পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৫

**** কালিমাটি অনলাইন / ২৪ ****

সম্পাদকীয়

  
আমরা, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলি, বাংলা ভাষায় গান করি, বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করি ও সাহিত্যচর্চা করি; কয়েকশ বছর আগে বাংলা ভাষায় এমন একজন মহান কবিকে আমাদের মধ্যে পেয়েছিলাম, যাঁর জন্য আমরা আজও গর্ব বোধ করি এবং ভবিষ্যতেও করব, হিমালয় সদৃশ উচ্চতায় ও গভীরতায়। কেননা সেই কবি  তাঁর পদাবলীতে একটি চিরকালীন সত্য উচ্চারণ করে গেছেন সামগ্রীক বিশ্বের মানুষের উদ্দেশ্যে। “সবার উপরে মানুষ সত্য...”। আমরা সেই প্রণম্য কবি চন্ডীদাসের অনন্য পংক্তিতে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে আরও দুটি শব্দ সংযোজন করতে আগ্রহী – “সবার উপরে মানুষ সত্য... এবং মনুষ্যত্ব”। কেননা মানুষের সভ্যতার ইতিহাস পাঠ ও পর্যালোচনা করে একটি ব্যাপারে সবাই সহমত পোষণ করবেন যে, কোনো মানবীর গর্ভে মানুষের মতো শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রতিপালিত হয়ে ভূমিষ্ঠ হলেই সে যে মানবিক গুণ ও মনুষ্যত্বের অধিকারী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর এই পৃথিবীতে যে মনুষ্যত্বহীন মানুষের আকার বিশিষ্ট প্রাণীর সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে, একথাই বা কে অস্বীকার করবেন! না, এটা শুধুমাত্র কোনো হতাশা এবং নিরাশার  কথা নয়; বরং এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যাঁরা জন্মগত সূত্রে মানুষের শারীরিক গঠন লাভ করার পর মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের সম্পর্কে আমরা কতটা ওয়াকিবহাল এবং কতটা শ্রদ্ধাশীল? কতটা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার জন্য আগ্রহী ও উদ্যোগী আমরা?

সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। ঝাড়খন্ড রাজ্যের বোকারোর সোনালি মুখোপাধ্যায়। যখন তাঁর বয়স মাত্র আঠারো, দুষ্কৃতীর অ্যাসিড হামলায়   সাংঘাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাঁর মুখমন্ডল। সেই নৃশংসতায় যেন হারিয়ে যেতে বসেছিল জীবনের সব রঙ ও স্বপ্ন। কিন্তু না, তা হারিয়ে যায়নি। হারিয়ে যেতে দেননি সোনালি মুখোপাধ্যায়। কেননা হেরে যেতে তিনি শেখেননি কখনই। নিজেকে মানুষ রূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লড়াই চালিয়ে গেছিলেন অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসে। শিক্ষাজীবন শেষ করে প্রবেশ করেছিলেন কর্মজীবনে। মেরুদন্ড সটান ও দৃঢ় করে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন নিজেরই দুই পায়ে। সোনালির এই জীবনসংগ্রাম কি অসামান্য নয়? মহাকাব্যিক নয়? সারা বিশ্বের কলা ও সাহিত্যে এই ধরনের অসাধারণ জীবনযাত্রাই তো অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে চিরকাল। ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয়  টিভি সিরিয়াল অনুষ্ঠান ‘কৌন বনেগা কড়োরপতি’তে সোনালিকে আমরা দেখেছিলাম একমেবদ্বিতীয়ম অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের মুখোমুখি বসতেবস্তুত সোনালিকে শ্রদ্ধা  জানাতেই এই অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

যাইহোক এসবই মহাকাব্যের প্রথম পর্বের কথা। কিন্তু মহাকাব্যের দ্বিতীয় পর্ব যে  আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ ও তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে উঠবে, তা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। সম্প্রতি সোনালি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন জামশেদপুরের চিত্তরঞ্জন তিওয়ারীর সঙ্গে।  চিত্তরঞ্জন পেশায় ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনীয়ার। কর্মসূত্রে তিনি বর্তমানে আছেন ওড়িশ্যার  ভূষণ স্টিল প্ল্যান্টে। এবং তাঁদের এই বিয়ে প্রেমজ। সোনালির জীবনের বিপর্যয়ের কথা চিত্তরঞ্জন অনেক আগেই জেনেছিলেন। তারপর তিনি নিজেই আগ্রহী হয়ে যোগাযোগ করেছিলেন সোনালির সঙ্গে। বন্ধুত্ব। গাঢ় বন্ধুত্ব।  ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। ক্রমে প্রেম। এবং শেষে পরিণয়। না, কোনো সহানুভূতি বা সমবেদনার মেলোড্রামা এখানে নেইনেই কোনো উচ্চগ্রামের রূপ ও রূপটানের মেলোডি। বরং আছে হৃদয়ের নিভৃত লেনদেন আর সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার ও মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য নিরন্তর যাত্রা বা ‘জার্নি’।

