পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৫

***** সম্পাদকীয় *****

কালিমাটি অনলাইন / ২৮

ঝড় ও বাতাসের মধ্যে চরিত্রগত যে পার্থক্য, তা একটা কিন্ডার গার্টেনের বাচ্চাও জানে, বোঝে। নতুন কিছু বোঝাবারও নেইবাতাসের অন্তরমহলেই আমাদের সবার  বসবাস, অনেকটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতোই। আর ঝড় যদিও বাতাসেরই একটা বিশেষ প্রক্রিয়া, কিন্তু তার স্থায়িত্ব বড়ই কম; জন্মের পরেই সে তেড়ে যায় মৃত্যুর  মুখোমুখি। রবীন্দ্রনাথ একটি লেখায় অন্য এক প্রসঙ্গে ঝড় ও বাতাসের বৈশিষ্ট্যগত  পার্থক্য নির্দেশ করে বাতাসকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন, ঝড়কে তেমন পাত্তা দেননি। আবার অন্যত্র একটি লেখায় তিনি পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ঝড়কে স্বাগত জানিয়েছেন। আসলে ঝড় তার যাত্রাপথে ধ্বংসের যেসব বীভৎস নিদর্শন রেখে যায়, তা রীতিমতো দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়। কিন্তু শান্ত নির্মল বাতাস যদিও আমাদের সবার জীবনধারণে অপরিহার্য, প্রকৃত  ভাবনায় আমাদের জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী; কিন্তু মাঝে মাঝেই সেই শান্ত বাতাসের রুদ্র রূপও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বস্তুত পুরনো নির্মাণ ও সৃষ্টি যদি তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েও অটুট থাকে, তাহলে নতুন নির্মাণ ও সৃষ্টির আর অবকাশ কোথায়! কোনো আয়তন অচল হয়ে গেলে তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং সেই কাজটি নিপুণ ভাবে সম্পন্ন করে হঠাৎ ধেয়ে আসা ভয়ংকর ঝড়। এখানে কিন্তু বাতাস ও ঝড়ের পারস্পরিক কোনো বৈরীতা নেই। আর বলা বাহুল্য, এখানে যা কিছু বলা হলো, তার মধ্যেও কোনো নতুনত্ব ও অভিনবত্ব নেই। ঐ যে বললাম, একটা কিন্ডার গার্টেনের বাচ্চাও এসব জানে, বোঝে। কিন্তু তাসত্ত্বেও আমাদের জীবনযাপনে, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায়, রাজনৈতিক কাঠামোয়, শিক্ষা-সংস্কৃতি-ধর্ম ভাবনায়, মানবিকতার ধারণায় কেন যে আমরা বৈপরিত্যের শিকার হই, স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য চরম রক্ষণশীলতার আশ্রয় নিই, তা সত্যিই বড় বিষ্ময়ের ব্যাপার! পুরনো জুতোয় পা গলিয়ে আমরা আরামে নিশ্চিন্তে থাকি, নতুন জুতোয় পায়ে ফোস্কা পড়ার আশঙ্কায়। অথচ সারা বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ড জুড়ে আমরা যা কিছু নতুনের সুলুকসন্ধান পাই, তা সম্ভব হয়েছে পুরনোকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে। আর এসব কিছুই ঘটে নিতান্তই বিজ্ঞানের নিয়ম সূত্র ও প্রযুক্তির বিকাশের দরুন। তবু আমাদের অমূলক দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে নতুন সৃষ্টি, নতুন নির্মাণকে সহজে গ্রহণ করতে আমরা অস্বীকার করি, তা সে আমাদের জীবনযাপন, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক কাঠামো, সাহিত্য, শিল্প, কলা, সঙ্গীত, শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদি যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন। আর আমাদের এই দ্বিচারিতাই আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ক্ষেত্র বিশেষে পঙ্গু করে রাখেএবং আমরা এই সত্য যত তাড়াতাড়ি  হৃদয়ঙ্গম করতে পারব, ততই আমরা প্রকৃত সভ্যতার দাবীদার হতে পারব।

কালিমাটি অনলাইনের বিভিন্ন বিভাগের জন্য আপনাদের লেখা ও ছবি পাঠাতে আবার অনুরোধ জানাই। সেইসঙ্গে প্রকাশিত লেখা ও ছবি সম্পর্কে আপনাদের সুচিন্তিত অভিমত। আপনাদের ভালো লেখা প্রকাশের জন্য আমরা দায়বদ্ধ।


আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India
     



    

***** কথনবিশ্ব *****


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

সখী, স্বাধীনতা কারে কয় ? শুধু অপারপবশ্য নয় !



