পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

বুধবার, ৯ মার্চ, ২০১৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

কালিমাটি অনলাইন /  


প্রসঙ্গটা পুরনো, খুবই পুরনো। অনেক আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। রাশি রাশি নিউজপ্রিন্ট ও দামি কাগজ খরচ করে বিশেষজ্ঞরা তাঁদের মূল্যবান অভিমত জানিয়েছেন। এমন কি চায়ের কাপে সুনামি তুলে অনেকেই আবার সেইসব অভিমতের সঙ্গে সহমতও পোষণ করেছেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে, এত কিছুর পরেও প্রসঙ্গটা তার পূর্বের অবস্থানেই অনড় হয়ে রয়েছে; আর তাই প্রসঙ্গটা পুরনো, এই অজুহাতে ঠিক এড়িয়ে যাওয়াও যাচ্ছে না।

অনেকদিন হলো, দুটি ইংরেজি শব্দের সমন্বয়ে একটি ‘কয়েনেজ’ খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল তথাকথিত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহলে। ‘আইডেনটিটি ক্রাইশিস’। অর্থাৎ আমাদের ‘পরিচিতি সংকট’ বা আর একটু বাড়িয়ে বললে ‘অস্তিত্ব সংকট’। কোনো তথ্য ও তত্ত্বের অবতারণা না করে সোজা সাপটা ভাবে বলা যায় যে, আমাদের চারপাশের দুনিয়া সমাজ ও সময় যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে তাতে আমরা আর আমাদের এতদিনের নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত পরিচিতি বা অস্তিত্বকে ধরে রাখতে পারছি না। সংকট ঘনিয়ে আসছে আমাদের ব্যবহৃত ভাষায়, সামাজিক অবস্থানে, জাতি ও বর্ণগত ঘেরাটোপে, এমনকি তথাকথিত জাতিয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদ ভাবনার অন্তরমহলেও। এবং এই সংকট যদি আরও গভীর হয়ে ওঠে, তাহলে সংশয় জাগছে, তখন আমরা কী পরিচিতি নিয়ে বেঁচে থাকব! কী পরিচয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করব!

তবে ইদানীং আরও একটি সংশয়ও সাম্প্রতিক দেশ-কাল-সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষিতে মনের মধ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে। এখনও পর্যন্ত আমরা যে পরিচিতি নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছি, তা সে ভাষাগত বা জাতিগত বা ধর্মগত বা সম্প্রদায়গত যাই হোক না কেন, অথবা একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডের বসবাসকারী রূপে, সেই পরিচিতি কি আজ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যথেষ্ঠ কার্যকারী বলে মনে হচ্ছেবরং ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যাচ্ছে, এই নির্দিষ্ট পরিচিতিই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারে সংকট ঘনিয়ে তুলছে, আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অস্থির করে তুলছে; সামগ্রীকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে আমাদের জীবন ও যাপন। বলা বাহুল্য, সারা পৃথিবী জুড়েই আজ চলছে এই উন্মত্ততা। ভাষা-জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়-দেশ নির্বিশেষে সবাই হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের অর্থ, স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার। আমরা কি শেষপর্যন্ত হেঁটে যেতে বাধ্য হচ্ছি সময় ও সভ্যতার উলটোপথে? ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছি আদিম অসভ্য জীবনের অন্ধকারে? আমাদের সহস্র সহস্র বছরের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার পরিণতি শেষপর্যন্ত এই? এভাবেই মুখ থুবড়ে পড়বে যাবতীয় সৃজনশীলতা?

‘কালিমাটি অনলাইন’এ বিগত তিন বছরে ৩২টি সংখ্যা আমরা প্রকাশ করতে পেরেছি। আজ মার্চ মাসে ৩৩ তম সংখ্যাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো চতুর্থ  বছরের যাত্রা বা জার্নি। আপনাদের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও সহযোগিতায় আমরা আপ্লুত এবং মুগ্ধ। সবাইকে জানাই আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।    

     
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India

      

<<<< কথনবিশ্ব >>>>


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

‘ওগো বাঁশিওয়ালা, বাজাও তোমার বাঁশি’ 


                                                                                                             
  খুব ছোটবেলায় কালিদাস রায়ের একটি কবিতায় পড়েছিলুম এক অনাহারক্লিষ্ট ব্রাহ্মণ সাধকের কথা। নিজের দুর্দশায় তিতিবিরক্ত হয়ে, স্বহস্তে গীতার ‘যোগক্ষেমং বহাম্যহম্’ কথা দুটি (রায়ের ভাষায় ‘আমি নিজে বই’) কেটে দিয়েছিলেন। তাতে   অবশ্য দুটি দিব্যদর্শন বালক তাঁর গৃহিণীর হাতে চাল-ডাল-তরিতরকারির সিধে  পৌঁছে দেওয়ার সময় তাদের রক্তাক্ত পিঠ দেখিয়ে, মাতৃভাবস্পৃষ্ট গৃহিণীকে তাজ্জব আর পরে সাধুকে লজ্জিত করে দিয়েছিল! সাধককে যেমন, কেউ না কেউ তো বিশ্ববিদ্যালয়কেও বইবেই! তার জন্য ঘরের পাশে তৃতীয় পাণ্ডবের মতো কেউ  ‘আমি একা বই’, ‘আমি মাইনে দিই’ বলে’ হুহুঙ্কার  করবে! আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ‘আধো আইবুড়ো ভিখিরীর’ মতো অনুতাপান্তে উপলব্ধি করতে হবে—     
‘জলিফলি ছাড়া  
চেৎলার হাট থেকে টালার কলের জল আজ
এমন কি হ’তো জাঁহাবাজ?
ভিখিরীকে একটি পয়সা দিতে ভাসুর ভাদ্র-বৌ সকলে নারাজ’

(লঘু মুহূর্ত, সাতটি তারার তিমির)

  আসলে সেই অযোধ্যাও নেই, সেই রামও নেই! অনেকে বলবেন (ক’নও বটে) সেই বহনকারীর কথা রাখেন মড়য়! সেই রামনাথীয় পণ্ডিতরা আছে! ফলে অনায়াসে এক প্রদেশখণ্ডে (একটু বঙ্কিমী, কিন্তু আমার প্রিয়) তৃতীয় পাণ্ডব, আর সারা দেশে আরেকজনা সাধুসম্মিলনের সুবাদে সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিক্ষানির্ভর আইবুড়োত্বকে ‘ঘর ঘর কা কহানী’ করে দিচ্ছেন! কখনো দক্ষিণ-পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিবাদে ঢুকে পড়ছেন কেন্দ্রীয় সরকার! খুঁচিয়ে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দমনপীড়নে  ব্যতিব্যস্ত হয়েও, আত্মহননের বার্তায় তাকে দায়ী না করেই আত্মঘাতী ছাত্রের ‘দলিত’ স্ট্যাটাস নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে। যেন মা তপশীলী হওয়া সত্ত্বেও ‘আমি নিজে বই’ বলতে নারাজ বাপ কেবল ওবিসি হওয়ায়, ছেলের প্রতিবাদটাও খাটো হয়ে গেল! আক্রমক, বৈষম্যকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দলিতের প্রতিবাদ কেন তপশীলীদের থেকেই আসতে হবে, ওবিসিদের থেকে নয়, তা বামুনের ভগাই জানে! কেউ পড়েও দেখেনি কীভাবে মহাত্মা জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে  চাতুর্বর্ণ্যকে দ্বান্দ্বিক যুক্তিতে, ‘ভাট/সাহুকার’ আর ‘শুদ্রাতিশুদ্রের’ দ্বৈবর্ণ্যে পরিণত হতে দেখান! আর কীভাবে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকদল তার প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিতে  পরিণত হয়েছে! কখনও খোদ রাজধানীতেই বিখ্যাত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ছেলে অবিমৃষ্যকারী ভাবে এক ঘোষিত, বিচারিত অপরাধীর ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদসভা করতে গিয়ে, agent provocateur–দের ফাঁদে পা দিয়ে, তাদের ভারতদ্বেষী স্লোগানে গলা দিয়ে, দেশের শিক্ষার স্বল্পশিক্ষিতা অভিভাবিকাকে সুযোগ দেওয়া মাত্র মানবসম্পদ মন্ত্রক ‘এমন মানবজমিন রইলো পতিত, আবাদ করলে লতো সোনা’ বলে’,  কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে, ‘ঘর ঘর কা কহানী’-র  পরের স্টুডিও হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়কে! কর্পোরেট মহামিডিয়ার (কুজ্)ঝটিকা আর শাসকদলের সাঙ্গোপাঙ্গোদের ‘নাহোক কলরব’ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্যকে এমনভাবে ব্যঙ্গ করছে যে সেটা যেন ‘দিয়ে খায় না পেতে শোয়’ ধরনের এক আজব বস্তু!

  Agent provocateur–দের ফাঁদে পা দেওয়া, কোনো অপরাধীর ফাঁসিবিরোধী প্রতিবাদসভায় শ্লোগানে ভারতদ্বেষী কলরব  মিশে গেলে আমাদের পরিতাপের আর প্রতিবাদীদের পশ্চাত্তাপের বিষয় হতে পারে, কিন্তু তাতে দেশদ্রোহিতার অপরাধে বিচার দেশের আইন মোতাবেকই হয় না, এ কথা নিয়ে ফেসবুকে কয়েক আইনজ্ঞর বিচারবিমর্ষ শেয়ার করায় এক পরমাত্মীয়, উজ্জ্বল বৈজ্ঞানিকের কাছ থেকে শুনতে হলো, ‘people who live their life on public dole should be loyal to hand that feed them এবম্বিধ সদুক্তির কারণ হলো ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্থান পাওয়া ছাত্ররা (কতকটা দেশের কোটিপতি সাংসদদের মতোই) কম  পয়সায় থাকে, খায়!  ডোলের ঢোলবাদকদের কী উত্তর দেবো, একথা ভাবতে  ভাবতেই মনে পড়ে গেল একটি ইংরিজি প্রবাদ: ‘He who pays the piper calls the tune’আর এই প্রবাদ সম্বন্ধে Margaret Atkins-এর প্রগাঢ় বিশ্লেষণ ‘Should He who pays the piper call the tune?’ লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক কোর্সের  প্রশাসন বিষয়ক ব্যাপারেই অ্যাটকিন্সের এক সমালোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পদাধিকারী তাঁকে শুনিয়েছিলেন এই মহাপ্রবাদ— ‘He who pays the piper calls the tune’প্রবাদটির ভাষাগত উৎপত্তির সাত সতেরোর পর, অ্যাটকিন্স ম্যা’ম প্রবাদটির সম্পর্কে  কয়েকটি ফাটাফাটি প্রশ্ন  তুলেছেন। যথা——
      
  ধরা যাক বেতনদাতা এই বাঁশিওয়ালাকে (নাম ধরুন পিটার) কেবল তাঁরই দেওয়া ‘সুর’ বাজাতে আদেশ করছে। কারণ পিটার ভালো বাঁশিওয়ালা হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু তাঁর কাছ থেকেই বাঁশি বাজানোর মজুরি পাবে, ফলে তাকেই আবিষ্কার করতে হবে বেতনদাতা কী সুর চাইছে। বাঁশিওয়ালা আর কারুর কাছে দায়িত্বশীল নয় (যেমন এক্ষেত্রে পড়ুন নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার, প্রতিবাদের জায়গা বা সুর)। পিটার বলতে পারবে না, ‘কি সুর বাজে আমার প্রাণে আমি জানি মনই জানে’। বলতে পারবে না ‘But everyone else loved the tune that I choseবেতনদাতাই খাওয়াচ্ছে যে!


      
  বলতে পারেন এসব কথার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাসঙ্গিকতা কী! আছে স্যার! বিশ্ববিদ্যালয়েই একে প্রয়োগ করে অ্যাটকিন্স ম্যা’ম লিখছেন——
·     বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতনদাতা অনেক। উপকারী, আদি ফাণ্ডদাতা, কর্পোরেশন, সরকার, করদাতা, রাজনীতিক ইত্যাদি! তাঁদের নির্দেশ অনেক চোরা, অন্ধকার, জটিল গলি ঘুঁজির মধ্যে দিয়ে রাজনীতিক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের  প্রশাসনিক আধিকারিক ইত্যাদিদের দ্বারা ঘোরানো-পেঁচানোর পর, আবার ছাত্র, মাতাপিতা, ভবিষ্যৎ  নিয়োগকর্তা ইত্যাদি  অনেকের সঙ্গে  পরামর্শ করার  প্রয়োজন মিটিয়ে, খুব অস্পষ্ট চেহারা নেয়! তা গৎবাঁধা, কিন্তু ভালো সুরের নয়!  কী বাজাবে পিটার?
·     ভালো বাজিয়ে পিটার অতএব দর্শন ভাবনায় স্পৃষ্ট হলে বেছে নেবে এদের মধ্যে, — (i) যারা বাজানোকে প্রভাবিত করে না; (ii) যারা বাজানোকে অনুপ্রেরিত করে না; (iii) যারা বাজানোকে দূষিত করে।
·     বেতনদাতা বুঝিয়ে দিয়েছে সে পিটারের কাছ থেকে কী চায়। বেতনদাতা বিশ্বাস করে যে পিটার বাজাবে তার দেওয়া টাকার জন্য, তার দেওয়া সুরে। বাঁশিবাদনের অন্তর্নিহিত কোনো মূল্য নেই! বাজানোর উদ্দেশ্য টাকা, উদ্দেশ্য গৌণ! পিটার কিন্তু বাজায় বাজানোর আনন্দে!  টাকা গৌণ! ফলে এই প্রবাদের অর্থেই লুকিয়ে আছে এই সম্ভাবনা যে বেতনদাতা ও পিটার বাজানোর উদ্দেশ্য বিষয়েই দ্বিমত প্রথম থেকেই! (Margaret Akkins, ‘Paying the piper’, https://www.royalholloway.ac.uk/classics/cucd/atkins.htm)

·     পিটার জানে যে গানের জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা বেতনদাতার কেজো জগৎ থেকে, যেমন আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় বাইরের জগৎ থেকে! বিতর্ক, দ্বিমত, অন্য সুর তার স্বভাবগত। বেতনদাতাকে ভাবতে হবে বাজনা চলবে কিনা। চললে তা তার সুরে বাজবে না! বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অটোনমির কথা বোধহয় সব চেয়ে প্রথম, সব চেয়ে ভালো বলেন বিশ্ববিশ্রুত জর্মান দার্শনিক উইলিয়াম ফন হুম্বোল্ড, এমনকি রাজতন্ত্রের অধীনেও।

  চরমতান্ত্রিক রাজতন্ত্রেও রাজা/ রাষ্ট্র কেন একটি নজিরবিহীন অটোনমির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিস্ক্রিয় গার্ডিয়ান এঞ্জেল হয়ে রাখবে তার পক্ষে হুম্বোল্ডের যুক্তি ছিল দ্বিবিধ— দার্শনিক/নৈতিক আর উপযোগিতাবাদী/ কেজো। প্রথমটায় বলা হয়েছিল যে নতুন এবং মৌলিক জ্ঞান প্রসূত হতে পারে কেবল ‘Einsamkeit und Freiheit’-এর (নির্জনে আর স্বাধীনতায়)আর দ্বিতীয়টায় বলা হয়েছিল যে যেহেতু কোনো আধুনিক ‘Kulturstaat’-এর (সংস্কৃতিবান রাষ্ট্রের) বৌদ্ধিক এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, এমনকি শারীরিক অস্তিত্বই  অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ও নির্ভরশীল  উচ্চ মানের জ্ঞানের কাম্য ও সর্বাধিক অনুসরণ  আর সৃজনের উপর, সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোনমির নীতি কেবল এক বাঞ্ছিত, প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান  নয়, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নৈতিক দায়! এই কারণেই ম্যাক্স হ্বেবর বলেছিলেন জ্ঞান সৃজনের ক্ষেত্রে Wertfreiheit তথা  মূল্যবোধ নিরপেক্ষতার কথা, যাকে এমিল দুর্খেইম আবার বলেছেন সব সামাজিক ঘটনাকে ‘বস্তু’ (‘thing’) হিসেবে দেখতে বলে’আর সমাজতত্ত্ববিদ থর্স্টিন ভেবলেন তাঁর শিক্ষকদের চমকে দিয়েছিলেন লুথের‍্যান কার্ল্টন কলেজ অ্যাকাডেমিতে। সেখানে Oratory নামের এক শাস্ত্রঘেঁষা বক্তৃতা পরীক্ষায় নিয়মমাফিক ‘heathen’ কেন প্রভুর ধর্মে দীক্ষিত করা দরকার, সেই ধরণের কোনো বক্তৃতার স্থলে ভেবলেন মাস্টারমশাইদের চমকে দিলেন, ‘A Plea for Cannibalism’ আর ‘An Apology for a Toper’ নামের দুটি বক্তিমা দিয়ে। প্রথমটায় ছিল recycling-এর অর্থনীতি হিসেবে cannibalism তথা নরখাদকতার সমর্থন। আর দ্বিতীয়টায় ছিল মাতলামোর বৈধতা প্রতিষ্ঠা। তাজ্জব ফ্যাকাল্টি যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন এইসব খেলো পাপময় বিষয়ে বক্তৃতার হেতু, তখন ভেবলেন তাঁদের নীরস গলায় বলেন এগুলো তাঁর বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষণ! অসোয়াস্তির সঙ্গে ফ্যাকাল্টি বোঝেন তাঁর জিনিয়াস (Robert L. Heilbroner, The Worldly Philosophers: The Lives, Times, and Ideas of Great Economic Thinkers, New York: Touchstone/ Simon and Schuster, 1953/1999, pp. 222-23

  শুনছেন ‘ঘর ঘর কহানী’র  অমর উচ্চমাধ্যমিকার অহমিকা, আর তাঁর ঔপরিকের ৫৬ কমে’ ৪৮ ইঞ্চির প্রতাপ, আর ঘরের কাছে ওজনদার তৃতীয় পাণ্ডব? যে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের সাধারণ, গড়পড়তা নীতির থেকে অন্যতর নীতির আলোচনার  জায়গা! সেখানে কোনো তথাকথিত অপরাধীর ফাঁসি রদের জন্য ছাত্ররা আওয়াজ তুলতেই পারে! ‘আমি একা বই’ বলে তাকে থামিয়ে দিলে গান বন্ধ হয়ে যাবে, জ্ঞানও!  বাঁশিওয়ালাদের বাঁশি বাজাতে দ্যান সায়েব/ম্যা’ম! ওর দমনের বিরুদ্ধে ছিলেন Atkins আর তার বহু আগে মহাদার্শনিক  Humboldt, Weber, Durkheim, Veblen!      
   
  কান্‌‌হাইয়া মোরা! বাজাতে রহো তেরা বাঁশরিয়া, শুনাতে রহো নয়া নাম ...  

   
    
        

     


শিবাংশু দে

সুমনসিম্ফনি এবং




----------------------------------------  
গান ভালো লাগার যে আবেগ বা মনন, তা মগজে গজাল মেরে আনা যায় না। সে তখনই সুখদা যখন সে স্বয়মাগতা 
----------------------------------------


যেমন আমি সুমনকে শুধু তাঁর নিজস্ব গানের মানদন্ডেই মূল্যায়ণ করার পক্ষে। রবীন্দ্রসঙ্গীত বা হিমাংশু দত্তের গান তাঁর শখের ব্যাপার, সেখানে তাঁর কিছু প্রমাণ করার নেই। তাঁর হয়ে ওঠা গান বইটি নিশ্চয় অনেকেরই পড়া আছে। এই হয়ে  ওঠা ব্যাপারটি  আমার মনে হয় শুধু তাঁর নিজের গানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি জানিয়েছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কিছু তালিম তিনিও নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ কৈশোর পেরিয়ে কঠিন হতে থাকে এবং নমনীয়তা হারায়। আমাদের চেনা গানে সঠিক সুরসংস্থান করতে গেলে কণ্ঠের নমনীয়তা অত্যন্ত জরুরি। তাই তিনি নিজের গানের মাঠটিই পাল্টে ফেলেন এবং গান পরিবেশনের সময় মূলত বিদেশি ছাঁচের স্ট্যাকাটো ধরনটি গ্রহণ করেন। এই পরীক্ষায় যে তিনি বেশ সফল হনতার সাক্ষী ইতিহাস।  
----------------------------------------
তিরানব্বই সালে একটি অনুষ্ঠানের সূত্রে তিনি আমাদের শহরে এসেছিলেন। তখন তাঁর সূর্য মধ্যগগন যাত্রী। একটা সারা দিন তাঁর সঙ্গে নানা আড্ডা, আলোচনায় কেটেছিলতখন বলেছিলেন তিনি একজন একটি বিশেষ সময়কালের গায়ক। হয়তো পাঁচ বছর পরেই তাঁর গান আর কেউ শুনবে না। আমরা তো চমৎকৃত। তখন তাঁকে আমরা সলিল চৌধুরির পর বাংলা গানের মসিহা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছি, তাঁর মুখে এমন কথা? কিন্তু তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে যে কতটা ওয়াকিফ ছিলেন, তা এভাবেই প্রমাণ হয়ে যায়।  
----------------------------------------


শিল্পী হিসেবে নিজের এই মূল্যায়ণ তিনি আত্মমর্যাদার অঙ্গ হিসেবেই করেছিলেন হয়তো। কিন্তু প্রায় বিশ বছর কেটে যাবার পরেও তাঁর গান মানুষ শুনছে আর এই সব গান থেকে অন্তত পঞ্চাশ ষাটটি গান বাংলা গানের মাইল ফলক হিসেবে আরো অনেকদিন বেঁচে থাকবে।
----------------------------------------


নচিকেতার সঙ্গে তাঁর গানের তুলমামূলক আলোচনা নিয়ে বহু শ্রোতা আগ্রহী হয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, নচিকেতার সুর যোজনার বৈচিত্র্য নিয়ে আমার মতো ইতর লোকও অনেক কথা লিখতে পারে। অকৃপণভাবে ভাংড়া থেকে গজল, রক থেকে রেগি, ভাটিয়ালি থেকে গোয়ান সুর, হির থেকে ব্লুজ, বৈঠকি থেকে বাউল, সবই তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে। কিন্তু তার মধ্যে কটা শেষ পর্যন্ত শিল্পমূল্য অর্জন করে উঠতে পেরেছে, সেটাই জরুরি। সাফল্য একটি ঘটনা তো  বটেই। কিন্তু এক সময় ক্যয়সে বনি সিলোরি কে বিনা চটনি, বাজারের ভাষায় ছপ্পর ফাড়কে হিট হয়েছিলঅতএব, শেষ কথা কে বলবে
----------------------------------------


আমাদের ছোটবেলায় দেখতুম সত্যম্বর অপেরার একটি আসরে যত উচ্ছ্বসিত দর্শকের ভিড় থাকে, বহুরূপীর সারা বছরে তত দর্শক জোটে না। তাই এভাবে কে সফল আর কে বিফল, তা  বিচার করতে যাওয়াটা মূঢ়তা।

দিনের শেষে ...ভালো আমার লেগেছে যে, রইলো সেই কথাই... 
----------------------------------------


এখানে একটা গান শুনি আমরা। গানটি সম্পর্কে সুমনের কিছু স্মৃতিচারণ রয়েছে, সেটাও পড়ি। আর পড়ি এর লিরিকটি। কেন সুমনকে নিয়ে লিখতে প্রয়াস পাই, তার কিছুটা প্রমাণ এখান থেকে সংগ্রহ হয়ে যাবে।
----------------------------------------


সিলভার স্প্রিং এর বাসা। বোধহয় ১৯৮৩ সালের গরমকাল। রাতের ডিউটি  সেরে বাসায় ফিরেছি। বসার ঘরটা নানান বাজনা আর যন্ত্রে ঠাসা। এর পাশে একটা ইলেকট্রিক পিয়ানো। সদ্য কিনেছি। নতুন প্রেমের মতো সারাদিন হাতছানি দিয়েছে পিয়ানোটা। ঘরে ঢুকেই আফিসের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে সটান গিয়ে বসলাম পিয়ানোয়। ঘরের আলো জ্বালাইনি। মস্ত কাচের জানলা দিয়ে বাইরের আলো যেটুকু ঢুকছে তাতে ঘরটা আবছায়া।

বাইরের আলো মানে রাস্তার স্থিমিত আলো। পিয়ানোয় একটা কর্ড বাজিয়ে জানলা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল দূরে একটা তারা। মুহূর্তের মধ্যে কি যে হয়ে গেল। এরকম আর কখনো হয়নি। পিয়ানো বাজিয়ে, ধীরে ধীরে আস্ত একটা গান বেঁধে ফেললাম - কথায় সুরে মিলিয়ে। কথাটা লিখতে হল না। লাইনগুলো গাইতে গাইতে আপনিই তৈরি হয়ে গেল সুর সমেত।

আমার আর কোন গান আমি এভাবে বাঁধিনি। এর আগে বা পরে কখনও গোটা একটা গান কথা বা সুর একসঙ্গে বেরিয়ে আসেনি আমার ভিতর থেকে। কি করে যে এটা সম্ভব হয়েছিল আমি আজও জানি না। এটুকুই শুধু জানি যে গানটা বাঁধার সময় বিশেষ ভাবতে হয়নি আমাকে” (সুমনের গান সুমনের ভাষ্য)

সারারাত জ্বলেছে নিবিড়
ধূসর নীলাভ এক তারা
তারই কিছু রং নাও তুমি

শহরে জোনাকি জ্বলে না - নয়তো
কুড়োতাম সে আগুন নীল - হয়তো,
যা কিছু নেই
নাই বা হল সব পাওয়া
না পাওয়ার রং নাও তুমি।

বড় বেরঙ্গিন আজকাল কাছাকাছি
কোন রং পাই না, তাই
দিতে পারি না কিছু
কিছুই রাঙানো হল না - নয়তো
আগামীর রঙে ছোপাতাম - হয়তো
এই মলিন
আর এ-ধূসর পথ চাওয়া
এ চাওয়ার রং নাও তুমি

----------------------------------------


গান ভালো লাগা না লাগার বহু মানদন্ড হতে পারে। অত্যন্ত সাবজেক্টিভ ব্যাপার। তবে সুমনের মতো অতিস্বল্প প্রকৃত সৃষ্টিশীল সময়কালের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়া  একজন শিল্পীর (বড়জোর সাত বছর) দ্বারা  বাংলা গানের প্রচ্ছদ পাল্টে দেবার ক্ষমতা আমি রামপ্রসাদ সেনের আমল থেকেও যদি ধরি, কাউকে পাইনি। কেন পাইনি, আমার মতো করে যদি তার বিশ্লেষণ করতে বসি তবে হয়তো একটা আলাদা বই লাগবে। ওঁর লিরিক, যন্ত্রানুসঙ্গ, সুরের চলন, মাত্রাজ্ঞান, গভীরতা এবং সর্বোপরি উপস্থাপনা, অর্থাৎ শুধু কারিগরির দিকটুকু নয়, প্রসাদগুণেও ওঁর  সমসাময়িক  কেন, আগে পরের খুব কম শিল্পীই পাল্লা দিতে পারেন। দুনিয়ার সব কিছু নিয়ে চটজলদি মন্তব্য করার ক্রমান্বয় বদ অভ্যেসটুকু উপেক্ষা করে যদি শুধু ওঁর গান নিয়েই ভাবা যায়, তবে সেটাই শ্রেয়তর।   
----------------------------------------


আসলে কী হয় ব্যাপারটা, এই গান নিয়ে লিখতে গেলে যেটা সতত মনে পড়ে, পৃথিবীর সর্বত্র তো কোটি কোটি রকম গান তৈরি হয়, কিন্তু যা টিকে থাকে তা শেষ পর্যন্ত দেখা যায় সঙ্গীত হয়ে উঠেছিল। যন্ত্রসঙ্গীতের কথা বাদ দিচ্ছি, কারণ এই আলোচনায় তার প্রসঙ্গটি গৌণ। তার উল্লেখ থাকছে শুধু সহায়ক সুরস্রোত হিসেবে। কন্ঠসঙ্গীতের  ব্যাপারে সব চেয়ে প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে গলার সঠিক সুরসংস্থান। যে পর্দাটি ধরতে চাইছি সেটিকে ঠিকঠাক গলা থেকে বার করা। বাংলায় যাকে বলে ভয়েস ট্রেনিং। পাতিয়ালা ঘরের অজয়বাবুর কথা ভাবা যায়। ওঁদের ঘরানার সব থেকে জরুরি তালিম হচ্ছে এইটা। কিন্তু এই বিষয়ে বেশি মনোসংযোগ করতে গিয়ে অনেক সময় ওঁরা গানের স্পিরিটটাকে দ্বিতীয় সারিতে রাখেন, এর ফলে গোল লাইনের কাছে এসে কিরানা পার্টি মেরে বেরিয়ে যান।  সবাই তো আর বড়ে গুলাম নন! আর বাংলা ব্যান্ড কোম্পানি প্রায় পুরোটাই  ‘স্পিরিট, সুরের তোয়াক্কা কেউ বিশেষ করেন না। কয়েকজন জনপ্রিয় ব্যান্ডগায়ককে যখন খালি গলায় সামনে বসে গান গাইতে শুনেছি তখন এই সীমাবদ্ধতাটিকে অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠতে দেখেছি। ইক্যুয়ালাইজার, মিক্সার, বাসকন্ট্রোল, সর্বোপরি ধমাধম ধমাধম কৃষ্টির ঢাক ছাপিয়ে অধম শ্রোতাদের কান পর্যন্ত যা পৌঁছোয়, তা নিয়ে বিশেষ আশাবাদী হওয়া যায় না। 
----------------------------------------


এত কথা এই জন্য লিখছি যে গত শতকের শেষ থেকে বাংলা গানের সব থেকে জনপ্রিয় শিল্পীদের মধ্যে স্বল্প দুয়েকজন ছাড়া বাকিরা সুরসংস্থানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে   পিছিয়ে থাকেন। মোদ্দা কথা গলায় সঠিক সুর না থাকলে কিছুদিনের জন্য বাজার কাঁপানো যায় কিন্তু শ্রোতাকে মজানো যায় না। যেমন ধরা যেতে পারে অঞ্জন দত্তের গান। আমার অভ্যেস অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে ভালো না লাগলেও যখন কোনও গায়ক জনপ্রিয় হন, তখন তাঁর গান আমি বার বার শুনি, এই প্রিয়ত্ব  অর্জন করার কারণটাকে খুঁজতে। কিন্তু এখনও অঞ্জনের কোনও চার মিনিটের গানও আমি মনোসংযোগ দিয়ে শুনতে পারিনি। বেসিক সুরসংস্থান এত মলিন যে চমকানো লিরিক দিয়ে তার গতি করা যায় না। 
----------------------------------------


শচীন কত্তা বলতেন, যে সুরটা রিক্সাওয়ালাও গাইতে পারবে তাই জনপ্রিয় হবে।  কিন্তু নিজে গানটা গাওয়াতেন রফি, কিশোর, মান্না, লতা, আশাকে দিয়ে, যাঁরা সুরসংস্থানের ঈশ্বর কোটীর মধ্যে পড়েন। এ ব্যাপারে কোনও আপোস নয়। তাই জনপ্রিয় গান গাইতে গিয়ে যদি আমি জনতার গায়নক্ষমতার অনুকর করি তবে  ‘প্রিয়তা হয়তো আসে, গান আসে না। অঞ্জনের ক্ষমতা বহুমুখী, কিন্তু গায়ক হিসেবে...??
----------------------------------------


সংখ্যার জনপ্রিয়তার দৌড়ে নচিকেতা সুমনের থেকে হয়তো বেশ এগিয়ে। কিন্তু লিরিকের ক্ষেত্রে নচিকেতা অতিনাটকীয়তাকে যেভাবে প্রশ্রয় দেন তাতে তাঁর গান শুধু কানের কাছে নয়, চোখের কাছেও প্রগাঢ় আবেদন নিয়ে আসে। এটা গানের দুর্বলতা। ঐ মিউজিক ভিডিও টাইপ আর কী। ওঁর গানের মধ্যে মুম্বাই এলিমেন্ট   অনেক বেশি, তাই বেশি জনপ্রিয়। আমরা বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে যেটাকে বেণীমাধব ইফেক্ট বলে থাকি। কবি জয়ের নেমোসিস যেমন বেণীমাধব’, তেমনিই  নচিকেতার নীলাঞ্জনা বা জগৎটা জুড়ে সোনাগাছি জাতীয় প্রত্যয়।    আর আমি নিজে জাত বিহারি হয়েও বলি, নচিকেতার গানে বাংলা উচ্চারণ    মুহম্মদ রফির থেকেও খারাপ। গত বছর বিশেক ধরে দেখি কলকাতার মূলস্রোতের নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের মধ্যে এই ভেজাল বাংলা উচ্চারণ বেশ আদর পায়। এটাকে কি মুম্বাই হ্যাংওভার বলা যায়!  জানি না। নচিকেতার স্বঘোষিত গুরু মদনমোহন যখন পঞ্জাবি গান গাইতেন তখন সেটা কিন্তু নিঁখুত পঞ্জাবি হতো। যদিও মদনমোহন বাল্যকাল থেকে দীর্ঘদিনের বিদেশপ্রবাসী পঞ্জাবি ছিলেন। 
----------------------------------------


শ্রোতা হিসেবে এত দীর্ঘদিন ধরে কোনও ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক, বৌধিক সীমারেখার কেয়ার না করে মন দিয়ে গান শুনে আসছি। সহস্র কেন লক্ষাধিক হবে হয়তো। এখন বুঝি গান নিয়ে বিতর্ক করাটা পণ্ডশ্রম। মন চায় না।  গান এখন একটা আশ্রয়শুধু অবসর বিনোদন নয়। এর মানে এই নয় যে আমি গান বেশি  বুঝতে শিখেছি, শুধু নিজের ভালো লাগা না লাগাটা সবিনয়ে জানানোর একটা নিমবিশ্বাস তৈরি হয়েছে কোথাও।
----------------------------------------


প্রসঙ্গ যখন উঠলো-ই, তখন একটু উল্লেখ থাক।
দুটি গান বেছে নিই। নচিকেতার জাগে জাগে রাত জাগে এবং সুমনের  সূর্যোদয়ের রাগে গান ধরে ভীমসেন যোশিএই দুটো গানেরই সুরের স্ট্রাকচার  এক, সুরও প্রায় এক, যন্ত্রানুষঙ্গও (সেই সরোদ আর কীবোর্ড)। যাঁরা দুটো গানই মন দিয়ে শুনেছেন (ব্যক্তিগতভাবে আমি একাসনে বসে অন্তত দশবার পর পর গান দুটি শুনেছি, পার্থক্যটুকু বুঝতে), তাঁরা যদি খুব দীক্ষিত শ্রোতাও না হন, তবু সুমন কোথায় জিতে যান সেটা বলার জন্য খুব পরিশ্রম করতে হয় না।
----------------------------------------


আমি আগেও এই ব্যাপারটি নিয়ে বলেছি এখানে। সুমন একটা মানচিত্র তৈরি করছেন এই গানে। ভোরসকালের সুরে যত রাগ রয়েছে, সবার মধ্যে বেশ কয়েকটি সমান্তরাল পর্দার ফ্রেজ রয়েছে। রাগের চরিত্র অনুযায়ী তারা শুধু জায়গা বদলায়, কিন্তু আমেজটা একই রকম থাকে। এই রকম একটা সুরকে কেন্দ্র করে তিনি তার একদিকে রাখছেন ভীমসেনকে অন্যদিকে রাগ জোগিয়া। তিনি শুধু ছুঁয়ে যাচ্ছেন মেরু দুটিকে। মনে হবে, ভীমসেনের বকলমে কোমল রেখাবের রূপ নিয়ে তিনি উতলা হয়ে পড়ছেন। কিন্তু খেলাটা অন্য জায়গায়। তিনি জানেন, শ্রোতা কোমল রেখাবের শাস্ত্রীয় বা অন্তর্লীন জাদু নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত নয়। তার জন্য জোগিয়ার হাত ধরে প্রবেশ করছেন তৃতীয় মেরু, নজরুল। এবার শ্রোতারা  বালিকাটির ফুল ছড়ানোর খেলায় অজান্তেই গানটির মানচিত্রের চারটি কোণ ভীমসেন, রাগ জোগিয়া, নজরুল আর সুমন, স্পর্শ করে ফেলছেন। একে কি ভুলিয়ে শটকে শিখিয়ে দেওয়া বলা যেতে পারে! যে কোনও কম্পোজারের এটাই চূড়ান্ত স্বপ্ন।
----------------------------------------


অপরপক্ষে নচিকেতা তাঁর গানটি শুরু করার সময় আরোহটি হামিং করেন। যন্ত্রীকে প্রিলিউড বাজাবার অবসর দেন এবং প্রথম তিনটি শব্দ সুরে বলেন। ইতোমধ্যে শ্রোতার প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে ভোরের সুরে নিজেকে ধুয়ে নেবে। সমস্ত  ভোরের রাগে মূলত কোমল বা অন্য রেখাবের যে জাদু শ্রোতাকে তৎক্ষণাৎ মুগ্ধ করে, যদি তার হাল হকিকৎ শ্রোতার জানা নাও থাকে, তবু সে এটুকু অনুভব করে, কুছ বাত বন রহি হ্যাঁয়। এই রকম একটা মোক্ষম সময়ে তিনি বলে ওঠেন  তাঁর আলাপ করার ইচ্ছে  জাগছে, শ্রোতারা কী অনুমতি দেবেন? তিনি যে সুরের  শাস্ত্রীয় তাৎপর্য সম্বন্ধে খুব উত্তম রূপে ওয়াকিফ, সেটা জানিয়ে দেন। সরগম,  পাল্টা, তানকারি গান তৈরির মশলা। সেটা পরিবেশনযোগ্য ভোজন নয়। নচিকেতা একটা শুদ্ধ বাংলা কাব্যসঙ্গীত শোনাতে গিয়ে তাঁর ছাত্রজীবনে মশলাবাটার  কুশলতার কথা শ্রোতার সঙ্গে বিনিময় করতে চান, কিছু অর্ধশিক্ষিত শ্রোতা বেশ হই হই করে স্বাগতও জানায়। কিন্তু গানটির অপমৃত্যু ঘটে।
----------------------------------------


কণ্ঠ বা গায়নের তৈয়ারি খুব জরুরি শর্ত, কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে গানটি শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছোলো। নচিকেতা মধ্য ও তার সপ্তকে বেশি স্বচ্ছন্দ, সেটা তাঁর প্রাথমিকভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষার সূত্রে এসেছে। কিন্তু লিরিকের কথা যদি একেবারে ছেড়েও দিই, তবু কণ্ঠসম্পদকে যথাযথ সংযম ও পরিণতমনস্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারার প্রশ্নে নচিকেতা সুমনের থেকে পিছিয়ে থাকেন।

সুমনের গলায় সুরের অনর্গলতা নিয়ে যদি সংশয় থাকে তবে বলি, তাঁর কণ্ঠ মূলত ব্যারিটোন। এই ধরনের কণ্ঠে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগরূপ ফুটিয়ে তুলতে যে মোচড় আনতে হয়, তা সর্বদা আসে না। উঁচু স্কেলে গেলে তীক্ষ্ণতা আসবে, কিন্তু মাধুর্যটা আসবে না। তাই সুমন সে প্রয়াস করেন না। তাঁর যেটা সম্পদ, মন্দ্র সপ্তকে কণ্ঠকে বশে রেখে খেলানোর কৌশল, সেটিকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করেন। নিজস্ব দুর্বলতাটি তিনি গায়নের এক্স ফ্যাক্টর হিসেবে প্রয়োগ করে ফেলতে অত্যন্ত দক্ষ। যেমনটি করতেন জর্জদা।
----------------------------------------


বিভিন্ন শাস্ত্রীয় গায়নপদ্ধতির স্কিলসেট দিয়ে বাংলা গান বিচার একটা অর্বাচীন লক্ষণ। যেমন অনেকে এখন রবিবাবুর গানকেও মূল রাগের সুরসংস্থান অনুযায়ী ভাগ করে গাইতে চান বা পৃথকভাবে তার বর্গীকর করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, গানটি হয়ে উঠছে কি না তা নিয়ে চিন্তা করা অথবা তার সুরের কাঠামো কোন রাগের আরোহ-অবরোহের সঙ্গে মিলছে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকা। রবিবাবুর পর বাংলা কাব্যগীতিতে লিরিকের সম্মান সুরের উপরে চলে গেছে। কিন্তু গান যেহেতু গাওয়া হয়, আবৃত্তি করা হয় না, তাই সুরের প্রতি তন্নিষ্ঠ না থাকলে শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি দাঁড়াবে না। এ একটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমিতিবোধ ও সংযমের খেলা। তাই বাংলা গানটির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি আমরা অপ্রয়োজনীয় ভাবে  নিকটতম একটি রাগের আরোহ-অবরোহের বিস্তার করতে থাকি তবে তা বিড়ম্বনার সূচনা করে। যদি আমাকে সেই রাগটিকে জড়িয়ে ধরতে হয়, তবে তার জন্য তো অঢেল মহীরূহদের জাগ্রত সৃষ্টিগুলি আমার শোনার অপেক্ষায় রয়েছে। নচিকেতা যখন শাস্ত্রীয় বা অন্তত উপ-শাস্ত্রীয় গান করবেন, তখন তিনি আলাপকারিতায় স্বাগত, কিন্তু কাব্যগীতির কাঠামোয় তার আতিশয্য অতিরিক্ত বোধ হয়। কবি বলছেন, যেন আমার গানের শেষে, থামতে পারি সমে এসে...।    এই সমে থামতে পারার ক্ষমতাই সব সৃষ্টির সাফল্যের প্রথম ও শেষ কথা। এটা নচিকেতা পারেন না, সুমন পারেন।
----------------------------------------


বাংলাগানে বড় মাপের শিল্পীদের আকালের দিনে নচিকেতার লোকপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। তাঁর সাঙ্গীতিক কৌশলের মধ্যে খামতি বাকিদের থেকে অনেক কম। তাই তাঁর কাছে শ্রোতার প্রত্যাশা বেশি। পরবর্তী প্রজন্মের শ্রোতাদের রুচি তৈরি করতে তাঁর দায়িত্বও তাই অন্যদের থেকে বেশি। কোনও জীবন্ত সংস্কৃতির জন্য সুরের স্রোত মানবশরীরে রক্তস্রোতের মতো জরুরি। তাই তার প্রতি সনিষ্ঠ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। গান শুধু জনমনোরঞ্জনের মাধ্যম নয়, তা মানুষের বৌদ্ধিক অস্তিত্বের  অঙ্গ। এখানেই সুমনের জিত, এখানেই নচিকেতা প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ম্লান হয়ে যান।
----------------------------------------


দিলীপকুমার রায়ের গান সম্বন্ধে বলা হয়, নিজস্ব গায়নভঙ্গিই তাঁর গানের প্রচারের প্রধান প্রতিবন্ধক বাংলাগানের যে সমস্ত কম্পোজার নিজেরা গান পরিবেশন করার চাইতে অন্য শিল্পীদের কণ্ঠে নিজস্ব সৃষ্টিকে রূপায়িত করতে চেয়েছেন, তাঁদের সঙ্গীত অনেক বেশি প্রচারিত হতে দেখা গেছে কারণ বিভিন্ন শিল্পীর বহুমুখী গায়নভঙ্গি, কণ্ঠসম্পদ পরিবেশনা একই গানকে নব নব রূপে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছে ফলতঃ সে সব গান এক প্রজন্মের সীমায় বাঁধা থেকে যায়নি দিলীপকুমার ছিলেন ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক গায়নে বিশ্বাসী তাঁর গান, তিনি ছাড়া আর কেউ তাঁর থেকে ভালোভাবে গাইতে পারবে না কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জন্য তাঁর যশোবৃদ্ধি হয়, কিন্তু কম্পোজার হিসেবে তিনি ফুরিয়ে যান

সুমনের গানের সঙ্গেও ভবিষ্যতে এই বিড়ম্বনাটি ঘটতে পারে তাঁর গান, নিজস্ব ছাত্রছাত্রী ছাড়াও ইদানিং অনেকে গাইবার প্রয়াস পাচ্ছেন কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাঁদের পরিবেশন থেকে সেই প্রতিশ্রুতি অমিল, যা সুমনের গানকে একটি প্রজন্মের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে ইতর শ্রোতা হিসেবে সুমনের কাছ থেকে আমরা বাংলাগানে যে আশ্রয় পেয়ে এসেছি, ভাবতেই পারি না তা কখনও অতীত হয়ে যেতে পারে

কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়
কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানা
কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়
প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা
কত বছর পাহাড় বাঁচে ভেঙ্গে যাবার আগে
কত বছর মানুষ বাঁচে পায়ে শেকল রে
কবার তুমি অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে
বলবে তুমি দেখছিলে না তেমন ভাল করে
কত হাজার বারের পর আকাশ দেখা যাবে
কতটা কান পাতলে তবে কান্না শোনা যাবে
কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে
বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে