাতা ভরিয়ে দিলে সম্পাদক কাজলদা আমার চাকরি খেয়ে নেবেন। বলবেন, অনেক হয়েচে, রাস্তা দ্যাকো এবার। সুতরাং, একটু উচ্চাঙ্গে ওঠা যাক। স্থান – শহরতলীর রাস্তা। নায়ক – রাম-শ্যাম-যদু-মধু-আমি-আপনি, অর্থাৎ যে কোনো পুরুষ মানুষ। মহিলারা এখনো এই ব্যাপারটাতে পুরুষের সমকক্ষ হতে পারেন নি। আশা রাখি, যেন কোনোদিন না পারেন। অন্তত এই একটা ব্যাপারে তো পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাক!

দেওয়াল

ছড়ানো রাস্তা, দাঁড়ানো দেওয়াল, জায়গাটা বেশ রম্য।
এই পরিবেশে কী দারুণ হয় প্র্যাকটিশ করা ধম্মো।
তা নয়, লোকটা লাজ-ভয় ভুলে,
হেথা হোথা চেয়ে, জিপখানা খুলে,
কুকুরে যা করে তুলসীগাছেতে, করে দিল সেই কম্মো!

বলবেন না যে, এই দৃশ্য দেখেন নি! সবাই দেখেছেন, সব্বাই। আমি আজীবন ভেবে গেছি, এর হাত থেকে পরিত্রাণের পথ কী? এ তো এক ধরনের টেররিজ্‌ম্‌-ই, সামাজিক-মানসিক-আধ্যাত্মিক উগ্রপন্থা, তাই না? বিষে বিষে বিষক্ষয়ের সনাতন রীতি মনে পড়ে গেছিল, তাই কিছুদিন আগে আমি রাষ্ট্রপতি প্রণববাবুকে খোলা মনে এই রকম একটা খোলা চিঠি লিখেছিলাম –

চাকরি

ডেথ সেন্টেন্স দিয়ে কী হবে গো? কাসবটাকে না মারিয়া
রাস্তা-টাস্তা ক্লীন করানোর কাজে দাও না গো ছাড়িয়া!
হাতে টিপ আছে, আসবে তা কাজে
রাস্তা-গলিতে সকালে বা সাঁঝে
জিপ খুলে যারা ‘হিসু’ করে, ব্যাটা তাদেরকে দেবে ‘নাড়িয়া’!

আজমল কাসব আর নেই। বিপথগামী কাসব কা শব মাটির নিচে চলে গেছে। কিন্তু যারা আমার এই প্রচারের সঙ্গে একমত, আসুন তাঁরা একজোট হয়ে দেওয়ালগুলো হিসির হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি! আরও তো ভোট আসবে!

আগের পদ্যটাতে কুকুরের উপমা টেনে আনলাম বলে সারমেয়প্রেমীরা নির্ঘাৎ গালমন্দ শুরু করবেন। সত্যি, কুকুরের মতো নির্ভেজাল জীব আর হয় না। কী মহামহিম প্রভুভক্তি! কী অসম্ভব বুদ্ধিমত্তা! ডারউইন যে কেন বাঁদরকে মানুষ বানালেন, কুকুরকে না করে!

ট্রেনিং দিলে কুকুর যে অনেক ব্যাপারে মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। ডগ-শো আজ সারা পৃথিবীতেই এক দুর্ধর্ষ এন্টারটেনমেন্ট। সেই ট্রেনিং-এর এক টুকরো ছবি দিয়েই শেষ করবো আজকের চারানা-আটানা-র পাতা।

ট্রেনিং

ইস্কুলে দিদিমণি, ও পাড়ার বেবি মিস
কুকুরকে করাচ্ছে টয়লেট প্র্যাকটিশ।
“দ্যাখ্‌, এইখানে বসে
এটা করে, ওটা ঘষে
বেরোবি। এ কী রে, ছিঃ! ফের মেঝেতেই, ইস্‌!”

<<< কবিতার কালিমাটি / ২৯ >>>


০১ সমীর রায়চৌধুরী

শ্যাওলার প্রজনন
সমীর রায়চৌধুরী



পোকাখেকো গাছেদের ডাইনীস্বভাবে শিরদাঁড়ায়
জন্ম জন্মান্তর পেরিয়ে উঠে আসছে পোকাজীবন
সবুজ ফিরে আসছে ক্লোরোফিলে পাতাবাহারের পাতাহরফে
ক্লোরোফিল দিবসে সবুজের হাঁ মুখের রহস্য খুলছে
মেয়েমানুষেরা মাসিক রক্তপাতের আঁশটে লুকিয়ে রাখছে
এই তো সেদিন জেটি থেকে ট্রলারে উঠতে গিয়ে অথৈ সমুদ্রে
সেকেন্ডের কাঁটায় ডুবছে সময় অবলম্বন খুঁজছে আত্মজীবন
গুপ্তচিহ্ন জমা পড়ছে বেড়ালের ঠ্যাং তোলা প্রস্রবণে
শ্যাওলা প্রজননের উষ্ণতায় কাঁকড়া বিছের বনে বুদবুদিয়া নদীতে
হাজার হাজার বিছে সন্তানের জন্য গর্ভদেশে সেঁক দিচ্ছে
সাবধানে পা রেখে হাঁটছি ঝরাপাতার আস্তরণে
ভিমরতি আর ভিমবাঁধের পুনশ্চ পেরিয়ে মল্লভূমির মল্লারপুর
অন্ধকার নামছে গাছেদের ছায়া নামছে পঞ্চমুখি জবার দেশে


০২ মলয় রায়চৌধুরী

৩৬০
মলয় রায়চৌধুরী


দেবারতিদি বিয়ে করলেন মণীন্দ্রদাকে
উত্তররৈবিক বাংলা কবিতায়
সেই প্রথম ভাইবোনের বিয়ে

টেকো বিদ্বানরা বললেন, এসব হবে
জানতুম জানতুম জানতুম;
খোঁপা বিদুষীরা বললেন
এ মা, এবার কী হবে!

হা-হা, কেউই জানত না, একটা সরলরেখা
এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে নয়
৩৬০ রকমের বিন্দুতে যায়।

কাটা আঙুলের মালা গলায় আমি
আঙুলপ্রমাণ বলে যে-সুবিধায় রাক্ষসরা ভোগে
কনের আর বরের কবিতার হলুদ মেখে
চোখ মেরে ঘুচিয়ে দিলুম দিন-রাতের ফারাক।

ওহ হো, বলা হয়নি, সে-আপ্যায়ন দ্যাখে কে!
 

০৩ বারীন ঘোষাল

রংছোরা
বারীন ঘোষাল


সকালের গাড়ি ধোয়া জল গড়াচ্ছিল
দেখে রাস্তা একটু থামল
জলরাও একটু দাঁড়াল
                             কী হয়

চড়ুই পাখি শিশুটিকে স্নান শেখাচ্ছে
বিকেলের নিয়নকলায় এই দৃশ্যটি মনে পড়তে
হাল যে হালত হবে বুঝতে পারিনি
এমন যা মিনির আঁধার
আর মিনিয়েচারে ব্রেইল শরীর
আর আঙুলের টরেটক্কা

আর আপনা গন্ধে শিশু তৈরি
করার কারখানা থেকে স্ট্রাইক তুলে নিচ্ছে রংছোরা




০৪ রত্নদীপা

কবি ও কবিতা -- সম্পর্কের হীরেমুক্তো
রত্নদীপা


কবি প্রথমবার যখন পুরী গেলেন তখন সমুদ্র লিটারেলি অন্তঃসারশূন্য মাকাল ফল অথচ সেখানে গিয়েই তিনি প্রথম কবিতার সঙ্গে একা হলেন আর কবিতা থেকে উঠে আসার পর যে কোনো ডুবুরিকে তাঁর মনে হলো সন্দেহজনক...

... লোকে বলে কবির চেহারার সাথে বৃক্ষের অনেক মিল। সবুজ পরচুলো, প্রাপ্তবয়স্ক পাহাড়, কোথাও ঝোপঝাড় জঙ্গল, পেন্সিলে আঁকা নতুন চামড়া যেন গজানোর আগেই এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে ডিঙিয়ে যাওয়া চকচকে, গোপন ধনেশ ঘুরে ফিরে জ্বরের দোহারা...

অবসর দীর্ঘ হয়ে উঠলে কবিতা শুয়ে বসে সাঁটে কমলারঙ। বেরুবার যো নেই, শিকার করা কিছু নিব লাগানো কলম আর পাখি লাগানো আকাশের স্কোয়ারফিট... কমলালেবুর তাপমাত্রা হেরফের হতেই কবি টের পেলেন... এইবার তিনি পাচার হয়ে যাচ্ছেন ঢাল তরোয়াল সমেত পারদস্তম্ভের আড়ালে।
 
----------------------------------------------------------------------------------------------------------

লোকে বলে যে কোনো দুর্গই কবির জন্যে দুর্গম, অঙ্ক না জানা শালিখ যেমন সিঁড়িভাঙাটি ঠোঁটে নিয়ে কেবল নাড়াচাড়া করে, কবির রুমাল ভেদ করে স্বপ্নপিঁপড়ে... আজন্ম চেনা কবিতাগুলো হাতড়ে হাতড়ে গুহার দরজায় কবি ঝুলিয়ে রাখেন নোটিশের গুণিতক... তবু খুলির ভেতরে ইনিয়ে বিনিয়ে ব্যালকনি, অল্প দূরত্বে কোমর সরু হওয়া সমুদ্রে পাল্টে যায় গ্রাফাইট চোঁয়ানো খরগোশ...

খরগোশ সামুদ্রিক প্রাণী নয় অথচ পুরীতে গিয়েই কবি প্রথম জানতে পারলেন জবুথবু সাদা পাথরের নাড়ী কেটেই সমুদ্রের জন্ম আর ঢেউয়ের মিলিমিটার মানে মাটির সাথে লাগানো খরগোসের হাইওয়ে ...

সমুদ্র থেকে ফিরে কবি বিবৃতি দিলেন এইভাবেই আর কেঁপে উঠলো নিশিবাসে শুয়ে থাকা কবিতার বাংলাফন্ট...


০৫ স্বপন রায়

ডাক
স্বপন রায়



শুধু শুধু ডাকতে যাবো কেন ক্রিক ডেকারস রাসেল কেন

হয় না একটা তারিখ ফেরার চেয়েও একা আর স্বাস্থ্যে ভরপুর?
সেই বয়েস, খুব কষ্ট কিন্তু কে যেন আছে...

ডাকি না ডাকি আছে যেমন স্টার্ট নেয়ার শব্দ বা হিন্দোল হিন্দোল বলে ডাকতে গিয়ে যেদিন দেখলাম পাতা পড়ে যাচ্ছে তুমি পড়ে যাচ্ছো হে পরীক্ষা ও নিরীক্ষা যাচ্ছো যখন আর

ডাকবে না, শুধু

শুধু শুধু আমাকে আমি কতদিন যে করিনি রঙ জমে জমে আছে

০৬ অথির শেরপা

সিংহরাশি ও কালোপরী
অথির শেরপা



ব্যাকরণের অনেক দূরত্ব পেরিয়ে তুমি এসো আকাশী কামিজ
                                                           তুমি এসো লাল উড়না…
বৃষ্টি এখানে ছিঁচকাঁদুনে, বাতাস অনির্দিষ্ট, ভুবনচিলগুলো
রানওয়ের বিমানের মতো কেবল ওঠে আর নামে, এই তো এখানের
                                                           প্রাকৃতিক খবর
কালোপরী, ভ্রান্তঠিকানায় তোমাকে আমি কখনো পৌঁছাতে দেবো না
তোমার চোখেও কি কামিজের নীল আর উড়নার লাল আগুন?
           এখানে স্লোগানে স্লোগানে প্রায়ই সরগরম থাকে প্রজন্মচত্বর
                     প্রেসক্লাব, কিন্তু সে আগুন আবার মৃতের মতো বরফ হয়ে যেতে
লাগে না সময়। প্রেমের চেয়ে এখন বেশি দরকার সিংহরাশির আগুন
আগুনের ভেতর দেখা যাক অজস্র মুখ!
সঠিক আগুনের রং চিনে বিপ্লবী হতে সাধ জাগে আজ
প্রতিদিন ডবল-ডেকারে করে যে চলে যায় পলাতক আসামীর মতো
তার পকেট থেকে জ্যান্ত সাপ বের করে এনে
তুমি তাকে এই শহরেই ছেড়ে দিও--

যে নম্বরে তোমার সঙ্গে কথা বলি রোজ, সে নম্বর আমার মৃতবন্ধুর সীমকার্ডে
আজও রয়ে গেছে -- আমিও হয়তো কিছুটা মৃত;
কালোপরী, এসো জাগাও, বোমার সৌরভে, প্রাণে-ঠোঁটে
বিদ্যুতের ভাষায় কথা বলে যাও
হৃৎপিন্ডটা ধিকিধিকি জ্বলে করে যায় বেঁচে থাকার তরজমা
হৃৎপিন্ডের পাশে বিশাল একটি সূর্য এঁকে দাও, যেন মুক্তি পাই
চোখের ঘনঘন পলক পড়া বলে যায় এখনো হইনি অন্ধ
চোখের পাশে এঁকে দিও সবুজ সমুদ্র, যেন মুক্তি পাই
বোবা জন্তুর গোঙানির ভেতর তুমি শব্দবীজ রেখে হেঁটে যেও সোজা কালোপরী
সোজা পথেই এবার আছাড় খেয়ে হাঁটতে শিখবে পুরো দেশ আমার


০৭ অনুপম মুখোপাধ্যায়

জাফরানি পোলাও
অনুপম মুখোপাধ্যায়


হাতে হাত রেখে নাচ

ছে

সকলের উল্লাস একজনের উল্লাসে
মাধ্যাকর্ষণ উলটে দিতে চাইছে

ব্রাউজার

সে এক ফেটে পRছে প্রজাপতি

ঋণাত্মক
ধ্বণাত্মক
আলাদা / আলাদা / আলাদা /

জ্যামিতির সূত্র ধরে একেকটা চামড়া চাইছো
কি

ধরা যাক চাইতে চাইছো না
পাঁজরার ছায়া ছিঁড়ে এক অংশ কেশরধোয়া আলো

আরেক থাবা রিপোর্টে

সু
পক্ক
জাফরান ছাড়াই

নিম্ফোম্যানিয়াকটি খেয়ে যাচ্ছেন
আরে, খেয়েই যাচ্ছেন


০৮ উল্কা

রঙ বারান্দা
উল্কা


(১)
রঙিন সম্ভাবনার আলতো বেলা
একপাশে আঙুল জঙ্গল
খড়মড়ে নীলচে জল রঙে পাতাবাহার
যুক্তাক্ষর পেরোই... এক দুই তিন
প্রচ্ছদে মারামারি করুক ন হন্যতের সংজ্ঞা!


(২)
মেঠো কাগজে এবেলার ঘেমো কল্পনাবাড়ি
অবাস্তব ছাপ কাটে ক্রুসেড মাফলার
ধর্ম
ধর্মতলা
ধর্মতলার ট্রামডিপো
বর্ষাট্রাম
হেডলাইট লেগে রইল প্যালেটের হলুদে...


(৩)
আবার জলরঙ
বাথরুমে পেতে রাখি চোখ দুই ঘুমের চাহিদা
জল পড়ে নড়ে ওঠে মগের মুলুক
কোন বারান্দা আমার?
লুকোচুরি তুলি কি তুলি না...
সংযমে জাহাজ ভাসাই।


(৪)
ছবি আঁকতে গিয়ে কিছু রঙ চাপা দিলাম
জলের নিচে, কিছু অক্ষমতার আড়ালে
কেবল তুলির মুখে কিছু রঙ
আকাশ দেখেছিল...




০৯ কাজল সেন

পাঞ্চালী একা
কাজল সেন


ব্যাপারটা অন্য রকমই হতো
যদি তৃতীয় ঊরু ভঙ্গ হতো স্বয়ং যুধিষ্ঠিরের
আর পটীয়সী পাঞ্চালীর রম্য অন্ন ব্যাঞ্জনে
তুষ্ট হতেন দুর্যোধন

আসলে যাবতীয় দৈনিক কবিতাপত্র ও রক্ষিত আইন
এবং দূরত্ব যথাযথ হলে
প্রাচীন হস্তিনাপুরের কোনো সাধারণ মাপের
আয়তক্ষেত্র থেকেও
হয়তো আজও খুঁজে পাওয়া যাবে
অর্জুনের নৈর্ব্যক্তিক নিষ্প্রাণ গান্ডীব
আর পদাতিক অশ্বারোহী গজারোহী
রথী মহারথীদের স্ত্রী ও সন্তানের মঙ্গল কামনায়
নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে
যাবতীয় অশ্বমেধ ও রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন

কতটা বৃষ্টিপাত আর শীতলপাটি ছেড়ে
তুমি আছ নৈঋতের বিরানা মল্লভূমিতে আজও
বিস্ফারিত জরায়ুতে এ কোন্‌ অচেনা তবে অভিমণ্যুপ্রাণ
যতটা গেছো চলে সেখানেই তুমি এক নতুন নির্মাণ

মহাপ্রস্থানের পথে একে একে ডুবে গেছে
মহামান্য ভাইদের সব বাক্যালাপ
শুধু তুমি পাঞ্চালী একা
পান্ডবের বারবধূ
দীর্ঘ উন্মুক্ত কেশরাশি তোমার
নিঃশেষিত হলে না আজও
চাহিদা ও যোগানের রসসিক্ত সূক্ষ্মতম খেলায়
বস্ত্রাঞ্চলের বড়ই নিদারুণ টান

১০ শফিউল আজম মাহফুজ

দুটি কবিতা
শফিউল আজম মাহফুজ



অক্ষত চোয়ালের লজ্জা
(হুমায়ুন আজাদ স্মরণে)

আকাশের কপালে তিলক এঁকে দিয়ে
নির্লজ্জ চাঁদ উঠলো ঠিকঠাক।
আর আমরাও বাতিঘর-এর সামনে দিয়ে
প্রবেশ করলাম চেরাগীর যোনিতে।
তারপর তুমুল আড্ডা, সে যে কী তুমুল আড্ডা
তুমি নেই আজ কতদিন...
তবু থামে না কিছুই।

তুমি কি জেনেছিলে এর সব
এমনই হয়, মানুষের অদ্ভুত স্বভাব
চায়ের সাথে সিগারেট, পরাটার সাথে কাবাব
না হলে মানুষের চলে না।

অথচ শতাব্দীর হাহাকার নিয়ে তুমি বিগত
তোমার ঝুলন্ত চোয়াল শুধু ঝুলে আছে বাংলার বুকে
তোমার মুখে, তোমার চোখে বিদ্রুপের হাসি
যেন বলছো, একি প্রহসন! আহা প্রহসন!
তুমি আজ বিগত--
তবু আড্ডাগুলো জমে ওঠে ভীষণ
মানুষের অদ্ভুত স্বভাব
অনায়াসে ভুলে যায় সব।

সারা মুল্লুক ঘুরে যখন ফিরি
দাঁড়াই আয়নার সামনে, দেখি আমার শান্ত চোখ,
মসৃণ মুখ, অক্ষত চোয়াল।
লজ্জায়, ভীষণ লজ্জায় দু'হাতে মুখ ঢাকি।


সহজ জ্যামিতি

হৃদয়ের সব সংলাপ ফিরে যায় অনাহত
আমাকে কেন্দ্র করে আঁকছো যে হৃদয়ের চাপ
তা আমার হৃদয়কে ছেদ করবে না কোনোকালে

তোমার কি জানা নেই সহজ জ্যামিতি
তোমার হৃদয়ের সমান কিংবা অন্তত
অর্ধেকের বেশি ব্যাসার্ধ না নিলে
আমাদের হৃদয় কখনো সমদ্বিখণ্ডিত হবে না।


১১ রবীন্দ্র গুহ

অতর্কিতে হারিয়ে যাওয়া
রবীন্দ্র গুহ


মাতাল বালিকার বুকে সুধাবিষ ঢেলে যৌবন চলে যায়
ভেংচি কেটে। নিকটতম বন্ধু অথচ বিপরীতে শত্রু, যার
বর্ণরোপিত মুখ ভ্রূ নাচায় শ্বেতপত্র ওড়ায় বাতাসে, আড়ালে
স্বগতোক্তি করে : ‘যে জীবনের কোনো গঠন নেই তার কোনো বৃত্তপর্বের
দিনলিপি নেই’।
সকাল বিকেল নেই অন্ধের বুকে
নিত্যনাম সর্বত্র অসময় অনাদরের স্মৃতি –- তর্জমাহীন তীব্র সেই
স্মৃতির ভিতর অনন্তের মৌনমুখ শুষে নেয় শরীর থেকে সুধাবাষ্প
ভালোবাসা অভ্যাসবশত পরকীয়া স্বাদ পেতে চায়
সুখের ধারাপাত এইভাবেই শুরু সরলরেখায় অন্য সব অবান্তর,
কপালে নিসর্গের বহুবর্ণ ছায়া, আর কোনো দুঃখ নেই স্বপ্ন নেই
মানচিত্রে পুরাতনী প্রেম চুপসা হয়ে আছে, তাকে ঘিরে অনিবার্য মায়া—
মঞ্চ থেকে নেমে করমর্দন হলো ইচ্ছা অনিচ্ছায়
আজ বাস্তুছুট।

১২ সোনালি বেগম

স্কি
সোনালি বেগম


প্রচণ্ড চাপ তাপ সঙ্কুচিত অভ্যন্তর।
প্রতারণা বাজেয়াপ্ত হলে অপরিমেয়
বস্তুগুণ পরিব্যাপ্ত হয়। উল্কার ক্ষণিক
প্রকাশ। স্প্রিং-আঁটা গদি পাখির
খাঁচায় স্থান করে নেয়। ধ্বনি
বিবর্ধক যন্ত্র অভ্র ছড়িয়ে দেবার
প্রতিশ্রুতি দেয়। মাইক্রোবায়োলজির
জটিল সংসার। আকাশের যৌবনপ্রাপ্ত
ঙ্খচিল। পানশালায় তোতাপাখির
নকল জাল প্রকাশ পায়। ইঁট
পাথর সিমেন্ট বালির মিশ্রণ পড়ে
থাকে। স্ফুলিঙ্গ পঙক্তি আঁকে।
ঈষৎদগ্ধ উপহাস উড়ে যায়।
বৃশ্চিক-হত স্কোর-বোর্ড। লাভাপিন্ড
সরিয়ে গতিশীল স্কি স্পষ্ট হতে
থাকে --



১৩ রঙ্গীত মিত্র

তিনটি কবিতা
রঙ্গীত মিত্র



এই আজকেই

ডায়নোসরদের রক্তের টেমপারেচারের মতো আমার মন; সেদিন ক্যাফেলায় বসে সৌভিকদার লেখা ‘শূন্য রঙের মানুষ’ পড়তে পড়তে খেয়াল করলাম, সাইমন আমার পাশে বসে গান গাইছে, ওই তো নেরুদাকে দেখছি কি এক গোপন আলোচনায় ব্যস্ত; কিন্তু এখানে আমি এক শরীর থেকে আর এক শরীরে লাফ দিয়েও ক্লান্ত নই, তিমিদের থেকেও আমার ক্ষমতা অনেক বেশি বলে ভাবি। শরীর কি বিবাহিত হতে পারে? বিবাহের উপর জোনাকিরা উড়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু আমি তো যৌথবাহিনীর মতো, গণতন্ত্র আমি নিজেই জানি না; স্বাভাবিকের অর্থ কি?



