পঞ্চম বর্ষ / দশম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫২

রবিবার, ১৪ জুন, ২০১৫

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

‘লুঠ’, সুশীল সমাজ ও রাজনীতি








লুঠ চলছে খোলাখুলি। আমাদের প্রাচীনা পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের। উন্নয়নের নামে শিল্পের নামে। আর আমাদের! ‘হৃদিকমলে বড় ধুম লেগেছে’। চওড়া, মসৃণ রাস্তা; চতুর্দিকে কারখানা, মানে শিল্প আর কি; সবার (মানে মধ্য-উচ্চ-উচ্চতর-মধ্যবিত্তের ছানাপোনাদের) ‘কাজ’, তরতরিয়ে ওঠা জিডিপি, মোদির হিন্দুত্বের ডানা-ভর-করা উন্নয়ন, পাস হতে হতে আটকে যাওয়া ভূমি-সংস্কার; এই-সংসদের-পাতে-পড়লো-বলে’ শ্রম-সংস্কার (উফ্ঃ একবার পাশ হলে ৩০০ জনার নিয়োগের কম শিল্পে ইচ্ছে মতো  হায়ার-ফায়ার)রামরাজ্য এলো বলে (আর সেটা আনতে হবে বলেই তো ‘ধীরোদাত্তঃ নায়কঃ’ কেমন খেপে গিয়ে কংগ্রেসের কোল ছেড়ে ভাজপার ধনুতে শর-যোজনা করেছেন)! এর জন্য দরকার! সংস্কার!
     
এটাকে লুঠ বলছেন কেন? উন্নয়নের দরকার নেই? আছে তো! সেই জন্যই তো কর্পোরেট হাউসগুলো সব রঙের কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলোর চোখ-টিপুনিকে ভর করে’ জমি-জল-অরণ্য-খনিজ নিঃশেষে ছিনিয়ে নিচ্ছে; রঙে ঢেকে এক পাহাড়ের গা কোক আর আরেক পাহাড়ের গা পেপসির বিজ্ঞাপনে ভরে দিচ্ছে, তার জৈব-বৈচিত্র্যের গোড়া মেরে’; নরম পানীয়ের নির্মাতারা ভূস্তরের নিচের জলের আদ্যশ্রাদ্ধ করে’, তাদের দূষক-প্রভাব ছড়িয়ে দিয়ে, আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে নাকের-বদলে-নরুন-পেলাম-টাকডুমাডুম-কোল্ড-ড্রিঙ্কস। ২০০৮ সালেই তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার যে কোস্টাল জোন ম্যানেজমেণ্ট নোটিফিকেশন চালু করেছিল, তা আইন হলে, অর্থনীতিবিদ অমিত ভাদুড়ী বলেছেন, উপকূলীয় ভারতের ৭৬০০ কিমি দীর্ঘ সমুদ্রতটভূমি জাতীয়-বিজাতীয় কর্পোরেট শ্রীহস্তে চলে যেত! আর জেলে-মৎস্যকর্মী-মৎস্যজীবী মিলে এককোটিরও বেশি অভাগা উচ্ছেদ হওয়া ছাড়াও প্রভূত উপকূলীয় সম্পদ নষ্ট হতো। তো! এই সব এনজিও মার্কা তাবলে উন্নয়ন হবে না। আর তার জন্যেই তো সাগর সামনে রেখে সৈকত চুরির আইন মাঠে মারা গেলেও তার পরের ‘গান্ধীপদবীবাহিনী’ নেত্রীর সরকার কত কষ্ট করে’ কর্পোরেট প্রতিনিধিপুষ্ট কোস্টাল জোন ম্যানেজমেণ্ট অথরিটি রেখে দিয়েছে। দেখা যাক, এবার কী হয়! জয়রামজীকি? লুঠ চলছে বিশ্বাস হচ্ছে না? তবে দেখুন ‘Plunder of India— Corporate Plunder: Myth or Reality’  (plunder.hpage.co.in/myth-or-reality_56246670.html) আমি দেখেছি এই ২৫শে মার্চে।

