পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৫

সম্পাদকীয়


কালিমাটি অনলাইন / ৩০

'কালিমাটি অনলাইন' ২৯তম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে আমরা আমাদের প্রিয় পাঠক- পাঠিকাদের কাছে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছিলাম যে, আপনাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে যা আপাতদৃষ্টিতে হয়তো খুবই সাধারণ ঘটনা বলে মনে হয়েছে অথবা আপনাদের ব্যক্তিগত জীবনে এমন কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাৎক্ষনিক ভাবে যা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, সেইসব  আপাত তুচ্ছ ঘটনা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকে গেছে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ অসাধারণ প্রাপ্তি, তা হয়তো আপনারা সেভাবে তলিয়ে দেখেননি বা ভেবে দেখেননি। আর তাই আমরা অনুরোধ করেছিলাম, আপনারা সেইসব ঘটনা ও অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করে রাখুন। এবং সেই লেখায় যদি সত্যিই কোনো সাহিত্যগুণ থাকে, যা একটা নতুন ভাবনা চিন্তা দৃষ্টিভঙ্গি অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে, তবে সেই লেখাটি নিঃসংকোচে ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনের জন্য পাঠিয়ে দিন। কিন্তু আমাদের অনুরোধ বা আবেদনে তেমন কোনো সাড়া পাইনি আপনাদের তরফ থেকে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে একটা কথা উল্লেখ করি, ফেলে আসা দিনের কথা বলতে বা লিখতে গেলেই আমরা আক্রান্ত হই এক ধরনের আবেগ প্রবণতায়, যাকে আমরা নস্টালজিয়া বলে থাকি। যাঁরা ইতিমধ্যেই বয়সের বিচারে এই পৃথিবীতে অনেকগুলো বছর কাটিয়ে ফেলেছেন, তাঁরা সামান্য সুযোগ পেলেই ফিরে ফিরে যান তাঁদের সেই ফেলে আসা 'সোনালি' দিনগুলিতে। চলচ্চিত্রের ফ্ল্যাশব্যাকের মতো মনের লেন্সে তখন পাক খেতে থাকে কত কী! এবং তাতে যে কী আনন্দ, কী বিষাদ বা বিষাদেরও আনন্দ! আর একটু গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই চেতনায় ঘা মারে জীবনের অনেক অনেক লুকিয়ে থাকা সত্য ও সততার সংজ্ঞা। আমরা আপনাদের কাছে সেইসব প্রাসঙ্গিক ও পরিবর্তিত সত্যকে লিখিত মাধ্যমে পরিবেশন করার জন্য অনুরোধ রাখছি।

প্রসঙ্গত এখানে আর একটি বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই। 'কালিমাটি অনলাইন' ব্লগজিনের প্রতিটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ঝুরোগল্প। ব্লগজিন প্রকাশের আগেও আমরা ঝুরোগল্প প্রকাশ করেছি 'কালিমাটির ঝুরোগল্প' ব্লগে। বর্তমান সংখ্যাটি সহ ইতিমধ্যে 'কালিমাটি ঝুরোগল্প'র মোট ৩৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হলো। প্রতিটি সংখ্যায় বেশ কয়েকজন কথা সাহিত্যিকের ঝুরোগল্প থাকে। কিন্তু এতদিন এভাবে চলার পরও একথা উল্লেখ করা জরুরি হয়ে পড়েছে যে, ঝুরোগল্প সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। বিশেষত অনেকেই ঝুরোগল্পকে গুলিয়ে ফেলেন অণুগল্পের সঙ্গে। আপনাদের জানাই, অণুগল্প ও ঝুরোগল্প কখনই এক নয়, বরং এই দুই আঙ্গিকের গল্পে আছে চরিত্রগত, বৈশিষ্ট্যগত, ভাবনাগত, আঙ্গিকগত পার্থক্য। সাদামাঠা কথায় বলা যায়, প্রতিটি অণুগল্পের একটি নির্দিষ্ট শুরু থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট পরিণতি থাকে। ঝুরোগল্পে এই দুটিই অনির্দিষ্ট থাকে। ঝুরোগল্প অর্থাৎ ঝরে পড়া গল্প। এবং যা ঝরে পড়ে, তার মধ্যে পরিণতির ব্যাপারটা অনিশ্চিতই থাকে। আর শব্দ সংখ্যার যে সীমা থাকে অণুগল্পে, ঝুরোগল্পেও তা আছেঝুরোগল্পে আপাতত আমরা শব্দসংখ্যা ৫০০(+/-) সীমিত রেখেছি। আগে এই শব্দসংখ্যা রাখা হয়েছিল ৩০০। আজ সম্পাদকীয় লিখতে বসে এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা প্রয়োজন হলো এই জন্য যে, প্রকৃত বিচারে আমরা ঝুরোগল্প খুব কমই পাচ্ছি। অনেকেই গল্প পাঠাচ্ছেন। তাঁরা গল্প ভালোই লিখছেন। কিন্তু গল্পগুলো ঠিক ঝুরোগল্প হয়ে উঠছে না। আমরা আশা করব, গল্প লেখকেরা ঝুরোগল্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন থাকবেন এবং উৎকৃষ্ট ঝুরোগল্প রচনা করে বাংলা সাহিত্যের এই নতুন ধারাটিকে পুষ্ট করবেন।

শারদোৎসব দুর্গাপুজো সদ্য অতিক্রান্ত হলো। সবাইকে জানাই শারদ শুভেচ্ছা এবং শুভ বিজয়া।   
  
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India
     


     

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

এঁরা কারা?




   সম্ভবতঃ ১৯৬৭ সালে একটা বাংলা ছবি এলো এই উপরের নামে। সমাজের কায়েমি শক্তিদের আসল চেহারা তুলে ধরতে। ‘এঁরা কারা?’ নামের সে ছবি বেশিদিন চলেনি। লেখার নামটা সেখান থেকেই নিলাম। কারণ এখানেও কায়েমি ধারণার সঙ্গে একটু লড়াই আছে। মহালয়া গেল এ লেখা যখন বেরোবে (যদি আদৌ বেরোয়) তখন দুর্গা এসে গেছেন, ঘোষিতভাবে বাঙালির (আসলে বাঙালি হিন্দুর) প্রধান পুজো ও  উৎসব ঘটাতে সচেতন ধর্মনিরপেক্ষরা একে শারদোৎসব হিসেবে পালন করতে চাইছেন। যদিও তাঁদের মনেও রবীন্দ্রনাথের শারদোৎসবের শারদা আর সারদা মাঝে মাঝে গুলিয়েও যাচ্ছে তো, এই গোলানো নিয়েই এবারের কথনবিশ্বের ইস্পিচ! দুর্গাপুজোর দুর্গা কে? কে এই মহিলা যিনি চার ছেলেমেয়ে আর একটা হাঁস, পেঁচা,  ময়ূর, ইঁদুর, মহিষ ও ষাঁড়ের মিনি সার্কাস পার্টি নিয়ে প্রতি শরৎকালে বাপের  বাড়িতে হাজির হন? যাঁকে নিয়ে মেনকার মুখে এত আগমনী গান সে কত কাল ধরে’ বাঙালি মনকে মথিত করছে! উমা উমা ডাকে কাকে ডাকেন মেনকা? পুরাণ পুরনো সব কথা প্রায়শঃই গোঁজামিলিয়ে দেওয়ার জন্যই বিখ্যাত। তবুও তাতেও উমা দুর্গা নন। রামায়ণে তিনি মহাদেবের স্ত্রী। তাঁর পিতা দেবতাত্মা হিমালয়। মাতা সুমেরুকন্যা মেনকা তথা মেনা। আগমনী গানে মেনা যখন ডাকেন, ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী’, তখন সেই গানের উদ্দেশ্য হিমালয় পর্বতের পাষাণ গলানো। বিধেয় উমাকে বছরকার দিনে বাপের বাড়ি আনা। অর্থাৎ গিরিজাই আসেন ছেলেমেয়ে কোলে কাঁখে, সগৌরবে, বাপের বাড়ি, তিনটি দিনের তরে। তিনি কি দুর্গা? বোধহয় না, ইনি তো পার্বতী। সেই পার্বতী যিনি গিরিরাজের গৃহে রাজার দুলালী হিসেবে যত্নপালিত হয়েও এক ভ্যাগাবণ্ডকে পেতে চূড়ান্ত গ্রীষ্মে উষ্ণস্রোতে, কঠিন শীতে ঠাণ্ডা জলে গা ডুবিয়ে শিবচিন্তা করে’, একবেলা খেয়ে, শেষে গলিত পত্র পর্যন্ত না খেয়ে বাজারে অপর্ণার বদনাম কিনে, আদেখলামি আর বিয়েপাগলামির শেষ করে ছাড়লেন! মেনাকে পর্যন্ত বলতে হলো, ‘উ মা তপ’, আর তাঁকে নাম দিতে হলো উমা!  আগের জন্মে তিনিই ছিলেন দক্ষের মেয়ে সতী। দক্ষ হিমালয়ের মতো জামাইভক্ত ছিলেন না।  বাড়িতে যজ্ঞ করলেন অথচ মেয়ে-জামাইকে দাওয়াতই দিলেন না। অনিমন্ত্রিত স্বয়মাগতা মেয়ের সামনেও এমন অমরীশপুরীপনা করলেন যে রিজোয়ানুর কাণ্ডের চেয়েও বড় ঝামেলা হলো! অপমানিতা সতী শিবনিন্দা শুনে দেহত্যাগই করে বসলেন। তারপর ‘দক্ষযজ্ঞ’ তথা ক্যাম্পাস ভায়োলেন্সের মতোন ঘটনা ঘটল শিবের চেহারা যা  হলো!