অভীকে লেখা টেক্সট


অনেকদিন সেই আমাদের কলেজে যাইনি। ডিএসকে কেন জানি না আমার একবার ফোন করাটা দরকার ছিলো। নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হয়; কখনো কুলির মতো স্মৃতি বয়ে নিয়ে গিয়ে দেখি, ঐ তো যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুল, সুরেশবাবু সাগরবাবু স্কুলের মাঠ থেকেই শিখেছিলাম, হেডস্যারকে সানডে-মনডে বলে।



মেরু

আমার লোভ বাড়ছে প্রতিদিনই। কারোর বাড়ির দরজা খুলে আমি স্যাটেলাইটের প্লাগ ঢুকিয়ে দিয়ে বলি, সবাইকে আমার মতো হতে হবে। কিন্তু আমি কে? আমি না কি মহাপুরুষ হবার অভিনয়ে নেমে দেখি, আমার গায়ের রং এখনো বাদামি, এখনো মেয়েরা পাত্তা দেয় না, পূর্ব পশ্চিম আমার প্রিয়। এখানে উত্তর এবং দক্ষিণ ছাড়া আর কোথাও মেরু নেই।

১৪ সুজন হাজারী

স্নানহীন জ্যোৎস্নার সেরেনাদ
সুজন হাজারী



স্বরচিত অন্ধকারে হেঁটে চলা
জুয়াড়ির বিড়বিড়
একাকী বায়ু সেবনের রাত
বিষাদে স্নানহীন জ্যোৎস্না পেরোয়
অন্ধ এক বালক পৃথিবীর।

চক্কর কাটে বিষুবীয় সুতোর টঙ্কার
গীটারে সুর তোলে ভ্রমরা রমণী
নিষিদ্ধ গানের বর্ণমালা
উঠোনে নষ্ট চাঁদের টি-ব্রেক অবসরে
অন্ধ বালক হাত ধরে পড়শির

বাজাও তুমি সেরেনাদ
মুছে যাক সকল বিষাদ।

১৫ সুবীর সরকার

গ্রামার
সুবীর সরকার



বাদ্যযন্ত্র রাখা থাকে গার্লস স্কুলে


তারপর চওড়া খাল।
বর্ষাকালে বাড়তি সতর্কতা
গ্রামার নামিয়ে দেখি
                            গুমঘর

হাসি

হাড়ছাড়া চিকেন
সঙ্গে মুচকি হাসি
দিন কাটছে লবণ ও
                           চিনি ছাড়াই

দৃশ্য

তীরের ফলক। বর্শার মুখ।
দৃশ্যের মধ্য দিয়ে যেতে
                                      হয়
আসবাব বলতে বাইসনের
                                      শিং

তাঁবু

ছোট কপালে কোনো টিপ নেই
খুব গোপন কিছু বলার মতো
বরাবর উলটো রাস্তায় হাঁটছি
আসলে যাযাবর। তাঁবু খাটিয়ে
                                     থাকে

গান

পাখিদের একটানা স্নান
গভীর গানের মতো বাজে
এত যে হাওয়ায় থাকি
অতিথি সংগ্রহের অভিলাষ
সুসমাচার বয়ে
                                  আনে

১৬ নীতা বিশ্বাস

আদিমে পেতেছি কান
নীতা বিশ্বাস


শব্দ শ’য়ে শ’য়ে অব্দ পেরিয়ে
শুয়ে বসে যৌগ রসায়নে প্রেমের
চিঠি চাপাটি’পট খুলে
লোপচুগন্ধে ম’ ম’
মম চিত্তে দ্রিদিম

ঘুমচুম আদিমে পেতেছি কান
স্যাটার্নের SMS
আলোবুক মুঠোয় এসেছে
মিডনাইট ড্রিম
ট্রিমেন্ডাস শংখনাভীশব্দমালাশরীরী
চাঁদাকাশ লিপইয়ারি দোস্তানা
ঠোঁটের ডালিমা শুষে যন্ত্রণানন্দ
অপরিমেয়... শব্দকোষের বন্ধনহীন ওপারে
বেপরোয়া রাত্রিযাপন

১৭ রাজেশচন্দ্র দেবনাথ

তিনটি কবিতা
রাজেশচন্দ্র দেবনাথ


অক্ষরমালা

ধাঁধানো ব্যথায় ধীর পায়ে আসে ছায়া
অশ্রুমোচনের রুমালে গতজন্মের ধ্রুপদী ঘাম
মিছে লগ্ন পেরিয়ে অবদমিত
                        সমস্ত কৌতূহল।

আলোর ডগায় ধ্যানরত ইন্দ্র
উপদ্রুত বায়নায় আদিহাত
                        গুঁড়ি গুঁড়ি হাসিতে
গলায় ঝুলিয়ে নেয় অক্ষরমালা।


স্মৃতি

অনুভবের তরতাজা সন্ধ্যায়
                            অনাবিল রহস্য।
বিপ্লবের বায়ু পেরিয়ে মুচকি প্রত্যাশা
মুঠিতে গুঁজে নেয় ক্ষত আগুন।
খাঁচাভর্তি রঙিন মন্তব্যে
অন্তর্লীন মধ্যরেখার ব্যর্থতা।

দীর্ঘ পায়ে হেঁটে
বড্ড কাতর স্বপ্নের ফাতনা,
চুপচাপ লালন
কাচের পরিবারে গল্পের দৃশ্যগুলো গুনে
পাতার সূচিপত্রে আনে নবান্নের নীরবতা।


প্রশ্রয়

আলোকবর্ষ জুড়ে কর্পোরেট উপাদান
রোজ প্রস্তুতিহীন হাওয়ায়
নেমে আসে চশমা বানরের উৎপাত।
আনন্দ শেষে শূন্যস্থানে লোক হাসানো প্রশ্রয়
ক্রমশ গোমতীর প্রতি ঢেউয়ে
                সরে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনের জট।
পশ্চিম বেলায় শ্যাওলার জীবাশ্ম
কুলীন শিশির অন্ত্যমিল ভেঙে
হাত বোলায় গদ্যের শিরা উপশিরায়।

১৮ পাভেল আল ইমরান

মৃত্যুর দু’মিনিট পূর্বের ছবি
পাভেল আল ইমরান



মৃত্যুর দু’মিনিট পূর্বের যে ছবিটি ছিল?
হাজার চেষ্টায় খুলে নেওয়া সে কাঁচা গাব রঙা রসের খোলস কতখানে রাখতে গিয়ে ঢাকতে গিয়ে
পেঁচা কুকুরের সমকামিতা দেখতে বাধ্য হয়েছি এ আমি
ধু ধু জনহীন মরু বুকে হঠাৎ এক পশলা বিষ্টির গল্প চরম মিথ্যুক খেঁকশেয়ালটাও
হাউ দেওয়ার চলে অন্যগ্রহে পাঠিয়ে দেবেন
আনকোরা তরুণের আঙুলে গিটার যত জোশ সুরই বমি করুক
প্রশান্ত মহার্ণবের হুরি-সুস্বাদু মাছেরা নীল তিমির পেটেই যায়
কোথাও রাখতে পারিনি ঝরঝরে ছাইয়ের পশমআঁকা মুখের খোলসটি

মৃত্যুর দু’মিনিট পূর্বের যে ছবিটি ছিল?
আকাশের বেলুনের শ্বাসে গ্রহ-গ্রহান্তর নামের মিথ্যার জগতে বাদুড়

১৯ মানিক সাহা

নির্বাসন
মানিক সাহা



শূন্য মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে একটি আঁকাবাঁকা পথ
নিঃসঙ্গ সরাইখানার দিকে চলে গেছে।
ঝাঁকঝাঁক বুলবুলি আনন্দহীন ঘরবাড়ির ছায়ায় নাচছে।
নাচুক, গান করুক, মাথায় মুকুট পড়ে
বসে থাকুক রঙিন সিংহাসনে।

টিপসইগুলো দিনদিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
লাল পদ্মফুলের পুকুর থেকে কাঠের বাড়িটি উঠেছে।
তার জানালা-দরজাগুলো খুলে দিলে
সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়বে দশদিকে।
এক অগরু গন্ধ এদিকে সাঁতরে আসবে
এবং জমাটবাঁধা ইঁট হয়ে
খাটের পায়ার নিচে শুয়ে পড়বে।
তাকে আর চেনা যাবে না।

আঁকাবাঁকা পথটি সরিয়ে নিয়েছে।
পালকের ঘাম থেকে বেরিয়ে আসছে মৃদু গুঞ্জন।
তারা বিদ্ধ করতে ভালোবাসে।
তারা নরম মাটি নিয়ে হৃদয়ের দিকে ছুঁড়ে দেয়।

কৌটোর ভেতরে থাকা ভ্রমরের লাবণ্য
দিন দিন ফিকে হয়ে আসে।

এখানে আর ভালো লাগছে না,
তাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে
বসে থাকি নির্বাসনের কোলেই।


২০ মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

কলাবতী
মধুছন্দা মিত্র ঘোষ


দীর্ঘ ভণিতায় কলাবতী আদলে
চিহ্নিত ছিল অভিমান
                “বাত না করো তুম
                মোহে হর যায়ে”

রাগ ভাঙছে ঠোঁট
রাগ ও রাগিনী
বর্জিত ঋষভ মধ্যমা কোমল নিষাদ
স গ প ধ নি স
                হে প্রিয় কলাবতী

আস্থায়ী আভোগ
ফিকে হয়ে আসে
ভালো লাগা পুরুষ ছোঁয়া
               “তুম সংগ মোহে
               অব না সুহায়”

জেদি নারীত্বে
হেলায় ফিরিয়ে দিই
              অবাধ্য পুরুষ... 