কী বললেন? এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে? সেটা করবে কে? সরকার বা রাষ্ট্র, যাই বলুন, সামিল। নইলে, অনন্যা  রায়ের লেখায় (‘Why India Cannot Plan Its Cities: Informality, Insurgence, and the Idiom of Urbanization’, Planning Theory, 8:1 (2009): 76-87) পড়ি কেমনে যে ব্যাঙ্গালোরে, জুরিখ এয়ারপোর্টের মডেলে তৈরি, ঝাঁচকচকে নতুন এয়ারপোর্টে ভারতের ঘনঘন-ওড়া (frequently-flying)  শ্রেণির দ্রুতধাবনের জন্য এক্সপ্রেসওয়ের স্বার্থে রাজনৈতিকভাবে ‘সুসংযুক্ত’ লোকদের সম্পত্তি বাঁচিয়ে, এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থার একজিকিউটিভ ডি.এম. দ্বারকানাথের বাংলো এবং একটি এইডস রোগীদের আশ্রয়স্থল সহ, আর সবই লেপেপুঁছে দেওয়া হচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে’ দ্বারকানাথ রেগেমেগে এক সাংবাদিককে বললেন, ‘ওদের ধৈর্য নেই! ওরা কেবল তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্টে পৌঁছতে চায়। তার জন্য সব্বাইকে সামনের পথ থেকে (নাকি পথের সামনে থেকে?) সরাতে চায়। আমরা কোথায় থাকব? আমাদের সমুদ্রে ঝেঁটিয়ে ফেলুক (S. Sengupta, (2008) ‘An Indian Airport Hurries to Make Its First Flight’, New York Times, 22 May 2008)!

হা ভগবান! বরিষ্ঠ আমলা বলছেন আমরা কোথায় বাঁচবো/থাকবো? তাহলে ওই ‘ওরা’, যাদের মামলা করার পথ বা পয়সা নেই, যারা ‘ইংরিজি’ জানে না, যাদের সাংবাদিক ধরার উপায় নেই, তারা? তারা তো এমনিই শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়, ‘চীনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাসে’ (জীবনানন্দ, ‘রাত্রি’)। তাদের কথা বলবে কে? কেননা,
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সব চেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই–প্রীতি নেই–করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া। (জীবনানন্দ, ‘অদ্ভুত আঁধার এক’)
  
এই ‘এঁদের’ হয়েই কাজ করছে সকলের অভিভাবক, কল্যাণময় রাষ্ট্র থেকে রাতারাতি বণিক বনে যাওয়া নিও-লিব্যারাল রাষ্ট্র। তার কাছে নিম্নবর্গের একমাত্র পরিচয় উপদ্রব হিসেবে। নইলে যে দিল্লীর প্রায় সব নাগরিক নির্মাণ এক সমাজতত্ত্ববিদের মতে (ঘার্টনার) প্রায় পুরোটাই বেআইনি, ‘unauthorized’, যেহেতু, শহরের মোট  নির্মাণের অনেকটাই কোনো প্ল্যান বা বাড়ি তৈরির কোনো না কোনো আইনকে লঙ্ঘন করেছে, সেখানে কোনো কোনো এলাকা  বেআইনি এবং ভূমিসাৎযোগ্য বিবেচিত হয়। বাকিগুলো হয় নাঘার্টনার প্রশ্ন করেন, এটা কেন হয় যে সাম্প্রতিক কয় বছরে  দিল্লির বস্তিগুলিকে ‘nuisance’ আর তাদের অধিবাসীদের ‘স্বাভাবিক’ সম্পত্তিমালিকানা বিশিষ্ট নাগরিকদের থেকে নিকৃষ্ট মনে করা হয়। অথচ যেসব নির্মাণ তথা উন্নয়নের চেহারা ‘বিশ্বমানের’, (world class) যেমন অক্ষরধাম মন্দির, তারা নির্মাণের হাজারো নিয়ম-নীতি-নির্দেশ ভাঙলেও ‘আধুনিকতার নিদর্শন’ হিসেবে ছাড় তো পায়ই, আদৃতও হয় (A. Ghertner, ‘Analysis of New Legal Discourse Behind Delhi’s Slum Demolitions’, Economic and Political Weekly, 17 May 2008, pp. 57–66)