  
এম.. ক্লাস আজকাল, বহুদিন ধরেই দ্বিভাষিক। ইংলিশে দুর্বল আর বেঙ্গলিতে (পাত্রান্তরে ব্যাঙ্গলিতে) ‘উইক’ ছাত্রদের দুটো ভাষাই অল্পবেস্তর শেখাতে হয়। তায় রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক আর সমাজবৈজ্ঞানিক শব্দের সঙ্গে তালমিল রেখে। এই পারিভাষিক সমস্যার অন্ত নেই। কারণ সব কটা শব্দই একেকটা ঐতিহাসিক ভাবে গঠিত, পুনর্গঠিত, বিবর্তিত ধারণা, আর তার সামাজিক-ঐতিহাসিক–সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ/অনুষঙ্গ নিজের অঙ্গে কবচকুণ্ডলের মতো ধারণ করে’ থাকে! ছাত্রদের বলি ‘লিবার্টি’, ‘ফ্রিডম’ আর  ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ — সবকটি শব্দের বঙ্গার্থ স্বাধীনতা হয় কী করে?

বন্ধু পাঠক আপাততঃ অনেকানেক সুগম্ভীর বিষয় সরিয়ে এটাই এবার আমার কালিমাটিকথন! কারণ অনুমেয়। পরের সংখ্যা কালিমাটি যখন বেরোবে তখন   স্বাধীনতা দিবসের আটষট্টি বার্ষিকী যাপনও সাঙ্গ। তাই প্রশ্ন — স্বাধীনতা, কারে কয়? শুধু পরবশ হওয়া নয়? অবশ্যই সময়াভাবে এবং লেখার উদ্দেশ্যের কারণে,  এতে আমার বিশ্রম্ভালাপের সুরই বেশি বাজবে!
  
‘লিবার্টি’ শব্দটি এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে ভালো ইঙ্গ-বঙ্গ অভিধানে প্রাথমিকভাবে চারটি অর্থ বোঝায় — (১) ‘স্বাধীনতা, মুক্তি, স্বাধীন বা মুক্ত অবস্থা (২) ‘নিজের খুশিমতো চলাফেরা, জীবনযাপন, কাজকর্ম ইঃ করার ক্ষমতা বা অধিকার;...  (৩) শিষ্টাচারবহির্ভূত/মাত্রাছাড়া অন্তরঙ্গতা, যা খুশি তাই আচরণ। (৪) ... কর্তৃপক্ষের দ্বারা প্রদত্ত অধিকার, সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি’। ওই ওখানেই ‘ফ্রিডম’ শব্দটির মানে দেওয়া রয়েছে আমাদের পক্ষে প্রাসঙ্গিক তিনটি — (১) ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা, অ-দাসত্ব; নাগরিক অধিকার, আজাদি স্বাধীনতা; কাজ করার স্বাধীনতা (২)স্বয়ং-নির্ধারণের ক্ষমতা, নিয়তিচালিত না-হওয়া।’ (৩)অকুণ্ঠতা,  অকপটতা, স্পষ্টবাদিতা; গায়ে পড়া ভাব; সাবলীলতা, স্বাচ্ছন্দ্য; ধারণার বা চিন্তার সাহসিকতা। (৪) শুল্ক, বোঝা, অসুবিধা ইঃ থেকে রেহাই, নিষ্কৃতি, ছাড়, মকুব, অব্যাহতি... (৫) শহর, পৌরসভা ইত্যাদির বিশেষ অধিকার ... (৬) অবাধে ব্যবহারের অধিকার...আর ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’এর যে সব মানে ওই থাম্বা অভিধানে দেয়া আছে সেগুলি হলো — স্বাধীনতা, অপারবশ্য, স্বাবলম্বন, স্বাতন্র্য।1