২১ অর্ণব ভট্টাচার্য

কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন
অর্ণব ভট্টাচার্য



মিছিমিছি কিছু চিঠি পাঠিয়েছি তোর উদ্দেশ্যে
বোনা কিছু উল রাখা আছে টেবিল-এর কোণে
তুলে রেখেছি তোর জন্য নিয়ে আসা কিছু কাঠবাদাম
তুই তো চলে গেছিস বেবাগী হয়ে

ঘনিষ্ঠ হওয়া কিছু মুহূর্ত আজ কলমবন্দী
ইনবক্স-এ আছে জমা কিছু মনখারাপ
তুলে রেখেছি তোর জন্য সুর করা কিছু ফিউসন
তুই তো মিশে গেছিস ছেঁড়া গিটার-এ

আলতো আলো আর নিওন-এর ডুয়েল-এ
পচে মরেছে কিছু পুরনো স্মৃতি
সজনে ডাঁটার ভেষজ গুণের কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন লিখছি
তুই তো রয়ে গেছিস স্যারিডন হয়ে

শেষ দুটো ডেট-এর দিব্বি
মনে গেঁথে গেছে তোর এলোচুল
জোয়ার ভাঁটার সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছি ডলফিন হয়ে
তুই তো বেঁধে গেছিস সাত পাকের জালে


২২ ব্রতী মুখোপাধ্যায়

অমর্ত্যের খাম
ব্রতী মুখোপাধ্যায়



রারাত চোখের পাতায় ঘুম নয়, শুধু দুইজন
যেন জাদুর দুনিয়া থেকে নেমে এসে আশ্চর্য পড়শি
যে জন্যে জানালা ভেঙে বেপরোয়া চাঁদ বিছানায় উঁকি দিয়ে
সারারাত
কারো জন্যে থামেন নি যে জন তিনিও কখন থেকে তাকিয়ে
তাকিয়ে তাকিয়ে তাকিয়েই
সারারাত চোখের পাতায়
যখন ওই মুখোমুখি দুই ঘর মরমিয়া গল্প বলছিল
কী কী সব বলছিল যা কেবল কানে কানে বলা যায়

হ্যাঁ, আমি তাদের চিনি
খালি চোখে ধরা যায় না যে মিঠেল কম্পন
মন বলে সে ছন্দও চিনি
তাদের প্রতিটি ভাঁজ, ছোট ছোট মধুময় রেখা, শুকনো কি ভেজা,
কারুকাজ গোলাপি জমিতে
যেভাবে আমাকে ডাকে
সংসারের সব কাজ ফেলে দিয়ে ছুটে যেতে ডাকে
আমি প্রায় পাগলের মতো চিৎকার করে উঠি, বলি,
এ কেমন মজা, বন্ধু, নিজেই না এসে
এ কাদের পাঠিয়ে দিয়েছ?
তখন ডাকাতে চাঁদ আর ওই যিনি
কখনোই থামেন না তিনভুবন জানে
খিলখিল করে হেসে ওঠে

চোখের পাতায় ঘুম নয়,
ঘুম নয়, দুটি ঠোঁট সারারাত

মন বলে অমর্ত্যের খাম


২৩ ইন্দ্রাণী সরকার

মোনালিসা প্রেমিকা
ইন্দ্রাণী সরকার


কি যেন নাম তার ‘তিস্তা’!
রূপসী না কি মোনালিসার ঘ্রাণ?
ঝানু প্রেমিকের একলা তরবারি
জাগে মাচার ওপর লকলকে
কচি লাউডগা আর পুঁইশাক।
নদীতে বান এসেছে রে, বানভাসি
হবি না কি রূপসী বিউটি পার্লারে
বসে থাকা ফেসিয়ালের মুখ?
না থাক্ তার চেয়ে বরং এলোচুল
জানালায় ঝুলিয়ে দে রাজার কুমার
বেয়ে বেয়ে উঠে যাবে মাচার উপর।
চিলেকোঠা ঘরে প্রেম এসেছে,
ওরে নাইতে যাবি নি নেশালু মেয়ে?

২৪ ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী

দুটি কবিতা
ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী


খসে পড়তেই

জানালার এক ফাঁক দিয়ে
              চাঁদের জ্যোৎস্না খসে পড়তেই,
চোখ সরে ঘরে ফিরতেই,
              চিড়িয়াখানার বাঘের খাঁচার
বুনো গন্ধে ভরে যায়
              আমার একাকী ঘর।


মনস্থির কর


তুমি মনস্থির কর
            এ বিছানায় না ও বিছানায়!
বাঘের জিব সাপটানোর দাগ
            সব বিছানায় সমান।
আরও কিছু সূক্ষ্ম তারতম্য থাকে
            তবে ততটা রসিক তুমি নও।
তাই বলছি মনস্থির কর।


২৫ শুক্তি ঘোষ

দুটি কবিতা
শুক্তি ঘোষ


সিনড্রোম

পনেরোতে রাগ হতো,
              পঁচিশে স্পর্দ্ধা,
                       পঁয়ত্রিশে পৌঁছে
                                   আর কাউকে গ্রাহ্য করিনি।

এখন পঞ্চান্নয়
             শরীর জুড়ে নামছে ভয়!
কী হবে
             যদি শিকল খোয়ানো খেঁকি কুকুর
             দাঁত বসিয়ে দেয় শরীরের ভাঁজে?
শরীর জুড়ে থৈ থৈ
             এখনও যে জেগে রয়েছে
                       নারীত্বের সামান্য লক্ষণ।

যদিও এখন
             স্তন বলতে ক্যান্সার
আর ঊরু বলতে
             বাতব্যাধি মনে পড়ে—

কিন্তু এই অন্ধকারে
             নিজেকে নিরাপদ মনে করাটা
                         বোধহয় অস্বাভাবিক,
                                     অত্যন্ত বিপজ্জনক এক সিনড্রোম!



আদ্যন্ত

তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম,
‘সূর্যোদয়ের ছবি আঁকছ,
না সূর্যাস্তের?’
তুমি উত্তর দাওনি।
তোমার তুলির রঙ
রাঙিয়ে দিচ্ছিল সাদা ক্যানভাস,
একটু একটু করে
ফুটে উঠছিল অপরূপ সূর্য!
অথচ অবোধ আমি বুঝতে পারিনি—
তুমি সেদিন শুরুর গল্প বলছিলে,
না শেষের?

সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৩

২৬ সৈকত ঘোষ

উল্লাস ২৯
সৈকত ঘোষ


রক্তের স্বাদ পেতে হলে
শরীরকে পর্ণমোচী হতে হয়
পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে
যেই তোমায় খুঁজে পেলাম
তুমি জোনাকি। অন্ধকারে চোখ পুড়িয়েছি সেদিন

কখনো কখনো নিজের আকার হারালে
ডাইরির পাতার পর পাতা ভরে যায়
কিশোর প্রেমিক ধুলোমাটি মাখে
দু’হাতে নিঃসঙ্গ রূপকথা...

আগুন ছুঁয়ে দিলে আমি, দস্যু
সস্তার বিজ্ঞাপনে মেঘের নির্মাণপর্ব শেষে
সেই তো চেনা স্বাদ
ঠোঁটের কষানিতে ও রক্ত হতে যাবে কেন

ওঃ আমার প্রিয় রামবল... 
 
 

২৭ পাঞ্চালী সীন্‌হা

ইতিকথা
পাঞ্চালী সীন্‌হা


ডালিম গাছটি থেকে আলো সরছে
আর গাছটি নিজের ছায়ার কাছে
খুঁজে নিচ্ছে
সমস্ত আত্মীয়তা

গাছটিকে কে হাঁটা শিখিয়েছে
গাছটিকে হাঁটাচ্ছে কে
দ্রুত কে হাত ধরে পার করাচ্ছে চৌকাঠ
এগোতে এগোতে
গাছটি শিখে নিচ্ছে শব্দহীনতা

চিনে নিচ্ছে নীল আর
একখণ্ড মেঘের খসে পড়া...

২৮ সুমিত রঞ্জন দাস

ফিরে দেখা
সুমিত রঞ্জন দাস


এবারও শেষ হয়ে উঠলো না ...

হিসেবের খাতা মেলানোর আগেই
পায়ে হেঁটে পেরিয়ে গেল নিকানো উঠান
গাঁয়ের পাঠশালা লাঙ্গল কাঁধে বিকেল
একলাটি ঘাটে মক্ষিস্নান
সব স-ব-কিছু;

এখন শুধু আতশ কাঁচ দিয়ে খুঁজে বেড়াই
অপদার্থতার ফ্যাকাশে নিশান হিমশীতল চোখ
বুকের পাহাড়ে শূন্যতার আঁকিবুকি
নীল আকাশে বকের আগমন
সাথে জবাকুসুমের লালগন্ধ

শেষ হয় না, কোনদিনও, সব যেন হারিয়ে যায়
আমার মধুমাস, অরন্য, কস্তুরীগন্ধা দিনগুলো।

অনিকেত এবার বুঝি তোমার ঘরে ফেরার পালা?

২৯ জুবিন ঘোষ

আহ্‌ গোলোক আশ্চর্য
জুবিন ঘোষ



একটা শূন্যের মতো ফুটবল আমার অপেক্ষা করে আছে
কার কতটা পায়ের জোর জানি না, গোলপোস্ট ফাঁকা
আমি সহজাত হয়ে উঠছি, আর বলটা ঠিক পায়ের কাছে

অসংখ্য তিল নিয়ে বনবন ঘুরপাক, ঠিক সুদর্শন
তুমি কৃষ্ণলাল , রাসলীলার মতো চেপে ধরছ পা
নো ট্রাই ব্রেকার, নব্বই মিনিট, নো গোল্ডেন গোল
স্পেস দিলেই গেমওভার যেখানে আবার শূন্যের মতো
গোলাকার অদ্ভুত বলটা ঠিক সামনে গড়িয়ে যাচ্ছে
চাঁদের আলোয়, চাদরের তলায় , ফুটফুটে জ্যোৎস্না
যেন ফাঁকা ময়দান, একটা প্লেয়ার চরকির গতিতে
চক্কর দিয়ে যাচ্ছে , পায়ের কাছে সোনার আপেল
ফেলে আটলান্টা থেমে যাচ্ছে দেখেও না কুড়িয়ে আগের গতিতে
সেই যে বলটা বলছিলাম, জালের মধ্যে যাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে
নির্ধারিত করে দিচ্ছে ম্যাচের ভাগ্য , আমার সামনে এখন
হতভাগ্যের মতো পরে আছে করমর্দনের অপেক্ষায়

<<< কালিমাটির ঝুরোগল্প / ১৪ >>>


০১ সমীর রায়চৌধুরী

ডগমগপুর
সমীর রায়চৌধুরী


হাংরি মামলায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে সাক্ষ্য দিতে হয়েছিল। তিনি সেই সাক্ষ্যে বলেছিলেন, তিনি একবার মাত্র হাংরি বুলেটিনে লিখেছেন, আমন্ত্রিত লেখক হিসেবে। কিন্তু আমার কাছে ফাইলের স্তূপের মধ্যে আমি খুঁজে পেলাম যে, সন্দীপন হাংরি বুলেটিনে লেখার জন্যে দেবী রায় অর্থাৎ হারাধনবাবুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভরে অনুনয় বিনয় করেছেন। হাংরি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই চিঠিটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। চিঠিটির পাঠ এইরকম :

প্রিয় হারাধনবাবু, হাংগ্রি জেনারেশনের জন্য লেখা পাঠালাম। প্লট, কনটেন্ট, ক্রাফট এসব বিষয়ে ডেফিনেশন চেয়েছেন। আপাতত অন্য কতকগুলো ডেফিনেশন পাঠালাম, ওগুলো পরে লিখবো। প্রকাশযোগ্য কিনা দেখুন।

১) ছাপলে সবকটি একসঙ্গে ছাপতে হবে – নইলে খাপছাড়া লাগবে।

২) শেষের তারিখটা রাখবেন।(লিখে, কেটে দিয়েছেন)

৩) ছাপার ভুল যেন বেশি না থাকে, দরকার মনে করলে অনুগ্রহপূর্বক একটা ফ্রেশ কপি করে প্রেসে দেবেন।

‘অমৃত’তে আমার বইয়ের যে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, দেখেছেন? নইলে পাবলিশারের কাছে গিয়ে তার একটা কাটিং পাঠাবার ব্যবস্থা করলে খুশি হই। ঐ বিজ্ঞাপনটাই ‘দেশ’এ বেরুবার কথা আছে – যদি বেরোয়, তার প্রুফটা কাইন্ডলি দেখে দেবেন। ‘আনন্দবাজার’এ লেখকদের কোনো বিবৃতি বেরিয়েছিল নাকি? তাহলে তারও একটা কাটিং পাঠাবেন।

সামনের মাসে বাড়ি পাল্টাবো। আরও একমাস থাকবো বা ততোধিক। সহজে যাব না। শরীর ভালো। ছোটগল্পের আবার লেখা দিতে পারলাম না, সম্ভব হলে ক্ষমা করবেন। ভালোবাসা নিন।

সুনীলবাবুকে (হাজরা) প্রীতি জানাচ্ছি। ইতি --

ডগমগপুর / ২৬-১১-১৯৬২ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

* হাংগ্রি জেনারেশনের একটা সিম্বল করবেন বলেছিলেন। কী হলো? পাঁচ নঃ পঃ করতে পারেন।

* কমাগুলো ভেবেচিন্তে দিয়েছি, ঐগুলোই আসল জিনিস, যেন থাকে।

* শেষের তারিখটা যেখানে আছে, ওখানে প্রকাশের তারিখ দেবেন।

* ‘অভিযান’ ‘পূরবী’তে হয়েছিল তো?

