পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

শুক্রবার, ২২ মে, ২০১৫

**** কালিমাটি অনলাইন / ২৫ ****

সম্পাদকীয়
  

মানুষ নিয়ে কিছু কথা লিখেছিলাম বিগত ২৪তম সংখ্যা কালিমাটি অনলাইন ব্লগজিনের সম্পাদকীয়তেলিখেছিলাম, মানবীর গর্ভ থেকে মানুষের মতো শরীরের গঠন ও আকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেই কেউ মানুষ বলে নিজেকে দাবি করতে পারে না, যদি না সে মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য সাধনা করে এবং সেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে। এবং সেইসঙ্গে একথাও উল্লেখ করেছিলাম যে, যদিও পৃথিবীতে মনুষ্যত্বহীন মানুষের আকার বিশিষ্ট প্রাণীর সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু এরই পাশাপাশি এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা জন্মগত সূত্রে মানুষের শারীরিক গঠন লাভ করার পর মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সিদ্ধিলাভও করছেন। এবারের সম্পাদকীয় যদিও মানুষ ও মনুষ্যত্ব সম্পর্কিত, তবুও প্রসঙ্গ কিছুটা স্বতন্ত্র। প্রসঙ্গটা হচ্ছে বুদ্ধি এবং বুদ্ধিবৃত্তির।

একটা কথা আমরা সবাই জানি যে, এই বিশ্বে প্রাণীজগতে তুলনামূলক বিচারে মানুষের বুদ্ধি সব থেকে বেশি। সেই বুদ্ধিকে ব্যবহার করে সে বিভিন্ন রকম বৃত্তিতে নিজেকে নিয়োজিত করেছে। অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে বুদ্ধির বিকাশ ঘটলেও সেই বুদ্ধিকে প্রয়োগ করে তারা কিন্তু কোনো বৃত্তি গ্রহণ করতে পারেনি। যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলবেন যে, যেহেতু মানুষের সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তাই স্বাভাবিক কারণেই বুদ্ধিবৃত্তি তার জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছেকোনো সন্দেহ নেই, এই যুক্তি অকাট্য যুক্তি। আমাদের জীবনধারার মতো বাকি প্রাণীজগত এখনও কিছু গড়ে তুলতে পারেনি এবং সেই অর্থে কোনো সমাজব্যবস্থাও তাদের নেই। আর তাই তাদের বুদ্ধি থাকলেও কোনো বুদ্ধিবৃত্তিও নেই।

আর ঠিক এই প্রাসঙ্গিকতায় এখানে প্রাণীজগতের দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যা হয়তো আপনাদের অনেকেরই জানা আছে। প্রথম ঘটনাটি আমেরিকার। একটি ছাগল, নাম ‘বুডি’, নিবাস ‘অল্বকুর্ক বোটানিক্যাল গার্ডেন’, অঙ্কনশিল্পী রূপে এখন রীতিমতো খ্যাতিলাভ করেছে। সংবাদে জানা গেল, সেই বোটানিক্যাল গার্ডেনের এক কর্মচারী, নাম ক্রিস্টিন রাইট, সেই ছাগলকে অঙ্কনশিল্পে শিক্ষিত করে তুলেছেন। সেই গার্ডেনের ম্যানেজার লিন টুপা জানিয়েছেন, এই ছাগলশিল্পী মুখে ব্রাশ আঁকড়ে ধরে ক্যানভাসে ছবি আঁকে। এই পর্যন্ত যা উল্লেখ করা হলো, তা নিঃসন্দেহে সেই ছাগলটির বুদ্ধি ও প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, যেহেতু অঙ্কনশিল্প সেই ছাগলটির বৃত্তি নয়, তাই সে তার বুদ্ধি ও শ্রমের বিনিময়ে কখনই অর্থ উপার্জন করতে পারে না। অথচ তার শিল্পকর্ম বিক্রি করে কিছু মানুষ প্রতিটি চিত্রের জন্য প্রায় চল্লিশ ডলার (ভারতীয় মূল্যে ২৫০০ টাকা) উপার্জন করছে।

এবার একটি কুকুরের কথা। কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি ভিডিও ক্লিপিংস দেখেছিলাম, যা আমি আমার টাইমলাইনে শেয়ার করেছিলাম। ভারতে এখন ক্রিকেট খেলা খুবই জনপ্রিয়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি গ্রামের খন্ডচিত্র। খুবই কম বয়সী একটি ছেলে ও একটি মেয়ে ক্রিকেট খেলছে। তিনটি কাঠের টুকরো সংগ্রহ করে উইকেট ও স্ট্যাম্পস খাড়া করেছে। ছেলেটি বল করছে, আর মেয়েটি একটা চ্যালাকাঠকে ব্যাট বানিয়ে বাঁ হাতে স্ট্যান্স নিচ্ছে। এছাড়া আছে একটি কুকুর, যাদের আমরা নেড়ি কুকুর বলি। বাচ্চা ছেলেটি নিয়মিত বোলারের মতো ডানহাতে বল করছে আর বাচ্চা মেয়েটি দক্ষ বাঁহাতি ব্যাটস-উয়ম্যানের মতো রীতিমতো কভার ড্রাইভ করছে। কুকুরটি ফিল্ডিং করছে। ঠিক উইকেটের পেছনে ক্যাচ ধরার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে মুহূর্তে মেয়েটি ব্যাট চালিয়ে বলটাকে পাঠাচ্ছে বাউন্ডারির উদ্দেশ্যে, সেই মুহূর্তে কুকুরটি ক্ষিপ্র বেগে দৌড়ে গিয়ে মুখে বলটি তুলে নিয়ে বোলারের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এবং পর মুহূর্তেই সে এসে আবার দাঁড়িয়ে পড়ছে উইকেটের পেছনে। না, এটা কোনো টেস্ট বা ওয়ান ডে অথবা কুড়ি-২০ ওভারের খেলা নয়। এবং এই দুটি নিতান্ত অর্বাচীন ছেলেমেয়ে আদৌ পেশাদার খেলোয়াড়ও নয়। আর কুকুরটি তো, বলা বাহুল্য, অপেশাদারও নয়। কিন্তু এখানে যেটা অবাক হবার মতো ঘটনা, তা হচ্ছে, কুকুরটি ক্রিকেট খেলার এই ‘বেসিক’ নিয়মকানুন শিখল কীভাবে! ভিডিও দেখে তো বেশ বোঝা গেল, ব্যাটিং বোলিং ফিল্ডিং, সব বিভাগেই তার যথেষ্ট জ্ঞানগম্যি আছে! সুতরাং একথা স্বীকার করতেই হবে যে, মানুষেরা যতই নিজেদের বুদ্ধি সম্পর্কে অহংকার করুক না কেন, বাকি প্রাণীজগতও ক্রমেই তাদের বুদ্ধি এবং সৃজনক্ষমতা উত্তরোত্তর বাড়িয়ে চলেছেএবং একথা বলাও হয়তো অসঙ্গত হবে না যে, এভাবেই হয়তো একদিন তারা বিজ্ঞানের নিয়মাবলী সম্পর্কে আরও শিক্ষিত হবে এবং আধুনিক প্রযুক্তিকেও করায়ত্ব করবে।

মাত্র দুটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা হলো। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের কাছে এই রকম আরও অনেক অনেক ঘটনার কথা জানা যেতে পারে। আমাদের শুধু বক্তব্য এটাই, যেখানে মানুষের আকার বিশিষ্ট প্রাণী অনেকেই মনুষ্যত্ব অর্জন না করেও জীবন অতিবাহিত করছে, সেখানে অন্য সব প্রাণী তাদের জীবনযাত্রায় পশু-পক্ষী বা কীটসুলভ গুণাবলি থেকে কখনই বিচ্যুত হচ্ছে না, সততা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে না, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সৃজনশীলতার আশ্চর্য বিভিন্ন দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত করছে। আর তাই একটা কথা এখানে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, কোনো মানুষ মনুষ্যত্বহীন হলে তাকে অমানুষ সম্বোধন অবশ্যই করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে যেন কখনই কোনো পশু বা জন্তু বা জানোয়ার বা কীটপতঙ্গের সঙ্গে উপমিত করা না হয়, সম্বোধন করা না হয়! তাদের অর্জিত বুদ্ধিকে যেন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা অপমানিত করা না হয়!
 