মুম্বই শহরে আদর্শ হাউসিং স্ক্যাম-এর ‘হুইস্‌লব্লোয়ার’ সিম্প্রীত সিং যখন কারগিল যুদ্ধের শহীদদের জন্য আর্মির বরাদ্দ করা জমি কী করে আমলা, সাংবাদিক, এবং  অন্য গণ্যমান্যদের হাতে গেল তা ঢুঁড়ে বের করার পর, ‘ঘর বাঁচাও ঘর বনাও’ আন্দোলনের মাধ্যমে জমি-হাঙরদের বাজারী শক্তির হাতে কী করে’ বস্তিবাসীদের বাস্তুচ্যুত হওয়া ঠেকাচ্ছেন, তখনও আমরা দেখি রাষ্ট্র সামিল। একদিকে যখন গরিব ‘অনধিকারপ্রবেশকারীদের’ হটিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বেআইনী বস্তি থেকে, তখনই সাংলি পুর কমিশনারের এবং ফরেস্ট কনজারভেটর এবং অ্যাসিস্ট্যাণ্ট কলেকটরের নেতৃত্বে চল্লিশ আমলার— নাকি আলিবাবার চল্লিশ চোরের— হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ৩৭,০০০ বর্গফুট জমি কোলাপুর শহরের সার্কিট হাউসের কাছে, ‘পশ’ এলাকায় ১৮ টাকা প্রতি বর্গফুট দরে, ওখানকার বস্তি লেপেপুঁছে, ভূমিসাৎ করে। কোথায়? না সেই মুম্বইতে, যেখানে বর্গফুটপ্রতি জমির দাম শস্তা এলাকায়(মুলুন্দ, গোরেগাঁও)-তে ৯০০০ টাকা থেকে মালাবার হিলে ১.৪ লক্ষ টাকা। সরকারি জমিলুঠ নয়?
             
এটা হচ্ছে কি করে? অনন্যা রায় বলছেন, হতে পারে এই কারণে যে, রাষ্ট্র এক ‘অনানুষ্ঠানিকতা’-র (informality)অন্তরালে ভূমির উপর নিজের সার্বভৌম অধিকারের ব্যবহাররীতিগুলির অনুশীলন করছে। যার ফলে বামশাসিত পশ্চিমবঙ্গেও আমরা দেখেছি রাষ্ট্রকে অনবরতঃ জমির অনানুষ্ঠানিক খাসকরণ তথা  ‘খাসীকরণ’— হ্যাঁ  ‘informal vesting’- এর এই বিকট বাংলাটা ভেবেচিন্তেই করা — করে যেতে। জমির এই অনানুষ্ঠানিক ‘খাসকরণ’ই বামফ্রণ্টের সমর্থনে বর্গাদারদের আইনের ফাঁকে জমির বাস্তব ব্যবহারের অধিকার (de facto use rights) দিয়েছিল। জমির এই অনানুষ্ঠানিক খাসকরণই তার ১০ বছর পর বামফ্রণ্টকে শহরের কেন্দ্রস্থলে  হকার ইত্যাকার দখলদারদের পুনর্বসতির জন্যে জমি জোগাড় করতে সাহায্য করেছিল। আর তারও দশ বছর পর জমির এই অনানুষ্ঠানিক খাসকরণই বামফ্রণ্টকে সাহায্য করেছিল  মূল শহরে এই দখলদারদের আর শহরের উপকণ্ঠে (সিঙ্গুরে) বর্গাদারদের হটিয়ে দিয়ে শিল্পটিল্প গড়ায় ব্যক্তিগত পুঁজিকে  সাহায্য করতে। বামফ্রণ্টের পক্ষে সহজ হয়েছিল বর্গাদারদের খেদিয়ে নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব তথা ‘সেজ’, ও মেদিনীপুরে ও অন্যান্য জেলায় প্রান্তীয়-নাগরিক শহর ও আবাসনপ্রকল্প গড়ায় বিদেশি পুঁজিকে আহ্বান করতে। এই প্রক্রিয়া বেআইনী নয়। আইনের বাইরে এর অবস্থান। বরং এর চরিত্র উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া অনানুষ্ঠানিকতা,  জমি-লুঠেরাদের সাহায্যার্থে ভূখণ্ড ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অনুশীলন। অনন্যা রায়ের কথায় এই ভূখণ্ডায়িত নমনীয়তাই রাষ্ট্রকে সুযোগ করে দেয় বর্তমান জমিকে ভবিষ্যতের নতুন নতুন ব্যবহারে কাজে লাগাতে; বর্তমান ব্যবহারের হীনায়ন বা মানহানি ঘটাতে; আর এক ভদ্রায়িত ভবিষ্যতের জন্য তাকে তুলে রাখতে। এতে কেবল আর স্থান থাকছে না গরিবের।

এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কই? এই সংগঠিত লুঠের বিরুদ্ধে কখনো কখনো বিচার ব্যবস্থা এগিয়ে এসেছে, যেমন আদর্শ হাউসিং স্ক্যাম-এর ক্ষেত্রে, বা যখন হিমাচল প্রদেশের হাই কোর্ট পারিবেশিক নিয়মনীতি লঙ্ঘনের কারণে জয়প্রকাশ অ্যাসোসিয়েটস-এর বাঘেরি  সিমেন্ট প্ল্যান্টের উপর ১০০ কোটি টাকার জরিমানা চাপিয়েছে। কিন্তু এই ‘extra-legal’ প্রক্রিয়ায় আইন অনেক সময়ই নিধিরাম। আমাদের ‘সুশীল সমাজের’ ভূমিকা কী? সে কখনও ২১শতকের মানবিক অধিকার, এলজিবিটিকিউদের অধিকার ইত্যাদির ব্যাপারে গলা খুললেও এই সব ব্যাপারে চুপ। কথা বলে মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোকসামাজিক ভিত্তির সংগঠন (Community based organizations বা CBO) অথচ আমি সমর্থন করি রাজন  গুরুক্কলকে, যখন তিনি এই জমি লুঠেরাদের বিরুদ্ধে গরিবের আন্দোলনকেই বলেন, তাঁর বিখ্যাত কাপ্পেন মেমোরিয়াল লেকচারে:  প্রতিরোধ ও আশার, এখনকার স্বাধীনতা সংগ্রাম (‘Resistance and Hope: Freedom Struggles in India Today’)যে গরিবরা লড়ছে তারা জানে না যে তারাই, লক-টকভিলের ঢঙের সত্যকারের সিভিল সোসাইটি, বা পার্থ চ্যাটারজির ঢঙের ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’যে লড়াই তারা লড়ছে সেটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাবৎ রাজনীতি। আসুন একবার তাদের হয়ে লড়ি! আমাদের গ্যারি স্নাইডারের টারটল আইল্যান্ডকে বাঁচাতে! তাঁর মতোই বলি,  
I pledge allegiance
I pledge allegiance to the soil
of Turtle Island
and to the beings who thereon dwell
one ecosystem
in diversity  
under the sun
with joyful interpretation for all.   

কী বললেন এই কুতর্কের মধ্যে পরিবেশ কিম্বা গ্যারি স্নাইডারের এই ইকোসিস্টেম আসছে কেন? কেন নয়? মানুষদের বাদ দিয়ে পরিবেশ কিবা পরিবেশ-ফ্রেণ্ডলি-উন্নয়ন? আর! স্নাইডারের সেই সব ‘beings’দের মধ্যে ওই বোকাসোকা, কালোকুলো, ঘেমোগন্ধ মানুষগুলো আসে কী করে? সেই তো সাহেব! যদি এই না হতো আপনাদের বিচার তবে কি আর রামকৃষ্ণ ঠাকুরকে বলতে হতো, ‘মন্দিরে তোর নেইকো মাধব,/ পোদো শাঁখ ফুঁকে তুই করলি গোল’! মানুষদের বাদ দিয়ে, প্রকৃতির লুঠের মধ্যে পরিবেশ হয়? বলুন!     

         

2 কমেন্টস্:

  1. খুবই প্রাসঙ্গিক এবং শিকড়ের দিকে মুখ করে লেখা... আগামী 20 বছরে বাসযোগ্য পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে...!
    গরীব মানুষ আইন বোঝেনা ঘোষনাও না,
    জমি জিরেত মাথা গোঁজার ঠাই হারনোর সম্ভাবনা দেখা দিলেই সে নড়বে দোলাবে...
    জল জঙগল নদী পাহাড়ের মাফিয়া তারা নয়, অথচ বাঁচানোর দায় জন্মগতভাবে তাদেরই হাতে...

    উত্তরমুছুন
  2. খুবই প্রাসঙ্গিক এবং শিকড়ের দিকে মুখ করে লেখা... আগামী 20 বছরে বাসযোগ্য পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে...!
    গরীব মানুষ আইন বোঝেনা ঘোষনাও না,
    জমি জিরেত মাথা গোঁজার ঠাই হারনোর সম্ভাবনা দেখা দিলেই সে নড়বে দোলাবে...
    জল জঙগল নদী পাহাড়ের মাফিয়া তারা নয়, অথচ বাঁচানোর দায় জন্মগতভাবে তাদেরই হাতে...

    উত্তরমুছুন