চিঠির বাঁদিকে মার্জিনের পাশে লিখেছেন :

আগামী সপ্তাহে নতুন ঠিকানা পাঠাবো। তার আগে চিঠি দিলে, কুমুদ বাংলো, রুম নম্বর ৫, Tikore, চূনার, মির্জাপুর – এই ঠিকানায় চিঠি দেবেন। ‘আক্রমন’ বানানটা কি – ‘ন’ না ‘ণ’?

পুনশ্চ : লেখাটা প্রকাশ হবার আগে আপনি ছাড়া কেউ যেন না দেখে। অনেক বাদ দিয়ে খুব নরম করে সব দিক বাঁচিয়ে লিখেছি, ভয় নেই।

(নোট : এই চিঠির সঙ্গে দশটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন। একটি কবিতা নিচে রাখা হলো।)



বেশ্যা

“বেশ্যার ঘরে আয়না থাকবেই, দেওয়াল-জোড়া আয়না, ছোট বড়, নানা সাইজের দামি বা সস্তা আয়না, একেকটা কারুকার্য করা। খাদ্যদ্রব্য কদাচিৎ দেখেছি, তবে বাসন থাকে। কাচের, কলাইয়ের, কাঁসা ও পিতলের বাসন। বেশ্যা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কটি তথ্য এই হতে পারে যে, ১) সে উপহার পেতে ভালোবাসে ২) তার soul আছে ৩) তার লজ্জাহীনতা সত্যের মতো ৪) সে মৌলিক নির্বোধ ৫) সামনে কোনো সময় নেই, এমন মানুষ যদি ভাবা যায়, সে সেইরকম।

তার সম্পর্কে একটি কথাই গভীরতর ভাবে ভেবে জানার। তার শরীর যখন একজন ভোগ করে, কী মানসিক অবস্থায় সে থাকে! লোক এলে সে সুখী হয়, বিরক্ত হয়, ঘৃণাও করে। লোককে হিংসা সে কখনও করে না। যখন লোক তাকে উলঙ্গ করে, সে বিরক্ত হয়; একবার উলঙ্গ হলে স্বস্তি বোধ করে, আর তার সহজ লাগে। কিন্তু বেশির ভাগ লোক একসঙ্গে উলঙ্গ হয় না, আলো নেভার আগে অন্তত আন্ডারওয়ার বা গেঞ্জি পরে থাকে। তার নগ্নতা সে দেখে, তাকে দেখতে দেয় না। তারপর কতকগুলি নিয়মকানুন তারা মানে, বেশ্যারা, সে সময় শয়তান তাদের সাহায্য করে বা ঈশ্বর, সে জন্য তারা কদাচিৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়”।

(নোট : এরপর আর এক প্যারাগ্রাফ তিনি লিখেছেন এবং কেটে দিয়েছেন, তাই তা আর উদ্ধৃত করা যাচ্ছে না।)

এমনই ছিলেন আমার প্রিয়বন্ধু প্রয়াত সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়।

০২ অলোকপর্ণা

ঝিঁঝিঁরা
অলোকপর্ণা


তিনঘণ্টা হাঁটার পর ঋজুর খেয়াল হলো, তার কব্জির ষোলোহাজারি ঘড়িটা উবে গেছে। রাস্তার ধারে ঋজু থেমে গেল। তাকে না ছুঁয়ে পাশ কাটিয়ে চলেছে খালি পা, কমলা গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট আর গামছার দল। তাদের কাঁধের বাঁক থেকে ভেসে আসা ঘুঙুরের ঝিঁঝিঁ ঋজুর চিন্তার মেঘ ছিঁড়ে দিলে, ঘড়ি হারিয়েও সে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ল। এরপরও আশে পাশের ভিড় ‘ভোলে বাবা পার করেগা!’ চেঁচিয়ে উঠলে ঋজু গলা মেলাতে পারে না। কুণ্ঠা হয় তার, ভিড়ে মিশে যাওয়ার শঙ্কাও হয়। রাস্তার পাশে একটু দূরত্ব রেখে বিষণ্ণ সে স্রোতের সাথে এগিয়ে চলে, তারকেশ্বরের দিকে।

ঋজু জানে না, সে হাঁটছে কেন! তবু নিজেকে ‘ফরেস্ট গাম্প’ বলে ভাবতে ভালোই লাগছে তার। ফর্সা খালি পা, থ্রি কোয়ার্টারস আর টাওয়েল ঋজুকে বাকিদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। কাঁধের ব্যাগের স্যুইচড্‌ অফ ফোন থেকে স্বস্তি ভেসে আসছে তার দিকে, ঋজু এখন সমস্ত নাগালের বাইরে! অচেনা, অশিক্ষিত মানুষগুলোর সান্নিধ্যে এসে সে নিরাপদ বোধ করে; বাবার বিজনেস, মায়ের পরকীয়া, বন্ধুদের মত্ত হাতছানি থেকে মুক্ত বোধ হয় তার।

গতরাতে শেওড়াফুলির ছাউনিগুলোয় খিচুড়ির গন্ধ লেগে ছিল। ঋজু খেতে পারেনি। দূরে দাঁড়িয়ে কলা খেতে খেতে সে দেখেছিল, কীভাবে মানুষেরা খিচুড়ি খেয়ে আনন্দ পায়, আনন্দ পেতে পারে আর আনন্দের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগে, মহাদেব!’ ওর পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা খাওয়ার পর বিড়ি ধরিয়ে ওকে কাউন্টার দিতে চেয়েছিল। ঋজু পাত্তা দেয়নি। ছেলেটার কথা ভেবে এখন তার করুণা হলো। কে জানে কোথায় মিশে গেছে, ঋজু চারপাশ খোঁজে, দিস গাই? অর দ্যাট ওয়ান? ঋজুর গুলিয়ে যায়। এদের সবারই মুখ এক রকম, কাউকে আলাদা করা যাচ্ছে না। ঋজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে গতি বাড়িয়ে ঝিঁঝিঁর প্রকাণ্ড লাইন ধরে উপরে উঠতে থাকে।

‘মানুষেরা এমনই বাঁক কাঁধে জন্মায়, ঝিঁঝিঁর মতো বাঁচে, সকাল হলে দুধ পুকুরে নেমে গায়ে লেগে থাকা সুতোগুলো ঝেড়ে উঠে এসে কোথায় চলে যায়, কেউ জানে না’-- শেষ দু’মাইল হাঁটতে হাঁটতে ঋজুর এরকমই ভ্রম হতে শুরু করে। পাশের লোকগুলো কোন্‌ সময় মায়ের বয়ফ্রেন্ড হয়ে গিয়েছে, সে খেয়াল করেনি। সে খেয়াল করেনি, তার ফুলে ওঠা বাঁ পায়ের ফোস্কাটা অভিগত গোলকের আকার নিয়েছে কখন! ঘামের দুর্বিষহ গন্ধ উপেক্ষা করে তার কানে ঝিঁঝিঁর ডাক ঢুকে আসছে। চারপাশে স্তবের মত ‘ব্যোম ভোলে’ সহ নানান অস্ফুট গালিগালাজ। ঋজু অজ্ঞাতসারে আওড়ে চলছে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’। আকাশে আলো দেখা দিতে শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া ঋজুর আনন্দ হয়। মন্দির আর আধঘণ্টার পথ। মায়ের বয়ফ্রেন্ডদের সাথে পাল্লা দিয়ে ঋজু ছুটে চলে, ঋজু ঝিঁঝিঁ বনে যায়।

লাল তেলে ভাসা আলুর দম মুখে ভরতে ঋজুর ঘুম পায়। পাশের লোকগুলো কত ফর্সা হয়ে গেছে স্নানের পর, সবার মুখে এখন কোটি টাকার হাসি। কচুরি মুখে ওঠে না ঋজুর। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে সে। পাশের ছেলেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে কেমন মিইয়ে যায়। কোত্থেকে বেরিয়ে এসে কাউন্টার দিতে আসা ছেলেটা ঋজুর কাঁধে হাত রাখে। ঋজু শোনে তার তামাটে কব্জিতে থাকা ষোলোহাজারি সময়ের টিক্‌ টক্‌, টিক্‌ টক্‌। ঋজু কেঁদে চলে।


০৩ অমিতাভ প্রহরাজ

আনন্দ পেয়েছিল
অমিতাভ প্রহরাজ



(২৮-শে জুলাই/ ২০১৩)



"গুস্তাখি মাফ হো"

"আপনি শুনতে পেলেন গুস্তাখি মাফ হো?"

"হ্যাঁ, পরিষ্কার শুনতে পেলাম, ড্রেসটা একই রকম, গেরুয়া, খুব আলো"

"সামনে? সামনে কী দেখলেন?"

"সেই বিশাল ক্রাউড। সবাই ফরেনার। কিন্তু ওপরে ঝিকমিকি আলোর বল ঘুরছে। আর হ্যাঁ, ক্রাউডের মধ্যে টম ক্রুজ, ব্রুস উইলিস, স্টিভ জোবস আর এ্যাঞ্জেলিনা জোলি দেখলাম।"

"কী দেখলেন? মানে কীরকম ভাবে দেখলেন? শুরু, শেষ টাইপের কিছু?"

"অনেকটা অস্কারের মতো... প্রচুর হাততালির শব্দ মিলিয়ে গেল... এ্যাঙ্কর, দাঁড়ান দাঁড়ান... এ্যাঙ্করটা মনে পড়েছে... লিন্ডসে লোহান... টিপিক্যাল এ্যামেরিকান উচ্চারণে বললো, নাও লেট্‌স ওয়েলকাম সোয়ামী ভিভেকানন্ডা... পিনড্রপ সাইলেন্স, তার মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ পোডিয়ামে এলেন, গম্ভীর গলায় বললেন, গুস্তাখি মাফ হো... ওফফফ তারপর সেই না থামা হাততালির ঝড়... থামেই না...থামেই না... আর আমি তত টানটান হয়ে উঠছি... এই থামলো বোধহয়, এই থামলো বোধহয়... থামেই না, থামেই না... তারপর ঘেমে নেয়ে ঘুম ভেঙে গেল..."

"হুম... পরের দিন অফিসে কিছু বড় কাজ ছিল?"

"হ্যাঁ... একটা প্রেজেন্টেশান ছিল, মেজর... পুরোটা আমাকেই করতে হতো..."

"হুম... আর আপনার তো স্ট্যামারিং-এর প্রবলেম আছে?"

"হ্যাঁ... সবসময় হয় না... কেউ আমার নাম জিজ্ঞেস করলে আটকে যায়... আর কোনোকিছু দেখে পড়তে গেলে শুরু করার সময় আটকে যায়"

"হুম, খুব সিম্পল... এটা আপনার ফীয়ার অফ ফেলিওর থেকে জেনারেটেড..."

"ফীয়ার অফ ফেলিওর??!!"

"হ্যাঁ, প্রেজেন্টেশানটা হয়ে গেছে আপনার কাছে ধর্ম মহাসভা... নিজের কোড হয়ে গেছে বিবেকানন্দ... আপনার সাবকনশাসে সারাক্ষণ ভয়টা ঘুরছে প্রেজেন্টেশান দিতে গেলে যদি আটকে যায়... আটকে গেলে সরি বলতে হবে, কীভাবে বলবেন... এই চিন্তা থেকে বিবেকানন্দের মুখে 'গুস্তাখি মাফ হো' বসিয়েছেন... আপাত সাকসেস হিসেবে হাততালি শুনেছেন, কিন্তু যেহেতু আলটিমেটলি আপনি ফেলিওর নিয়ে চিন্তিত, ভীত... অতিভীত... তাই হাততালি না থেমে আপনার ভয়টাকে আরো কনডেন্স করেছে যাতে আপনি কনশাস স্টেটে মানে জাগরণে চলে এসে এটার সঙ্গে ডিল করেন... সিম্পল... আর প্রেজেন্টেশানে আপনার বসেরা হয়ে গেছেন স্টীভ জোবস, টম ক্রুজ, ব্রুস উইলিস জাতীয় এ্যাস্পায়ারিং ফিগার, বিকজ ইন ইওর প্রফেশ্যানাল ফিল্ড ইউ এ্যাস্পায়ার টু গ্র্যাব দ্যাট পোস্ট অফ ইওর বস... এ্যাম আই রাইট অর রং?"

"রাইট স্যার, এ্যান্ড মাই ওয়াইফ ইজ দীক্ষিত... মানে আমার স্ত্রী রামকৃষ্ণ মিশনের দীক্ষিত... সেখান থেকে বিবেকানন্দের রেফারেন্সটা ঢুকে এসেছে...

"ব্যাং অন দ্য পয়েন্ট"

"আর লিন্ডসে লোহান..."

"এইচ বি ও... গত সপ্তাহে চল্লিশবার ফ্রিকি ফ্রাইডে দিয়েছিল... সেখানেও লিন্ডসে লোহানের বারবার অপদস্থ হওয়ার ব্যাপার ছিল, সেটা আপনার ফীয়ার অফ ফেলিওরের সাথে জমে ক্ষীর হয়ে গেছে... খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ টাইপের... হা হা হা হা..."

"তাহলে স্যার ওষুধ?"

"ওই তো যা চলছে চলবে, ওলানজেপিনটা ২০ থেকে ১০ করে দিন... কোনো সমস্যা নেই তো... দিব্যি সুস্থ লোকের মতো স্বপ্ন দেখছেন। চলুন"





(১৫ ই জানুয়ারি/ ২০১২)



"ডাক্তারবাবু, আমি লিখি, লেখা ছাড়া বাঁচবো না... জানি না কেন এরকম করলাম... মনে হলো... জানি না"

"ঠিক আছে... ঠিক আছে... তা কি কি খেয়েছেন?"

"আমার যা যা ওষুধ ছিল, যত পাতা, সব... কুড়িটার মতো রিভোট্রিল টু, তিরিশটা টেগ্রিট্যাল সি আর ৪০০, কুড়িটা এসজিট্যালো টেন, কুড়িটা প্যালিডো ওডি... আর স্যাভলন, মারকিউরোক্রোম আর হার্পিক..."

"কী আপদ, আবার স্যাভলন, হার্পিক কেন খেতে গেলেন? কতটা?"

"... আমি জানি না ডাক্তারবাবু... কেন... (কান্না)... একটা স্বপ্ন প্রতিদিন রাত্রে আমাকে (কান্না)... আমি জানি না... আমার লেখা... "

"স্বপ্নে পরে আসবো... এখন আপনাকে তো এইসব থেকে সুস্থ করতে হবে... আপনি কে? ওনার ওয়াইফ? সত্যি স্যাভলন, হার্পিক এইসব খেয়েছেন?"

"... (কাঁদতে, কাঁদতে) হ্যাঁ, স্যাভলন এক বোতল, মারকিউরোক্রোমের পুরো শিশিটাই ফাঁকা, হার্পিক একদম নতুন ছিল, ফুল, তার হাফ আছে"

"না স্যার, হাফ বোতলের বেশি হারপিক খেয়েছি... আমি জানি না... (কান্না)... "

"আপনি চুপ করুন, এখন কথা বলবেন না, শুয়ে থাকুন, হ্যাঁ মিসেস রাজ আপনি বলতে থাকুন"

"... আর স্যার এক শিশি ডেটলও ছিল, ভর্তি, ওটাও ফাঁকা... (কাঁদতে, কাঁদতে)... কিছু হবে না তো"

"কিচ্ছু হবে না... ইমিডিয়েটলি এ্যাডমিট করুন, বডি থেকে টক্সিক ম্যাটেরিয়ালগুলো আগে ফ্লাশ করতে হবে... স্টমাক ওয়াশ করতে হবে"





(১৯ শে জানুয়ারি/ ২০১২)



"ডাক্তারবাবু, আমি বাড়ি যাবো কবে? অন্তত একবার দেখা করা যাবে না?"

"বাড়ি যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না, আর দেখা টেখা আপাতত একমাস নয়"

"প্লিজ, ডাক্তারবাবু... এটা তো পুরো জেলখানার মতো... লেখার জন্য খাতা পেনও দেয় না"

"হ্যাঁ... যদি আবার খেয়ে ফেলেন... আপনার তো নানা রকম জিনিস খাওয়ার অভ্যেস আছে..."

"না, ডাক্তারবাবু (কান্না)... ওটা আমি কেন করেছিলাম, জানি না... আমি জানি না(কান্না)... কিন্তু না লিখে আমি থাকতে পারবো না... প্রত্যেক রাত্রে একটা স্বপ্ন... "

"কী স্বপ্ন?"

"একটা বিরাট দাবাখেলা... বিশাল বিশাল রাজা, মন্ত্রী, অট্টালিকার মতো... কালোর দিকে খেলোয়াড় কালো আলখাল্লা পরে আকাশছোঁয়া লম্বা, সাদার দিকে তেমন... আর তারপর মন্ত্রীর গায়ে একটা মশা, আমি মারতে যেতেই সব গড়িয়ে পড়ে আর আমি অনেক উঁচুর থেকে গড়িয়ে পড়ি, পড়তেই থাকি... ঘুম ভেঙে যায়"

"অনেক উঁচুর থেকে পড়া খুব কমন জিনিস... এটা ৮০% মানুষেই দেখে... অবচেতনে থাকা এসকেপিজম থেকে জন্ম নেয়... ছোটখাটো এসকেপিজম... যেমন ধরুন, রোজ আপনাকে রাতে মশা কামড়ায়, কিন্তু আপনি উঠে মশারিটা ভালো করে গুঁজতে চান না... তো অবচেতন দায়িত্ব নিয়ে আপনাকে কনশাসে ফিরিয়ে আনবে, গার্জেনের মতো... আর দাবাখেলা? অনেকবার বার্গম্যান দেখেছেন বা ওই বিখ্যাত সিনটার স্রষ্টার মতো ঐতিহাসিক লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন অবচেতনে... চিন্তা নেই সেরে যাবে"



(২৫ শে জানুয়ারি/ ২০১২)



"এখন কেমন লাগছে? ওই শব্দ টব্দ শোনা, সুইসাইড্যাল ইচ্ছে?"

"কিচ্ছু নেই... আমি এখন একেবারে ঠিক হয়ে গেছি... প্লিজ ছেড়ে দিন... আমি ওকে না দেখে আর থাকতে পারছি না... না লিখেও"

"স্বপ্ন হয় না, এখন ঘুম ঠিক হচ্ছে?"

"স্বপ্ন... স্বপ্ন... (কান্না)... একটা স্বপ্ন দেখি, আর ভয় একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা... দেখি একটা ঘোড়া একটা গোরুকে খেয়ে ফেলছে, তারপর ঘোড়াটা আমাকে খেয়ে ফেলছে..."

"ভাস্কর চক্রবর্তী"

"এ্যাঁ!!"

"ভাস্কর চক্রবর্তীর শয়নযানে আছে... ওই বইটা, যে তিনটে বই আপনাকে এ্যালাও করা হয়েছে তার মধ্যে আছে না?? ... ভয় নেই, স্বপ্ন টুকছেন বলে বলছি না (অট্টহাসি)... যদি দেখেও থাকেন, খুব ভালো... এটা ট্রান্সফর্মেশান সিগনিফাই করে... মানে সাবকনশাসলি আপনি ট্রান্সফর্ম হতে চাইছেন প্রবলভাবে... খুব ভালো লক্ষণ... গুড সাইন"



(১০ ই ফেব্রুয়ারি/ ২০১২)



"ডাক্তারবাবু, প্লিজ আমাকে সামনের রোববার রিলিজ করে দিন, আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারছি না... খুব কষ্ট হয়... স্বপ্নে ওকে দেখি খুব, আমরা একসাথে খুব আনন্দে সংসার করছি... খুব লিখছি আমি আর ওকে পড়াচ্ছি..... ঘুমও খুব ভালো হয়... কেন যে বোকার মতো ওইসব করতে গেলাম (কোনো কান্না নয়)..."

"হুম, দেখছি... তবে রোজ স্বপ্ন দেখছেন মানে ঘুমটা ভালো হচ্ছে না... রিভোট্রিলটা ডোজ বাড়িয়ে দিলাম... কাউন্সেলিং-এ যাবেন প্রতিদিন ম্যাডামের কাছে"

"হ্যাঁ, রোজ যাই... প্লিজ এই রোববার রিলিজ করে দিন... প্লিজ"







(২ রা আগস্ট/ ২০১৩)



নিজের এ্যাপার্টমেন্টে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল বিখ্যাত মনোবিদ ডঃ শ্রীকান্ত তপাদারের মৃতদেহ। হলিউড সাইকো মুভিগুলোর মতো দেওয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা "স্টোমাক ওয়াশের বদলা নিল বিবেকানন্দ"







১৪ই ফেব্রুয়ারি/ ২০১৪



ক্যালকাটা মেডিক্যাল সেন্টার, সি এম সি-তে নিউরো-সাইকিয়াট্রিস্ট ডঃ শ্যামল নন্দীর চেম্বার

"ডঃ নন্দী, একটা স্বপ্ন আমাকে সারাদিন কেমন একটা ফিয়ার সাইকোসিসের মধ্যে রাখে"

"বাবাঃ, ফিয়ার সাইকোসিস, আপনি তো দেখছি বেশ সাইকোলজির টার্ম ফার্ম জানেন ইন্দ্রনাথবাবু!! অবশ্য লেখক মানুষ। তা কি স্বপ্ন?"

"আমি দেখি আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে খুন করছি, কারণ তার রক্ত দিয়ে আমি লিখবো... নৃশংসভাবে খুন করছি... প্রচুর রক্ত বেরোচ্ছে কিন্তু ক্লট করে যাচ্ছে... আমি তুলি ডোবাতে পারছি না... হঠাৎ বাথরুমে খুঁজে পাচ্ছি সার দিয়ে সাজানো আলতার শিশি... খুব খুশি হচ্ছি, তাহলে লাল রঙে লিখতে পারবো... কিন্তু আলতার শিশিগুলি একটাও ভাঙতে পারছি না... আছাড় মারছি, তবু ভাঙছে না... ঘেমে নেয়ে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে..."

"করেছেন কী মশাই??!! সাইকিয়াট্রিস্টকে খুন... রক্ত দিয়ে লিখবার তুলি... কম্যুনিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল... তারপর রক্তের বদলে আলতা... ডিগ্রেডেশান অফ কম্যুনিজম... মেনে নিতে পারছেন না... ভাঙছে না... গল্প লেখার মতো ইন্টেলেকচুয়াল থিম মশাই... আপনি নবারুণ ভট্টাচার্য পছন্দ করেন? কম্যুনিস্ট অপটিমিস্ট ফ্রম দ্য কোর অব দ্য হার্ট, লেখায় হরর, বিজ্যার"

"হেঁ হেঁ... এ্যাঁ!!! আপনার পেশেন্ট নাকি??"


০৪ শ্রাবণী দাশগুপ্ত

জল, চশমা ও সবুজ গল্প
শ্রাবণী দাশগুপ্ত



আর কোনও কিছু না, নিশীথের মনে পড়ছিল চশমাগুলোকে। বাহারি ফ্রেম সুদৃশ্য বাক্সে। পাঁচ বছরে পাঁচটা। শেষেরটা মোটে তিনমাস আগে, জন্মদিনে। ঝুমুর বিরক্ত, য ত্ত স ব! যদিও চালশে দেরিতে –- গড়িয়ে গড়িয়ে পাঁচবছর পরে। দেখতে অসুবিধে... একবারেই বাইফোক্যাল। প্লাস ওয়ান আর মাইনাস ওয়ান। এখনো প্রায় একই পাওয়ার, তফাত ইতর বিশেষ। দোকানের আয়নায় চশমার নতুন ডিজাইনে মোটামুটি সাধারণ নাকচোখও একই। তবু সূক্ষ্ম পরিবর্তনটুকু খুব মন দিয়ে নিশীথ নিরীক্ষণ করে। হাফ-রিম দুটো, একটা রিমলেস, নতুনটা বড়সড় ফ্রেমে। সেলফ-অবসেস্‌ড্‌ লোক একটা... ভেঙিয়েছিল ঝুমুর।



ঠিক পেছন ফিরল না নিশীথ, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। মাঝারি মাপের একটা গল্প; দুলছে। কিন্তু তার সমস্তটুকু মজবুত ভাবে মনে নেই। টুকরো টাকরা এদিক ওদিক। ঠিক দুঃখ হলো না। একটু ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছিল পায়ের দিকে। সবে গয়ংগচ্ছ দুপুর শেষ। ঘাটলা থেকে খানিকটা নিচে সিঁড়িতে সে দাঁড়িয়ে। ধাপিটা গেছে বিশ্রি রকম ভেঙে। সবুজ জলের নিচে আরো কতখানি গভীর দেখতে পাওয়া যায় না। তার পা থরথর। অল্প হাওয়া ছাড়লে কী হবে বলা যায় না। বাবার কথা ভুলে গেছে। একদশক আগে মাকে পৌঁছাতে এসে ওপরের ঘাটলার শুকনোতে দাঁড়িয়েছিল। ভারি জল তেমনই ঠান্ডা। মা অবলীলায় সিঁড়ি ভেঙে তরতর কতদূর... একবারও পেছন দিকে তাকায় নি। তাকাতে নেই? তার আর অতদূর যাওয়া হলো কই? সিঁড়িটা এখনই ভাঙা, নড়বড়ে। পেছনে ঝুলন্ত গল্পে পাশাপাশি একজোড়া মসৃণ উঁচু কচি ঘাসের ঢিবি। কী অদ্ভুত! এর সঙ্গে ঝুমুরের কী সম্পর্ক?



হাতটা একভাবে টান করে রাখায় অবশ লাগছিল। নিশীথ জোর করে গুটিয়ে নিতে চেষ্টা করল। পারল না। কে হাঁ-হাঁ করে ছুটে এসে যতটা গুটিয়েছিল তাও সোজা করে দিল। চশমাবিহীন চোখে সবুজ গল্পের খামচা খামচা কিছু অংশের আলোময় ধাক্কা। শেষ চশমাটা বিশিষ্ট। প্রোগ্রেসিভ। ভাল মতো অভ্যাস হয়নি এখনও। দামও প্রচুর। দোকানদার নিখিলবাবু টুপি পরাল কিনা জানার উপায় নেই। চশমাটা কি আশেপাশে কোথাও... হাতটা বাড়ানো, অথচ একেবারে নাড়ানো যাচ্ছে না। গল্পটার মাত্র মাঝামাঝিটায় এমন ভাঙা সিঁড়ি। আর সামনে যাবার উপায় নেই। কষ্ট করে পিছনের ধাপিগুলোতে ফেরা যাবে কি? তাও কি হয়! কারা যেন ভাসছে এধার থেকে ওধার। ঝুমুর কোথায় এখন! প্রত্যেকবার চশমা কেনার সময়ে পঁচিশ পার্সেন্ট রিবেটে পালটে নেওয়ার কথা বলেছে। ওগুলো শেষ অবধি বোধহয় শোকেসে শোভা... গল্প শেষ হওয়ার আগেই তাকে কি তুলে রাখবে?




০৫ অপরাহ্ন সুসমিতো

করিডোর নিয়ে গল্প
অপরাহ্ন সুসমিতো


(ক)

আমি তখন ১ম বর্ষের ছাত্র। মাহবুব আলী তখন 'করিডোর' নামে একটা ম্যাগাজিন বের করতো। আমাকে কেউ চেনে না। ক্লাসে মন খারাপ করে চুপচাপ বসে থাকতাম। তৌহিদুল করিম চৌধুরী (আমরা বলতাম টি কে সি, তখন ক্লাস রুটিনে স্যারদের নাম সংক্ষেপে লেখা হতো) স্যার মাইক্রো ইকনোমিক থিওরি পড়াতেন। মাহবুব আলী ওর বিশাল শরীর নিয়ে করিডোরে ঘুরে বেড়াতো। ইশরাত জাহানকে দৌড়ে দৌড়ে নোট দিত। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম নোটগুলোর দিকে। ইশরাতের সাথে একদিন কথা বলতে গেলে ও আঙুল তুলে মুকুটের দিকে দেখিয়ে দিয়েছিল। ততদিনে জেনে গেছি মুকুট আমাদের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। ইশরাত ভেবেছিল আমি বুঝি মাহবুবের নোট কব্জা করতে চাইছি। তখন বুঝেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নোটের কী মাহাত্ম! মাহবুব আলী'র মতো নোট জোগাড় করত হবে ভেবে উঠে পড়ে লেগে গেলাম লাইব্রেরীতে। ওখানে গিয়ে আবিস্কার করি, আমাদের ক্লাসের ঝকঝকে মেয়েটাকে, নীলুফার জামান সীমা। কী চমৎকার করে ইংরেজি বলে! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। কেউ কেউ বলে সীমা ডাক্তারী পড়া ছেড়ে ইকনোমিক্স পড়তে এসেছে। আমার ইকনোমিক্সে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায়। সীমার সামনে কুঁকড়ে থাকি। অবাক কান্ড সীমা আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। আমার লাইব্রেরী ওয়ার্ক তুমুল বেড়ে যায়।

একদিন আমরা দলে বলে পাহাড় ডিঙিয়ে সীমাদের বাসায় যাই। কী সুন্দর ওদের বাসা! ওর বাবা ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক। আমি একদিন সীমাকে বলি, আমার ফরেস্ট্রি পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। মানে আমার বাবা খুব চাইছিলেন। সীমা বলল : সত্যি চাও? বাবাকে বলে দেখতে পারি। আমি বললাম : না থাক। ইকনোমিক্সই পড়তে থাকি, ভবিষ্যতে অর্থমন্ত্রী হব। সীমা হাসতে হাসতে শেষ। সীমাদের বাড়ি থেকে নামতেই ঢালু পিচ-ঢালা রাস্তা। শামসুন নাহার হলের সামনে কত ছেলেদের ভিড়। আমার তখন কবি আবুল হাসানকে মনে পড়ে। মানুষ কতো একা, চিবুকের কাছে একা।

সন্ধ্যা নামছিল কালো ওড়নার মতো। তখন আচানক মনে হলো, এখানে আমাকে কেউ চেনে না। চাটগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একা। সেই সন্ধ্যাটায় মন খারাপের একটা জগদ্দল পাথর বুকে টুপ করে বসে পড়েছিল। রাতের বেলা আজিম বলল : চল গৌতমকে নিয়ে রেলস্টেশন থেকে ঘুরে আসি। গৌতম তখন সমাজতন্ত্রের কথা বলতো। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, কী করে ডিপার্টমেন্টে সবাই আমাকে চিনবে? আমি তখন শাহজালাল হলে সিট পাইনি। শাহজালাল হলের সামনে সদ্য নির্মিত কুঁড়েঘর ‘শান্তিনিকেতন’ এ থাকি। মনু মিয়ার কটেজ। কটেজে থাকি, শাহজালাল হলে শাওয়ার করতে যাই, দেয়াল টপকে। পাশের চৌকিতে আজিম ঘুমাচ্ছে , আমার ঘুম নেই। এ পাশ ও পাশ করছি, তখন ওই চন্দ্রালোকে ভেসে যাওয়া গভীর রাত্রিতে একটা গল্পের প্লট মাথায় খেলা করে যায়। লিখতে বসে যাই কোনো বল পেন নিয়ে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দে রাত বাড়তে থাকে একাকী, আমিও। নিশি পাওয়া বাউলের মতো। সকাল হলে দেখি, এ এক অসাধারণ সকাল! রেণুময় শিহরিত সকাল। রব ভাইয়ের দোকানে নাস্তা সেরেই ছুটি ক্লাসে। পকেটে টাটকা গত রাতের নিশিথিনী গল্প। নিতাই নাগ স্যারের ক্লাস হতেই মাহবুব আলীকে বাড়িয়ে দিলাম কাল রাতের সেই সুবাসিত টাটকা গল্প। মাহবুব আলী তার ভারি চশমা সরিয়ে বলল : ইশরাত বলেছে কারে নোট না নিতে। আমি খুব বিনয়ী ভঙ্গিতে বললাম : নোট নয়, গল্প। করিডোর’এর গল্প।

(খ)

আমাদের ম্যাক্রো ইকনোমিক থিওরি পড়াতেন ড: শাকের। স্যারকে হাসতে দেখিনি। হাঁ করে বোঝার চেষ্টা করি। সুজিতকে জিজ্ঞেস করি : মাথায় ঢোকে কিছু? সুজিত হচ্ছে হাত বাড়ানো বন্ধুর মতো। একদিন বাসে আমার কানের সামনে মুখ নিয়ে বলে

: তুমি অপরাহ্ণ সুসমিতো? তোমার গল্প পড়লাম। আমি সুজিত রায়।

: তুমি সত্যজিতের কিছু হও?

সুজিত প্রেমে পড়ার মতো একটা হাসি দেয়। সুজিত আমাদের পাড়ায় চলে আসে শহরে ওর দাদু'র আস্তানা ছেড়ে। আমাদের রাতের দিনের বেসুমার আড্ডা বেড়ে যেতে থাকে। শাহজালাল হলের পেছন দিয়ে কাটা পাহাড়। বাস যাবার জন্য পাহাড় কাটা হয়েছিল, কিন্তু যে কারণেই হোক আমাদের দেশে'র অন্যান্য প্রজেক্ট-এর মতো দশা। থেমে আছে রাস্তা। কিন্তু আমরা তো থেমে থাকতে পারিনা । শামসুন নাহার (নতুন শাখা) হলে যাবার কোণাকুণি রাস্তা অবিলম্বে আবিষ্কার হলো। সুজিতকে বললাম

: কই দেখাও।

সুজিত বললো : ইশরাতের কাছে আছে।

তার মানে আবার ইশরাত। বিকেলে অত:পর আমরা সেই পাহাড় কাটা কোণাকুণি পথ ধরে। শামসুন নাহারে যাবার দ্রুতগামী পুলসেরাত। বিকেলের দলে জমা হয় : আজিম, গৌতম, সুজিত ও মুকুট। মুকুটকে নেওয়ার বুদ্ধি : মুকুট ও ইশরাত দুজনেই একে অন্যকে আগে থেকেই চেনে। ওরা একই শহর থেকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক। শহীদ মিনারের কাছে এসে আমার মন এত ভালো হয়ে যায়। সন্ধ্যাটুকু বাগানের ঢল মনে হলো। এত বড় স্তম্ভ! কতো ছেলেমেয়ে। কাকলী'র ধ্বনি। শহীদ মিনারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া সড়কটাকে 'করিডোর' 'করিডোর' মনে লাগে। শহীদ মিনার নিয়ে আলাদা একটা ভয় মেশানো ছিল, ভয়টা মুহূর্তে উড়ে যায়। সুজিত মুকুটকে বলে

: মুকুট গান করো।

মুকুট সুজিতকে এক ধমক দেয়

: ফাইজলামি পাইছো! মেয়েদের হলের সামনে করি গান আর ইশরাত ভাববো আমরা সবাই তারে দেখতে আইছি। পারতাম না।

গৌতম, আজিম মুকুটের ধমকের স্টাইল দেখে হো হো করে হেসে ওঠে। এত প্রাণের হাসি। মেয়েদের হলে যাবার তরুণ শিহরিত হাসি। আমার মাথায় একটা অসভ্য পংক্তি ঘূর্ণন দিয়ে ওঠে।

: বৃষ্টির ডানা নেই জল হয়ে আকাশ থেকে পড়ে। পাখিদের ডানা আছে, মুক্ত হয়ে ভূমি থেকে ওড়ে।

মাথার উপর দিয়ে চলে যায় কতোগুলো বিকাল পাখি। নাম জানি না। শহীদ মিনারের এক কোণায় মুকুল, অন্য কোণায় মোজাম্মেল, মাঝখানে কতোগুলো মেয়ে। মুকুল আর মোজাম্মেলের একটা দারুন ভ্যারিয়েশন আছে, মুকুল যেমন লম্বা, মোজাম্মেল তেমনি ছোটখাট। মুকুল আমাদের দেখিয়ে ৫৫৫ সিগারেট ধরায়। মোজাম্মেল সিগারেট খায় না, লাজুক কিংবা চোরা হাসি দিয়ে বসে থাকে, ভাবখানা, আমি নিজে আসিনি, মুকুল ধইরা নিয়া আসছে।

দেখাদেখি আমাদের আজিমও সিগারেট ধরালো ফস করে।

চাটগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকাল নামে দলবলে। আমি মুগ্ধতা নিয়ে সন্ধ্যা দেখি, অপেক্ষা করি রাত নামার।




০৬ নীতা বিশ্বাস

খুঁজেছি তোমায়
নীতা বিশ্বাস


চাঁদেলাআলো ২৫তলার জানালায় হুড়মুড়িয়ে স্টুডিওঘরের দখলদার। শুরুটা এইরকমই। কেয়াগন্ধ বাতাস একঝলক –- হাই রঞ্জন! মন খারাপ? স্বাতী এলে! চাঁদ ছুঁয়ে এসেছো? কেন! তাকে না ছুঁয়ে এলে আমি ট্রেসপাসার? চলে যাচ্ছি। রাগ? তবে কী ভেবেছো অনুরাগ? ভাবতে পারি না? না। আমি নক্ষত্র। পূর্ণিমাচাঁদালোকে আমি কেয়ার করিনি রঞ্জন, কেয়াগন্ধ ভুলে গেছ? ভ্রুকুটি কোরো না স্বাতী। আমার ২৫তলার জানালায় গ্রীলের বন্ধন নেই, সর্বস্ব খোলা। খোলা আকাশ, খোলা বাতাস, খোলা নীহারিকা নক্ষত্র সব সব -- হ্যাঁ হ্যাঁ ওই নির্বসনা চাঁদও যাকে নেকুপনা করে জোছোনা বলো তোমরা। বাঃ, কবে থেকে এরম হলে স্বাতী? কী রকম? ঐ যে ঠিকঠাক সুন্দর উপমাটি দিলে -- নির্বসনা চাঁদ। নির্বসনা বলেই তো এমন মোলায়েম পিছল আলো। এ আলোতে কতজন যে পিছলেছে জানো স্বাতী! ক-ত- জ-ন ল্যুনাটিক...। অন্য অনেকজনকে জানি না, তবে তোমাকে জানি, যে বারে বারে আছাড় খায়। কতবার যে এই নির্বসনাদের কাছে নির্বাসন চেয়েছো! বসনহীনাদের তো তোমার ইজেলে ক্যানভাসে রঙে তুলিতে যথেচ্ছ যাতায়াত। তাদেরও কি এরকম পিছল আলো শরীর জুড়ে, চরাচর জুড়ে! উহুঁ, শুধু পিছল নয়, পিতল আলো। মানে? জানতে চেয়ো না স্বাতী, সব কথার কি শব্দার্থ হয়! অনুভবার্থ বলেও, ব্যাঞ্জনা বলেও...। অনুভব, ব্যাঞ্জনা -- এসব তো তোমার চিরকালের, শরীরের ওপারেও এক অন্য শরীর... এইসব বাতেলা। আছে আছে স্বাতী। নক্ষত্রের ইগো নিয়ে তুমি কোনোদিন চাওনি দেখতে...। থামো। কোনো নারীর বুকের আগুন তুমি দেখেছো? দেখিয়েছে তোমার ক্যানভাস? দেখেছো তার পিপাসাঘন বুক? বুকের আগুনে জসমিন রাইস ফোটায় সে, পিপাসার্ত শিশু থেকে যাত্রা শুরু করে হদ্দ মুদ্দ বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার পিপাসাও মেটায় সে-ই। দেখার ওপারে এই দেখা কি তুমি কখনো দেখেছ রঞ্জন? মিটিয়েছো তারও খুদপিপাসা? কোনোদিন? তোমরা শুধু তার বুকের ঢেউ গুনতেই জানো। এভাবে বেঁধাও কেন স্বাতী অহোরহ তোমার শজারুকাঁটায়? কী সুখ পাও? বিঁধেছে তোমায়, এই আমার সুখ। এই যে তোমার বিছানায় কাগজে শুয়ে-বসে থাকা পিনোদ্ধতা, স্বচ্ছ সর্বাঙ্গপ্রকটিনী, তাকে কি তুমি ভালোবাসতে জান? না-আ-আ, হাত বাড়িও না স্বাতী, স্বাতীনক্ষত্র আমার।

রঙ-তুলির জীবন্তকে নিয়ে আমি ঝলক বাতাসের তাড়নায় বিশাল নগ্ন জানালায় আছড়ে পড়ি, পড়তে থাকি, পড়তে থাকি, পড়তে থাকি অখন্ড চরাচরের খোলা বুকে, নক্ষত্র পতনের ওপারে নারীর বুকের আদিম থেকে আগুনে, পেয়ভান্ডারের স্নিগ্ধতায় তাকে প্রথম খুঁজতে, পেতে...

০৭ অর্ক চট্টোপাধ্যায়

রেডরুম
অর্ক চট্টোপাধ্যায়


আমার আপার্টমেন্টে সব মিলিয়ে পাঁচটা ঘর। আমি একটায় থাকি। বাকি চারটে ফাঁকা। বাড়িওয়ালা ওই ঘরগুলো প্রথমে বন্ধ করে রেখেছিলো। আমি যখন আমার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে হাঁটতাম, বন্ধ দরজাগুলো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো। ঘর থেকে বেরোলে উল্টোদিকের দেওয়ালের রঙ টকটকে লাল, দরজাগুলোও লাল। ভেতরের রং লাল কিনা বলা যেতো না তখন। আমার ঘরের দিকের দেওয়াল সাদা; ভেতর বাইরে দু’দিকেই। আমার ঘরের দরজার রঙও সাদা; ভেতর বাইরে দু’দিকেই।

আমার পাশের ঘরের দরজাও বাইরে থেকে সাদা। ভেতর জানা নেই। যা দেখতাম তা হলো : লাল দেওয়াল বরাবর তিনটে লাল দরজার ঘর আর বাকি দুটো, যার মধ্যে একটা আমার, সাদা দেওয়াল বরাবর সাদা দরজার ঘর।

তারপর একদিন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে দেখলাম বাড়িওয়ালা এসে আমার উল্টোদিকের তিনটে লাল ঘর খুলে দিয়ে গেছে। হয়তো হাওয়া খেলানোর জন্য। হয়তো অন্য ভাড়াটে আসবে বলে। ঘরগুলোয় ঢুকে দেখলাম তাদের ভেতরটাও লাল। টকটকে লাল।

REDRUM REDRUM

তারপর যখনি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে হাঁটতাম, চাপা নিশ্বাসের শব্দ আসতো। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম নিজের। তারপর মনে হলো, তা কী করে হয়! এ নিশ্চয়ই ঘরগুলোর শ্বাস প্রশ্বাস... ওমা, সেইজন্যই তো তাদের খুলে রেখে গেছে বাড়িওয়ালা... যাতে খানিক দম নিতে পারে। আমার পাশের সাদা দরজার ঘরটা কিন্তু বন্ধই আছে। সেখানে শ্বাসের শব্দও শোনা যায় না। তবে হয়তো ওই ঘরে ভাড়াটে আসছে না আপাতত।

ওদিকের তিনটে ঘরের ভেতর আর বাইরের দেওয়াল আর দরজা দুইই লাল। আমার ঘরের ভেতর আর বাইরের দেওয়াল আর দরজা দুইই সাদা। এর থেকে ধরেই নিলাম আমার পাশের সাদা দরজার ঘরের ভেতরটাও নিশ্চয়ই পুরো সাদা।

তারপর সাদার ওপর লাল উঠলো, লালের পিঠে সাদা। দিনের ওপর রাত উঠলো আর রাতের পিঠে দিন। লালের ওপর সাদা উঠলো আর সাদার পিঠে লাল। দিনের ওপর মাস উঠলো আর মাসের পিঠে বছর।

আমি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে হাঁটতাম আর লাল ঘরগুলোয় শ্বাসের শব্দের ওঠানামা শুনতাম। পাশের ঘরের দরজার সামনে চলে এলে চুপ। ঘরের ভেতরের সাদা রঙ দেখতে বড্ড ইচ্ছে করতো। কিন্তু দরজার মাঝামাঝি স্টিলের লক নায়ের গায়ে হেলান দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো। একেক দিন তো ভেবেছি ভেঙেই ফেলবো দরজাটা! দু’হাতে মেখে নেব সাদা দেওয়ালের নিশ্বাস, কিন্তু তারপর আবার শান্ত হয়ে নিজের ঘরে ফিরে শুয়ে পড়েছি।

তারপর আবার সাদার ওপর লাল উঠেছে, লালের পিঠে সাদা। দিনের ওপর রাত উঠেছে আর রাতের পিঠে দিন। লালের ওপর সাদা উঠেছে আর সাদার পিঠে লাল। দিনের ওপর মাস উঠেছে আর মাসের পিঠে বছর।

এতগুলো বছর হয়ে গেলো, কেউ আসেনি আমার আপার্টমেন্টে। লাল ঘরের দরজাগুলো যে-কে সেই খোলা, শ্বাস-প্রশ্বাস অব্যাহত। তারপর একদিন সন্ধেবেলা একটা ঘটনা ঘটলো। অফিস থেকে ফিরতেই চোখে পড়লো, আমার পাশের ঘরের দরজাটা বাড়িওয়ালা এসে খুলে দিয়ে গেছে। হাট করে খোলা দরজার ভেতর থেকে ঘরের রং ঠিকরে বেরোচ্ছে। ঘরের ভেতরটা লাল। টকটকে লাল। কিন্তু না, কান পাতলেও কোনো নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে না। আমি এখন ওই ঘরেই থাকি। ওই ঘরেই লিখি

MURDER MURDER...