আমরা ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনের জন্য বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী লেখক-লেখিকাদের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাই, আপনারা আপনাদের সুচিন্তিত ও মননশীল লেখা পাঠিয়ে এই ব্লগজিনকে আরও সমৃদ্ধ করুন এবং প্রকাশিত লেখাগুলি সম্পর্কে আপনাদের অভিমত জানিয়ে আমাদের উৎসাহিত করুন।
     
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India
     





শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

ধারাবাহিক উপন্যাস 



যে চিঠি অতিশূন্যতাকে পড়তে 




                            

(৪)
বেড়ালটা একটা লাফ মেরেছিল। সুনীলের ছবি আঁকা শেষ হতেই। একটা বাঘের মতো  লাফ মেরে উড়ে এসেছিল সামনের দিকে। হাতের বর্শাটা তাক করে ছুঁড়েছিল অশোক। বাঘটার বুকের ঠিক মাঝে গেঁথেছিল। তাও তার ভারী শরীর আছড়ে পড়েই স্প্রিং-এর   মতো খাড়া হতে চাইছিল। হু হু বাতাসের মতো ছুটে গিয়ে তরোয়ালটা চালালো  অশোক। ভারী তরোয়াল, বাতাসের মধ্যে দিয়ে একবার ধাক্কা খেল, অশোকের কাঁধের পেশীতে একটা প্রতিক্রিয়া লাগলো এসে। কাঁধ বেয়ে সেটাকে কোমরের মোচড়ের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে পিঠের ঋজুতা নিয়ে মাথা সোজা করে ফিরে দাঁড়ালো অশোক। বাঘটার মাথাটা ধড় থেকে আলাদা হয়ে ছিটকে গিয়েছে। ধড়টা কাঁপছে। এমন সময় এই মহাশক্তিমান ও একটি মুরগীর মধ্যে কোনো ফারাক নেই। মৃত্যুর পরে কিছু বিদ্যুৎ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে এভাবে খেলে যায় এবং তারপরে স্তব্ধতা একটি চাদরে ঢেকে দেয় অনন্ত খেলার সম্ভাবনাসমূহ। বিদ্যুৎ মরে গেলে জল আবার, মেঘ আবার, বৃষ্টি আবার, একটি জন্ম এবং বৈদ্যুতিক প্রকাশ।
দামাস্কাস ইস্পাতের তরোয়াল। ভেতরের অংশটার উপর আবার জ্বলন্ত আগুনে গলিয়ে এবং পিটিয়ে অন্য ইস্পাত লাগানো। গলানো টিনের আস্তরণ আছেধার একদিকে। গ্রীকদের দেখে এই তরোয়াল বানিয়েছে অশোক। বাতাসে কাটে যেন ভিজে রঙ  মাখানো ভারী তুলি। কব্জির মোচড়ে মোচড়ে যখন নাচে তখন মৃত্যুর রঙ ছেটানোর উল্লাস অশোকের মধ্যে লাফায়। গলার কাছে এসে জট পাকায়, উত্তেজনায় শিরাগুলো দিয়ে উল্লাস ছোটে, আহা মৃত্যু বাহা মৃত্যু করতে করতে অশোক নাচতে থাকে। জঙ্গলের যুবকরা যেমন নাচে। অশোক সে নাচ শিখেছে। পায়ের পদক্ষেপ বড় করে সে নাচ নাচলে হাতের সীমা প্রসারিত হয়। আরো অনেকটা বায়ুপূর্ণ স্থান হাতের নাগালে পায় অশোক। হাতের নাগাল মানে বর্শার নাগাল। মানে তরোয়ালের নাগাল। আরেকটা জীবনের নাগাল। অশোক, জীবনের এবং স্পেসের প্রভু।
এবং মাছটা, সুনীলের ছবির মাছটা আসলে যুবতী মাছ। জলে খেলছিল। শরীরে চিকণ কালো আভা। ঝরণার ঠিক নিচে যেখানে ঝরণা প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে এসে  গভীরতর ক্ষত বানিয়েছে, সেইখানে। যেখানে কেউ প্রতিদিন লাফায় সেখানে একটা  ক্ষত তৈরি হয়। হবেই। একই জায়গায় এক নির্দিষ্ট ভরবেগ ক্ষতকে খুঁড়তে থাকে,  খুঁড়তে থাকে। অশোকের ভেতর আছে এমন ক্ষত। মহারাজ বিন্দুসারের ভেতরের ক্ষতটাতে অশোক প্রলেপ দিয়েছে। এবং মারতে পারেনি। কিন্তু বিন্দুসার অশোককে তার ক্ষত সারার সুযোগ দেননি। তক্ষশীলার বিদ্রোহ দমন করে অশোক রাজধানী ফিরতে চেয়েছিল, বিন্দুসার রাজী হননি। অশোককে সুসীম পছন্দ করে না। অশোক  এলে সুসীম ক্ষুব্ধ হয়। জনপদকল্যাণীর সন্তান, রাজ সন্তানদের সঙ্গে প্রতিপালিত হয়েছে, কিন্তু সিংহাসনে নজর - এ কেমন কথা!
মাছটা জলে থেকে নারী হয়ে উঠে এলে তার নগ্নতা অশোক পান করছিল। নির্লজ্জের মতো পাশের জঙ্গলে গাছের আড়াল থেকে দেখছিল একটু একটু করে নারীর শরীর  থেকে জল শুষে নিচ্ছে একটা গামছা। বেশ কারুকাজ করা গামছা। আর গামছার আড়ালে যখনই শরীরের অংশ বিশেষ লুকোচ্ছে, তখনই অশোক বাকি অংশকে পান   করছে। তৃষ্ণার্ত সে। খুব ইচ্ছে করছিল কাছে গিয়ে যুবতীর ঘাড়ের চুলটা একটু সরিয়ে নাক ডুবিয়ে দেয়। পাকস্থলী অবধি গন্ধ নেয় ওই শরীরের। গন্ধ একটা আছে। সে গন্ধ বাতাসে অশোক ছাড়াও আরেকজনের কাছে গেছিল। সে গন্ধের ফলাফলে সে লাফ দিয়েছিল নারীর দিকে অশোকের স্পর্ধায় ও ক্রোধে বিদ্ধ হতে। এমন হুলুস্থুলুর পরে অশোক গোপন থাকার পথ পায় না। প্রকাশ্য হয়ে যায়। নারী বিষ্ফারিত চোখে বাঘ, মৃত্যু ও অশোককে একসঙ্গে দেখে, একে একে দেখে এবং অবশেষে বাঘের কাছে নত হয়। ঠিক তখনই জানা যায় বাঘ না, বাঘিনী - গর্ভিণী ছিল।
- বিন্দুসারকে তো গর্ভ চিরে বের করে নিয়েছিলেন চাণক্য!
সুনীল ক্লান্ত চোখে তাকায় নিজের হাতের দিকে। আমিও তাকাই। আমার হাতেও ওই বাঘিনীর রক্ত, অজাত সন্তানের রক্ত। সুনীল মোছে না। আমি আস্তে করে একটি শাল  পাতায় মুছে নিই। কোনোদিন বৃষ্টি হলে ধুয়ে যাবে। মাটির লাল রঙের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। আমার হাতে তাহলে কোনো রক্ত লেগে থাকবে না। সুনীলের ক্লান্ত পর্যবেক্ষণ ভারী হয়ে আসে গলায়।
- সেখানেই সমস্যা! মহারাজ চন্দ্রগুপ্তকে যে মহামন্ত্রী চাণক্য স্বল্প করে বিষ প্রতিদিন দিতেন, তা রাজপাচক এবং খাদ্যস্বাদগ্রহীতা ছাড়া কেউ-ই জানতো না। মহারাজ  আহ্লাদ করে গর্ভিণী স্ত্রী-কে দিয়েছিলেন সেই খাবার। স্ত্রী তো বিষে অভ্যস্ত নয়, তিনি  আক্রান্ত হলেন।