মহারুদ্ররূপে মহাদেব সাজে। ভভম্ভম ভভম্বম শিঙ্গা ঘোর বাজে।।
লটাপট জটাজুট সংঘট্ট গঙ্গা। ছলচ্ছল টলট্টল কলক্কল তরঙ্গা।।
ফণাফণ্ ফণাফণ্ ফণিফণ্ণ গাজে। দিনেশপ্রতাপে নিশানাথ সাজে।।
ধক্‌ধ্ধক্ ধক্‌ধ্ধক্ জ্বলে বহ্নি ভালে। ববম্বম্ ববম্বম্ মহাশব্দ গালে।।
দলমল দলমল গলে মুণ্ডমালা। কটি কট্ট সদ্যোমরা হস্তিছালা।।
পচা চর্ম্মঝুলি করে লোল ঝুলে। মহাঘোর আভা পিনাকে ত্রিশূলে।।
ধিয়া তাধিয়া তাধিয়া ভূত নাচে। উলঙ্গী উলঙ্গে পিশাচী পিশাচে।।
সহস্র সহস্র চলে ভূত দানা। হুহুঙ্কারে হাঁকে উড়ে সর্পবীণা।।
চলে ভৈরব ভৈরবী নন্দী ভৃঙ্গী। মহাকাল বেতাল তাল ত্রিশৃঙ্গী।।
চলে ডাকিনী যোগিনী ঘোর বেশে। চলে শাঁকিনী প্রেতিনী মুক্তকেশে।।
গিয়া দক্ষযজ্ঞে সবে যজ্ঞ নাশে। কথা না সরে দক্ষরাজে তরাসে।।
অদূরে মহারুদ্র ডাকে গভীরে। অরে রে অরে দক্ষ দে রে সতীরে।।
ভুজঙ্গপ্রয়াতে কহে ভারতী দে। সতী দে সতী দে সতী দে সতী দে।।


এক্কথায় ‘রে সতি! রে সতি! কান্দিল পশুপতি পাগল শিব প্রমথেশ’। সতীকে কাঁধে নিয়ে, তাঁর দুঃশীল সমাজের অগ্রভাগে শিবুর হিস্টিরিক তাণ্ডব দেখে বিষ্ণু তো তাঁর চক্র দিয়ে সতীকে একান্ন টুকরো করে’ ফেললেন, আর কের্মে কের্মে সেখানে এক এক পীঠে এক এক দেবী এলেন। সতীর বিরহে শিব সব কটি পীঠে তপস্যা করলেন বলে সবেতেই একান্ন ভৈরব আর সতীর দেবাংশী একান্ন দেবী! এঁদের কারুর নামে ডাইরেক্ট, ওনলি দুর্গা নেই। হিঙ্গুলাতে কোটারী (ব্রহ্মরন্ধ্র); করবীরপুরে মহিষমর্দিনী (ত্রিনয়ন); জ্বালামুখীতে অম্বিকা (জিহ্বা); ভৈরবপর্বতে অবন্তী (ঊর্ধ্ব ওষ্ঠ); অট্টহাসে ফুল্লরা (অধরোষ্ঠ); প্রভাসে চন্দ্রভাগা (উদর); জনস্থানে ভ্রামরী (চিবুক); গোদাবরীতে বিশ্বমাতৃকা (বামগণ্ড); শুচীদেশে দন্তপংক্তিদেবী নারায়ণী (ঊর্ধ্বদন্ত); গণ্ডকী নদীতে গণ্ডকী  (দক্ষিণ গণ্ড); করতোয়া তটে অপর্ণা (বামকল্প); শ্রীপর্বতে শ্রীসুন্দরী (দক্ষিণ কল্প); কর্নাতে জয়দুর্গা (কর্ণদ্বয়); বৃন্দাবনে উমা (কেশপাশ); কিরীটে কিরীটেশ্বরী (কিরীট); শ্রীহট্টে মহালক্ষ্মী (গ্রীবা); নলহাটিতে কালী (গলার নলী); কাশ্মীরে ক্ষীরভবানী (কণ্ঠ); রত্নাবলীতে কুমারী (দক্ষিণ স্কন্ধ); মিথিলায় মহাদেবী (বাম স্কন্ধ); চট্টগ্রামে ভবানী (দক্ষিণবাহু); মানসসরোবরে দ্রাক্ষায়নী ( দক্ষিণ হস্তার্ধ); উজানীতে মঙ্গলচণ্ডী (কনুই); মণিবন্ধে গায়ত্রী (করগ্রন্থি); প্রয়াগে ললিতা (দশ হস্তাঙ্গুলি); বাহুলায় বাহুলা (বামবাহু); জলন্ধরে ত্রিপুরমালিনী (এক স্তন);  চিত্রকুটে শিবানী (আরেক স্তন); বৈদ্যনাথে জয়দুর্গা (হৃৎপিণ্ড); উৎকলে বিমলা (নাভি); কাঞ্চীদেশে দেবগর্ভা (কঙ্কাল); কালমাধবে কালী (দক্ষিণ নিতম্ব); শোন নদে নর্মদা (বাম নিতম্ব); কামাখ্যাতে কামাক্ষী (দেবীযোনি); নেপালে মহাশিরা (জানুদ্বয়); জয়ন্তীতে জয়ন্তী (বাম জঙ্ঘা); মগধে সর্বানন্দকারিনী (দক্ষিণ জঙ্ঘা); ক্ষীরগ্রামে যোগাদ্যা (দক্ষিণ চরণের অঙ্গুষ্ঠ); কালীঘাটে দক্ষিণ চরণের চার অঙ্গুলি (দক্ষিণাকালী); কুরুক্ষেত্রে সাবিত্রী (বাম চরণের  চার অঙ্গুলি); বক্রেশ্বরে মহিষমর্দিনী (দেবীমন); যশোরে যশোরেশ্বরী (দেবীর পাণিপদ্ম); নন্দীপুরে নন্দিনী (অস্থি); বারানসীতে বিশালাক্ষী (কুণ্ডল); কন্যাশ্রমে সর্বাণী (পৃষ্ঠদেশ); লঙ্কায় ইন্দ্রাক্ষী (পায়ের নুপুর); বিরাটে অম্বিকা (পদাঙ্গুলি); ত্রিপুরায় ত্রিপুরেশ্বরী (দক্ষিণ চরণ); বিতাসকে ভীমা (বাম চরণের গুল্ফ); ত্রিস্রোতায় ভ্রামরী (বাম চরণ); সুগন্ধায় সুনন্দা (নাসিকা) ইত্যাদি। আমি যেখানে জন্মেছিলুম সেও বায়ান্নতম, লঘু হলেও এক পীঠ, দুর্গার মালাইচাকি পড়েছিল! তাই নাম্না মেলাইচণ্ডী। কিন্তু অন্য জায়গাতেও যাঁরা বিরাজমানা তাঁরা সতীদেহী। দুর্গা নন! কেন!