অবশ্যই এই শব্দার্থগুলি কোনো একটি অবস্থা, পরিস্থিতি, দায়বিদায়কে ব্যাখ্যা করে না। তাই এদের অনুষঙ্গ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে! কিন্তু তবুও আমি নিজের স্বার্থে সবকটির একটি একক অভিধা করে নিই! ‘লিবার্টি’ বলতে আমি বুঝি স্বতঃশ্চালনা; ‘ফ্রিডম’ বলতে স্বাধীনতা; আর ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ বলতে অপারবশ্য(তা)। শব্দত্রয়ের একটা গুরুত্বের ক্রম আছে, যদিও তিনটিই কর্তৃত্বের অধিকারের উপর সীমাবদ্ধতা ও সীমাবন্ধনকে নির্দেশ করে এবং তা থেকেই উদ্ভূত; আর তিনটিই আন্তঃসম্পর্কিত! এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাথম্য বোধহয় ‘লিবার্টি’-র তাকে ছাড়া স্বাধীনতা, আর অপারবশ্যর অর্থ ও তাৎপর্য থাকে না! স্বতঃশ্চালনার অর্থে ‘লিবার্টি’র শ্রেষ্ঠ আদি তাও্বিক জন মিলটন (হ্যাঁ, কবিই) আর জন স্টুয়ার্ট মিল, তাঁদের বই অ্যারিওপাগিটিকা আর অন লিবার্টি-র দৌলতে। মিল্টনের ‘লিবার্টি’-প্রকল্প যেন অনেকগুলি সমকেন্দ্রীয়/এককেন্দ্রিক বৃত্তের পর্যায়। একেবারে বাইরের বৃত্তে সিভিল লিবার্টি, যা রাষ্ট্রের সকল মানুষকে স্পৃষ্ট করে ও তাদের সকলের লভ্য। তার পরের ভিতরের ক্ষুদ্রতর বৃত্তটায় পাই যাজকীয় বা খ্রীষ্টীয় লিবার্টি, যা খৃস্ট-উদ্ধৃত সকল মানুষের লভ্য। ভিতরের আরো ক্ষুদ্রতর বৃত্তটায় পাই গার্হস্থ্য লিবার্টি, পরিবারের ভিতরে আর ব্যক্তি হিসেবে মানুষের জীবনযাপনের অধিকার। আর সবার মধ্যেকার ক্ষুদ্রতম আর বাকি সবকটির সম্পর্কে কেন্দ্রীয় বৃত্তটায় আছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, যেখানে প্রতিটি মানুষ ঈশ্বরের ইচ্ছার সঙ্গে সম্মুখসম্পর্কে উপনীত, যাকে সে মানতে পারে বা না পারে। আর এই ক্ষুদ্রতম ক্ষেত্রটায় সব চেয়ে ছোট্ট পছন্দ আর বাছাইগুলো বাইরের সবকটি বৃত্তকে প্রভাবিত করে। তবে টেনিওর অভ কিংস অ্যান্ড মাজিস্ট্রেটস বইয়ে মিলটন বললেন কেবল সদিচ্ছা আর সৎ বাছাই ছাড়া এই স্তরের স্বতঃশ্চালনা সম্ভবই নয়। মিল কিন্তু তাঁর অন লিবার্টি বইয়ে স্বতঃশ্চালনাকে অনেক খোলা হাওয়া দিয়েছেন। লিবার্টি দুই ধরনে — নঞর্থক ও সদর্থক। নঞর্থক অর্থে লিবার্টি বলতে বোঝায় ব্যক্তিমানুষের ‘আত্মসম্পর্কিত’ সব কাজের উপর সব ধরনের কর্তৃত্ববাদী নিষেধাজ্ঞার অনুপস্থিতি, যদিও ‘(অ)পরসম্পর্কিত’ ক্রিয়ার উপর নয়। আর সদর্থক অর্থে লিবার্টি হলো সেই এলাকা যেখানে ব্যক্তিমানুষ নিজেদের উদ্দীপনাকে সৃজনশীল  আর আত্মোন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারে। এর পর থেকে লিবার্টিতত্ত্বের অনেক বিবর্তন হয়েছে। মিলের ‘আত্মসম্পর্কিত’ আর ‘(অ)পরসম্পর্কিত’ ক্রিয়ার পার্থক্য নিরুপণ অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। তবুও লিবার্টির সংজ্ঞায়নে মিল্টন আর মিলের এই পার্থক্য নিরুপণ রয়ে গেছে আর্কিমিডিয়ান পয়েণ্ট।

লিবার্টি তত্ত্বের এই প্রয়োগটি লক্ষ্য করুন। এডওয়ার্ড লীয়রের সেই বিখ্যাত ছড়ায়,  যাতে আমার ভাবানুবাদে দেখি  
হাট্টিমা টিম টিম
হাম্পটি ডাম্পটি ডিম।
সেই ডিম খেয়ালে
পা দোলায় দেয়ালে।
তারপরে তো সটান পপাত্*
সক্কলেরি মাথাতে হাত
কারণ রাজার সকল ঘোড়া,
এবং রাজার হাজার সেনা, 
হাম্পটি ডাম্পটিকে
জুড়তেই পারলো না।
    
খেয়াল করুন যে, একটি আগামুড়ো না ভাঙা ডিম দেয়ালে বসছেওর কোনো  ‘নেগেটিভ এন্ট্রোপি’ থাকবেই না! পড়বা! জানে সবাই। কিন্তু কেউ আটকাচ্ছে না! যদিও পড়ে যাওয়া মাত্র রাষ্ট্র তৈরি তার সব সেনাঘোড়াক্ষমতা নিয়ে সাহায্য করতে। নঞর্থক স্বতঃশ্চালনার এর চেয়ে ভালো উচ্চারণ হতে পারে?

ফ্রিডম বা স্বাধীনতা লিবার্টির বা স্বতঃশ্চালনার ধারণার সঙ্গে কার্যকারণসূত্রে জড়ানো,  আর তার নঞর্থক এবং সদর্থক দুই ধারণারই ভাগীদার। স্বতঃশ্চালনার উপর আইসা বার্লিনের বিখ্যাত প্রবন্ধ, ‘টু কনসেপ্টস অভ লিবার্টি’ (১৯৫৮) পড়লেই বোঝা যাবে।2 বার্লিন শুরু করছেন এই কথা দিয়ে কোনো মানুষকে বাধ্য করা মানেই তাকে   স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা কিন্তু, কিসের থেকে স্বাধীনতা? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে অবশ্যই বিচার করতে হবে (১) কোন কোন এলাকার মধ্যে ব্যক্তিমানুষকে বা তাদের গোষ্ঠিকে বা সমষ্টিকে সে/তারা যা যা করতে চায় আর যা  যা হতে চায় সেটা অন্যদের ব্যতিচার বা হস্তক্ষেপ ছাড়া অনুসরণ করতে ছেড়ে    রাখা/দেওয়া হয়েছে; আর (২) কোন নিয়ন্ত্রণের বা ব্যতিচারের উৎস থেকে ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে সে/তারা এটা না করে/হয়ে অন্যটা করতে/হতে পারে।

এই দুই প্রশ্নের আর তাদের সমর্থন/খণ্ডনের মধ্যে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতা, অধিকার, রাষ্ট্র ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে’ মহা মহা প্রতর্ক আর আখ্যান। তাদের মধ্যে ঢোকার সময়, পরিসর নেই! কেবল এগুলোই বলে নেয়া যাক যে  স্বাধীনতার নঞর্থক আর সদর্থক ধারণার মধ্যে এই তফাৎ করাই যায় না। উদাহরণ হিসেবে ভাবুন চুক্তির স্বাধীনতা তথা ‘লাইসে ফেয়ার’, যা সকল উদারনৈতিক স্বাধীনতার প্রাণ তথা মূল ভিত্তিকারণ তার আদি উচ্চারণে, ক্ষমতাশালী ফরাসি অর্থমন্ত্রী Jean-Baptiste Colbert-কে জনৈক ব্যবসায়ী M. Le Gendre-র বলা এই আপ্তবাক্যটি ‘Laissez faire laissez passer’ যার রাবীন্দ্রিক বাংলা হতে পারে, ‘যেতে দাও গেল যারা’, তা ব্যক্তিমানুষ ও শিল্পোদ্যোগীর স্বাধীনতা দিতে দিতেই রাষ্ট্রের অধিকারের সীমা নির্ধারণ করে! এই তত্ত্বের একদেশদর্শিতা ও ব্যবসায়ীমুখিতাকে দূর করতে এসেছে (ক)‘ফ্রিডম টু’ আর ‘ফ্রিডম ফ্রম’-এর পার্থক্যনিরুপণ; (খ)‘রাইট্‌স টু’ থেকে ‘রাইট্‌স অভ’-এর প্রভেদকরণ; (গ)‘রাইট্‌স অ্যাজ গুডস’ এর ধারণা। অনেক যৌথ/সামগ্রিক/ সার্বজনিক দ্রব্যের প্রতি, যাকে আজকাল ‘পাবলিক গুডস’ বলা হয়, আর যার বাংলা আমি রবীন্দ্রনাথের একটি অসাধারণ প্রবন্ধের নামে করি ‘লোকহিত’, সম্ভব হয় না যদি আমার ‘ফ্রিডম ফ্রম’এর সঙ্গে সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ ‘ফ্রিডম টু’ না থাকে। ‘রাইট্‌ টু ফ্রি মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট’ আপনাকে হাসপাতালের দোরগোড়া অব্দি পৌঁছে দেয়, কিন্তু ‘বেডে’ উঠতে আর ওষুধ-বিষুধ, ডাক্তারি-সার্জারি, শুশ্রূষা ছিনিয়ে নিতে সাহায্য করে না। এখানেই আসে ‘রাইট্‌স অ্যাজ গুডস’-এর তাৎপর্যএর জন্যে আবার ঠিক করতে হয় আমার রাষ্ট্র কেমন হবে! কারণ অধিকারকে দ্রব্যে/হিতে বা হিতকারী দ্রব্যে পরিণত করতে গেলে ন্যায়, অপক্ষপাতী বিচার আর সাম্য ছাড়া চলবেই না। এর ব্যাপারে লিখেছেন স্টুয়ার্ট রাশ, ফ্র্যাঙ্ক কানিংহ্যাম, ভার্জিনিয়া হেল্ড3 আদি অনেক গণতন্ত্রতাত্ত্বিক। এর জন্যে আবার রাষ্ট্রকে কুলীনতান্ত্রিক ‘থিন ডেমোক্রেসি’ ছেড়ে ‘স্ট্রং বা থিক ডেমোক্রেসি’-র বন্দোবস্ত করতে হবে। যেমন লিখেছেন বেঞ্জামিন বার্বার তাঁর প্রখর লেখনীতে।4 অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছয় খণ্ডের মহোপন্যাস ‘সত্যাসত্য’-তে নায়ক বাদল তো স্বতঃশ্চালনার তথা লিবার্টির সঙ্গে সাম্যের সম্পর্ক নির্ধারণ করার পরিশ্রমে অকালে মরেই গেলমরার আগে অবিশ্যি সে দিব্যবাণী করে গিয়েছিল যে, লিবার্টি আর ইকোয়ালিটিকে ভাগ করে নিতে গিয়ে পশ্চিম আর পূর্ব ইউরোপ  দুটোকেই খোঁড়া করে দিয়েছে। দিব্যবাণী, কারণ এই সত্যোপলব্ধি পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রগুলির ভাঙনের অনেক আগেকার কথা! কিন্তু পশ্চিম ইউরোপে আর তার আরো পশ্চিমে সমুদ্রপারে যে ‘বিজয়ের’ ট্রায়াম্ফ্যালিজ্‌ম চলছে তার দিনও শেষ হলো  বলে। বাদলই ঠিক প্রমাণিত হবে। কিনসীয়/রুজভেল্টীয় জনকল্যাণবাদী রাষ্ট্রকে সেই ১৯৪৪ সালেই ‘ন্যানি স্টেট’ বলে দিলেন হায়েক।5 আর ফ্রিডম্যানীয় / থ্যাচারীয় / রেগনীয় অর্থনৈতিক দর্শন যে সেই রাষ্ট্রকে তার মেদ ঝরাতে আর পাততাড়ি গোটাতে পরামর্শ দিল, আর আমরা মানা শুরু করলাম,6 তার পরে বহুকাল কেটে গেছে আমাদের সুমেদী  টুনটুনরাষ্ট্র স্লিমিং পার্লারে গিয়ে যখন আমাদের দেশেও ঐশ্বর্যা/প্রিয়াঙ্কা রাষ্ট্রের জিরো ফিগারের সাধনায় মত্ত, তখনই সমুদ্রপারে ব্রিটনি স্পিয়ারের জায়গায় কেট মিলেটের ফিগারমডেলের আগমনের পাশাপাশিই ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তাঁর ইতিহাসের সমাপ্তির ১৯৯২-এর বুকনি ছেড়ে7 ২০০৪ সালেই নতুন রাষ্ট্রনির্মাণের পথে ফিরে এসেছেন।8 পিকচার অব্‌ভি বাকি হ্যায় দোস্ত!

এইসব ঝামেলার মধ্যে স্বাধীনতা বলতে কেবল রাষ্ট্রিক অপারবশ্যের কথা বললে যে ব্যক্তিমানুষের মুক্তির চিঁড়ে ভিজবে না, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। উপরের শব্দত্রয়ের পরস্পর নির্ভরতার আর সেই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রিক অপারবশ্যের শূন্যগর্ভতার কথা অনেককাল আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কেমন করে তুলে ধরেছেন সেটা একটু আগে বলতে হবে এই প্রসঙ্গে।
‘ভারতবর্ষ পূর্ব্বে স্বাধীন ছিল এখন অনেক শত বৎসর হইতে পরাধীন’ এতে ‘নব্য ভারতবর্ষীয়েরা’ যত দুঃখ পেয়েছেন তাতে দৃকপাত না করে’ বঙ্কিম প্রাচীন স্বাধীন ভারতের সঙ্গে আধুনিক পরাধীন ভারতের তুলনা করতে গিয়ে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন তাঁর এক বিখ্যাত প্রবন্ধে।8 তিনি তাঁর মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া যুক্তিমালা শুরু করলেন এই কথা দিয়ে
‘বাঙ্গালি ইংরেজি পড়িয়া এ বিষয়ে দুইটি কথা শিখিয়াছেনLiberty” “Independence”, তাহার অনুবাদে আমরা স্বাধীনতা এবং স্বতন্ত্রতা দুইটি কথা পাইয়াছি। অনেকেরই বোধ আছে যে, দুইটি শব্দে এক পদার্থকে বুঝায়। স্বজাতির শাসনাধীন অবস্থাকেই ইহা বুঝায়, এইটি সাধারণ প্রতীতি। রাজা যদি ভিন্নদেশীয় হন, তবে তাঁহার প্রজাগণ পরাধীন, এবং সেই রাজ্য পরতন্ত্র। এই হেতু, এক্ষণে ইংরেজের শাসনাধীন ভারতবর্ষকে পরাধীন ও পরতন্ত্র বয়লা হইয়া থাকে। এই জন্য মোগলদের শাসিত ভারতবর্ষকে বা সেরাজদ্দৌলার শাসিত বাংলাকে পরাধীন বা পরতন্ত্র বলা গিয়া থাকে। এইরূপ সংস্কারের সমূলকতা বিবেচনা করা যাউক।’

তা করেছেন বঙ্কিম, সবিস্তারে! প্রথমে দেখিয়েছেন যে ‘জর্ম্মান’ বংশোদ্ভূত প্রথম বা দ্বিতীয় জর্জ আর ওলন্দাজ তৃতীয় উইলিয়াম শাসিত ইংলণ্ড, কর্সিকার ইটালীয় বোনাপার্টি শাসিত ফ্রান্স সে অর্থে পরতন্ত্র। ‘যদি প্রথম জর্জ-শাসিত ইংলণ্ড বা ত্রেজান-শাসিত রোমকে পরাধীন বলা না যায়, তবে শাহাজাঁদা-শাসিত ভারতবর্ষকে  অথবা আলীবর্দ্দী-শাসিত বাঙ্গালাকে পরাধীন বলি কেন?’ অতএব পারতন্ত্র্য ও পরাধীনতা ‘পরিভাষার অনুরোধে’ আলাদা। তবে ‘স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাধীনতায় প্রভেদ কি?’ এর পর যে অকাট্য যুক্তিজালের সাহায্যে বঙ্কিম সাধারণ মানুষের সাধারণ মঙ্গলের নিরিখে পারতন্ত্র্য ও পরাধীনতা, এবং ‘স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাধীনতা’-র মধ্যে প্রভেদ করেছেন তার সংক্ষিপ্তসারও এই প্রবন্ধে করা যাবে না। আমরা কেবল তাঁর সিদ্ধান্তটা বলি, যা স্বতঃশ্চালনা, স্বাধীনতা আর অপারবশ্যের মধ্যেকার পার্থক্য আর সেই পার্থক্যের নিরসন সম্পর্কে আমাদের আদি ভণিতার যাথার্থ্য বিধান করবে

‘তবে ইহা স্বীকার করিতে হইবে যে, পরাধীন ভারতবর্ষে উচ্চশ্রেণীস্থ লোকে স্বীয় বুদ্ধি, শিক্ষা, বংশ এবং মর্য্যাদানুসারে প্রাধান্য লাভ করিতে পারেন না। যাহার বিদ্যা এবং বুদ্ধি আছে, তাহাকে যদি বুদ্ধিসঞ্চালনের এবং বিদ্যার ফলোৎপত্তির স্থল দেওয়া যায়, তবে তাহার প্রতি গুরুতর অত্যাচার করা হয়। আধুনিক এরূপ ঘটিতেছে। প্রাচীন ভারতবর্ষে বর্ণবৈষম্যগুণে তাহাও ছিল। কিন্তু এ পরিমাণে ছিল না। ... আধুনিকাপেক্ষা প্রাচীন ভারতবর্ষে উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা স্বাধীনতাজনিত কিছু সুখ ছিল। কিন্তু অধিকাংশ লোকের পক্ষে প্রায় তুল্য, বরং আধুনিক [পরাধীন] ভারতবর্ষ ভালো। একেবারে শেষে বঙ্কিম অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে বলছেন, ‘প্রাচীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার হেতু তদ্বাসিগণ আধুনিক ভারতীয় প্রজাদিগের অপেক্ষা সুখী ছিল কি না? আমরা এই মীমাংসা করিয়াছি যে আধুনিক ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় অর্থাৎ উচ্চশ্রেণীর লোকের অবনতি ঘটিয়াছে, শূদ্র অর্থাৎ সাধারণ প্রজার একটু উন্নতি ঘটিয়াছে।’

মার্ক্স ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনকে ‘unconscious tool of history’ বলে অনেক খোয়ার ভুগেছিলেন। কিন্তু ১৯২০র দশকের। ই. রামস্বামী নাইকারের অনেক আগে, জ্যোতিবা ফুলের প্রায় সমসময়ে, বঙ্কিম বুঝেছিলেন যে অত্যাচারী, উচ্চবর্ণীয়, ব্রাহ্মণশাসনের চেয়ে ইংরেজ শাসন নিম্নবর্গীয়দের পক্ষে ‘একটু’ ভালো হয়েছিল। আজ ৬৮ বছর পর স্বতঃশ্চালনা ও স্বাধীনতার দিক থেকে অপারবশ্য কি সাধারণ, নিম্নবর্গীয়দের আরো অনেক উন্নতি করেছে? সেটাই প্রশ্ন!

এর পরেও দুইখান কথা আছে! ১৪ই আগস্টে একটি বাচ্চাকে দেখলেম স্বাধীনতা দিবসের দেশপ্রেমে টইটুম্বুর! ছেলেটি বিহারি, জাতে লালা, বাংলার কায়স্থদের মতো! উচ্চশিক্ষিত বাবা মার সন্তান। ওই বাবা মা আবার নেহরু-আজাদ শিক্ষাপ্রকল্পের সন্তান! তো, ছেলেটা নিজে হাতে ‘ইণ্ডিয়ার ফ্ল্যাগ’ এঁকে, হাতে নিয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে; আর মুহুর্মুহু চিৎকার করছে, ‘আই অ্যাম অ্যান ইণ্ডিয়ান’। বাড়ির নিচে, মাঠের বাচ্চা দাদা, দিদি, ভাই, বোনেরা হেসে বলছে, ‘হেই! হ্যাভ ইউ গান ক্রেজি!’ নির্লজ্জ দেশপ্রেমে তাও ছেলেটা ওর কাগজের পতাকা  উঁচিয়ে দৌড়ুচ্ছে! জানে না, আজ রাত বারোটা অব্দি এই অধিকার নেই ওর! তাতে কিবা এসে যায়! জোর কনফিডেন্স না আর ওর আজ!  নিজের জাপানি লাট্টুটা খেলাঘরের কাবার্ডে ঢুকিয়ে দিয়ে, ইণ্ডিয়ান লাট্টুটা ধুলো ঝেড়ে বের করে’, এক হাতে ভারতীয় পতাকা আরেক হাতে ভারতীয়  ইয়োইয়ো নিয়ে ও ছয় বছরের নতুন পায়ে দৌড়ুচ্ছে! আর মাঝে মাঝে মাকে  শুধোচ্ছে, ওর ভারতীয় পতাকা ওর ইণ্ডিয়ান লাট্টুকে খুশি হচ্ছে কিনা। এখানে কথাটা আবেগের। কিন্তু ফেলনা নয়। আরেকটা কথা হলো স্বাধীনতার ফলেই ওরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলো হয়তো! মানে বঙ্কিমি যুক্তির কথা!
  
অনেক তকরার হলো, হচ্ছে, হবে — স্মরণে/বিস্মরণে/ অপহ্নবে। র‍্যোম্যান্টিক কবিদের সম্পর্কে রসগ্রাহী সমালোচকরা বলতেন ‘উইলিং সাসপেন্সন অভ ডিসবিলিফ’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা। আমাদের কি উচিৎ ছিল ওই ছেলেটার  মতো অনেক হাজার হাজার, না না, লাখ লাখ, কোটি কোটি, বালখিল্যদের মনের সঙ্গ দেওয়া! ‘বাবরের প্রার্থনা’ করতে পারি না  আমাদের সবার  সহস্র আয়ু নিয়ে বেঁচে থাক এই হাজার হাজার, না না, লাখ লাখ, কোটি কোটি, বালখিল্যরা। নিজেদের নিয়মে ইংরিজি, বাংরেজি, ‘হিংলিশ/বিংলিশে’ সাঙ্গ করুক স্বাধীনতার অসমাপ্ত প্রকল্প! এই ৬৮ বছরের বিবর্ণ স্বাধীনতাকে — সংঘাতে, ঝঞ্ঝাটে, বিপদে, বিপাকে দীর্ণ স্বাধীনতাকে — ওই বোকার মতো এঁকাবেঁকা ‘ত্রিবর্ণ’ দিয়ে  আশীর্বাদ  দিচ্ছে ওরা! কখনোও কখনোও তো ওরাই ঠিককথা বলে তাই না — ওরা, যারা দেশভাগ করেনি, দাঙ্গা বাধায়নি, ঘোটালা করেনি, স্ক্যাম রচেনি — ওরা, যারা অজস্র সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্য বুঝে, না বুঝে, গতকাল পার্কে, মাঠে, স্কুলে, এনক্লেভে রবীন্দ্রনাথ, ইকবাল, নজরুল, কুরুপ, আডিগা, আয়েঙ্গার-দের লেখা কবিতা পড়লো, গান গাইলো রবীন্দ্র, নজরুল, এ আর রহমানের সুরে! আমরাও কি এই ৬৮ বছরের বিবর্ণ স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে — ট্যারাব্যাঁকা ত্রিবর্ণ উঁচিয়ে ওদের মতো দৌড়ুতে পারতাম,  রাষ্ট্রতও্ব পড়ে’ও, বঙ্কিম বুঝেও! দৌড়োইনি! ফেসবুকে কিছু ‘কবি’কে দেখলাম প্রাকৃতিক ক্রিয়ার সব শব্দে বিশেষিত করলেন দিনটিকে। তাও পারিনি! তাত্ত্বিক ব্যালান্স শীটে আটকে আর আঁতকে থেকেছি ফলে ৪ঠা জুলাই কিম্বা ১৫ই জুলাই হয়ে ওঠেনি ১৫ই আগস্ট। আফশোস!




1.       Everyman’s English Dictionary, (eds.)  Gouri Prasad Ghosh et al (Kolkata: Ramkrishna Pustakalaya, 2013), pp. 596, 758, 864.
2.       Isaiah Berlin,   ‘Two Concepts of Liberty’, in Four Essays on Liberty (Oxford: Oxford University Press, 1969).
3.       Virginia Held, Rights and Goods: Justifying Social Action (Chicago: University of Chicago Press, 1989).
4.       Friedrich August Hayek, The Road to Serfdom (New York: George Routledge & Sons, 1944).
5.       Ruth Blakeley, State Terrorism and Neoliberalism: The North in the South (Abingdon, Oxon: Routledge, 2009).     
6.       Francis Fukuyama, The End of History and the Last Man (London: Penguin, 1992).
7.       Francis Fukuyama, State-Building: Governance and World Order in the 21st Century (Ithaca: Cornel University Press, 2004)
8.       Benjamin Barber, Strong Democracy: Participatory Politics in a New Age (Berkeley, California and  London:  University of California Press 2003)
9.  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা’, বঙ্কিম রচনাবলী (কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৪১১ [1993]), পৃঃ ২১০-১৪।