বিষের অভ্যস্ততা সম্পর্কে আমি কিছু জানি। বিতস্তা আমাকে বিষে অভ্যস্ত করেছে। বিতস্তার গল্পে একটি করুণ গান ছিল। বয়স্ক সঞ্জীবকুমার ছিল, তিরিশ হওয়া শর্মিলা ঠাকুর ছিল, একটা প্রাচীন রেডিও ছিল, যা সব সময় বড় আলমারির মাথায় রাখতে হতো এবং শব্দ তার গমগম করত। শর্মিলার একটা জা্নালা থেকে অন্য জানালায়  যাবার পথে লতা মঙ্গেশকর গেয়ে উঠতেন, 'রুকে রুকে সে কদম / রুক্‌কে বার বার চলে'! গানটায় আমি আটকে গেছিলাম। বলা ভালো বিতস্তার দীঘিজল চোখে  আটকে গেছিলাম। সেই এক দুঃখের গপ্প! সেই যে আঠারো শতক থেকে বাবুরা পাশ্চাত্য থেকে বুঝলেন 'মেয়েরাও মানুষ' - স্বপন সাহা সিনেমা বানানোর অনেক  আগে - তখন থেকেই মেয়েদের উপর অত্যাচার-অনাচারের গল্প খুব ভালো খায়  জানা গেল। তারপর সবাই লিখল। বাঙলা, মারাঠি, তামিল, তেলুগু, গুজরাতি কত কত ভাষায়। মেয়েদের প্রতিষ্ঠার গপ্প, আত্মপ্রত্যয় অর্জনের গপ্প, আত্মমর্যাদার লড়াই - প্রচুর লোক লিখল, প্রচুর লোক পড়লতারপরে কয়েকটা শতাব্দী চলে গেল। দুঃখের গল্পটা সত্যি এবং সত্যির ছাঁচ রেখে অনায়াসে গল্প বানানো চলে। সে গল্প বানাতে অনেকের ঈর্ষণীয় দক্ষতা বাড়ল।
যেমন বিতস্তার। তার গল্পে অত্যাচারী-ব্যাভিচারি স্বামী থেকে অবুঝ বাবা সব ছিল।  পুরুষতন্ত্রের সার্থক প্রতিনিধি। তার অনুপম সরলতা ছিল। কিচ্ছু বোঝে না সে। কিচ্ছু জানে না সে। কোনো অপরাধ তার নেই। ভায়ের মতো ছেলের সঙ্গে, ইস্কুলের বন্ধুর  সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে কেউ সংশয় প্রকাশ করতে পারে? কতবড় পাষন্ড হলে পারে! এ সব গল্পের লাইনে লাইনে সিনেমার গানটা ছিল। কিন্তু মজা হচ্ছে, গান তো শুরুই  হয় শেষ হয়ে যাবে বলে। গানটা শেষ হলে একটা রেশ থাকে। রেশ শেষ হয়ে গেলে গল্পের রূপসজ্জা খুলে পড়েব্রণগুলো, চামড়ার কাটা দাগ, ত্বকের যত্ন ও অযত্ন সব  দেখতে পাওয়া যায়। তখন জানা যায় যে, এই গল্পটায় গল্পই বেশি ছিল, সত্যির মতো দেখতে। যুধিষ্ঠিরের অর্ধসত্যের মতো ভয়ঙ্কর।
প্রশ্নটা হচ্ছে, যুধিষ্ঠিরের অর্ধসত্য কি মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর নয়? দ্রোণ যুধিষ্ঠিরকে  শুধু বিশ্বাস করতেন না, ভরসা করতেন। পূর্বতন আচরণ বা আচরণের খেলা দিয়ে যুধিষ্টির এই ভরসা অর্জন করেছিল। সেই ভরসা বিশ্বাসের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।  দ্রোণ ভাবতেই পারতেন না, কোনো অবস্থায়, যে যুধিষ্ঠির - আদর্শ যুধিষ্ঠির কখনো কোনো অবস্থাতে মিথ্যে বলতে পারে। মিথ্যে আচরণ করতে পারে। এই ভরসার মূল্য দিতে হয় মুন্ডচ্ছেদ দিয়ে। প্রাণ চলে যায়, ভরসা যায় না।
আর যুধিষ্ঠিরের শাস্তি? এর আগে যুধিষ্ঠিরের রথের চাকা মাটি ছুঁতো না সে চাকা মাটিতে নেমে এলোসবশেষে যখন পঞ্চপান্ডব হেঁটে স্বর্গে চললেন, তখন একমাত্র  যুধিষ্ঠির কুকুর সমেত সেখানে পৌঁছল নরক ঘুরে। ওই নরক ঘোরাটুকুই যা আরেকটু শাস্তি। গোটা রাস্তা সে অন্যে কে কী ভুল করেছে তার ব্যাখ্যা দিতে দিতে গেল! ভাবখানা এমন যে, সে ভুলের উর্দ্ধে। তাহলে মহাকাব্য কী শেখাচ্ছে?
শেখাচ্ছে যে, ভরসা তোমার প্রয়োজনে ভাঙতেই পার! তার বিশেষ কোনো শাস্তি  নেই। কেন না তারপরেও তোমার স্বর্গ সশরীরে বাঁধাই থাকবে, যেহেতু তোমাকেই নায়ক হিসেবে, আদর্শ সামাজিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, তাই। তোমার কোনো শাস্তি হবে না।
এর পরেও দুটি কথা আছে। মহাকাব্য তো! সব শিক্ষাই এমন সহজ সরল নয়উল্টোদিকে মহাকাব্য এও জানিয়ে যাচ্ছে যে, এই পৃথিবীতে নিজের প্রাণ দিয়ে অন্য  কাউকে ভরসা করে মূর্খরা। পৃথিবী উন্নত মানুষের জায়গা নয়এবং নায়কের  উচ্চতায় পৌঁছনোর জন্য নির্দিষ্ট সামাজিক আচরণ বেশি বেশি করে কর। আর মধ্যে  মধ্যে ভয়ঙ্করতম সর্বনাশ করে চলে যাও, সমাজ উপেক্ষা করবে, স্বর্গ নিশ্চিত করবেই করবে। মানুষের ভরসার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সামাজিক ব্যবস্থা সমূহকে যথাস্থানে  অক্ষুণ্ণ রাখা। অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজনে সমাজ নয়, সমাজের প্রয়োজনে মানুষ। গায়ের  জামা মানুষ পরে না, জামা মানুষকে পরে।
এর মূল সূত্র আছে উপন্যাসের মৃত্যুতে। উপন্যাস, আমাদের এই ভূখন্ডে যে আখ্যানভাগ শুরু হয়েছিল মহাভারতের বিশালতায়, সে আখ্যানভাগে ছিল একটা সীমাহীন ভূখন্ড। যেহেতু মহাকাব্য, তাই এর চরিত্রেরা গম্ভীর জামা পরে বেরিয়ে  পরেছিল নানা উদ্দেশ্য সাধন করতে। মহৎ উদ্দেশ্য থেকে অসাধু উদ্দেশ্য, সব উদ্দেশ্যকেই সে বিশালতায় ধারণ করেছে। মহাকাব্য না হলে সার্ভান্তেসের চরিত্রর মতো  একটি জীর্ণ ঘোড়া এবং একটি শীর্ণ গাধা সমেত সহচর সংগ্রহ করে এরা কি বেরিয়ে যেতে পারত? কাল্পনিক দৈত্য দমন করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে দেখত, এ তো এক  আজব দুনিয়া, কিছুই কিছুর সঙ্গে মেলে না! না, তা সম্ভব ছিল না। যে যুগে মহাকাব্য শুরু হয়েছে সে এক অপার যুগ। মানব সভ্যতার সব কিছুই একে একে গড়ে উঠছে। অসীম সম্ভাবনা। সার্ভান্তেস যে ইউরোপে তাঁর নভেল লিখতে শুরু করেছেন, সে হলো এই গড়ে ওঠার শেষ পর্বের খেলা। এর মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে  'দশকুমারচরিত'সার্ভান্তেসের কাছাকাছি। মহাভারতেও মানুষের সামাজিক জীবনের রীতি-নীতি মূল্যবোধগুলো ইচ্ছে মতোন ভাঙচুর হয়েছে। কিন্তু সে সব ভাঙচুর ঢাকা  পড়ে গিয়েছে একটি উচ্চতর আদর্শের খোলসে। মানুষ জন্তুই। জন্তুসুলভ লোভ,  লালসা, তাড়না নিয়েই তার অস্তিত্ব। সেই অস্তিত্বকে মহিমান্বিত করতে তার লাগে আদর্শবাদ। হাজারো অযথার্থ অসামাজিক কাজকে ঢেকে দেওয়া গিয়েছে 'ধর্মরাজ্যগড়ার কবিকল্পনায়।