কেনোপনিষদে একটি আখ্যানে আছে দেবাসুরের একটি যুদ্ধে অসুরদের উপর জয় পেয়ে দেবতারা যখন আনন্দে নৃত্য করছেন, তখন এক জ্যোতির্ময়ী নারী নেমে এসে তাঁদের নৃত্যপরতার কারণ শুধোলে দেবতারা নিজের শৌর্য ও পরাক্রম বর্ণনা করার পর তিনি তাঁদের তা দেখাতে বললেন।
বায়ু: আমি পবনদেব! স্বর্গমর্ত্যরসাতলের সব কিছু ফুঁয়ে উড়িয়ে দিই!     
জ্যোতির্ময়ী:  প্রদর্শন করো! এই তৃণগুচ্ছ ওড়াও!
তৃণগুচ্ছ  উড়িল না!
অগ্নি: আমি হুতাশন। স্বর্গমর্ত্যরসাতলের সব কিছু দগ্ধ করি!   
জ্যোতির্ময়ী: প্রদর্শন করো! এই তৃণগুচ্ছ পোড়াও!
তৃণগুচ্ছ  পুড়িল না!
বরুণ: আমি জলদেব পর্জ্জন্যস্বর্গমর্ত্যরসাতলের সব কিছু সিক্ত, নিমজ্জিত করি!
জ্যোতির্ময়ী: প্রদর্শন করো! এই তৃণগুচ্ছ ডোবাও!
তৃণগুচ্ছ ডুবিল না!
ইন্দ্র: আমি শক্র, মঘবা ইত্যাদি বীরদের পরাক্রমে বিখ্যাত ইন্দ্রপদের অধিকারী, বজ্রক্ষেপী দেবরাজ। স্বর্গমর্ত্যরসাতলের সব কিছু ধ্বংস করি।
জ্যোতির্ময়ী: প্রদর্শন করো! এই তৃণগুচ্ছ বিধ্বংস করো।
তৃণগুচ্ছ  নড়িল না!

বাদবাকি দেবতাদেরও একই হেনস্থা হওয়ার পর জ্যোতির্ময়ী তাঁদের ব্রহ্মজ্ঞান দিলেন। সেই একোহবর্ণ, অদ্বৈত, অনাদি, নিরাকার দেবতাদের সকল শক্তির উৎস! জ্যোতির্ময়ী তাঁরই প্রেরিতা শক্তিজ্যোতি। সেই জ্ঞানজ্যোতির মাধ্যমে একেশ্বরবাদ, বহুদৈববাদ মিলে গেল! এঁকে বাপের বাড়ি আসা হিমালয়কন্যা বা দক্ষকন্যার সঙ্গে মেলানোর মতো ভুল বা বোকামি আর হয়!
  
কিম্বা দেবী ভাগবৎ, মার্কণ্ডেয় চণ্ডী অথবা কালিকাপুরাণ অনুযায়ী দুর্গা আদিশক্তি, বিশ্বের আদি কারণ, পরমাপ্রকৃতি। ব্রহ্মার বরে অবধ্য মহিষাসুরকে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত ও নিধন করার উপায় জানতে ব্রহ্মা স্বয়ং ও শিব যখন বাকি দেবতাদের নিয়ে বিষ্ণুর কাছে গেলেন, তখন বিষ্ণু তাঁদের পরামর্শ দিলেন নিজ নিজ স্ত্রীর সঙ্গে  মিলিত হয়ে নিজ নিজ স্ত্রীর তেজের কাছে প্রার্থনা করতে হবে, যাতে তাঁদের সম্মিলিত  তেজ থেকে এক তেজোময়ী নারীর আবির্ভাব হয় যিনি এই মহিষাসুরকে বধ করতে পারেন! এই প্রার্থনা থেকে যে জ্যোতির্ময়ীর আবির্ভাব হলো তাঁকে দেবতারা নিজের নিজের অস্ত্র দান করলেন! এই মাতৃকাকেও শিবপত্নী বানানোর আর হিমালয়কন্যা বা দক্ষকন্যার সঙ্গে মেলানোর কোনো যুক্তি বা প্রয়োজন নেই।


দুর্গা যদি ভেজাল তবে ছেলেমেয়েরা? বাঁদিক থেকে ধরা যাক! ঋক বেদে শ্রী ও ঐশ্বর্যের দেবী একাই লক্ষ্মী। তৈত্তিরীয় সংহিতায় শ্রী আর লক্ষ্মী আদিত্যের দুই স্ত্রী। আদিত্য কে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। আদিত্য শব্দে সাধারণতঃ সূর্য বোঝায়। সেই অর্থে  বারোজন আদিত্য হলেন দ্বাদশ সূর্য বোঝায়। কিন্তু মতান্তরে বারোজন আদিত্য বলতে বারোটি মাসের দ্যোতক। আরো একটি মতে আদিত্য দেবতাদের সাধারণ নাম। সে যাই হোক, শতপথ ব্রাহ্মণে শ্রী প্রজাপতি সম্ভূতা। রামায়ণ সহ অন্য পুরাণে লক্ষ্মী মহর্ষি ভৃগুর ঔরসে আরেক দক্ষকন্যা খ্যাতির গর্ভে জন্মান আর নারায়ণের স্ত্রী হন। দুর্বাসার অভিশাপে ইন্দ্রের স্বর্গ শ্রীহীন হলে’ লক্ষ্মী সমুদ্রে প্রবেশ করেন, আর সমুদ্রমন্থনের সময় পুনরুদ্ভূতা হন! দক্ষের দৌহিত্রী হিসেবে তিনি ম্যাক্সিমাম দুর্গার বোনঝি! মেয়ে হলেন কোথায়?

গণেশে গোলমাল কম। কেবল এক পুরাণে আছে পার্বতীর দিব্য গাত্রমল থেকে গণেশের জন্ম হয়। ফলে তিনি শিবের পুত্র না হতেও পারেন। অন্য সর্বত্র তিনি শিবপার্বতীর সন্তান। কিন্তু ডানদিকে এলে গোলমাল অনেক বেশি। সরস্বতী তো কার্তিকের পরেই সবচেয়ে গোলমেলে! ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুযায়ী সৃষ্টিকালে ঈশ্বরাভিলাষে প্রধানা শক্তি যে পঞ্চভাগে বিভক্তা হন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাধা, পদ্মা, সাবিত্রী, দুর্গা ও সরস্বতী। ফলে এঁরা, দুর্গা ও সরস্বতী, পরিষ্কার বোন। আর এখানেই সরস্বতী বিষ্ণুকণ্ঠ থেকে উদ্ভূতা, পূজিতা ও পরে কামিতা ও বিবাহিতা। ফলে দুর্গা পরিবারে তিনি সন্তান নন। এবার কার্তিকে তো কেয়স! সপ্তর্ষিদের পত্নীদের প্রতি অগ্নির গোপন কামের সুযোগ নিয়ে অগ্নির প্রতি কামনায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য দক্ষকন্যা স্বাহা মহর্ষি অঙ্গিরার স্ত্রী শিবার রূপ গ্রহণ করে অগ্নির সঙ্গে সহবাস করেন। একবারে কামনা প্রশমিত হয়নি। হবার কথাও নয়। শাস্ত্রেই বলে, ‘ন যাতু কামঃ কামাণামুপভোগেন শাম্যতি।/ হবিষা কৃষ্ণবর্ত্ম ইব ভূয়া ইবভিবর্ধতে’। ফলে স্বাহা অন্য পাঁচ মহর্ষিদের স্ত্রীদের রূপ নিয়ে আবার পাঁচবার  অগ্নির সঙ্গে সহবাস  করলেন। সপ্তমবার হলো না। কারণ বশিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধতীর তপোপ্রভাব পথ আটকালো! প্রত্যেকবারই তিনি অগ্নিশুক্র কাঞ্চনকুণ্ডে নিক্ষেপ করলেন! ইনিই স্কন্দ বা কার্তিকেয়। ইনি পরে শিবের অনুচরী মাতৃকাদের স্তন্যপান করেন! অন্য মতে, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে, কার্তিকেয় মহাদেবের ও পার্বতীর বিহারকালে স্খলিত বীর্য থেকে উৎপন্ন হলেও সেই বীজ পড়েছিল পৃথিবীতে। ধরা তাকে ধারণ করতে না পেরে অগ্নিতে নিক্ষেপ করেন। অগ্নি ফেলেন শরবনে। সেখানে তাঁকে স্তন্য দেন ষড়কৃত্তিকা। তাই কার্তিকেয় ষড়ানন। সুতরাং কার্তিকেয় দুর্গাপুত্র নন, মহাদেবের বীর্যসম্ভূত হলেও।       
         
ফলে ‘কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম’ এই শাস্ত্রবাক্য মেনেই আমি অঞ্জলি দিতে যাইনি! আপনারা সকলে যাঁরা যাচ্ছেন তাঁদের সক্কলকে, ‘দুর্গা  দুর্গা!’ পুজোর পরে আবার দেখা হবে! আগাম বিজয়ার শুভেচ্ছা!