অনেকেই বলেন, সাহিত্যে মহাকাব্যের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। কথাটা তাঁরা ঠিকই বলেন। পরবর্তী যুগে আর মহাকাব্য রচিত হয়নি। বরং সাহিত্যে  প্রচলিত হয়েছে অনেক নতুন নতুন আঙ্গিক, শৈলী ও ‘ফরম্যাট’। কিন্তু একথাও ঠিক যে, সাহিত্যে মহাকাব্যের যুগ শেষ হলেও শেষ হয়নি মহাকাব্যিক জীবন। আর এইসব মহাকাব্যিক জীবনই তো অনুপ্রেরণা যোগায় নতুন নতুন আঙ্গিক, শৈলী ও ‘ফরম্যাটে’ সাহিত্য সৃজনের। এবং সেইসঙ্গে আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে মনুষ্যত্ব অর্জনের যাত্রায় বা ‘জার্নি’তে। আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জানাই সোনালি মুখোপাধ্যায় ও চিত্তরঞ্জন তেওয়ারীকে। কামনা করি তাঁদের সুখী দাম্পত্য জীবনের।       

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India
     




'> 

**** কথনবিশ্ব ****


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

‘কাহারো ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায় ...’ : কিছু অসংলগ্ন ভাবনা


 ()                                                                      
ওপরের পংক্তিটি (প্রায়) সবার চেনারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাষাভিত্তিক দেশচেতনার অভাবে তাঁর এই দুঃখের অনুভূতিটি  গানে লিখলেন, বাংলা ১৩০৪ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে, ইংরিজি ১৮৯৭ সালের মার্চে। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ছাপা হলো, মানে কবির  ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বছর বয়সে। পরের কথাগুলো ‘সে যে আমার জননীরে’ পড়লেই (বা শুনলেই) বোঝা যায় যে পুরো একশো আঠারো বছর পরে কথাটা দ্বিগুণ সত্যিকোনো নব্যবঙ্গী (দ্বিতীয় পর্যায়ের) আর ‘বাঙ্গালা’ শিখতেই চান না। রবীন্দ্রনাথের অনেক আগে লেখা, বঙ্কিমের বঙ্গদর্শনে ‘বাংলা সাহিত্যের আদর’-এর ব্যঙ্গ দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এসেছে বাঙালির মধ্যে। তফাতের মধ্যে, এবার তার শিকার কেবল ইংরিজি  মাধ্যমে শিক্ষিত/উচ্চশিক্ষিত বাংলার বাঙালি নন, আপাদমাথা বাংলা মাধ্যমে শিক্ষিত/উচ্চশিক্ষিত বাঙালিও। বঙ্কিমের  স্বাজাত্যবোধের তথা দেশাত্মবোধের উপর সংরক্ত বক্তিমা করে (জাতীয়তাবাদ কথাটা তাঁর সময়ে চালুই হয়নি) শেষে দ্বিতীয়োক্ত ধরনের শ্রোতাদের থেকে জানতে পারি, তাঁরা কেউ বঙ্কিমের উপন্যাসগুলোও  পড়েননি, প্রবন্ধ তো দূরস্থান। কারণ ভাষার বাধার প্রকাশ আবার দুরকমের।  ছাত্র/ছাত্রীদের বঙ্কিমের জাতীয়তাবাদ পড়াই। যারা ইংরিজি ও বাংলা মাধ্যমে পড়ে উভয়দেরই বলি, আদি বাংলায় অথবা ইংরিজি বা অন্য কোনো ভাষায়, যেমন হিন্দি, অনুবাদে কৃষ্ণচরিত্র, কমলাকান্ত, ধর্মতত্ত্ব, ইত্যাদির অংশ, এবং কয়েকটি অন্ততঃ উপন্যাস পড়তে হবেই, সঙ্গে অন্ততঃ পার্থ চ্যাটার্জির, সুদীপ্ত কবিরাজের, তপন রায়চৌধুরির অসাধারণ বিশ্লেষণ। ইংরিজি মাধ্যমের ছাত্ররা তো বটেই, বাংলা মাধ্যমের ছাত্ররাও বঙ্কিমের উপর ইংরিজি সেকেন্ডারি টেক্সটগুলো পড়ে’ ফেলে। কিন্তু কেউ  বঙ্কিম পড়ে না। এর ফলে মজার মজার ঘটনাও ঘটে। ইন্টারভিউয়ে সপ্রতিভ প্রার্থী বঙ্কিমের উপর প্রশ্নে চোখা চোখা উত্তর দেন, বঙ্কিম ও ঔপনিবেশিক আধুনিকতার, বঙ্কিমের চিন্তায় উত্তর-আলোকোদ্ভাস চিন্তনের প্রভাবের নানান দিক বিষয়ে। কিন্তু যখন প্রশ্ন করা হয় বঙ্কিম কে? মানে তাঁর প্রাথমিক পরিচয় কী? উত্তর পাই, ব্যঙ্গসাহিত্যিক!
          
ভাবতেও কষ্ট হয় যে দুর্গেশনন্দিনীর যে বাক্যাংশটি — ‘প্রাবৃটসম্ভূত বারিধারার ন্যায় যুবতীর নয়নপল্লব জলভারস্পন্দিত’*— ক্লাস সিক্সে লুকিয়ে পড়ে’, বিশালাক্ষী, ‘ডাগর আঁখি’-র, ক্রন্দনপরা এক যুবতীর কথা ভেবে, কল্পনার নিষিদ্ধ আনন্দে ভাসা যেত, সেটি ভাষার বাধায় আর কারুর কানে বাজবে না। কেউ উপভোগ করতে পারবে না বিদ্যাসাগরের লেখা উত্তররামচরিতের সেই অমর বাক্যটি— ‘লক্ষ্মণ কহিলেন আর্যে! এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি। ইহার শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চরমাণ জলধরপটলের যোগে নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত। পাদদেশে প্রছন্নসলিলা গোদাবরী প্রবহমাণা।’ (* কেন কিনা এই ধ্বনিগুঞ্জরিত বাংলা আর অনেকের কাছেই অধিগম্য নয়। সংস্কৃত শব্দের বাধা।)

কেউ বলতেই পারেন যে, যে কালে এই রাজ্যে প্রায় আটত্রিশ বছর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষণীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত চলে গেছে (গত চার বছরে তা বদলায়ও নি), যার জন্য ‘লড়াকু পুরোহিত সমিতি’ তাঁদের সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণে, বোধে, পাঠে অসুবিধার জন্য বামফ্রন্ট সরকারকে দোষারোপ করেন, সেখানে বিদ্যাসাগরী/বঙ্কিমী ভাষা তো তরুণ প্রজন্মকে প্রতিহত করবেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ? তাঁর ভাষাতেও বাধা?
       
ঠিক কত দূর যেতে পারে এই বাধার শিকড় তার একটি ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী তাঁর Thy Hand, Great Anarch!: India 1921-1952(১৯৮৭) বইতেসেখানে তিনি বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ শিল্পী রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্যের কথা জানাতে গিয়ে বলছেন:
নিজের জীবদ্দশায় তিনি সহ-বাঙালিদের অধিকাংশের দ্বারা প্রায় পরিত্যক্ত হয়েছিলেন, কারণ তিনি যা লিখতেন সেটা তাঁদের মাথার উপর বেরিয়ে যেত, এমন কি যে অল্পসংখ্যক অনুরাগী তাঁর বিগ্রহায়ন করত তাঁরাও সেটা বুঝতেন না। এখন অবস্থাটা আরো খারাপ, কারণ বাঙালি জীবন আর সাহিত্যিক ঐতিহ্য এত আলাদা হয়ে গেছে ... কারণ তাঁর সমসাময়িক বাঙালিদের কাছে অল্পবিস্তর অনধিগম্য হয়ে গেছে। [‘He was virtually rejected by a majority of fellow Bengalis in his life time, because what he wrote was far above their head, not fully understood even by the small number of admirers who made an idol of him. Now the position is even worse, because both Bengali life and Bengali literary traditions have become so different … because both his matter and manner have become more or less inaccessible to contemporary Bengalees.’] একটু পরেই নীরদচন্দ্র বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে এমন সময় আসবে যখন রবীন্দ্রনাথের কাব্যে  সাহিত্যে অর্থ ও সম্পদ খুঁজতে পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক খনক লাগাতে হবে। কিন্তু আমরা আদৌ পাবো সেই সন্নিষ্ঠ, সংরক্ত খনক, যিনি ভাববেন, ‘কোন পুণ্যবলে সেই খনির ভিতরে/প্রবেশি গাঁথিয়া মালা অমূল্যরতনে,/সাজাইব মাতৃভাষা কমকলেবরে?/সুকবি, সুকরে গাঁথা মহাকাব্যধনে/ সজ্জিত যে বরবপু?(নবীনচন্দ্র সেন)’

সমস্যাটা কি কেবল সংস্কৃতগন্ধী ভাষা নিয়ে? হতে পারেও বা। পরীক্ষার খাতায় ছাত্রছাত্রী রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ সম্পর্কে ধারণার কথা বলতে গিয়ে কোনো ‘নিগুঁড় বয়বের’ কথা বলে। শিউরে উঠি কেবল তাদের অবস্থার কথা ভেবে নয়, তাদের ‘সোর্স’ বা উৎসের কথা ভেবেও। বানানের কথা না বলাই ভালো।  সহযোগিতা/প্রতিযোগিতার ‘গ’ ঈ নিয়ে মুখ ভ্যাঙায়। ণত্বষত্বের দশা করুণতর। ছোট্ট বেলায় বাবারা/শিক্ষকরা শেখাতেন, ‘ঋ-কার র-কার স-কারের পর ণকার যদি থাকে ঘ্যাঁচ করে তাঁর মাথা কাটি, কোন বাপ তার রাখে’। আজ সেই বাপরা কোথায়? ফেসবুকে প্রতিষ্ঠিত কবিরাও লিখছেন ‘নাভী’, ‘জীভ’ ‘হরীণ’, ‘করুন’,  ‘বানী’। সসঙ্কোচ প্রতিবাদ করলে চালু গত, ‘স্মার্ট ফোনের’ সমস্যা। এদিকে এফ. এম. রেডিও মিরচির কল্যাণে একই বাক্যে তিনটি ভাষা হরবকৎ চলছে। অটোসঙ্গিনীকে তাঁর সঙ্গী বলছেন, ‘এই তুই কেন for nothing আমার নামে ঝুটা ইলজাম দিচ্ছিস’? সঙ্গিনী তাতে বলেন, ‘বাওয়ালি করিস না তো!’ এদিকে বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে, বৈদ্যুতিন চ্যানেলে সপাটে ছয় মারছে ‘বিদ্যজন’,‘সখ্যতা’, ‘দৈন্যতা’,  ‘মৌনতা’। তাতে কারুর বেশি আপত্তিও দেখা যায় না। ‘মৌনং সম্মতিলক্ষণম্’?

এমন কথা বলতে ভয় লাগে। পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা, তাকেও কিনা বোকা বলে সকলে ‘ভুলিতে’ চায়? একথা শুনলে আমার প্রথম জীবনের কর্মস্থল কাটোয়ার স্থানীয় ভাষায় ‘হাত্তিও হাঁইসবে’। বাংলাদেশ ছোড়ো! এই পশ্চিমেও ভাষী কী কম? বেশ কিছুকাল আগে থেকেই, মানে ১৯৯৯র আগস্ট থেকে, নবজাগরণ গোষ্ঠি বাংলা ভাষা আর বাঙালি সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। তার দুটি সহ-সংগঠন ভাষা শহীদ স্মারক সমিতি আর ভাষা ও চেতনা এই  ভাষার বিবৃদ্ধির জন্য সাত হাত মাটি উপরে তুলে ফেলেছেন। ‘ফেসবুকে সাড়ে সাত লক্ষ কবি’ ছাড়াও নিত্য চর্চা করছেন মুখবইয়ের অজস্র মন্তব্যকারী। তার পরও ভাষাকে ভোলার কথা ওঠে?
 
ওঠে, তার কারণ এক বিশেষ ধাঁচের বাংলা, বরং বাক্-ক্রিয়া (speech act) বা লিখন-প্রক্রিয়া, ছেয়ে ফেলছে ভাষাকে। দেশি ভাষা, গ্রাম গঞ্জের মানুষের মুখের ভাষা প্রায় নেই। এর জন্য কতকটা দায়ী, আশ্চর্য হলেও সত্যি, রবীন্দ্রনাথ নিজেই। বঙ্কিম একটি উচ্চ সাহিত্য তৈরি করার জন্য কেঠো বিদ্যাসাগরী, আবার টেকচাঁদি, হুতোমি  ‘babu colloquial’-কে ছেড়ে বেরিয়ে একটি সচেতনভাবে শুদ্ধ, পরিশীলিত ভাষা তৈরি করতে চেয়েছিলেন যেখানে সুদীপ্ত কবিরাজের কথায় ভাষা হবে যুদ্ধের মঞ্চবঙ্গদর্শনে ১২৮৫-র জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় ‘বাঙ্গালা ভাষা: লিখিবার ভাষা’ প্রবন্ধে বঙ্কিম বলছেন:
‘...যে সকল সংস্কৃত শব্দ রূপান্তর না হইয়াই বাঙ্গালায় প্রচলিত আছে, তৎসম্পর্কে বিশেষ কিছু বলিবার নাই।... তৃতীয় শ্রেণীর, অর্থাৎ যে সকল শব্দ সংস্কৃতের সহিত সম্বন্ধশূন্য ... সংস্কৃতপ্রিয় লেখকদের অভ্যাস এই যে, এই শ্রেণীর শব্দ তাঁহারা রচনা হইতে একেবারে বাহির করিয়া দেন। ... ইহার পর মূর্খতা আমরা আর দেখি না। যদি কোনো ধনবান ইংরেজের অর্থভাণ্ডারে হালি এবং বাদশাহী দুই প্রকারের মোহর থাকে, এবং সেই ইংরেজ যদি জাত্যভিমানের বশ হইয়া বিবির মাথাওয়ালা মোহর রাখিয়া, ফার্সি মোহরগুলি ফেলিয়া দেয়, তবে সকলেই সেই ইংরেজকে ঘোরতর মূরখ বলিবে। কিন্তু ভাবিয়া দেখিলে এই পণ্ডিতেরা সেই মত মূর্খ।’

তাই এই মূর্খতা ঘোচাতে বঙ্কিম উচ্চ সাহিত্যের ভাষাগত আদর্শ বিষয়ে বলছেন, 
‘অনেক রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য সৌন্দর্য্য — সে স্থলে সৌন্দর্য্যের অনুরোধে শব্দের একটু অসাধারণতা সহ্য করিতে হয়। প্রথমে দেখিবে, তুমি যা বলিতে চাও, কোন ভাষায় তাহা সর্বাপেক্ষা পরিষ্কাররূপে ব্যক্ত হয়। যদি সরল প্রচলিত কথাবার্তার ভাষায় তাহা সর্ব্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট এবং সুন্দর হয় তবে কেন উচ্চভাষার আশ্রয় লইবে? যদি সে পক্ষে টেকচাঁদি, হুতোমি ভাষায় সকলের অপেক্ষা কার্য সুসিদ্ধ হয়, তবে তাহাই ব্যবহার করিবে। আওদি তদপেক্ষা বিদ্যাসাগর বা ভূদেববাবু প্রদর্শিত সংস্কৃতবহুল ভাষায় ভাবের অধিক স্পষ্টতা ও সৌন্দর্য্য হয়, তবে সামান্য ভাষা ছাড়িয়া সেই ভাষার আশ্রয় লইবে। যদি তাহাতেও কার্য সিদ্ধ না হয়, আরও উপরে উঠিবে; প্রয়োজনে আপত্তি নাই — নিষ্প্রয়োজনেই আপত্তি। বলিবার কথাগুলি পরিস্ফুট করিয়া বলিতে হইবে — যতটুকু বলিবার আছে সবটুকু বলিবে — তজ্জন্য ইংরেজি, ফার্সি, আর্‌বি, সংস্কৃত, গ্রাম্য, বন্য, যে ভাষার শব্দ প্রয়োজন, তাহা গ্রহণ করিবে, অশ্লীল ভিন্ন কাহাকেও ছাড়িবে না। তার পর সেই রচনাকে সৌন্দর্য্যবিশিষ্ট করিবে।’ (বঙ্কিম রচনাবলী, সাহিত্য সংসদ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩২০-২১)।
 
তাই আমরা দেখি বঙ্কিম অনায়াসে লিখতে পারেন প্রসন্ন বিষয়ে — এক জায়গায়, ‘দূর মাগি, ধেমো গোয়ালার  মেয়ে’, অন্যত্র তার প্রতি ‘প্রসক্তি’-র কথাতাই সুদীপ্ত কবিরাজ (The Unhappy Consciousness: Bankimchandra Chatopadhyay and the Formation of Nationalist Discourse in India) বঙ্কিমের লেখায় খুঁজে পান, ‘element of the popular, the carnivalesque, the market- like’রবীন্দ্রনাথের লেখায় এটি নেই। একদিকে ভারতীয় ধ্রুপদী আর এক দিকে পশ্চিমি উৎস থেকে নেওয়া উচ্চ সংস্কৃতি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এনেছিল এক নন্দনতাত্বিক এবং সংগুপ্তভাবে সামাজিক (‘aesthetic and surreptitiously social’) দ্বিস্তরীয় বা দ্বিতল পাতনযন্ত্র (‘double filter’), যা ভাষাকে অনেক বেশি পরিমাণে ঋদ্ধ ও সক্ষম করলেও একমাত্রিক করে তুলেছিল। ফলে তাঁর সাহিত্যে বাউল বৈরাগীরাও তাদের ভাষায় এবং সাংস্কৃতিক রুচিতে নিখুঁত রকমের ভদ্রলোক ও বাবু (‘impeccably babu in their language and cultural taste)সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথের লেখায় নিম্নবর্গীয়রা অনেক বেশি ভাষাবর্জিতবঙ্কিমের দিগ্বিজয়, গিরিজায়া, রঙ্গলাল, মাণিকলাল, রামচরণের তুল্য চরিত্র রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে নেই। ভাষা সম্পর্কে কবিরাজের আলোকে আমার করা এই দুজনের তুলনা যাঁর কষ্টকল্পিত মনে হবে, তিনি  বঙ্কিমের ভাষা বিষয়ে শেষ অসাধারণ উদ্ধৃতিটির সঙ্গে প্রবাসী-র ১৩৩৯ সালের সালের ভাদ্র সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘মক্তব-মাদ্রাসার বাংলা ভাষা’ প্রবন্ধটি পড়তে পারেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় ঢোকা অনেক আরবী, ফার্সি শব্দ নিয়ে তাঁর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ঠিক, যে প্রসঙ্গটি ছিল কিছু মুসলিম অত্যুৎসাহীর তরফে অনেক আরবী, ফার্সি শব্দ জোর করে  ঢোকানোয় তাঁর প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ভাবা যায় যে রবীন্দ্রনাথ ‘খাঁটি বাংলা’-র স্বার্থে যুগ্মশব্দ ‘খুনখারাবি’-কে মানলেও রক্ত অর্থে খুন-কে মানবেন না। নজরুল তো, ‘হায় সাকী এই আঙ্গুরী খুন, নয় ও হিয়ার খুন খারাব' দিব্যি উতরে দিয়েছেন!


(২)                               
বাংলা ভাষায় এই রাবীন্দ্রিক ছুঁৎমার্গ অনেক কুপ্রভাব রেখে গেছে। এমন নয় যে কোনো উপন্যাসিক, গল্পকার লোকের কথ্য ভাষা তুলে আনেননি। উদাহরণ অনেক। শরৎচন্দ্রের ভাষা অনেক শিষ্ট হলেও, তিন বাঁড়ুজ্জ্যের মধ্যে তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ রাঢ় ও দক্ষিণ বঙ্গের অনেক দেশি কথা সমাহৃত করেছেন তাঁদের লেখায়। মাণিকের পদ্মানদীর মাঝিতে  এসেছে তখনকার পুব বাংলার নিম্নবর্গীয়দের মুখের ভাষা। সমরেশের উপজাতীয় জীবনের দীর্ঘ আখ্যানে আরণ্যক মানুষের মিশ্র বাঙালি ভাষা (দুই অরণ্য, ‘শানা বাউড়ির কথকতা’), প্রফুল্ল রায়ের পূর্বপার্বতী-তেও লভ্য। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। আমি সেই সব শব্দের কথা বিশেষ করে বলছি যেগুলো  সাধারণ শিষ্ট মানুষ অপশব্দ বলেন। যাদের উদাহরণ পাই সুবিমল মিশ্রের অনেক না-গল্পে, ‘হারাণ মাঝির বিধবা বৌয়ের মড়া অথবা সোনার গান্ধীমূর্তি’ ছাড়াও  সাধারণভাবে এরকম অনেক দেশি শব্দের প্রতি সাহিত্যিক উদাসীনতা আভিধানিক অস্বীকৃতির চেহারা নিয়েছে। দুঃখের বিষয় পশ্চিম বঙ্গের শহীদুল্লাহ নেই। তার সঙ্গে আমাদের সুশীল সমাজের শিষ্ট আলাপেও তারা বর্জিত। একই অর্থের ইংরিজি শব্দ চলে। যাঁরা কথায় কথায় ‘shit’ বা ‘a load of crap’ বলেন, তাঁদের ‘হাগা’ বা ‘ছেরানো’ বলতে শুনি না। যাঁদের কথায় কথায় ‘shit’/‘turd’ বলতে আটকায় না, তাদের ‘ন্যাড়’-এ আপত্তি কোথায়? Fuck-এর চকারান্ত বাংলা প্রতিশব্দটির সাহিত্যিক প্রয়োগের কথা তোলায় শ্রদ্ধেয় বাংলাভাষী ইংরিজির অধ্যাপক বললেন, ‘ওটা ঠিক আমাদের অন্তরঙ্গ বাক্যালাপের ভাষা নয়, যে অর্থে ওদের ভাষায় fuck’ কথাটি মুখের কথায় উঠে এসেছে’ আমাদের ভাষায় ওগুলো খিস্তি। জ্যোতির্ময় দত্ত কিছু আলগা চেষ্টা করেছিলেন এগুলিকে সাহিত্যে স্থান দেওয়ার, কিন্তু সিরিয়াস ছিলেন না’। জ্যোতির্ময়ের প্রচেষ্টা কি করে সিরিয়াস হবে, যদি আমরা সিরিয়াস না হই, এ প্রসঙ্গ আর তুলিনি। কারণ রাবীন্দ্রিক ছুঁৎমার্গে উনিও সমাচ্ছন্ন। এটা ওঁর মাথায় এলো না যে, সায়েবরা অনেক ‘eclectic’, শব্দ বিষয়ে।
                   
এ প্রসঙ্গে বলি অনেকদিন আগে, যখন ‘fuck’ কথাটি শিক্ষিত বাঙালি তথা ভারতীয়দের মুখের কথায় পর্যবসিত হয়নি, তখন একটি ইংরিজি উপন্যাসে পড়েছিলাম একটি প্রধান চরিত্র ‘fuck’ কথাটি বলায় তার বন্ধু আপত্তি করলে নায়ক বলছে এটি খাঁটি অ্যাংলো-স্যাক্সন শব্দ, হাই পেডিগ্রি-র। আমেরিকায় Cohen v. California তথা The Fuck the Draft Jacket Case মামলায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় Paul Robert Cohen বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরুদ্ধে ১৯৬৮-র ২৬শে এপ্রিল লস আঞ্জেলেস কান্ট্রি কোর্ট হাউসে Fuck the Draft কথাটি তাঁর জ্যাকেটে লিখে হাঁটার সময় নিন্ম আদালতের রায়ে কারারুদ্ধ হন। এই রায়কে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ ৫-৪ রায়ে পালটে দেন, সরকার পক্ষের এই যুক্তি খণ্ডন করে’ যে Detest the Draft অথবা Stop the Draft কথাটি সমান ভাবে বোঝানো যেতযে সব ব্যক্তিস্বাধীনতার ও বাক্-স্বাধীনতার সাংবিধানিক যুক্তিতে কোর্ট এই রায় দিয়েছিল, তার কচকচিতে না ঢুকে কেবল এর ভাষাগত দিকটির কথা বলছি।  Fuck কথাটি যে বিকল্প শব্দগুলির চেয়ে অনেক বেশি তেজিয়ান সে কথা বলার সময় সমর্থক জাজদের সঙ্গে Justice M. Harlan- একটি অসাধারণ কথা লিখলেন, one man's vulgarity is another's lyric আজ যদি ভারতে কোনো প্রতিবাদী বা আন্দোলনকারী সমসময়ের সব চেয়ে বিতর্কিত বিলটির সম্পর্কে গায়ে লেখে ‘আমি জমি অধিগ্রহণ বিলকে দি’ তবে তফাৎ হবে কোথায়? নষ্ট হতে দেব শব্দটিকে এই অপযুক্তিতে যে ‘ছোটলোকরা বলে’?

আমি বোঝাতে চাইছি এই বোধের কথা! তথাকথিত অশ্লীল শব্দের সাঙ্গীতিক অনুরনণের বোধের কথা, যে বোধ থাকলে ‘দুঃখিনী বর্ণমালা মা আমার’- তাঁর একটি অক্ষরসমষ্টিকেও নষ্ট হতে দেব না আমরাভাষার প্রতি আমাদের সেই যত্ন আদর থাকতে হবে যা আছে ‘Gaia’-ঘরানার পরিবেশবাদীদের পৃথিবীর প্রতি। ব্যোম-স্থল বা স্পেস-স্টেশন থেকে যে একদিকে আলো আরেকদিকে ছায়ায় ঢাকা  অখণ্ড পৃথিবীকে দেখা যায়, তার সম্বন্ধে যে অখণ্ড আন্তঃসম্পর্কের বোধ পেলেন ব্রিটিশ  পদার্থবিদ জেম্‌স লাভলক, ভালোবাসার নাম দিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক উইলিয়াম গোল্ডিং, কিনা Gaia’, যেহেতু গ্রিকরা পৃথিবীকে ‘Ge’ বলতেন। ‘গাইয়া’ কেবল এক সামূহিক চেতনা নয়, একটা নতুন দৃষ্টি, একটি আয়না, যা দেখায় যে জীবাণু থেকে তিমি পর্যন্ত সকল প্রাণী আমরা সবাই ‘গাইয়া’-র অংশ, তাঁর সম্ভাব্য মঙ্গলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার ফলে গুটিবসন্তর মতো একটি কঠিন রোগের ভাইরাস নষ্ট হলেও পৃথিবীর জৈববৈচিত্র্যের দারুণ ক্ষতি। কারণ লাভলক বলছেন, এদের একটিকেও পৃথিবী  থেকে হতে দিলেও আমরা নিজেদেরই একটি অংশকে নষ্ট করে ফেলছি, আমরাও ‘গাইয়া’-রই অংশ বা ক্ষুদ্র কণা (‘when we eliminate one of these from Earth, we may have destroyed a part of ourselves, for we also are a part of Gaia when we eliminate one of these from Earth, we may have destroyed a part of ourselves, for we also are a part of Gaia’)
                      
ভাষার প্রতি এই ‘গাইয়া’-প্রতিম বোধে আচ্ছন্ন আমি। রবীন্দ্রনাথ যে কথা ‘গাইয়ার’ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘জীবপালিনী, আমাদের পুষেছো’, তাই বলতে চাই ভাষার সম্পর্কে মনে রাখতে চাই হাওড়া-হুগলির বাল্যজীবনে শোনা অজস্র বাক্যাংশে অগণ্য শব্দ, অসংখ্য পরিস্থিতিতে। মূলশব্দ, উপসর্গ, অনুসর্গ, কত ধরনে! গ্রামগঞ্জ থেকে আসা,  সাধারণ ঘরের পি. এইচ. ডির ছাত্র, নদে জেলায় বাড়ি, বললো, ‘সার, দিয়ে আমি  কই তিরিশ তারিখে আসব?

আমি: দিয়ে কেন বলছ? তুমি তো নদিয়ার ছেলে! বর্ধমানের তো নও! 
ছাত্র: না, সার, আমি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে দু-বছর এম.ফিল. করেছি। (বুঝুন!)
কাটোয়ায় পড়াই প্রথম জীবনে। বাসে করে যাচ্ছি দুর্গাপুর। বুদ্বুদের পরই উঠল আধচেনা ছাত্র।
ছাত্র: নিয়ে, সার বাসে করে কোথায় চললেন?
আমি: যাচ্ছি দুর্গাপুরকিন্তু সব কথার আগে ‘নিয়ে’ বলছ কেন?
ছাত্র: সার, সত্যি কথা বলতে কি, বর্ধমানের দিয়ে-ই বীরভূমের নিয়ে।(বুঝুন!)

দেওয়া-নেওয়ার এই উপসর্গনির্ভর ভাষাতত্ত্ব আছে কোনো অভিধানে, প্রয়োগবিধিতে? 
আমার বাল্যজীবনের হাওড়া-হুগলির জীবনজগতে (এখানে হাবেরমাসের ‘life-world’ না আনলে চলে?)ভাষার খেলা অন্য রকমের।
(প্রথিতযশা ইংরিজির অধ্যাপক শ্যালককে, আগেকার ফোনে, তথনো ‘ল্যান্ড’ কথাটা সেই কালোপানা ফোনের আগে যুক্ত হয়নি) বাবলু, তুমি কিন্তু আজ বিকেলে ওখানে যেতেই চাও
বাবলু: জাঁইবাবু, আজ বিকালে ওখানে (হাওড়া জেলার একটি জায়গায়) যেতে চাইবো কেন? আমি তো চাইই না। 
অধ্যাপক: তোমার চাওয়া না চাওয়ার উপর কী নির্ভর করছে? তুমি যাবেই! (হুগলির শ্যালক জানত না যে হাওড়ায়, অথবা হাওড়ার ঐ অংশে ‘যেতেই চাও’ মানে যেতে হবেই। তাই বলছেন জামাইবাবু। কী গেরো!)   

অথবা দেখুন    
আজ সকালে বাহ্যে হয়েছে (মা, বাবা, নাড়িটেপা ডাক্তার)? হরিচরণে আছে বাহ্যক্রিয়া/কৃত্য। বাহ্যে নেই। সাহিত্যে দেখিনি। কথাতেও অনুপস্থিত। এখন বুড়োরা বলে ‘পাইখানা/পায়খানা হয়েছে? ছোঁড়াছুড়িরা বলে ‘পটি’। হাওড়া হুগলির প্রবাদ: ‘গরিব মানুষ ফড়িং খায়,/ঘোড়ায় চড়ে বাহ্যে যায়;/দুধেতে আঁচায়, অম্বলে ছোঁচায়;/সন্দেশে হাতমাটি করে’। হাগা-র পরই চালু শব্দ মলত্যাগের ব্যাপারে
  
সারা সকাল খেটে হাড় কালি হয়ে গেল, এখন উনি ঠাপাতে ঠাপাতে এলেন  (নিম্নবর্গীয়া কাজের লোক অনুজা, কন্যা বা অন্য কোনো অসমবয়স্কার প্রতি।)  ঠাপানো মানে সঙ্গম করা; যতবার শুনেছি মনে পড়ে গেছে ওথেলো-তে ইয়াগোর সেই কথা ডেসডিমোনার পিতার কাছে, That black ram is tupping your white ewe’কি ধ্বনিসাদৃশ্য নয়!
                   
উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। কেউ (সাধারণতঃ মেয়ে) হঠাৎ মেঝেতে ‘থাপান জুড়ে’ বসে পড়ায়, বা চৌকাঠের সামনে ‘হাঁটুমালা গেড়ে’ বসে পড়ায় গুরুজন/জনাদের অসন্তোষ, সমবয়স্কাদের কোনো অনভিপ্রেত ব্যবহারে/আচরণে ‘নিয়াগ্‌গুণ’ বলা অভিধানে স্থান পেয়েছে কি? ‘নিকুচি করেছে’ অ-শহীদুল্লাহপ্রতিম অভিধানের। চাই জেলাওয়ারি ভিত্তিতে হারিয়ে যেতে থাকা শব্দের তালিকা, তাদের প্রয়োগবিধি।

কেন? কারণ এই সব শব্দই বাংলা সাহিত্যের প্রাণ বাঁচাবে। ভারতীয় সাহিত্যের যে ‘high mode’-এর প্রসঙ্গ আমরা রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এনেছিলাম, সেটাকে প্রখ্যাত কন্নড় লেখক ইউ আর অনন্থমূর্থি (আমাদের ভাষায় অনন্তমূর্তি)সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন কন্নড় সাহিত্যের সম্ভাবনাসন্ধানেসেখানে যে বিভিন্ন উপাদানের খোঁজ তিনি করেছেন  তাতে দেশি শব্দ থাকতে বাধ্য। তাঁর Towards the Concept of a New Nationhood: Languages and Literatures in India’ প্রবন্ধে  প্রথমে সংস্কৃত, তার পর ইংরেজির প্রাধান্যসূচিত ভারতীয় সাহিত্যের ধ্রুপদী উচ্চ ধারা বা প্রবাহের সঙ্গে দেশীয় ধারার সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে অনন্তমূর্তি কন্নড় স্থাপত্যরীতির নিজের বাড়ির সামনের উঠোন (‘frontyard’) ও খিড়কি-উঠোনের (‘backyard’)-এর রূপক ব্যবহার করেছেনবাবার পুরুষ-দমিত/প্রাধান্যসূচিত সামনের উঠোনে বার্ক, গান্ধী,  স্বাধীনতা সংগ্রাম, উচ্চ রাজনীতির আলোচনা এবং সংস্কৃত-ইংরেজি উচ্চ-পাঠকৃতি অনন্তমূর্তির মতে কোনো অধ্যাপকের জন্ম দিতে পারত, কোনো সাহিত্যিকের নয়। সাহিত্যিক  হতে লাগত মার/মহিলাদের কুক্ষিগত, মহিলা-অধ্যুষিত, অঃনিশেষ খিড়কি-উঠোন, সেখানকার শাকপাতার রান্না, গোপন সহৃদয়হৃদয়সংবাদঅনন্তমূর্তির মতে ভারতের bhashas-এ লেখা সাহিত্যগুলির এরকমই একটা বৈঠকখানা আর একটি খিড়কি বা পাছদুয়ারের এলাকা আছে। সংস্কৃতে লেখা ‘অখিল-ভারতীয়’ খ্যাতির ধ্রুপদী গ্রন্থগুলি বৈঠকখানার সামনের রাস্তার বা ‘মার্গের’ সম্পদকিন্তু আসল গল্পটা খিড়কি-উঠোনেরঅনন্তমূর্তির কথায়, The backyard, which is still the world of women, of secret therapeutic herbs, and roots and tendrils for the creation of new dishes, keeps literature in the bhasas continuously supplied with new themes and stylistic patterns.’

আমরা এখানে কেবল তার একটি উপাদান দেশি শব্দের কথা বলছি। সেখানে বঙ্কিমের উদারতা সম্বল করতে গিয়ে আমরা তাঁর অশ্লীল শব্দের প্রতি নিষেধবাণী অগ্রাহ্য করছি শুধু। অনেকদিনের পরের কথা নয়, এখন? 
   
*(স্মৃতি থেকে লেখা, শব্দপ্রমাদ হলে মার্জনীয়)