'রামায়ণ' ঠিক এই কারণেই মহাকাব্য হলেও বড় বেশি সাদাকালো। ঈশ্বর এবং  ঈশ্বরেরা জগৎ সৃষ্টি করলেন। তার পাপ-পূণ্য, ন্যায়-অন্যায় সাদা-কালোতে বিভাজিত। সীতাকে রাবণ হরণ করে নিয়ে গিয়েছে এই অপরাধে রাবণের সঙ্গে সঙ্গে সীতারও মৃত্যু হয় অবশেষে। যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ মহাকাব্যিক কবি থামতে পারছেন না। সাদা-কালোর মধ্যে ধূসর অঞ্চলে বসবাস তাঁর কাজ নয় কিন্তু 'মহাভারত'-এ কে  কার স্বামী, কে কার স্ত্রী, কে কার পুত্র সব ঘেঁটে একসা! মহানন্দে এই ঘাঁটার কাজটা মহাকাব্য-রচকরা করে গিয়েছেন। ঈশ্বরের মৃত্যুর পরবর্তী যুগের রচনাএ যুগে নতুন ঈশ্বরকে এঁরাই জন্ম দেবেন। অতএব ঈশ্বরের সেই অপার মহিমা নেই। সাদা-কালো জগত নেইমানুষ, তার বৃত্তের বাইরের পৃথিবীটাতে একান্ত অসহায়। একটি মাত্র সত্যের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে। অজস্র সত্যের মুখোমুখি হয়ে দিশাহারা মানুষ। তাকে দিশা দেবার জন্যই মহাকাব্য বয়ান। ব্যক্তি ও সামাজিক মানুষকে দিশা দিতে না পারলে সব ভেঙে যাচ্ছে।
এই ভাঙনকে মেনে নিয়েই যাত্রা শুরু 'দশকুমারচরিত'-এর। দন্ডি-র নামে লেখকসত্ত্ব নথিভূক্ত হলেও এ দন্ডি কেউই একা নয়। নানা হাতের ছাপ, এখানে 'মহাভারত'-এর  মতো করেই আছে। এখানে ন্যায়-অন্যায় পাপ-পূণ্য এ সব তুচ্ছ। যা চাও, যেভাবে  পাবে, সেভাবেই তাকে পেতে হবে। চুরি, জালিয়াতি, কামতাড়িত নারী ও পুরুষ সঙ্গ,  রাজ্য দখল, বিদ্রোহ, ক্ষমতার হস্তান্তর সব শুধুমাত্র খেলা। এক অসামান্য খেলার  বৃত্তান্তে খেলে যায় এই উপন্যাস। কোনো এক সত্য আর নেই। নতুন ঈশ্বরও মৃত। সামনে যা কিছু তার সীমা কেউ জানে না। অতএব এক তুমুল রোমাঞ্চকর যাত্রা হলো জীবন। এক ভয়াল যাত্রার নাম জীবন। কোন মোড়ে কার জন্য কী অপেক্ষা করে আছে তা কেউ জানে না! পাঁচ থেকে দশ শতকের মধ্যে এই উপাখ্যান রচিত। এবং এই উপাখ্যানে কেউ কোনো আদর্শের জামা পরে নেই। মহাকাব্যের বয়ান যখন আধুনিক রূপটি নিয়ে এসে দাঁড়াল তখন এই 'দশকুমারচরিত'-এর যুগ। তাই মহাকাব্যের মধ্যেও আদর্শের জামা পরা চরিত্রগুলোকে মাপের থেকে ছোট লাগতে শুরু করল সেই ছোট হওয়া মাপ থেকে জামা খুলে নেবার কাজটা প্রায় গুছিয়ে সেরে ফেললেন মধুসূদন দত্ত। রামকে কার্যত প্রতিনায়ক করে লিখে ফেললেন 'মেঘনাদবধ কাব্য'
ঈশ্বর এবং পাপ-পূণ্যের মৃত্যুতে মানুষের কাজ বেড়ে যায়। অতএব এবারে চলে এলো মানুষের ঈশ্বর সাজার পালানানা সংস্কারের দাবিতে মুখর হয়ে উঠল লেখকদের  কলম। সে সব কলমই জন্ম দিল নতুন  চেহারায় নারীকে বঞ্চনার তীক্ষ্ণ সমালোচনার। বিধবাবিবাহ থেকে বাল্যবিবাহ অথবা বহুবিবাহ রোধ এ সব সামাজিক আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নারী রক্ষা ও জাগৃতি। শুরু হলো পুরুষের হাতে। তারপরে  যার কথা তার হাতেই মানায় বলে নতুন শিক্ষিত নারী নিজের কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তো দুনিয়া বদলে গেল না! বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ চলতেই থাকল, বিধবাবিবাহ চালু হলো না। শিক্ষা ও সম্পত্তিতে নারীর  অধিকার সর্বত্র সুনিশ্চিত এমন কী আজ-ও নয় তার মানে সমাজ বদলায়নি। আবার সমাজে কিছু নারীর অবস্থা বদলে গিয়েছে। সামাজিক ক্ষমতার যে বৃত্তে পুরুষ  বসে অভ্যস্ত, সেখানে সে বসেছে। পুরুষ যা যা করে এসেছে সেও তাই তাই করেছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে রাতারাতি সব মানুষের স্বাধীনতা হরণ করতেও সে পিছ পা হয়নি। নারী বলে কোমল সত্ত্বা তাকে না ভাবিয়েছে না ঠেকিয়েছে! মুখ্যমন্ত্রী হলে চুরি থেকে বুটের ডগায় থেঁতলে দেওয়া কোনোটাতেই তার এলেম কম দেখা যায়নি! এইখানেই বিতস্তার গল্প প্রাসঙ্গিক। বিতস্তা যে গল্পটির কথক, সে গল্পটির উপাদান পূর্বতন নারীদের রচনা থেকে আহৃত, বয়ন বা বুননও তাই। বিতস্তার গল্পে বিতস্তার প্রকৃত অনুপস্থিতি স্বাভাবিক। পুরুষ যখন ধর্মরাজ্য গড়ার গল্প লিখেছে তখন আসলে সে তার সুবিধাকে আদর্শের জামা পরিয়ে চালিয়েছে যেমন, বিতস্তাও তেমন তার নিজের অপরাধকে সুনিপুণ অপরাধীর মতো চেপে গিয়ে একটি একপেশে গল্পের ছিপ  ফেলেছিল। সেই ছিপে আমার মতো মাছেরা ধরা পরেছে সহজেই। সে টোপ কেটে  বেরিয়ে যেতে পারা না পারার সময়ের মধ্যেই বিষ কতদূর গেল তার পরিমাপ নির্ধারিত হয়। আমি অনেকটা বিষ নিয়ে ফেলেছিলাম। আমিও বিষে অভ্যস্ত।
- মহারাজ বিন্দুসারের জন্ম, মহারাজ চন্দ্রগুপ্তের প্রেমের মৃত্যু এবং তাঁর প্রস্থানের সূচনাবিন্দু। বিন্দুসার বড় হলেই রাজ্য ছেড়ে তিনি চলে গেলেন নির্গ্রন্থ জৈন সাধু হয়ে।
সুনীল মাথার রুক্ষ চুলগুলোতে হাত চালাতে চালাতে কথাগুলো আলগা করে ফেলে দিল। যেন অনেকদিন এসব ভার সে বইছে। এবারে ফেলার সময় নিতান্ত নিস্পৃহতার সঙ্গে ফেলে দিচ্ছে। কালোয় কুঁদে তোলা সুনীলের শরীর বেয়ে কালো আরো কালো রঙ নামছে, যাকে আমরা সন্ধ্যা বলে থাকি। আমি সুনীলের কন্ঠের উষ্ণতা খুঁজে পেতে জন্য মরিয়া হয়ে বললাম,
- অথচ তাঁর শিক্ষক ও প্রধান পরামর্শদাতা, তাঁকে গড়ে তোলার কারিগর চাণক্য আজীবিক!
শব্দ নেই আর। সুনীল ডুবে গিয়েছে। সুনীলের বয়ানের ইচ্ছের মধ্যে শুধু ইচ্ছের প্রতি ইচ্ছেটাই অবশিষ্ট। বুঝতে পারলাম এরপর এইখান থেকে সুনীল কাহিনীটি বয়ান করবে। সুনীল নিজে চিরদন্ডিত এবং দন্ডের কাহিনীতে সে দন্ডদাতার ভূমিকাও একদিন পালন করে এসেছে। এই বদলাবদলি চরিত্রে তার কোনো আকর্ষণ নেই। সে ব্যক্তি হিসেবেও এখানে উপস্থিত নয়ব্যবস্থা যেহেতু চলে, তার ইচ্ছে করার ইচ্ছেতেই  চলে শুধু, ভালো মন্দ ব্যতিরেকে নির্গুণ ব্রহ্মের মতো সে সর্বগ্রাস করতে উদ্যত হয়, সেই ব্যবস্থার মতো সুনীলকে দেখতে লাগবে আলো এলে। সুনীল এখন রাত ন'টার  সময় কলকাতার যে এস আই বাইক থামায়, এটা ওটা কাগজপত্র চায় এবং সবশেষে আশা করে কোনোভাবে পঞ্চাশ টাকাও অন্তত হাতিয়ে নেবে, অথচ এ টাকার প্রতি যে তার আর কোনো মোহ নেই। সার্ভিসে কুড়ি বছর হয়ে যাওয়া এস আই-এর মুখের চেহারাটা এখন সুনীলের।