           
                    

                                                


।  

       


           
                    


     

অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী

‘‘সাহেবসমাজ আসিবেন আজ...”




তিনশো বছর আগে কলকাতা শহরপত্তনের ইতিহাসের সঙ্গে এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিস্তারের কাহিনী এক রকম অঙ্গাঙ্গীভাবেই জড়িত। তাই কলকাতা শহরে দুর্গোৎসবের সূচনাপর্বের সঙ্গেও শ্বেতাঙ্গ সাহেবকুল, এ-দেশের ফিরিঙ্গি সমাজ ও ইয়োরোপের নানা দেশের পর্যটক, শিল্পী প্রভৃতিরাও ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এমন কি, কলকাতার আঠারো শতকের দুর্গাপূজার সমারোহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিস্তারের একটি প্রধান ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়েই জনশ্রুতিতে স্থানলাভ করেছে। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে জিতে ইংরেজরা এই বিজয় উপলক্ষে সমারোহ করতে চাইলে তাদের মুনশি নবকৃষ্ণ তাড়াতাড়ি ঠাকুরদালান তৈরি করে নিজের শারদীয়া দুর্গাপূজার ব্যবস্থা করলেন। সে উপলক্ষে আয়োজিত হল দেশী নর্তকীদের নৃত্যোৎসব, সেখানে  আমন্ত্রিত হলেন সাহেবরা। পলাশির যুদ্ধের নায়ক স্বয়ং লর্ড ক্লাইভও যোগদান করেছেন নবকৃষ্ণের বাড়ির দুর্গোৎসবে। সাহেব শাসকদের দুর্গাপূজায় এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যে ঐতিহ্যের সূচনা হ্য় তা অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলেছিল প্রায় আট দশক ধরেএই অংশ নেবার নানা সাক্ষ্য ছড়িয়ে আছে এ-দেশের সংবাদপত্রের বিবরণে, ভ্রমণকাহিনীতে ও শিল্পীদের আঁকা চিত্রমালায়।

কলকাতায় ব্রিটিশ শাসন কায়েমের সঙ্গে সঙ্গেই তাদের অনুগ্রহপুষ্ট দেশী বাবুসমাজের পক্ষে দুর্গাপূজার মতো অনুষ্ঠানের অজুহাতে সাহেবকুলকে নিমন্ত্রণ করে এনে তাদের পানভোজন ও নৃত্যবিনোদনে আপ্যায়িত করার চেষ্টার মধ্যে হয়তো কিছু অস্বাভাবিকতা ছিলনা। তাই সংবাদপত্রের বিবরণেও স্বাভাবিক ভাবেই দেশী রাজা-জমিদারদের নিকেতনের দুর্গাপূজায় সাহেবসুবোদের আগমন, খানাপিনা, গানবাজনা, এমন কি, ‘গড সেভ দি কিং’ গাওয়ার পর্যন্ত বর্ণনা পাওয়া যায়।উদাহরণস্বরূপ বঙ্গদূত পত্রিকায় ১৮২৯ সালে “মহারাজা নবকৃষ্ণ বাহাদুরের দুই বাটীতে নবমীর রাত্রে শ্রীশ্রীযুত গবর্নর-জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্ক বাহাদুর ও প্রধান সেনাপতি শ্রীশ্রীযুতলর্ড কম্বরমীর ও প্রধান প্রধান সাহেবলোক”-দের আগমন ও “ নানা আমোদ ও নৃত্যগীতাদি দর্শন ও শ্রবণ করত অবস্থিতি করিয়া প্রীত হইয়া’ গমন করার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।[১০-১০-১৮২৯]

এই বিবরণের দু’ বছর পরে ‘সমাচার দর্পণ’-এমহারাজ কালীকৃষ্ণের বাড়ির দুর্গাপূজার তিন রাত্রিতেই নানা উচ্চপদস্থ ‘ইংরেজ ও বিবিলোকের সমাগমে’র বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে লেখা হয়, “......অনন্তর মদ্য ইত্যাদি আহারীয় ও পেয় সামগ্রীর যথেষ্ট আয়োজন এবঞ্চ নট ও নটী ও কাশ্মীরী বালকখড়্গকর্মনিপুণ নানাবিধ তামাসা ছিল...।”[২২-১০-১৮৩১] ‘সংবাদ প্রভাকর’ ১৮৬৩ সালেও ‘শোভাবাজারে স্বর্গীয় মহারাজ রাজকৃষ্ণ বাহাদুরের নিকেতনে’ নাচের সভায় “অনেকানেক ইংরাজ সম্ভ্রান্ত বিবি ও বিস্তর এতদ্দেশীয় মহৎ ও মান্যব্যক্তির” উপস্থিতির বিবরণদিয়েছে।শুধু দেশী খবরের কাগজগুলিই নয়, ইংরেজদের পত্রিকাতেও সেকালে দুর্গাপূজায় সাহেব-আপ্যায়নের বর্ণনা নেহাত কম নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে নবকৃষ্ণ-ভবনে সস্ত্রীক বেন্টিঙ্ককে সোণার সিংহাসনে বসিয়ে ‘গড সেভ তি কিং’ সুরধ্বনি, বাইজিদের নৃত্যগীত ইত্যাদি দ্বারা আপ্যায়নের বিবরণের পর ‘হরকরা’ পত্রিকাটি সহর্ষে লিখেছিলঃ-“ A sight so pleasing and grand was hardly ever before witnessed , for it was never known that the rulers of the country had thus designed  to honour their festivities with their presence…..” [১২-১০-১৮২৯]।

হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবেউপস্থিতিকে সব পত্রিকাই এ-রকম উদার দৃষ্টিতে বা অমায়িক ভাবে  দেখতে পেরেছিল, এমন কিন্তু নয়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বিখ্যাত পত্রিকা ‘সংবাদ প্রভাকর’ ১৮৫৪ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে পূজোয় নিমন্ত্রিত সাহেবদের “নাচের সভা উজ্জ্বল করার’’ ওতাদের সাঙ্গোপাঙ্গ খ্রীস্টান কৃষ্ণাঙ্গদের “যাঁহারা মোদের বেলাত ও মোদের কুইন বলিয়া গর্ব পর্ব বৃদ্ধি করেন” উপস্থিত হয়ে “বিলক্ষণরূপে উদরপূরণ”-এর শ্লেষাত্মক বর্ণনা দিয়েছিল।এ-বছরেই পত্রিকাটি একটি মন্তব্যে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল যে, “হিন্দুশাস্ত্রের ব্যবস্থানুসারে পর্বাহ দিবসে সাহেবদের নিমন্ত্রণ করা অতিশয় নিষিদ্ধ।” সে সঙ্গে প্রভাকর টিপ্পনিও কেটেছিল যে, ‘খ্রীস্টান অ্যাডভোকেট’ কাগজের সম্পাদকও হিন্দু পর্বাহে সাহেবদের যাওয়া পছন্দ করেন না, “তিনি কি পূজার সময় নগরে ছিলেন না?” [৯ অক্টোবর] সেকালের বিখ্যাত ব্যঙ্গপত্রিকা ‘বসন্তক’ও একটি কবিতায় দুর্গাপূজাকে উপলক্ষে সাহেব-তোষামোদকে কটাক্ষ করে লিখেছিল,”......আর এক সাধ মনে জাগে অবিরত/ বড় বড় লালমুখ সাহেব বিবি যত।।/ নিমন্ত্রণ করিয়া আনিব সে সভায়/ পা দিয়ে সিংহের ঘাড়ে দেখিবে দুর্গায়...।।

শুধু সমকালের সংবাদপত্রেই নয়, কবি সাহিত্যিকদের রচনাতেও দুর্গাপূজায় সাহেবদের সমাগমের বর্ণনা আর সমালোচনা যথেষ্ট দেখা যায়। এই ধরনের বিবরণ পাওয়া যায়, দীনবন্ধু মিত্রের ‘সুরধুনী’ কাব্যে আর রসসাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যঙ্গচ্ছলে তাঁর ‘পাঁচুঠাকুর’ [তৃতীয় কান্ড] রচনায় প্রস্তাব দেন, মহারানী ভিক্টোরিয়ার আদলে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হোক, ছোটলাটসাহেব, হাইকোর্টের জনকতক জজ ও ফিরিঙ্গিসমুদয়কে দিয়ে দুর্গাপূজা সমাধা করা হোক। ঈশ্বর গুপ্ত তো দেশীয় জমিদারদের রীতিমতো ভর্ৎসনাকরে লেখেন, “...অন্তরে অচলা ভক্তি করিয়া ধারণ/ ধূপদীপ দেহ যারে মুক্তির কারণ/ নিজমতে শাস্ত্রমত করিয়া খন্ডন।/ তাঁর কাছে কর কেন ম্লেচ্ছ নিমন্ত্রণ।।/.........অতএব নৃপগণ এই নিবেদন।/ পূজায় ক’রোনা আর ম্লেচ্ছ নিমন্ত্রণ।।”[‘দুর্গাপূজা’]

দুর্গাপূজায় সাহেবদের ডেকে এনে পূজাচারের সঙ্গে সম্পর্কহীন যে সব কান্ডকারখানা হত তার সমর্থন আর বিরোধিতা কিন্তু দেশীয় আর ইয়োরোপীয় দু’ পক্ষেই ছিল। ১৮২৭ সালে সালে দেখা যাচ্ছে, চুঁচুড়ার প্রাণকৃষ্ণহালদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন যে,যে-সব সাহেব ও দেশী সম্ভ্রান্তজন নিমন্ত্রণপত্র পাননি, তাঁরাও যেন তাঁর বাড়ির পূজোতে গ্র্যান্ড নাচে যোগ দেন, সেখানে টিফিন, ডিনার ও সুরার ব্যাবস্থা থাকবে। অপরপক্ষে ‘জেন্টু’দের [দেশীয় ভদ্রলোকদের বোঝাতে ব্যবহৃত ইংরেজদের তৈরি শব্দ] দুর্গাপূজায় সমাগত সাহেব-সমাজের পূজাস্থলে মদ্যপান ও নানা অসংযমের সমালোচনাও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছিল।খ্রিস্টান মিশনারিরাও ১৮৩৫ সালে হিন্দুদের পৌত্তলিক অনুষ্ঠানে ইংরেজদের আমন্ত্রণের বিরোধিতা করে ‘এ ওয়ার্ল্ডইন সিজন’ নামে এক পুস্তিকা প্রচার করেন।সম্ভবত এই সব বিরোধিতার প্রতিক্রিয়াতেই ১৮৪০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দুর্গাপূজায় ইংরেজদের যোগদান নিষিদ্ধ করে দেয়।
ভারতে আগত ইংরেজ রাজপুরুষ, ফিরিঙ্গি ও খ্রীস্টানসম্প্রদায়ের লোকজন ও কোম্পানির কর্মচারীরা যে শুধু দর্শক হিসেবেই কলকাতার দুর্গোৎসবে যোগ দিতেন, এমন কিন্তু নয়। ১৮১৭ সালের কোম্পানির আইন অনুসারে তাদের ফৌজ পূজোর সময় গিয়ে সামরিক কায়দায় সেলাম জানাত, তোপ দাগত, কখনও বা বিসর্জনের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণও করত। দুর্গাপ্রতিমার এক সমকালীন কাঠখোদাই ছবিতে ব্রিটিশ ধ্বজাধারী কোম্পানির পল্টনদেরও দেখা যায় [দ্রষ্টব্য- শিরোনাম-চিত্রের মাঝখানের ছবি]এ ছাড়া পূজোর সময় নিমন্ত্রিত সাহেবদের আপ্যায়নের জন্য ইংরেজি বাজনা থেকে শুরু করে বিলিতি খাদ্য ও পানীয়সব কিছুই পূজাস্থলে আসতো। এই সব খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবেগান্টার অ্যান্ড হুপার, হোটেল উইলসন প্রভৃতির নাম পাওয়া যায়। ১৮৫৫ সালে শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজোতে টিকিট কেটে এক শ্বেতাঙ্গিনী নর্তকীর নাচের ব্যবস্থা হয়েছিল।একবার এই রাজবাড়ির পূজোতেই দুর্গাদালানে এক ইয়োরোপীয় জিমন্যাস্ট নানা রকম কসরৎ দেখিয়েছিলেন, এমন বিবরণও পুরানো সংবাদপত্রে পাওয়া যায়। অতুল সুরের লেখায় কুমোরটুলিতে অ্যানটনি নামে এক খ্রীস্টান প্রতিমাশিল্পীর কথা আছে, যে নাকি কোনো রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা গড়ে দিয়ে মুক্তোর হার পারিতোষিক পেয়েছিল।
দুর্গাপূজায় ইংরেজদের অংশগ্রহণকে ব্রিটিশ কর্তারা বেআইনি ঘোষণা করার ও এই প্রথা বন্ধ হয়ে যাবার প্রায় দু’ দশক বছর পরে যাঁর জন্ম, সেই রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতাতেও কিন্তু সাহেবদের দুর্গাপূজায় যোগদানের ছবি পাওয়া যায়উন্নতিলক্ষণ’ কবিতাটির সেই নেতিবাচক চিত্রায়নের কিছু অংশ এখানে দেখা যেতে পারেঃ-“দেবী দশভুজা, হবে তাঁরি পূজা/ মিলিবে স্বজনবর্গ/ হেথা এল কোথা দ্বিতীয় দেবতা/ নূতন পূজার অর্ঘ্য?/ কার সেবা তরে আসিতেছে ঘরে/ আয়ুহীন মেষবৎস?/ নিবেদিতে কারে আসে ভারেভারে/ বিপুল ভেটকি মৎস্য?/ কী আছে পাত্রে যাহার গাত্রে/ বসেছে তৃষিত মক্ষী?/ শলায় বিদ্ধ হতেছে সিদ্ধ/ মনুনিষিদ্ধ পক্ষী?/ দেবতার সেরা কী দেবতা এঁরা?/ পূজাভবনের পূজ্য?/ যাঁহাদের পিছে পড়ে গেছে নীচে/ দেবী হয়ে গেছে উহ্য?’’ এইসব প্রশ্নের উত্তরে কবি নিজেই বলছেনঃ-“ম্যাকে, ম্যাকিনন, অ্যালেন, ডিলন/ দোকান ছাড়িয়া সদ্য/ সরবে গরবে পূজার পরবে তুলেছেন পাদপদ্ম।।”

‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় ১৮২৯ সালে কলকাতার কোনো বাবুর বাড়ির দুর্গাপুজায় বহির্দ্বারে শান্ত্রী বসানোর সমালোচনা করা হয়েছিল, যারা অনিমন্ত্রিত রবাহূত দর্শকদের ভিড় সরাবার জন্য তাদের বেত্রপ্রহারেও দ্বিধা করতোনা। একই সুরে রবীন্দ্রনাথের কবিতাটিতেও তুলে ধরা হয়েছে একই ছবিঃ- “এসেছিল দ্বারে পূজা দেখিবারে/ দেবীর বিনীত ভক্ত/ কেন যায় ফিরে অবনত শিরে/ অবমানে আঁখি রক্ত/ উৎসবশালা, জ্বলে দীপমালা,/ রবি চলে গেছে অস্তে --/ কুতূহলীদলে কী বিধানবলে বাধা পায় দ্বারীহস্তে?/......না না, এরা সবে ফিরিছে নীরবে/ দীন প্রতিবেশীবৃন্দে-/ সাহেবসমাজ আসিবেন আজ, এরা এলে হবে নিন্দে।।”

সাহেবদের কলমে দুর্গোৎসব

কলকাতার দুর্গোৎসব সম্পর্কে সাহেবি বিবরণ বলতে বোঝায় দু’ শ্রেণীর লিখিত বর্ণনা – ইংরেজ পরিচালিত পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদন ও ইয়োরোপীয় দর্শক ও পর্যটকদের লেখা বিবরণ। সাহেবি কাগজগুলোর বিবরণ প্রধানত জেন্টুদের পূজোতে জাঁকজমকের খবরেই ভর্তি। ১৮১৪ সালে ক্যালকাটা গেজেটে দেখা যাচ্ছে, হিন্দুদের দুর্গাপূজায় নাম কেনার জন্য অর্থব্যয় ও জাঁকজমকের উল্লেখ আর খ্যাতনাম্নী নর্তকী নিকি কোন্‌ রাজার পূজোতে নাচবে, তার খবর। ১৭৯২ সালে ‘ক্যালকাটা ক্রনিকলে’ রাজা সুখময় রায়ের পূজোতে বহু উৎকৃষ্ট গায়ক ও নর্তকীর সমাবেশ, মেলা, বিলিতি হোটেলের ভোজ্য  ও ফরাসি পানীয়ের ব্যবস্থার কথা ছাপা হয়েছিল। ১৮১৬ সালে ‘এশিয়াটিক জার্নালে’ দেখা যাচ্ছে, আগের বছর গুরুপ্রসাদ মল্লিক, নীলমনি মল্লিক, রাজা রামচন্দ্র বা বৈদ্যনাথ বাবুর দুর্গোৎসবে কোন্‌ কোন্‌ নর্তকী নেচেছিল তার খবর।

‘ক্যালকাটা জার্নাল’ ১৮১৯ সালে মন্তব্য করেছিল, পাঠকেরা যদি ‘magnificent spectacles of Doorga Puja in Calcutta’  না দেখে থাকেন, তবে রাজা রামচন্দ্র রায়ের রূপকথাতুল্য প্রাসাদে গিয়ে তিন দিন আরব্য রজনীর চমকপ্রদ কল্পকথাকে প্রত্যক্ষ করতে পারেন। এর পরের বছরেই এই পত্রিকার এক পাঠক মন্তব্য করেন যে, এখন এ-সব পূজাপার্বন আর ভক্তিভাব থেকে নয়, ঐশ্বর্য প্রদর্শনের সুযোগসন্ধান আর হীনরুচি পরিতৃপ্ত করার জন্যই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। [১-১০-১৮২০] ১৮২৯ সালে গভর্নমেন্ট গেজেটও মন্তব্য করেছিল, এই সব উৎসবে নাচগান ও খানাপিনার লোভে সমাগত ইয়োরোপীয়েরা মাতলামি করে বাঙালিদের চোখে নিজের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করে। এই গেজেটেই আবার পাওয়া যাচ্ছে, ১৮২৬ সালে গোপীমোহন দেবের দুর্গাপূজায় হরেক তামাশার খবর, যেমন- মুসলমান ও বর্মী নর্তকীদের নাচ, রণপার ও কাঁচ চিবিয়ে খাবার খেলা, সাহেবদের নানারকম খানাপিনায় আপ্যায়ন ইত্যাদি।১৮২৯ সালে  ‘ক্যালকাটা জন বুল’ কাগজটি স্বীকার করছে যে, পূজো উপলক্ষে এই নাচের আয়োজন বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছু বদনাম কুড়িয়েছে।১৮৩৮ সালে রাজা কালীকৃষ্ণের বাড়ির পূজোয় কিছু সিভিলিয়ন ও সামরিক অফিসারদের আপ্যায়নের প্রশংসা করলেও ‘বেঙ্গল হরকরা’ লিখেছিল, এই জাতীয় জাঁকজমকে অর্থব্যয় না করে তা কোন জনহিতকর কাজেই করা উচিত। ১৮৩৯ সালে ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’র খবর অনুযায়ী প্রায় সাত হাজার দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হয়েছিল ও খরচ হয়েছিল পঁচিশ লাখ টাকা! ১৮৫৫ সালে ‘মর্নিং ক্রনিকেল’ জানাচ্ছে, শোভাবাজারে রাধাকান্ত দেবের পূজাতে নাচের টিকিট পাবার জন্য বহু লিখিত আবেদনপত্র জমা পড়েছে।
দুর্গাপূজার ইয়োরোপীয়দের লেখা বিবরণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জে জেড হলওয়েলের [সিরাজউদ্‌দৌলার নামে কলঙ্কপ্রচারে জন্য যিনি জাতীয়তাবাদী মহলে কিছু কুখ্যাতির অধিকারী] লেখা [দুই খন্ডে] “Interesting Historical Events  Relating to theProvinces of Bengal and the Empire of Indostan”  বইটি, যেখানে দুর্গাপূজা লেখকের চোখে হচ্ছে- ‘The grand fest of the Gentus’তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী এই উৎসব চলে সেপ্টেম্বরের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত, যারা নিঃসন্তান তারা অষ্টমীতে উপবাস করে। জেন্টুদের এই ‘গ্র্যান্ড জেনারেল ফীস্টে’ পূজোর কর্তা  নিমন্ত্রিত সাহেবদের ফুল, ফল ও খাদ্যপানীয় ও নৃত্যগীতে আপ্যায়িত করেনহলওয়েলের বইয়ে হিন্দু ‘দেবতালোগ’-এর যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে দুর্গার বিবরণটি এ-রকম :-“কেন্দ্রস্থলে দুর্গাকে ঘিরে লক্ষ্মী, সরস্বতী, বৃষবাহন শিব,গণেশ, বানরারূঢ় রামচন্দ্র ও কার্তিক।বইটির দ্বিতীয় খন্ডে লেখক দুর্গাপ্রতিমার যে-পটচিত্র দিয়েছেন [চিত্র-১ দ্রষ্টব্য],

তাতেও এই বিন্যাস চোখে পড়ে।
আঠারো শতকের বেলজিয়ান শিল্পী ফ্রাঁসোয়া বালথাজার সলভিনস কলকাতায় এসেছিলেন ও এখান থেকেই তাঁর আঁকা ছবির যে অ্যালবাম প্রকাশিত হয়[১৭৯৯], তাতে দুর্গাপূজার ছবিও ছিল।ইয়তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম লন্ডন থেকে ১৮০৭ সালে ও তৃতীয়টি ১৮১২ সালে পারী থেকে [চার খন্ডে] প্রকাশিত হয় তৃতীয় খন্ডটির নাম  ‘Les Hindous’এর ভূমিকায় ও ছবিগুলির পরিচিতিতে সলভিনস এদেশের লোকজীবন ও পূজাপার্বন বিষয়ে কিছু বিবরণও দিয়েছেন, যেমন, হিন্দুদের সকল দেবদেবীর পূজার মধ্যে দুর্গাপূজারই জাঁক বেশি, এতে সমাজের সব শ্রেণীর লোকই প্রচুর অর্থব্যয় করে, ধনী হিন্দুদের তো লাখ টাকাও খরচ হয়ে যায়। সকালে পূজার্চনা, ভক্তদের অর্ঘ্যদান, পাঁঠা বা মহিষ বলি, সন্ধ্যায় নাচগান, নৌকায় প্রতিমা বিসর্জন ইত্যাদির বর্ণনা তিনি যথাযথ দিয়েছেন। এ ছাড়া ঢালাও মিষ্টি বিতরণ, সাহেবদের দুর্গোৎসবে যোগদান ইত্যাদির কথাও আছে।

ফ্রেডারিক উইন নামে এক ইংরেজ সেনানায়ক রাজা রাজকৃষ্ণের বাড়ির পূজোতে তখনকার নাম করা নর্তকী নিকিকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। উইনের ভ্রমণকাহিনিতে নাচঘরের আসবাব, গালিচায় সাহেব-মেমদের আসন, নর্তকীদের গান আর নাচের বিবরণ সহ মন্তব্য করা হয়েছেঃ- “ভারতের ধনীদের প্রায় একমাত্র বিনোদন নাচ।......মিতব্যয়ী হিন্দুরা সারা বছরের ভাতকাপড়ের সংস্থানটুকু করে নিয়ে সমস্ত সঞ্চিত ধন দুর্গাপূজার সময় আমোদ ও আড়ম্বরে উড়িয়ে দেয়।” শ্রীরামপুরের এক মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ডের দিনলিপিতে কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলের দুর্গোৎসবের বর্ণনাপাওয়া যায়, পাদ্রি বলেই বোধ হয় হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবের নেতিবাচক দিকগুলোতেই তাঁর নজর পড়েছে বেশি, যেমন, ১৮০৩ সালে বলাগড় ও শ্রীরামপুর অঞ্চলে বিসর্জনের নৌকোয় অশ্লীল অঙ্গভঙ্গীসহ নৃত্য জনতা উপভোগ করছে, এমন এক বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার ১৮০৬ সালে এই পাদ্রিই রাজা রাজকৃষ্ণের পূজোতে ইংরেজি খানা ও মদ্য, নাচের আসর, নর্তকীদের নাচ দেখে দর্শকদের পারিতোষিক দান ইত্যাদির বর্ণনা ছাড়া প্রচুর নেতিবাচক ব্যাপারেরও উল্লেখ করেছেন, যথা- সারা গা গহনা ও সূক্ষ্ম পোষাকে মোড়া [সে কাপড় নাকি এত সূক্ষ্ম যে তাকে আবরণ না বলাই ভালো]গণিকাদের পূজার প্রথম দিন অশ্লীল নৃত্য [যা নাকি ইয়োরোপীয় ও বাইরের লোকদের দেখতে দেওয়া হতোনা], বেশি রাতে ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, তন্তুকার ইত্যাদি নানা শ্রেণীর অগ্ণিত মানুষের প্রতিমার সামনে সারা রাত ধরে ও পরের দিন বেলা ন’টা পর্যন্ত “তারস্বরে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী সহকারে’’ নাচ[সে নাচ নাকি এত কুরুচিপূর্ণ যে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না] ইত্যাদিগ্রান্ট নামে আরেক পাদ্রির বিবরণে সেকালের দুর্গাপূজায় বিপুল খরচের কথা পাওয়া যায়, যেমন, এক বাবুর বাড়িতে নাকি মিষ্টি এসেছিল আশি হাজার পাউন্ড, রেশমি কাপড় এসেছিল এক হাজার জোড়াতাঁর হিসেব মতো বাবুদের এক একটি দুর্গাপূজায় মোট খরচ প্রায় পাঁচ লক্ষ পাউন্ড।
১৮২২ সালে কলকাতায় বেড়াতে এসেছিলেন শ্রীমতী ফ্যানি পার্কস তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে ১৮২৩ সালের এক পূজোবাড়িতে নাচের আসরে ইয়োরোপীয় স্ত্রী-পুরুষের উপস্থিতি, বিলিতিখানা, ফরাসি মদ্য, বরফ ইত্যাদির পরিবেশন, দুর্গাপ্রতিমা ও পূজাপদ্ধতি ইত্যাদির যথাযথ বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন পূজার নাচের আসরে ইয়োরোপীয় মহিলারা কখনো কখনো যোগ দিলেও ভারতীয় সম্ভ্রান্ত মহিলারা এসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন না। তাঁর মতে ধনী বাঙালিদের এই উৎসবে খরচের পরিমাণ অকল্পনীয়। শ্রীমতী ফেন্টন নামে এক মহিলা ১৮২৬ থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত এ-দেশে ছিলেন ও রূপচাঁদ মল্লিকের বাড়ি একবার নাচ দেখতে যান। লন্ডন থেকে ১৯০১ সালে প্রকাশিত তাঁর জর্নালে তিনি এ-দেশের লোকেদের সারা বছর মাদুরে শুয়েও উৎসব উপলক্ষে ঐশ্বর্য দেখানোর জন্য এই সব নাচের মজলিশ, সাহেবদের নিমন্ত্রণ করে এনে কৃতার্থ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে প্রচুর করুণা প্রকাশ করেছেন।

উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতায় আগত আলেকজান্ডার হ্যামিলটন নামে এক বণিকের  ভ্রমণকাহিনিতে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় আড়ম্বরের বর্ণনা পাওয়া যায়। রূপচাঁদ মল্লিকের বাড়ির পূজোতে আমন্ত্রিত জনৈক হাচিনসনের লেখায় পাওয়া যায় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সমাগত গাইয়ে বাজিয়ে ছাড়াও কৌতুকাভিনেতা, মূকাভিনেতা ও বাজিকরদের বৃত্তান্ত। বাজিকরদের আস্ত তরোয়াল খেয়ে ফেলার খেলাটা হাচিনসন সাহেবের খুব পছন্দ হয়েছিল।

শ্বেতাঙ্গদের আঁকা ছবিতে দুর্গোৎসব

কলকাতায় আঠারো উনিশ শতকের নানা সময়ে ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশের যে সব চিত্রশিল্পীরা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকের ছবিতে দুর্গাপূজারবিভিন্ন দিক ফুটে উঠেছে। এ-রকম চার পাঁচটি ছবির কথা আমরা এখানে উল্লেখ করবো। এর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সব ক’টিতেই শ্বেতাঙ্গদের উপস্থিতি ও নাচের অনুষঙ্গ লক্ষ করা যায়।
আমরা এর আগেযে বেলজিয়ামের শিল্পী ফ্রাসোঁয়া সলভিন্‌সের কথা উল্লেখ করেছি, ১৭৯৯ সালে তাঁর আঁকা ছবিটিতে বিরাট দুর্গামূর্তির সামনে ফলমূল, নৈবেদ্য আর পূজারী ব্রাহ্মণদের দেখা যাচ্ছে।[চিত্র ২]

পূজা-দালানের এক কোনে দাঁড়িয়ে দু’ জন দেশী পুরুষ, একজন মহিলা ও একটি বালিকা। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক- এদের পোশাক, অস্ত্রশস্ত্র, অবস্থান ও ভঙ্গিমা এখানে এত নির্ভুল ভাবে চিত্রিত হয়েছে, যা বিদেশী চিত্রকরদের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় না। অশ্বাকৃতি সিংহ, ও সবুজ-রঙা অসুর, এমন কি, তার পা ছড়ানো পরিচিত যুদ্ধভঙ্গীটি প্ররযন্ত সলভিন্স এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা সেকালের কোনো পটে আঁকা দুর্গার প্রতিকৃত্র সঙ্গে অনায়াসে মিলিয়ে নেওয়া যায়। এর কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি ঘটনাস্থলে বসেই ছবিগুলি আঁকতেন।
এর পাশাপাশি রাখা যায় রুশ শিল্পী প্রিন্স সল্টিকফের ১৮৪১ সালে মাস দু’ তিন কলকাতা ও চন্দননগর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে আঁকা কলকাতায় দুর্গাপূজার ছবিটি, যেখানে চিত্রিত দুর্গামূর্তিতে দেখা যাচ্ছে দেবীর ছ’টি হাত আর তিনি ময়ূর জাতীয় কোনো বাহনের ওপরে অধিষ্ঠিতা। নীচের দিকে আলাদা ভাবে সিংহ আক্রমণ করেছে অসুরকে, কিন্তু তাদের বিন্যাস প্রচলিত ধারার বিপরীত, অর্থাৎ সিংহকে দেখা যাচ্ছে ডান দিকে আর অসুরবাঁ দিকে।[ দ্রষ্টব্য- ছবি-৩] 

গণেশের জায়গায় বিশাল এক হস্তীমুন্ড ছাড়া আর কিছু নজর করা যায়না! তবে এই ছবিতে পূজায় সমাগত সম্ভ্রান্ত ‘জেন্টু’ ও নগ্নগাত্র দেশীয়রা, সাহেব ও মেম ছাড়াও মুসলিম পোষাকে একজন নবাব ও তিন জন ‘রাজকুমার’ [চারজনেরই কোমরে গোঁজা ছূরি], ঝাড়লন্ঠন ও মানুষে টানা পাখা ইত্যাদি সবই পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও এতে দেখা যায় যে, দু’ জন নর্তকী নাচছে, একজন লোক বসে তামাক খাচ্ছে, রয়েছে দেশী গরিব বাদ্যকরেরা ও চারপাশে ছড়ানো নানা বাদ্যযন্ত্র। এই ছবিটি পাওয়া যায়পারী থেকে প্রকাশিত তাঁর অ্যালবামে [“Voyage dansL’Inde, Pendent les Annees 1841-1842-1843, 18445-1846]

জেন্টুদের বাড়ির উৎসবে সাহেব-সমাগম ও বাই-নাচের ছবি এঁকেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী মিসেস এস সি বেলনোস। ভারতে জন্মগ্রহণ করে এখানেই বেড়ে ওঠা এই কন্যাকে অবশ্য সঠিক অর্থে ইয়োরোপীয় বলা না গেলেও তিনি খুব সম্ভব ছিলেন পর্তুগীজ বংশোদ্ভূতা। ১৮৩০ সালে প্রকাশিত তাঁর অ্যালবামের [‘Twenty Four Plates Illustrative ofHindu and European manners in Bengal’]  এই ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে [চিত্র-৪] 

সুদৃশ্য ঝাড়বাতি ও কার্পেট-শোভিত এক হলঘরে নাচছে এক সুরূপা নর্তকী, তার একপাশে নানা বাদ্যযন্ত্র সহ সুবেশ বাদ্যকরেরা দাঁড়িয়ে আছে, অন্য পাশে এক ইয়োরোপীয় অভ্যাগতের সঙ্গে আলাপ করছে এক সম্ভ্রান্ত ‘জেন্টু’ ও একজন শিখাধারী ভারতীয়। ছবিটিতে অবশ্য বিশেষ ভাবে দুর্গাপূজার কোনো অনুষঙ্গ দেখা যায়না। তবে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এই ছবিটিতে যেমন দেখানো হয়েছে, রাধাকান্ত দেবের বাড়ির দুর্গোৎসবেই সে-ধরনের সমাবেশ হতো।

এই ছবিটির সমসাময়িক কোলম্যানের ‘দি মাইথোলজি অব হিন্দুজ’ [১৮৩২] বইটিতেও পাওয়া যায় কোনো অনামা শিল্পীর আঁকা দুর্গোৎসবে নাচের একটা ছবি, যাতে বিরাট হলঘরের কেন্দ্রস্থলে বাহারি পর্দায় সাজানো প্রকোষ্ঠে দুর্গাপ্রতিমা দেখা যাচ্ছে, 
যদিও শুধু গণেশ আর কার্তিককেই দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্মী-সরস্বতীর খোঁজ নেই! সামনে মাঝখানে নাচছে একজন নর্তকী, এ ছাড়া উপবিষ্ট বাদ্যকর ও অতিথি ইয়োরোপীয় নারীপুরুষকে দেখা যাচ্ছে। দু’ পাশে বাতিশোভিত থামের পেছনে দু’ পাশে টানা বারান্দায় বসে আছেন বিপুলসংখ্যক দর্শক। একতলায় দু’পাশে দাঁড়ানো দেশী সম্ভ্রান্তজন, দোতলায় সাহেব-মেমরা বসে আছেন ডান দিকে আর বাঁদিকে চিকের আড়ালে দেশী মহিলারা। [দ্রষ্টব্য-ছবি-৫] 


আমাদের আলোচ্য সর্বশেষ ছবিটির [ছবি-৬]

শিল্পী উইলিয়াম প্রিন্সেপ,যা দেখলে মনে পড়ে যেতে পারে দীনবন্ধু মিত্রের ‘সুরধুনী’ কাব্যের এই বর্ণনাঃ-“জ্বলিতেছে ঝাড়বৃন্দে বাতি-পরিকর,/ দুলিতেছে চন্দ্রাতপ শোভা মনোহর,/ চৌদিকে দেয়ালগিরি সারি সারি থামে, / বিরাজে দালানে যেন দুর্গা গিরিধামে,/...... বসিয়াছে বাবুগণ ধরি রম্যবেশ,/ মাথায় জরির টুপি, বাঁকাইয়ে কেশ,/ বসেছে সাহেব ধরি চুরুট বদনে/ মেয়াম ঢাকিছে ওষ্ঠ মোহন ব্যজনে,/ নাচিছে নর্তকী দুটি কাঁপাইয়ে কর,/ মধুর সারঙ্গ বাজে কলমনোহর,/... পাখা হাতে বেহারা অবাক শোভা হেরে,/ তুষিতে সাহেবে শিধু হাতে হাতে ফেরে।......”  ১৮৩০-৪০সময়পর্বে আঁকা ছবিটিতে পর্দা ও ঝাড়লন্ঠন শোভিত বিশাল ঠাকুর-দালানের মধ্যে দূরে দেখা যাচ্ছে দশভুজা দুর্গার প্রতিমা, কিন্তু সেখানে দেখ যাচ্ছে না লক্ষ্মী-সরস্বতীপ্রমুখ অন্যান্য দেবদেবীদের! কেন্দ্রস্থলে অভ্যাগত সাহেব-মেমদের আপ্যায়ন করছেন গৃহকর্তা দেশী জেন্টু, অদূরে অপেক্ষমান পানীয় হাতে পরিচারকবৃন্দ। ডানদিকে দেখা যাচ্ছে নৃত্যরতা নর্তকী ও বাদ্যকরদের। দোতলার বারান্দা থেকে উঁকি দিচ্ছেন বাড়ির মহিলারা। প্রবেশ দ্বারের দু’পাশেই রয়েছে অস্ত্রধারী প্রহরী বা দারোয়ানেরাআর দালানের বাইরে সম্ভবত রবাহূত সেই ‘দীন প্রতিবেশীবৃন্দ’, প্রতিমা দেখতে এসে যারা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “বাধা পায় দ্বারীহস্তে”।

শহর কলকাতার আদি পর্বে শুরু হয়নি ফটোগ্রাফির যুগ, তখন ছিল না তেমন কোনো দেশী চিত্রকরও। তাই বিদেশী চিত্রীদের আঁকা গুটিকয় মূল্যবান ছবিতেই বন্দী হয়ে আছে অতীত ইতিহাসের এই দুর্লভ মুহূর্তগূলো।


তথ্যসূত্রঃ-

১। সেকালের কলকাতার দুর্গোৎসবে নাচ/ হরিপদ ভৌমিক- পুরশ্রী, ২২-৯-১৯৭৯।
২। জেন্টুদের দুর্গাপূজা/ কমল চৌধুরী- যুগান্তর, ৬-১০-১৯৮১।
৩। সেকালের কলকাতার দুর্গোৎসব ও শ্বেতাঙ্গ সমাজ/ নিশীথরঞ্জন রায়, কলকাতা পুরশ্রী, ২৩-৯-১৯৮২।
৪। বসন্তকের চোখে দুর্গোৎসব/ সুনীল দাস, ঐ।
৫। পুরানো কলকাতায় দুর্গাপুজা/ স্বপন বসু, ঐ, ২৪-৯-১৯৮৪।
৬। রাজা রাজকৃষ্ণের দুর্গোৎসবে নাচের আসরঃ বিদেশীদের চোখে/ প্রতাপ মুখোপাধ্যায়, ঐ।
৭। শারদোৎসবের কলকাতা, কলকাতার শারদোৎসব/ রাধারমণ রায়, ঐ।
৮। কালান্তরের দুর্গোৎসব/ অতুল সুর- বর্তমান, বিশেষ সংখ্যা আশ্বিণ, ১৩৯২।
৯। প্রাচীন সংবাদপত্রে দুর্গোৎসব/ কৃষ্ণশর্বরী দেব- ঐ।
১০। এক বিদেশী শিল্পীর চোখে সেকালের পূজা-পার্বন/ অভী দাস- দেশ, ৪-১০-১৯৮৬।

১১শ্রী শ্রী দুরগাপূজাঃ সাকিন কলকাতা/ শোভন সোম, ঐ, ৭-১০-১৯৮৯।