(ক্রমশ)




**** কথনবিশ্ব ****


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

রবিন্দর পূজা  



                           
বিহারি ড্রাইভার বলল — সাব আপলোগ সব কোই রবিন্দরনাথকো শুরুসেই অ্যায়সেহি পুজতে থে ক্যা? প্রশ্নটা শুনে চমক লাগলবলে কী ব্যাটা! বাঙালির রবীন্দ্রভক্তিতে  সংশয়? আর ভাবলাম, আচ্ছা আমার চমকিত ভাবনাটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা  যাক। এই বছরের ৯ই মে রবিন্দরনাথ তাঁর খ্যাতিপ্রচারের নয়া মাধ্যম পেয়ে গেলেন, ফেসবুক! আমি আনাড়ি বলে এখনো জানি না, টুইটারে আর হোয়াইট অ্যাপ্‌‌সে  রবিন্দরনাথ ঠিক কত বাইট পেলেন। এখানে আবার বাইট বলে তো? কে জানে!

কিন্তু যেটা জানি তা হলো স্বদেশে বা বিদেশে রবিন্দরনাথ শুরুসেই এত পাত্তা পান নি। হয়তো ‘বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে’ আপ্তবাক্যটি তাঁর ক্ষেত্রে অতটা খাটেওনি। একে তো ‘কালেজি’ পড়ায় রসগোল্লা। তারপর শেক্সপীয়রের পড়াশোনার পরিধি নিয়ে মোটামোটা বই আছে। আর আমাদের রবীন্দ্রনাথ কী পড়েছিলেন, তা নিয়ে তো ওই  সবেধন  নীলমণি উজ্জ্বলকুমার মজুমদার। সুতরাং অত পাত্তা পাবার কথাই নয়। তাই নিয়ে লিখছি, কাজলবাবু, সরি! আমার গুরুগম্ভীর এ সংখ্যায় হলো না। এ সংখ্যায় নিতান্তই কবিকথন। গুরুগম্ভীর হবে কী করে? ৯ই মে ফেসবুকে জানালাম যে—
কেউ কি জানেন যে রবীন্দ্রনাথ নোবেল প্রাইজ পাওয়ার আগে পর্যন্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর বাংলা রচনার একটি উপযোগিতাই খুঁজে পেয়েছিলেন, তা হলো,  বাংলা পরীক্ষায় শুদ্ধ বঙ্গানুবাদ করতে দেওয়ার জন্য প্যাসেজ হিসেবে? বিশ্বাস না হলে পড়ুন বিখ্যাত ঐতিহাসিক ই.পি. টমসনের, তাঁর রবীন্দ্রভক্ত কবিপিতা ই.জে.  টমসনের ডায়েরি ও কাগজপত্রের ভিত্তিতে লেখা Alien Homage: Edward Thompson and Rabindranath Tagoreএরকম আরো কিছু জ্ঞাতব্যবিষয় নিয়ে  হয়তো লিখব একটি ব্লগজিনের পরের সংখ্যায় (যদি ছাপা হয়)ড়বেন, অ্যাঁ।  বড্ড মাতামাতি করি আমরা বাঙালিরা, তখন উৎসবী ভক্তদের কেউ কেউ যখন জানালেন যে এইরকমের গবেষণালব্ধ আরো তথ্যের জন্য তাঁরা আশায় রইলেন, তখন ভালো আত্মগ্লানি হলো। নিজের একটি পচা, মোটা, (ন্যায়তঃই) প্রায় অপঠিত বইয়ের ভূমিকায় এ কথা লিখেছিলাম সার্ধশতবার্ষিকীর আগের বছরে তাঁর লেখার প্রতি আরো সন্নিষ্ঠ মনোনিবেশের আবেদন জানাতে গিয়ে। সেখানে আরো কথার ফাঁকে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মতেই জানিয়েছিলাম যে, এই সোচ্চার বাৎসরিকের গণ্ডগোলের মধ্যেই  তাঁকে — মানে তাঁর লেখাকে ভুলে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও বীরগতিতে চলবে। তার ফলে রাজশেখর বসুর ভাষায় ‘কাকদন্তগবেষণ’ তথা ‘কাগের দাঁত কটা আছে’ তা গোণার বরাত! বরাত আমার!২ 

অথচ এই ভদ্রলোকটির সামনে পড়লে বিশ্বনিন্দুক, ইংরেজপাগল, ইউরোপমনস্ক নীরদ চৌধুরীর কলম পর্যন্ত কেঁপে গেছে। ‘Tagore: The Lost Great man of India’ প্রবন্ধে চৌধুরী বলছেন, যদি এক কঠোর মেধামাপকের কষ্টিতে পৃথিবীর সর্বকালের, সর্বদেশের লেখকের সংখ্যা এককুড়িতে নামিয়ে আনা হয়, তবুও রবীন্দ্রনাথ সেখানে থাকবেন। চৌধুরী নিজেই এক European standard of reference’ অনুযায়ী তাঁকে ১৯১৩ সালের আগের তেরো বছর ধরে নোবেল পাওয়া সবার অনেক উপরে, একদিকে গ্যেটে আর এক দিকে বিত্তর উগো-র মাঝখানে একস্তরে রেখেছেন। কিন্তু সংশয় প্রকাশ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ কখনো তাঁর প্রাপ্যটা পাবেন না (অবশ্যই এই প্রাপ্য পুজোর  নয়, রসানুধাবনের, রসোপলব্ধির) সমস্যাটা কেবল অংশতঃ তাঁকে যে কোনো  ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করার কষ্টসাধ্যতা। কিন্তু আরো বড় সমস্যা হলো, তিনি বঙ্গদেশেও ‘নিরাপদ’ নন। তাঁর কাছে বঙ্গদেশে রবীন্দ্রনাথের ‘গ্রহণের’ বহমান ট্রাজেডি হলো এই যে, তাঁর আসল ব্যক্তিত্বটি দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মৃত হবে না। আর তাঁর সাহিত্যকর্ম এক মাটির নিচে পোঁতা নগরীর মতো রয়ে যাবে। বেঁচে থাকবে কেবল এই  জড়মোহটা, কিন্তু সেই উদ্দেশ্যে নয় যার জন্য এটাকে তাঁর স্বদেশীয়রা সৃষ্টি করেছে। এটা কেবল তাদের গলার চারদিকে ঝুলে থাকবে, কোলরিজের প্রাচীন নাবিকের গলায় ঝোলা অ্যালব্যাট্রস-টার মতো, শাস্তি হিসেবে। গলা থেকে পড়বে না। কারণ সেই অ্যানসেন্ট ম্যারিনারের মতোই বাঙালিরা কিছুতেই তাঁর বিরুদ্ধে করা নিজেদের পাপের  জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে পারবে না
কী বললেন? চৌধুরী ভুল বকেছেন? আমরা কী পাপ করেছি? পাপ করিনি? আধুনিক  বাংলাভাষার স্রষ্টা (লোকে বলে মিল্টন ইংরিজি ভাষায় ছ'শো নতুন শব্দ সৃষ্টি  করেছিলেন; শেক্সপিয়র করেছিলেন কুড়ি হাজার; আর রবীন্দ্রনাথ? কখনো-কিছু-করার-না-থাকা শীতের দীর্ঘ সন্ধ্যাতেও ভেবে দেখেছেন?)! তাঁর লেখা বাংলা পরীক্ষায় শুদ্ধ  বঙ্গানুবাদ করতে দেওয়ার জন্য প্যাসেজ হিসেবে দেওয়া পাপ নয়? আর কিসে পাপ হতো! ইনকুইজিশনে দিলে? আর এই অসাধারণ বঙ্গ-বঙ্গানুবাদের উদাহরণ বেয়াক্কেলে চৌধুরী দেন নি। কে দিয়েছেন, ওপরে বলেছি না? সেকালীন শ্রেষ্ঠ বা বলা ভালো একমাত্র উচ্চবিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠান! আর কীভাবে অপমান করা যেত ওঁকে। এর পরেও আমরা বলতে পারি না যে তাঁকে এই কাল্ট করে দেওয়া আসলে অবচেতনায় (রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মগ্নচৈতন্যে’) এই অ্যালব্যাট্রস নামানোর উদ্দণ্ড অবসাদ? কী ভুল করেন চৌধুরী, যখন তিনি বলেন যে নিজের জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ সহ-বাঙালিদের অধিকাংশের দ্বারা প্রায় পরিত্যক্ত হয়েছিলেন, কারণ তিনি যা লিখতেন সেটা তাঁদের মাথার উপর বেরিয়ে যেত এমন কি যে অল্পসংখ্যক অনুরাগী তাঁর বিগ্রহায়ন করতেন তাঁরাও সেটা বুঝতেন না। এখন অবস্থাটা আরো খারাপ,  কারণ বাঙালি জীবন আর সাহিত্যিক ঐতিহ্য এত আলাদা হয়ে গেছে ... যে তাঁর লেখ্যবিষয়  আর তার শৈলী  সমসাময়িক বাঙালিদের কাছে অল্পবিস্তর অনধিগম্য হয়ে গেছে’ তাঁর প্রবন্ধে একটু পরেই নীরদচন্দ্র বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে এমন সময় আসবে যখন  রবীন্দ্রনাথের কাব্যে-সাহিত্যে অর্থ ও সম্পদ খুঁজতে পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক খনক লাগাতে  হবে৪ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোথায় যেন বলেছিলেন (মোটেও ঠিক বলেননি যদিও, কাহ্নপাদের লেখায় কবিতা নেই?), চর্যাপদে কবিতা খুঁজতে গেলে গোয়েন্দা লাগাতে হবে। রবীন্দ্রনাথের সেই দশা হবে না তো আরো একশো বছর পর!  

ভুল বকছি? যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে ফেসবুকে, অ্যাপসে গলা ফাটাচ্ছেন (যেন যায়?), বুকে হাত দিয়ে বলুন তো শেষ সপ্তক, পরিশেষ, পুনশ্চ-র কটা কবিতা পড়েছেন? উইলিয়াম রাদিচের গীতাঞ্জলি সহ বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থের অনুবাদ, কেতকী কুশারী ডাইসনের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ, ওয়েন্ডি বার্কার ও শরনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Wendy  Barker Saranindranath Tagore) যুগ্ম সম্পাদনায় Rabindranath Tagore: Final Poems নামে 'শেষ সপ্তক'এর কবিতাগুলির অনুবাদ ইত্যাদির উপর  করে’ ভর করে’ রবীন্দ্রনাথ অবশেষে তাঁর নিজের এবং তাঁর বেছে নেওয়া কোটারির (coterie)-র জঘন্য অনুবাদের রাহুদশা কাটিয়ে আবার বিদেশে নিখাদ কবি হিসেবে কিছু কল্কে আর আমরা সিরিয়ালে, পাড়ার ক্লাবে, ব্লকের অনুষ্ঠানে ফেসবুকে কবির সেই সব বালখিল্য কবিতা নিয়ে আদিখ্যেতা করছি, যেগুলোকে নিয়ে তিনিই হয়তো পরে লজ্জিত ছিলেন।

কেন করছি এই আধিক্য? নোবেল পেরাইজ ব্যাধি! বা অন্য খেতাবের? যেমন করি অনাবাসী খোরানা, বা চন্দ্রশেখর, এমনকি সুনীতা উইলিয়ামসকে নিয়ে? আনন্দমোহন চক্রবর্তীকে নিয়ে নয়, পেতেও পেতেও নোবেল পাননি যে! প্রাইজকাঙাল বাঙালি এই একটা মওকা পেয়ে গেছে গলা থেকে অ্যালব্যাট্রসটাকে নামাবার! কারুর খেয়াল নেই  যে সেই সময়কার এক বরেণ্য সাহিত্য-সমালোচক আর বিদ্বান দীনেশচন্দ্র সেন অনামা থাকার শর্তে ই. জে. টমসনকে লিখলেন, বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে ইউরোপের হাতে  তুলে দেয়নি। বরং ইউরোপই তাঁকে দিয়েছে বাঙালিদের হাতে। ফলে তাঁকে প্রশংসা করে’ ইউরোপীয় পণ্ডিতরা নিজেদের ‘দান’-এরই প্রশংসা করছে।৫ আরো দুঃখের কথা, তিনি  চাইলেন না, তাঁর নাম উদ্ধৃত হোক। কারণ হিসেবে তিনি ই.জে.টি.কে লিখলেন, যে তিনি রবীন্দ্রনাথের আক্রমক ভক্তদের যত ভয় করতেন, ততটা বোধ হয় টোরিরা হুইগদের বা ক্রমওয়েলের আয়রনসাই্ডসদেরও করতো না।৬ ভদ্রলোক হিসেবে ই.জে.টি. তাঁর ১৯২৬ সালে লেখা Tagore বইয়ের প্রথম পরিশিষ্টে চিঠিটির কিয়দংশ নাম না করেই উদ্ধৃত করেছেন। সেটি আবার ই.পি. উদ্ধৃত করেছেন তাঁর বইতে।৭ সব্বাই হয়তো এত লুকোছাপাও করেন না। যাঁরা ইচ্ছুক জানতে, তাঁরা দেখুন সুজিতকুমার সেনগুপ্তর লেখা জ্যোতির্ময় রবি ও কালো মেঘের দলদেখুন কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ তাঁর মিঠেকড়া-তে লিখছেন যে, কেবল বাপের টাকার জোরে তাঁর  ওইসব লেখা বিকোলোআর পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় তো বলেই দিলেন যে,  রবীন্দ্রনাথের সব লেখাই বিদেশি সাহিত্যের অঋণস্বীকারী নকলি! ই.জে.টি. বোধহয় জানতেন না এঁদের নাম। জানলে বেচারা দীনেশবাবুকে নিয়ে পড়তেন না।
                   
তো! দীনেশবাবুর মতে, ‘ইউরোপই তাঁকে দিয়েছে বাঙালিদের হাতে’ইউরোপ মানে কী? ইয়েটস, স্টারজ মুর, রথেনস্টাইন? রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তির পর ইয়েটসের  কিছু কথাবার্তা এই বিশাল কবিকে বাঙালির কাছে অচ্ছুত করে দিয়েছে। কিন্তু ইয়েটসের মাধ্যমিকতা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের কী হতো তা বোঝা যায় নোবেলপ্রাপ্তির আট বছর পরও তাঁর সম্পর্কে ইউরোপ কী বলছে তার টুকরো-টাকরা থেকে। এক প্রতিষ্ঠিত জার্মান কাগজে লিখছে, প্রাচ্যের এই স্বপ্নদর্শী ও কবির একটি সঙ্কীর্ণ   ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি আছে। নিজের দেশের প্রতিভা থেকে তিনি পেয়েছেন কেবল কিছু ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক ভাবনা, কিন্তু প্রখর কবিপ্রতিভা নয়আরেক ফরাসি সাহিত্য-সমালোচনা পত্রে এলো এই বাণী যে, নিজভূমেই রবীন্দ্রনাথ অনিকেত। কারণ  এক ‘শিক্ষিত বাঙালি’ নাকি সমালোচককে বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের দেশবাসীরাই তাঁর ইংরেজি 'গীতাঞ্জলি' বইটি আদি বাংলাটির থেকে বেশি পছন্দ করে। কেবল  বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত কিছু বাঙালি সাহিত্যব্যবসায়ী, যারা অবিরত  ইংরেজি বই পড়ে, তারাই তাঁর লেখার পরম ভক্ত। তাছাড়াও তাঁর তথাকথিত মরমিয়াবাদে আচে কেবল উপনিষদের, দুর্বল, মৃদু প্রতিধ্বনি।৯ এই মত যে একেবারে অমূলক নয়, তার কিছু প্রমাণ আগেই দিয়েছি। এখানে উল্লেখ করা অসমীচীন হবে না যে, ই.জে.টি দেখাচ্ছেন কীভাবে তাঁর নিকটস্থ স্কুলের সংস্কৃতজ্ঞ হেডপণ্ডিত বাংলা  'গীতাঞ্জলি' দেখে ইস্কুলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন পাশে তীর বেঁধা চিতার মতো (‘like a  leopard with an arrow in his side, আর এক পণ্ডিত বইয়ের সারমর্মটিই উপলব্ধি করতে পারেননি। আর ছাত্রদের বিষয়বস্তু ‘পসন্দ’ হলেও কাব্যশৈলীটা মনে হয়েছিল কাঁচা (‘the diction was mean and bad)১০ আরেক বোদ্ধা তাঁর কবিতার  উপর প্রাচ্যের প্রভাবের গভীরতা আর অগভীর পাশ্চাত্যবাদকে একই বাণে বিঁধে বললেন, এই যদি টিপিক্যাল ওরিয়েন্টাল কবি হয়, তাহলে প্রাচ্যের এমন কিছু দেওয়ার নেই আমাদের যা কিনা আমরা জানি না, একটু স্থানিক রঙ ছাড়া (beyond a little local colour’)এটাই পথ করে দিল পরের ব্যঙ্গোক্তিটির যে,  যাঁরা আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা জীবনের ঝলক দেখে প্রভাবিত হতে চান, যে পূর্বের মন এমন ভাবে কাজ করে যে আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভবই নয় তার প্রকাশ দেখে  ভাবিত হতে চান, তাঁরা ভালো করবেন তাঁদের প্রার্থিত বস্তুর জন্য মিঃ কিপলিং-এর কাছে গেলে, ... ইনি বরং খুব সঙ্কীর্ণ ভিক্টোরীয় অর্থে ইউরোপীয় (‘Those who wish to be impressed by glimpses of a life that is totally different from  our own, by revelations of the Eastern mind which works in a way we can never understand, would do far better to go to Mr. Kipling for what they want … And he is European in what can be called a narrow Victorian style.)’ যাঁরা এতটা মাকড়া নন, তাঁরা আবার বললেন, তাঁরা প্রাচ্য  থেকে চান না, ‘poetic edifices built  upon a foundation of Yeats and Shelley and Walt Whitman”, বরং শুনতে চান কৃষ্ণের সেই বংশীধ্বনি যা শুনে রাধা স্বপ্নপদ্ম-হৃদে এই নীল-দেবতার মায়ামোহে পড়েছিলেন (the flute of Krishna as Radha heard it, to fall under the spell of the blue god in the lotus-heart of dream’).  ১১  

১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর বছরগুলিতে রবীন্দ্রনাথ যখন ইউরোপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন দুই বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী রাজনীতির আবর্তে এই দেশগুলির কায়েমী স্বার্থসমূহ তাঁর সম্পর্কে যেসব আজব আকথা-কুকথা বলেছে, (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন,  সব্বাই!) সে কথা বলার ঠাঁই এটা নয়। রবিন্দর-ভক্তরা ব্যথা পাবেন। কেবল তিনটি কথা  বলি। ক) জানেন যে, পৃথিবীতে একটিমাত্র দেশে রবীন্দ্রনাথের লেখা  নিষিদ্ধ হয়েছিল, লিথুয়ানিয়ায়? কারণ রাজধানী ভিলনায় (যাকে ইতিমধ্যে ইউরোপীয় মাতব্বররা পোল্যাণ্ডকে দিয়ে দিয়েছিলেন) অগ্রসরমাণ ব্রিটিশ ও ফরাসি  যুদ্ধজাহাজগুলিকে  প্রতিহত করতে অপারগ এই দেশটি রাগে, ক্ষোভে রবীন্দ্রনাথের সব লেখাকে শেক্সপীয়র এবং অস্কার ওয়াইল্ডের সঙ্গে বাজেয়াপ্ত করেছিল, অষ্টাদশ শতাব্দীর কুপ্রভাব বলে? ২) ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এক সময়ে নাচানাচি করা জার্মানিতে ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদী কাগজগুলি ভাবতে আরম্ভ করেছিল, রবীন্দ্রনাথ জার্মান না সেমিটিক! বলছিল, জার্মানই মনে হয়, ফলে স্বস্তিকা-ধারণের উপযুক্ত, কিন্তু  বেটার শান্তিবাদ দেখেই ধন্দ হয়। আর  সেমিটিক না হলে ওই লম্বা দাড়ি কেন? আর এত ইহুদি প্রকাশক, শিল্পপতি, বিজ্ঞানীদের (আইনস্টাইন) সঙ্গে ওঠাবসাই বা কেন? ১২

ভাবতে, সংশয় কাটতে লেগে গেল পাক্কা বারো বছর, মানে জার্মানি পুরো ফ্যাসিস্ট হয়ে যাওয়া অবধি। তারপর  এক ইংরেজ মহিলা স্টেটসম্যান, কলকাতায় চিঠি লিখে জানালেন যে, ‘ওখানে’ একটি বক্তৃতার পর একজন উঠে দাঁড়িয়ে জানালেন, এইসব  লোকদের সম্বন্ধে (মানে রবীন্দ্রনাথ) কথা বলাও পাপ। কারণ সব্বাই জানে ব্যাটা  ইহুদি, আদত নাম ‘Rabbi Nathan’ — ইহুদি যাজক কিনা  বিয়ে করেছে বম্বের এক ইহুদিনীকে, যার বাপ আবার বাঁশ-ব্যবসায়ী, আর প্রচুর টাকা কামিয়েছে এই বিয়ে থেকে। ১৩

তো! জার্মান জাত কিনা! পাঁচ বছরের মধ্যেই ভুল শুধরে নিল। বলল যে, নাম  শুনেই বোঝা যায় যে লোকটা ইন্দো-জার্মান। এই ইন্দো-জার্মান বংশেরই একটা ধারা ভারতে গেল, আর একেবারে অশোক থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, মায় নেহরু অবধি  ওটাতেই জন্মাচ্ছেন কিনা! ১৪ ওদের কথা ছাড়ুন। আপনি একটু পড়ুন না ভাই!  লোকটাকে! নইলে সব্বাই যে বেবাক ভুলে যাবে! আর চলবে এই মোচ্ছব!   
**************         ******************         
আরে দূর! এও পড়তে বলছে, বে! শেষ দিকের কবিতা, কীসব মাথামুণ্ডু বকছে। চল তো ‘কবিগুরির’ জম্মদিনটা সেরে আসি! ১৬ শালা বেজম্মা, আমাদের রবীন্দ্রনাথ শেকাতে চায়! বোঝে না, গুরু আমাদের জম্মসূত্রে পাওয়া।  চল, ‘ওই রাতদুপুরে দুষ্টু  বাঁশি বাজে’ দিয়েই শুরু কর। বেড়ে লিখেছে মাইরি বুড়ো! একেবারে লে ছক্কা!

তথ্যসূত্র (ইংরেজিতে, তবে না পড়লেও হয়)
1.  E.P. Thompson, Alien Homage: Edward Thompson and Rabindranath Tagore (Delhi: Oxford University Press, 1993), pp. 53-54, 66.
2.  রাজশেখর বসু, ‘বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি’, রাজশেখর বসু প্রবন্ধাবলী, সঃ দীপঙ্কর বসু (কলকাতা মিত্র ও ঘোষ, ২০১৪), পৃঃ ১৩৯-৪৮, বিঃ ১৪৭।   
3.  Nirad C. Chaudhuri, Thy Hand, Great Anarch! : India 1921-1952 (London: Chatto & Windus, 1987), p. 63-6 সেখানে চৌধুরী বলছেন ‘his real personality will not be recalled as an example, and his work will be like a buried city in the past. Only the fetish Rabindranath will remain, but nor for the purpose for which it has been created by his people. It will hang round their neck as punishment… and it will not drop from there because the Bengalis will never be able to pray for forgiveness for their sins against him.’ 
4.  ‘He was virtually rejected by a majority of fellow Bengalis in his life time, because what he wrote was far above their head, not fully understood even by the small number of admirers who made an idol of him. Now the position is even worse, because both Bengali life and Bengali literary traditions have become so different … because both his matter and manner have become more or less inaccessible to contemporary Bengalees’, তদেব। 
5.  ‘Bengal has not given Rabindranath to Europe. Rather, Europe has given him to the Bengalis. By praising him, the European scholars praise their own gift’, তদেব।
6.  ... far more than the Tories did the Whigs or Cromwell’s Ironsides’.
7.   Dineshchandra [Sen] to E.J. Thompson (EJT), n.d. (1922) and 6 November 1922. EJT, Tagore (1926), parts of Sen’s Letter in Appendix A , pp. 307-08; cited in E. P. Thompson, Alien Homage: Edward Thompson and Rabindranath Tagore (Delhi: Oxford University Press, 1993), pp.53-54.
8.  ‘This man from the East, a dreamer and a poet, has a narrow European outlook. He has gained from the genius of his country only historical and philosophical impressions, but not a formidable poetical impetus’. Vorwarts, Berlin, June 1921, cited in Alex Aronson, Rabindranath through Western Eyes (1943) (Calcutta: Ŗddhi-India, 1978), p.17.
9.  Revue Anglo-Americaine, Paris, February 1930, cited in ibid, p.17.
10.          … only uprooted litterateurs who no longer are in touch with Bengali culture, and only read English books are his most enthusiastic admirers.” Thompson, Alien Homage, pp. 46-7, 53.
11. Edward Shanks, ‘Sir Rabindranath Tagore’, in The Queen, London 21 May 1921, cited in Aronson, Rabindranath, p.16. 
12.          Der Gegner, Berlin, 20 June 1921, Aronson, Rabindranath, pp. 62-3.  
13.          Cornelia Blake to The Statesman, Calcutta, 21 July 1933, cited in Aronson, Rabindranath, p.63. 
এক নাৎসিভূত সিংহলীর বয়ানে, Daily News, Colombo, 6 October 1936.
হ্যাঁ, ভাই এবছরের সরকারি বিজ্ঞাপনে এরকমটাই! দ্রঃ, আর কী? ফেসবুক! সৌজন্যে মহালয়া চ্যাটার্জি।    
                                               
              
 
  

                         

                                  

অন্তরা চৌধুরী

রবীন্দ্র যাপন




রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নতুন করে রচনা লেখার ইচ্ছে আমার নেই। কারণ সেই ক্লাস টু থেকে লিখে আসছি। তাই তথ্য সমৃদ্ধ লেখা থেকে আপাতত মুক্তি নিয়েছি। গত একমাসে সত্যজিৎ রায় ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমরা বড়ই ব্যস্ত। যদিও এই দুজনকে একই ফ্রেমে বন্দী করার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই।

জানেন, রবীন্দ্র যাপন করতে খুব ইচ্ছে করে। অনেকে বলতেই পারেন যে, ‘কে বার করেছে’? সত্যি কেউ বারণ করেনি। কিন্তু ঠিকঠাক রবীন্দ্র যাপন কি করা সম্ভব? বাঙালি যে শুধু পঁচিশে বৈশাখেই রবীন্দ্র যাপন করে তা হয়তো নয়, প্রায় সারা বছর ধরেই করেসত্যি কথা বলতে কি, রাবীন্দ্রিক হওয়ার একটা আলাদা আভিজাত্য আছে। রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝেই চোখে পড়ে, কোনো এক বঙ্গললনা সুসজ্জিত হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত লেখা শাড়িতে। কাঁধে শান্তিনিকেতনের ব্যাগ। কপালে একটা বেশ বড় সাইজের টিপ, খোঁপায় ফুল। সকলের মাঝে থেকেও কিন্তু সে একটা আলাদা মাত্রা পেয়ে যায়। ব্যাক্তিত্বের সীমারেখার পারদ ক্রমশঃ চড়তে থাকে।

পুরুষরাও রাবীন্দ্রিক হবার ইঁদুর দৌড়ে কোথাও এতটুকু পিছিয়ে নেই। বাটিকের পাঞ্জাবী, মুখে খোঁচা দাড়ি আর ওই শান্তিনিকেতনের ব্যাগ নিয়েও সেও যে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা, যে কোনো উপায়ে তাকে এটা প্রমাণ করতেই হয় আবার  মোবাইলের রিংটোনেও রবীন্দ্রনাথ! হঠাৎ জনৈক সঙ্গীত শিল্পীর কন্ঠে ভেসে উঠল- ‘আমার এ পথ, তোমার পথের থেকে অনেক দূরে গেছে বেঁকে’- বোঝাতে চাইল যে সে প্রেমেও রবি, আবার বিরহেও রবি।
 
অর্থাৎ নিজের একটা আলাদা identity তৈরি করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ আদর্শ ঘরানা   মাঝে মাঝে ভাবি জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত কি আছে, যার জন্য রবি ঠাকুর গান  লিখে যাননি! শুধু রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাফিক কাকুদের জন্য তিনি গান লেখেন নি এইখানে তাঁর কিছুটা দূরদর্শীতার অভাব লক্ষ্য করা যায় না না আমি তাই  বলে দোষ তাঁকে দিচ্ছি না সে ধৃষ্টতাও আমার নেই

এখন তো আবার বাংলা সিরিয়ালে রবীন্দ্রসঙ্গীত নতুন ফ্যাশন বাঙালির শয়নে স্বপনে মননে জাগরণে আনন্দে বিরহে সবেতেই রবি ঠাকুর, একথা আমার আগেও অনেকজন বলেছেন আমি শুধু মহাজন যে পথে করেন গমন

দোলের সময় শান্তিনিকেতন না গেলে যেন সমাজে status নষ্ট হবার একটা ভয় কাজ করে তবে সেটা সকলের নয় সারাজীবনে রবীন্দ্রনাথের একটি কাব্য না পড়লেও কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু ড্রয়িংরুমে রবীন্দ্ররচনাবলী থাকা চাইই আপনার অতি  প্রিয়জনের যে কোনো অনুষ্ঠানে ব্যাকগ্রাউণ্ডে যদি হালকা সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়, তাহলে অতিথিরা আপনার রুচির প্রশংসায় পঞ্চমুখ এমনকি দুর্গা পুজোতেও জলতরঙ্গে  রবিঠাকুরের মিউজিক চালিয়ে পুজো কমিটি পেয়ে যাচ্ছে শ্রেষ্ঠ পরিবেশ মনস্কতার  পুরস্কার

তার মানে নিজেদের ইমেজ ধরে রাখার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ভীষ দরকার কিন্তু রবি ঠাকুরের সমসাময়িক এবং পরবর্তীকালে অনেক নতুন সূর্যের আবির্ভাব হয়েছে কিন্তু তাদের অনেকেরই নিজস্ব ঘরানা থাকলেও বাঙালি সেটা গ্রহ করল না কেন? Sofishticated মনোভাবে কি কোথাও ভাঁটার জন্ম নিয়েছিল? আমরা সাহিত্যের ক্ষেত্রে খুব বড়াই করি, একে অপরের ভুল ধরি তখনই, যদি কারো লেখায় রবীন্দ্র প্রভাব পাওয়া যায় অর্থাৎ তার নিজস্বতা বলে কিছু নেই রবীন্দ্রনাথের লেখার স্টাইল এখন নাকি ‘ব্যাকডেটেড’! নৈব নৈব চ কত বড় বড় ভাষণ শুনতে যে হয়,বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া কিছু বুঝল না তার প্রভাব মুক্ত হতে গিয়ে আধুনিক হবার ম্যারাথনে অংশগ্রহ না করলে আর যাই হোক, কফিহাউসে মুখ দেখানো যায় না কিন্তু জীবনের সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে আবার সেই বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে রবিঠাকুর-

      নদীর বুকে যে যার ডিঙা দে ভাসিয়ে
      জীবন নদী খেয়াল খুশি যায় বয়ে যায়
      কোন সাগরে মিলবে নদী বেলা শেষে
      জোয়ার ভাঁটার খেলা সে পথ বোঝারে দায়

এই মনোভাব সকলের নয়, কারো কারো রবিঠাকুর বলেছিলেন, কমল হীরে পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার কিন্তু শিক্ষিত বাঙালির এই বিদ্যে আর কালচারের মধ্যেই যত ঘাত-প্রতিঘাত নিজেদের ইগো নিয়ে আমরা সদা ব্যস্ত, তাই আপনিও যখন যেমন তখন তেমন, এটাই তো আমাদের আদর্শ, তাই নয় কি?
আবার মাছের তেলেই মাছ ভাজি রবিঠাকুরের কাছে-
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে