পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

সোমবার, ২৩ মে, ২০১৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

কালিমাটি অনলাইন /


এই বিশ্বে প্রথম মানুষের জন্ম কতদিন আগে হয়েছিল, তার সন তারিখ সম্পর্কে নির্দিষ্ট ভাবে যদিও এখনও কেউ নিশ্চিত হতে পারেননি; কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, মানুষের বয়স হলো অনেক। যুগের মাপকাঠিতে তাকে এখন আর যুবক বা প্রৌঢ় বলা হয়তো ঠিক হবে না, বরং তাকে বৃদ্ধ বলাই যথাযথ। কিন্তু জীবনযাত্রার এই এতগুলো  বছর ও যুগ পেরিয়ে এসেও সে এখনও কেন জীবন সম্পর্কে নিঃসংশয় হতে পারল না, নিরাপদ থাকতে পারল না, এটা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। সেই আদিম গুহাযুগ থেকে থেকে বিবর্তিত হয়ে আজকের সাইবার যুগে প্রবেশ করেও তার বিপন্নতার অবসান হয়নি। প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে হানা দিচ্ছে অবাঞ্ছিত ভয় ও সন্ত্রাস। অথচ তার লড়াইয়ের ইতিহাসও সুদীর্ঘ। লড়াই করেই সে এতদিন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। প্রকৃতির সঙ্গে তার লড়াই চলছে সেই আদিম যুগ থেকেই। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যখন মানুষ মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার উত্থানের পাশাপাশি পতনও সুনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ আমাদের এই পোড়াদেশে এবং পোড়াপৃথিবীর সর্বত্র তথাকথিত ‘অমৃতের সন্তান’ নিজেদেরই ধ্বংস উৎসবে মেতে উঠেছে সোল্লাসে। মানুষের সভ্যতার এ এক আশ্চর্য ট্র্যাজেডি!

প্রসঙ্গত ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনের প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের কাছে আবার আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনারা আপনাদের লেখা পাঠিয়ে সহযোগিতা করুন। বিশেষত ‘কথনবিশ্ব’ বিভাগের জন্য লেখা পাঠাতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্পকলা, রাজনীতি, ইতিহাস – যে কোনো বিষয়ে আপনার যে মৌলিক চিন্তাভাবনা আপনার মনের মধ্যে ভিড় করে আছে, তা লিপিবদ্ধ করে পাঠিয়ে দিন আমাদের ব্লগজিনের জন্য। আর ‘ঝুরোগল্প’ বিভাগের জন্য যাঁরা লেখা পাঠাতে আগ্রহী, তাঁদের আবার জানাই, অণুগল্পের সঙ্গে ঝুরোগল্পকে গুলিয়ে ফেলবেন না।  ঝুরোগল্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই গল্প কখনই ‘ক্লোজ এন্ডেড’ নয় বরং ‘ওপেন এন্ডেড’। ঝুরোগল্প কোনো নির্দিষ্ট পরিণতিতে এসে শেষ হয় না। তার শব্দসংখ্যাও সীমাবদ্ধ রাখা জরুরি ৫০০ থেকে ৬০০ শব্দের মধ্যে। আশাকরি এই শর্ত মেনে আপনারা ঝুরোগল্প পাঠাবেন ‘কালিমাটি অনলাইন’এর জন্য।

সবাই ভালো থাকুন। আনন্দে থাকুন। 
    
     
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India

      

<<<< কথনবিশ্ব >>>>


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

বাঙালির সুশীল সমাজ




 ঠাক্‌মা বলতেন দাদু সত্যি বড় নয়, পেত্যয়ই বড়। আর যা দেখো সেটাই সব নয়, যা ঘটে সেটাই ঠিক। সারা জীবন, মানে এই কুল্যে পঁয়ষট্টি পেলাস বছরের ছোট্ট জীবনে, এই সুবচনীর প্রয়োগ করে বেড়িয়েছি আর জিতেছি। আজ লক্ষ্য বাঙালির পুরসমাজের প্রাবল্য নিয়ে সক্কলের পেত্যয়। তাঁদের বলতে ইচ্ছে করে যা দেখেন সেটাই সব নয়, যা ঘটে সেটাই ঠিকবাঙালি মন দিয়ে অমর্ত্য সেনের ‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’ পড়ে, সেখান থেকে তর্কপ্রিয় বাঙালির অনুসিদ্ধান্ত টানে; আর তার থেকেই আবার বাঙালির সমৃদ্ধ পুর-তথা-নাগরিক-সমাজের সিদ্ধান্ত করে নেয়। বাঙালি যা নেই তাই দেখে। আমরা এখানে বাঙালি জীবনে পুরসমাজের চঞ্চল উপস্থিতির  ইতিহাসটা একটু ঘেঁটে দেখি, নাস্তিতে অস্তির ভ্রম কাটাতে। তবে পুরসমাজের মানে অনেক, যদি আমরা গ্রীক ঐতিহ্যে অ্যারিস্টটেলীয় ‘politike koinonia’, বা পোলিসের থেকে আলাদা রাজনৈতিক জনসমাজ থেকে শুরু করে’ সিসেরো-র ‘societas civilis’, Physiocrat-দের ‘sociéte naturelle’এর বিরুদ্ধে স্থাপিত ‘sociéte politique’, অ্যাডাম ফার্গুসনের ‘polished society’ ইত্যাদি হয়ে, হেগেলের bügerliche Gesellschaft’, মার্ক্স, টকভিল ইত্যাদির সিভিল সোসাইটির ধারণা পার করে’, রবার্ট পুটনামের সোশ্যাল ক্যাপিটালের ধারণা, ট্যালকট পারসন্‌স (ঠিক উচ্চারণে প্যাসন্স)-এর ‘societal community’ পর্যন্ত পুরসমাজের আর্থিক (হেহে!) বিবর্তনকে খেয়াল রাখি। আসলে এই অর্থ-বিবর্তনের কারণ হলো পুরসমাজের ধারণাটি মোটামুটি তিন ধরনের বৈপরীত্য, তথা সংঘাত থেকে গড়ে উঠেছে। প্রথমটা হলো ‘commonwealth’  আর ‘state of nature’-এর বৈর বা সংঘাত যার ব্যাপারে তত্ত্বায়ন শুরু টমাস হব্‌স থেকে। দ্বিতীয়টা হলো পুরসমাজ আর রাষ্ট্রের, যাকে সমৃদ্ধ করেছে চরমপন্থা-বিরোধী দুটি ধারা। একটি লকীয় উদারনীতিতে প্রারব্ধ ও দৃঢ় প্রোথিত। আরেকটি মঁতেস্কু-র ক্ষমতার বিতরণ-বিভাজন-সমন্বয়ের — কেবল স্বতন্ত্রিকরণ নয়, যতই কিছু অনড্বান বলুন, কারণ মঁতেস্কু তাঁর De l'esprit des lois(The Spirit of Laws, 1748) বইতে যে শব্দগুলি ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো হচ্ছে তিনটি ‘pouvoir’ বা ক্ষমতার আর দুটি ‘puissance’ বাকর্তৃত্বের ‘combination’, ‘fusion’, ‘liaison’, এগুলোর মানে স্বতন্ত্রিকরণ করে কোন্‌ বুড়বাক! — ভিত্তিতে সীমিত সরকারের ধারণা। দ্বিতীয়টার মধ্যে নানা তত্ত্ব পাই লক-হেগেল-মার্ক্স-টকভিল থেকে অনেকের। তৃতীয় দ্বন্দ্ব তথা বৈপরীত্যটি হলো পুরসমাজ আর জনসমাজের মধ্যে আধুনিক সমাজতত্বের ঐতিহ্যে করা পার্থক্য। এখানে দুর্খেইম, হ্বেবর, পুটনাম, পার্সন্স ইত্যাদির নিত্য অধিষ্ঠান। আসলে বৈপরীত্যগুলির অধিক্রমণ সাঙ্ঘাতিক রকমের চড়া।


এদের মধ্যে বাঙালির পছন্দ হলো অ্যাডাম ফার্গুসনের ‘polished society’-কে সবচেয়ে বেশি। নইলে সুশীলসমাজ নামে এত আগ্রহ কেন? আগ্রহ হবে নাই বা কেন? ঔপনিবেশিক সমাজে ও জীবনে গণতান্ত্রিকতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে পশ্চিমী পুরসমাজের কিছু দেশি অপভ্রংশের জন্ম হয়েছিলওই যাদের সুদীপ্ত কবিরাজ বলেছিলেন “ungrammatical organizations” তথা অ-ব্যাকরণসিদ্ধ সংগঠন, তাদেরতারা সদস্য আহরণ করত কোনো জাতিগোষ্ঠী থেকে, অর্থাৎ ‘ascriptive’ এবং gemeinschaftliche’ মাপকাঠির ভিত্তিতে কিন্তু তার পর সার্বজনিক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ব্যবহার ও জননীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করত, যেমন কায়স্থসমাজ।  ঔপনিবেশিকরাষ্ট্র এদের বাইরে কিছু শুদ্ধীকৃত সংগঠন স্পন্সর করেছিলতাদের নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু তাদের ছাড়াও ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি কিছু বিদ্বজ্জনসভা এবং সাহিত্যিক(পুর)সমাজ বা literary society তৈরি করেছিলপার্থ চ্যাটার্জি তাঁরTexts of Power: Emerging Disciplines in Colonial Bengal(Calcutta: Samya, 1996, pp. 13-15) গ্রন্থে Society for the Acquisition of General Knowledge (1838 সালে, বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মসালে প্রতিষ্ঠিত) নামের এমন এক সমিতির কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ নিজে বঙ্কিমচন্দ্রের তিরোধান উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণসভায় কিছুটা না বুঝে, কিছুটা আবেগের আতিশয্যে, বঙ্গদেশে এই ধরনে সাহিত্যিক(পুর)সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অভাবের বিরুদ্ধে বলেছিলেন, যেটি তাঁর  ‘শোকসভা’ নামের প্রবন্ধে ছাপা হয়েছিল, যদিও তাঁর অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিদ্বজ্জনসমাগম, বেথুন সোসাইটি, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর তাঁর নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সারস্বত সমাজ, সাবিত্রী লাইব্রেরির অধীনে সাবিত্রীসভা, চৈতন্য লাইব্রেরি, বীডন স্কোয়ার লিটারারি ক্লাব ইত্যাদি সংগঠন তখনও সগৌরবে বিরাজমান। এমনকি তিনি নিজে ১৮৯৪ সালে যখন এই বক্তৃতা দিচ্ছেন তখন স্মরণসভার উদ্যোক্তা চৈতন্য লাইব্রেরি, আর সমাবেশস্থল বীডন স্কোয়ার লিটারারি ক্লাব

এই ধরনের পুরসামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালির আবেগ প্রথমদিন  থেকেই। এর পিছনে কি ফার্গুসনের প্রভাব আছে? হয়তো! লোকে বলে আধুনিক বা সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গে পুরসমাজের কথা বলার সময় সুশীলসমাজ কথাটির ব্যবহার বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের আর আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তো একই! ফার্গুসন তাঁর বইয়ে জীবনের ‘rude formsথেকে ‘polished’ অথবা ‘civilized societyঅবধি মানব প্রজাতির ‘natural history’-র বর্ণন করেছিলেন। ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালির কাছে এই প্রাকৃতিক ইতিহাস হয়তো টেলিস্কোপিত হয়েছিল প্রাক্-ঔপনিবেশিক কাল থেকে ঔপনিবেশিক কাল অবধি। নইলে রবীন্দ্রনাথ নিজে কেন ‘পাব্লিক’ শব্দটাকে ‘নামে’ ও পদার্থে উভয়তঃই নতুন দেখবেন! সে যাই হোক! বাঙালির সুশীলসমাজ ছিল প্রথম থেকেই বৃহত্তর সামাজিক অর্থে অপরিবেষ্টক, সীমিত। কিন্তু তাও কি থাকলো পরে?

অনেক পণ্ড করা, ‘এস্কলারলি’ (মানে পণ্ডিতি) লেখায় আমি দেখিয়েছি কীভাবে  ঔপনিবেশিক আমলের অপরিবেষ্টক পুরসমাজও স্বাধীনতার পর থেকে কেন্দ্রে নেহরুর আর রাজ্যে বিধান-রায়-অতুল্য ঘোষের দ্বৈরথের জেরে আসা ‘কম্যান্ড পলিটিক্সের’ চাপে নষ্ট, ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল১৯৭৭ সালের পর থেকে বামফ্রন্ট সরকারের নীতিমালাও তার বিকাশের অন্তরায় হয়েছিলএন.জি.ও. এমনকি তৃণমূল স্তরের কার্ষ সমবায় সমিতিগুলির প্রতিও বামফ্রন্ট তথা সিপিএমের বিরূপতা পুরসমাজের কোনো আঙ্গিককেই মাথা তুলতে দেয়নি তার ভূমিসংস্কার ভিত্তিক, পঞ্চায়েত-প্রধান আর ফ্রন্ট্যাল-সংগঠন-দমিত স্ট্রাটেজির বিরুদ্ধেএমনকি বাঙালির সুশীলসমাজকেও আবার মাথা তোলার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-রিজোয়ান-লালগড় ইত্যাদির সিপিএম ও বামফ্রন্ট সরকারের জারি করা পার্টি-সোসাইটির বিজড়িত আধিপত্যের বা ‘integral hegemony’ অবক্ষয় অবধি। কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে মাথা তোলা এই বাঙালির সুশীলসমাজ যাদের নিয়ে গড়া ছিল তা হলো স্টেজ-সিনেমার অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রশিল্পী-চিত্রকর, বাজারী-অবাজারী কবি-লেখক-সাহিত্যিক, গায়ক, নায়ক ইত্যাদিদের নিয়ে। কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছাড়া। দুর্খেইমের-টকভিলেপর থেকে যে পেশাদারীকরণ বা ‘professionalization’ পুরসমাজের মেরুদণ্ড তার অভাব এই সুশীলসমাজে প্রকট। ‘ট্র্যাডিশন্যাল ইন্টেলেকচুয়াল’ আর ‘অরগ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল’-দের পার্থক্য করার সময়েও সমাজের যে অংশগুলির এই ট্র্যাডিশন্যাল ইন্টেলেকচুয়ালদের গোষ্ঠিভুক্ত হওয়াকে ব্যঙ্গ করেছিলেন গ্রামশি, তাঁরাই সুশীলসমাজ আলো করলেন। তাও ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন বা ২০০৯-এর লোকসভার সময়েই তো এই নবজাগরূক সুশীলসমাজ ত্রিধাবিভক্ত বা ত্রিফলা হয়ে যায়! বুদ্ধিজীবী, বুদ্ধজীবী আর রেলজীবীতে। ২০১১-র বিধানসভার নির্বাচনে ‘পরিবর্তনের’ পর থেকেই তার কোওঅপ্টেশন বা গ্রাস পূর্ণ হয়ে যায়। ২০১১ থেকে সুশীলসমাজে বুদ্ধদেবের আমলে যদি ‘লিটারেটি’ সুশীলসমাজের অংশ হয়ে থাকে, তবে নববিধানে তার স্থান নেয় রাঙতা মোড়া টালিগঞ্জ-টেলিউডের ‘গ্লিটারেটিরা’ভূষণে-পুরস্কারে-সম্মাননায় সিঞ্চিত এই সুশীলসমাজ সরকারের ক্রোধোদ্রেক করতে পারে এমন কোনো বিষয়ে রা-কাড়া বন্ধ করে দেয়। কয়েকজন ছাড়া। অধুনা কারো কারো গলায় আবার স্বর ফিরে এসেছে। কিন্তু সুশীলসমাজের এক অংশের এই স্বরভঙ্গহ্রাস অন্যত্র বৃহত্তর–ভঙ্গকে সামাল দিতে পারছে 
কি?

কেন বলছি এই কথা? একটু বুঝিয়ে বলি। এই কিছুকাল আগে যে জে.এন.ইউ.-এর এক বাঁশিওয়ালার সঙ্গীত বন্ধ করতে রাষ্ট্র তেড়েফুঁড়ে নেমে পড়ল (এই ব্লগজিনে এই নিয়ে একটি লেখা দিয়েছিলাম, মনে আছে?) তার জেরে এই তো কমাস আগে  প্রেসিডেন্সিতে, সেটা আবার এখন আর কলেজ নয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়’, বিদ্যায়তনিক স্বাধিকার নিয়ে এক বিতর্ক সভার আয়োজনে জল ঢেলে দিলেন তার ভিসি। মনে আছে? কেমন সোনা মুখ করে’ মেনে নিয়েছে সেটা সুশীলসমাজের গরিষ্ঠ অংশ! দুহাতজোড়া পুরস্কারগ্রস্ত করতলের বন্ধন কাটাতে না পেরে তার যা অবস্থা! দেখলে  মাইকেল মশাই ‘সিওর বলতেন ‘স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে, / পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি / ধূলায়’? হে সুশীলসমাজ ‘কেমনে ভুলিলে জন্ম তব কোন মহাকুলে’?

অথচ এই ‘কলেজে’ই বঙ্কিমচন্দ্রের সমবয়সী Society for the Acquisition of General Knowledge-এর এক সভা চলছে তাঁর পাঁচ বছর বয়সে, ১৮৪৩ সালে। সেখানেThe Present State of the East India Company’s Criminal Judicature and Police’ নামক বিষয়ে আলোচনা চলছেএমন সময়ে হিন্দু কলেজের প্রথিতযশা অধ্যাপক D. L. Richardson আলোচনাক্রমে সরকারের সমালোচনায় অতিষ্ঠ হয়ে বলে উঠলেন ‘in a hall which the government had erected and in the heart of a city which was the focus of enlightenment’ সরকারকে এমন সমালোচনা করা হচ্ছে যে সেটি প্রতিভাত হচ্ছে as oppressors and robbers’আর কলেজ পরিণত হচ্ছে den of treason’-এ, আর তাই সরকার ‘must close the doors against all such meetingsতখন ওই হিন্দু কলেজেরই এক প্রাক্তনী, তারাচাঁদ চক্রবর্তী, যিনি এই সভার অধ্যক্ষতা করছেন, তিনি বলে উঠলেন, ‘I consider your conduct as an insult to the society... if you do not retract  what you have said and make due apology, we shall represent the matter to the Committee of the Hindu College, and if necessary to the Government itself. We have obtained the use of this public hall, by leave applied for and received from the committee, and not through your personal favor. You are only a visitor on this occasion, and possess no right to interrupt a member of this society in the utterance of his opinionsতিরস্কৃত রিচারড্‌সনও চুপ মেরে গেলেন! মাইরি বলচি!


লেখাপড়া জানেন এমন ভাব করা সব্বাই যেমন শুরু করেন, আমিও ঔপনিবেশিক ভারত দিয়ে শুরু করলাম। কিন্তু তা বলে সেখানেই শেষ করতে হলো? যে সুশীলসমাজকে পুরসমাজের একটি মাত্র সীমিত অংশ বলে’ শুরু করেছিলাম, সেটাও দেখতে হলো যে রাখতে পারিনি! একখানা তারাচাঁদ চক্কোত্তি নেই! এখনও সুশীলসমাজ আছে বহিরঙ্গে বই কি! কিন্তু তার নির্দল থেকে দলীয় হয়ে যাওয়া, দলীয় থেকে নির্দলীয় হয়ে যাওয়া, একদলীয় থেকে রাতারাতি অন্যদলীয় হয়ে যাওয়া, পুরস্কার পেলেই বচন বদল, আর এই সবের মধ্যে তার নির্লজ্জ, ডোন্ট-কেয়ারি জ্ঞানরত্নপনা দেখে মনে হয় কবি গৌরাঙ্গ ভৌমিক তাঁর এই কবিতার লাইনগুলি বোধহয় এদেরই উৎসর্গ করেছেন!


সংখ্যাটাকে ভেবে নাও / গৌরাঙ্গ ভৌমিক

সংখ্যাটাকে ভেবে নাও,
পঁয়ষট্টি কোটির মধ্যে আমরা পঞ্চান্নজন বিশিষ্ট অতিথি
এদেশে জন্মেছি শুধু এদেশেরই মানুষের মহাপুণ্যবলে।
ভাবতে ভালো লাগে,
আমাদের সমর্থনে জনসভা হয়, প্রদর্শনী এবং নাটক।
আমাদেরই জন্যে আজও কলে জল আসে, এখনও বিদ্যুৎ জ্বলে,
গাঁয়ে-গাঁয়ে রজনীগন্ধার চাষ হয়।
শিল্পের উদ্দেশে আমরা জয়ধ্বনি দিলে শিল্পসৃষ্টি তবেই সার্থক
এবং আমরা না থাকলে নাগরিক সম্বর্ধনা দিতে হবে বলে
‘স্বাগত’তোরণ বাঁধা কখনও হত না,
এবং আমরা না থাকলে ফুল দিয়ে ঘণ্ট রাধত বর্বর  মেয়েরা।

সংখ্যাটাকে ভেবে নাও,
দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে, মহামারী মন্বন্তরে, যখন অন্নের হাহাকার,
দ্রব্যমূল্য বর্ধমান, মানুষের মূল্য যাচ্ছে কমে
তখনও আমরাই আছি, প্রতিদিন রক্ষা করছি
এ দেশের ঐশ্বর্য সম্মান।

আছি বলে এখনও ভিখিরি এসে ভিক্ষে পায়,
ভালোবাসা, দয়ামায়া, প্রকৃত দুঃস্থের জন্য দুঃখবোধ—
এইসব মানবীয় গুণগুলি মানুষের মধ্যে বেঁচে আছে,
গুহার মুখের মতো বড় বড় হোটেলের দরজা খোলে, দরজা বন্ধ হয়।

সংখ্যাটাকে ভেবে নাও,
পঁয়ষট্টি কোটির মধ্যে আমরা পঞ্চান্নজন বিশিষ্ট অতিথি

এঁদের জন্যই কি সমর সেন বলেছিলেন, ‘চন্দ্রবিন্দু লাগে না’? আর নীরদ চৌধুরী দেখলে তাঁর প্রিয় শব্দটি বলতেন, দেশের ‘intellectual migraine’? কী বলেন স্যার!








বারীন ঘোষাল

বহে যাই বহেরাগোড়ায়




কম বয়স থেকেই পথ আমাকে ভীষণ টানে বন্ধুর মতো। তাই কখনো বিপথে পড়িনি। বিপদে পড়িনি। প্রথমে সাইকেলে তারপর ক্রমে নিজেদের দ্বিচক্রযানে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাবার রোমান্সের তুলনা নেই। আর গড়েছিলাম কৌরবদলবল মিলে নানাদিকে। চলে যেতাম বারিপদা হয়ে সিমলিপালের দিকে, কখনো বালেশ্বর হয়ে চাঁদিপুরে, কখনো লোধাশুলি পেরিয়ে ঝাড়গ্রাম। প্রতিবারই বহেরাগোড়া ক্রসিং পেরিয়ে যেতে হতো। বহেরাগোড়ায় এন এইচ ৩৩ থেকে ওড়িষ্যার দিকে সুবর্ণরেখার ব্রিজ পেরিয়ে গেছে বড়রাস্তা। প্রতিবার এখানে একটা ব্রেক নেবার জন্য ক্রসিং মোড়ের বিয়ার শপে বসে গলা ভিজিয়ে নিতাম। সেরকমই বিশ্রামে বসে একবার বহেরাগোড়ার মিঠু (পুরো নাম মনে পড়ছে না) নামের এক তরুণ কবির কথা উঠল যে বহেরাগোড়ায় লিটল ম্যাগাজিনের অভাবের কারণে জামশেদপুরে গিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ করেছিল কৌরবের প্রতি আগ্রহে, সে এখানেই থাকে, মনে পড়লআরে! এতবার যাই আসি, ভেতরে ঢুকে এই আধা শহরটা দেখা হয়ে ওঠেনি! ঠিক করলাম নেক্সট ট্রিপ এখানেই। জামশেদপুরে বাড়ি ফিরে প্রণবকে ধরলাম। প্রণবকুমার দে সারা জীবন হিমালয় থেকে নীলগিরি আর সমস্ত জঙ্গল চষে বেড়িয়েছে,  তার জানাশোনা বাংলো চারদিকে, বললাম ওখানে একটা ব্যবস্থা দেখ। তো সে ঠিক মোড়ের মাথায় ন্যাশনাল হাইওয়ে ইন্সপেকশন বাংলোটাই বুক করে ফেলল। ১৯৮৩ অক্টোবরের শেষে আমরা রওনা দিলাম। আমরা – আমি, কমল চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী সুশ্বেতা, দীপক চ্যাটার্জি (নাট্যকার), ধীরাজ জানা (নাট্য সমাচার পত্রিকার সম্পাদক), আর বাবু প্রণবকুমার দে, যে মাটিতে থাকলেও মাথাটা নন্দাদেবীতে থাকেমালপত্র নামিয়ে চা-এর উদ্দেশে শহরে ঢুকছি, মিঠুকে আগেভাগেই চিঠি দিয়ে রেখেছিলাম, দেখি সে আসছে। কী আনন্দ! মিঠুর কাছেই শুনেছিলাম তার মাস্টারমশাই জ্যোতির্ময় বাবুর কথা যিনি ছাত্রদের নিয়ে পড়ানো, নাট্যচর্চা, আর লাইব্রেরি গড়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। সেই মহাপুরুষকে প্রণাম করে আমাদের বহেরাগোড়া ভ্রমণ শুরু করা যাক।


চা আর পান খেয়ে হেলতে দুলতে আমরা জ্যোতির্ময় বাবুর বাড়িতে পৌঁছলাম। ভিতরে ঢুকে সবাই তাঁর লাইব্রেরি দেখে হাঁ হয়ে গেছি। আমাদের শহরে এতবড় লাইব্রেরি ছিল নাসেই ১৯৬৮ থেকে শুরু করে জামশেদপুরে এমন একটা লাইব্রেরির অভাবে যে কষ্টে ছিলাম! অথচ এখানে কোনো লিটল ম্যাগাজিন নেই। বাংলায়  পড়াশুনো হয়, কবিও নিশ্চয়ই হয়তাহলে এই প্রৌঢ় মাস্টারমশাই কোন্‌ আনন্দে তিল তিল করে লাইব্রেরি গড়ে তুললেন? তাও পাকা বাড়ি না। টিনের চাল, সিমেন্টের  মেঝে, রীতিমতো লোহার র‍্যাকে থরে থরে বই রাখা। ঘরে মৃদু আলো দিনের বেলাতেও। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, বাংলা আর ইংরিজি, হাজার হাজার বই।  উই আর ইঁদুরের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচিয়ে রাখা দশ বিশ বছর, শুধু একটা প্রাইভেট কালেকশন ছাত্রদের জন্য, কত ভালোবাসা থেকে এর অভিভাবনা! নিরহঙ্কারী জ্যোতির্ময়বাবুকে আমরা সবাই প্রণাম করলাম।

তিনি আমাদের ভেতর বাড়ির দাওয়ায় চেয়ার মাদুর পেতে বসিয়ে আলাপ করতে করতে চা খাওয়ালেন। ধীরে ধীরে বললেন তাঁর লাইব্রেরি করার স্বপ্নের কথাসুশ্বেতা গান জানে শুনে গাইতে বললেন। ভাগ্যিস আমি নাচ জানি সেকথা বলিনি। লাইব্রেরি দেখতে ব্যস্ত মিঠুর সাথে। সেদিন দুপুরে মাস্টারমশাইয়ের চাপে তাঁর বাড়িতেই আহার সারতে হলোবাইরে চটি খুলে ঢুকেছিলাম। কী ঠান্ডা ঘরের মেঝে! শেষে প্রণাম করে  রওনা দিলাম আমরা। শীত পড়ব পড়ব, ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগিয়ে আমরা বহেরাগোড়ায় মোটামুটি চক্কর দিলাম মিঠুর সাথে। হাঁটা শুরু করলাম ওড়িষা বর্ডারের দিকে। ক্রমে সুবর্ণরেখার ব্রিজ। এসেছি, গেছি। কখনো এখানে দাঁড়িয়ে চোখ মেলে  চেয়ে থাকিনি নদীটির অপার সৌন্দর্যের দিকে। দীর্ঘ তাকিয়ে থেকে চারিপাশ বিস্মৃত হলে ফুটে ওঠে সেই সৌন্দর্য। আমার তো ভালো লাগে নদীর চলে যাওয়া দেখতে।  ক’টা যে সিগারেট খেলাম, কী ভাবলাম, সন্ধে হয় হয়, মিঠু বলল - চলুন। ফিরে আসছি, পথে ডান হাতে দেখি একটা গেটলেখা – হাতীবাড়ী অভয়ারণ্য – ভুলভাল লেখা অবশ্য। ঠিক করলাম কাল সকালে আসব।

সন্ধেবেলায় বাংলোর হাতায় চেয়ার টেবিল পেতে আমরা গোল হয়ে বসলাম। হুইস্কি, হালকা খাবার এলো ধাবা থেকে। ধীরাজের একমাত্র গল্প উৎপল দত্তদীপকের গল্প  ইবসেন। দুজনে মুখোমুখি। সুশ্বেতা বড্ড ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গায় আর প্রণব তখন  সেতার শিখছে। দুজনে মুখোমুখি। দুজনেই মদ খায় না। কমল আমি আর মিঠু এক টেবিলে কবিতা। রাত গড়ায়। একসময় মিঠু উঠে বাড়ি ফিরল। সুশ্বেতা উঠে গিয়ে বিছানা পেতে এলোশুতে ডাকল সবাইকে। দীপক, ধীরাজ, কমল একে একে। আমার  গায়ে শাল দিয়ে গেল প্রণব। আলো নেই কবিতা পড়া বন্ধমদ তখনও। কমল সঙ্গে বউ এনেছে। আমাকে ফেলে গেল। আচ্ছা, ব্যাটা! আমি মন থেকে পড়ছি।  আমার না কমলের না স্বদেশ সেনের নাকি সুভাষ মুখার্জী বা জীবনানন্দ কি যায় আসে? কবিতা কবিতাই হয়। প্রণব বলে গেল – বারীনদা চলে এসো, ঠান্ডা লাগবে। হু কেয়ার্‌স! রাত প্রায় নিশুতি। হাইওয়ে থেকে আওয়াজ কমে আসছেএই সুন্দর  রাতে কবিতার ঘর বলে কিছু হতে পারে না। কবিতা তো পথে, কবিতা আকাশে। প্রণব এসে আমার খাতা কেড়ে আমাকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে বিছানায় ফেলল। আমি ছটফট করে প্রতিবাদ করছিলাম। সে সরে যেতে আমি রেগে মেগে একাই বেরিয়ে হাইওয়ের দিকে গিয়ে হাঁটতে থাকলাম সোজা। আমার কবিতার ভাষায় বাধা দেয় কোন মূর্খ? মুখ দিয়ে কবিতা বেরোচ্ছে তখন অনবরত ‘সাতটি তারার তিমির’ থেকে --- ‘সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়ো নাকো তুমি,/ বোলো নাকো কথা অই যুবকের সাথে ;/ ফিরে এসো সুরঞ্জনা :/ নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে ;’ --- আমার মনে সেই আগুনের উত্তাপ। ‘আমরা যাইনি মরে আজও – তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয় :/ মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে ;’ --- সত্যিই সেদিন কার্তিক মাস প্রায় শেষের মুখে - মহীনের ঘোড়া নয় ভারতীয় ট্রাকরা খাবি খাচ্ছে পথে প্রান্তরে - অন্ধকার পথে ট্রাকের আলোয় একজন কবিকে দেখা যাচ্ছে বিড়বিড় করতে করতে হেঁটে যেতে - যারা দেখল কী ভাবল কে জানে, তবে মন শান্ত হয়ে আসাতে পায়ে পায়ে ফিরে এলাম। বাংলোর বারান্দায় তখন ধীরাজ ক্যাসেট চালিয়ে রেখেছে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গানেরবিছানায় না গিয়ে আমি সেখানেই থামে হেলান দিয়ে বসে শুনতে থাকলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বারান্দায়সকালে উঠে সবাই আওয়াজ দিতে থাকলে আমি চুপচাপ শুনলাম


এর পর সবাই মিলে হাতির বাড়ি। কথা শুনে মনে হয়, প্রণব আর কমল জঙ্গল নিয়ে কত কিছু জানে! আমি কিছু জানি না বাবা। আমার না জানা বিস্ময়গুলো  অক্ষত থাক। আবারো নদীর ধার। হাতির দেখা নাই রে! এমনকি কোনো পটিচিহ্নও  চোখে পড়ল না। একটা গাছের ছায়ায় বসে সুশ্বেতা গান ধরল – মায়াবন বিহারিনী হরিণী – ফলে হরিণও উধাও হয়ে গেলএরপর যা যা দেখলাম, সেসব হাতিবাড়ি নামের অযোগ্য। ফিরে এলাম বাংলোয়, তারপর জামশেদপুর।

এহেন শূন্যস্থান থেকে এতদিনেও একটা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ পেলো না, এই প্রাকৃতিক পরিবেশে, জ্যোতির্ময়বাবুর পাঠাগার থাকা সত্বেও, কেন যে! সেখানকার  বাসিন্দা কবি বেবী সাউ চেষ্টা করেছিল অবশ্য, কিন্তু সফল হয়েছে কিনা জানা নেই। আমরা শহর গ্রাম গঞ্জ ঘুরে বেড়াতাম কবিসঙ্গ করার জন্য। এই ভ্রমণের কাল পর্যন্ত কেবল মিঠু ছাড়া আর কো্নো কবির সন্ধান ছিল না আমাদের কাছে। অগত্যা  নিজেরাই গুলজার করে ফিরি।

                                                

শিবাংশু দে

ঋত্বিকচরিত অথবা মিশন মুদ্রারাক্ষস




...Film is not made, film is built. আমি চিত্রপরিচালক নই, আমি চিত্রস্রষ্টা। চিত্র সৃষ্টি করে একজন - সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন চিত্র সৃষ্টি করে, তাঁরা (নিছক) চিত্রপরিচালক নন” (ঋত্বিক ঘটক)

তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন ব্যক্তি ঋত্বিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকলেও স্রষ্টা ঋত্বিক সেভাবে আগ্রহীদের উপযুক্ত মনস্কতা আকর্ষণ করেননি। ঋত্বিককে কেন্দ্র করে মনস্তত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব, চিত্রনির্মাণ ইত্যাদি নানা বিষয়ের উদ্দীপক চর্চা শুরু হয়েছে একটু ধীরে। কিন্তু অনিবার্য অভিঘাতগুলি দিনে দিনে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে মানুষের মনেএকজন প্রকৃত শিল্পী যথাসময়ে মানুষের মনোজগতের গভীরে পৌঁছে যান, এটাই শিল্পের নিয়ম। সময়ের মাত্রা শিল্পের সার্থকতার একটা প্রধান শর্ত। ঋত্বিক আবার তা সপ্রমাণ করলেন। 

সেকালে বিশাখদত্ত একটি অঙ্গুরীয় মুদ্রার প্রতীককে কেন্দ্রে রেখে তাঁর চিরায়ত নাটকটির মাধ্যমে আমাদের নাট্যশাস্ত্রের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছিলেন। মুদ্রাই মন্ত্রী না মন্ত্রীর মুদ্রা, রাক্ষস শেষ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেননি। প্রকৃত প্রস্তাবে শিল্পবিচারে মুদ্রার ছাপ থেকেই আমরা শিল্পীকে চেনার প্রয়াস পাই। ঋত্বিক ঘটকও কোনও ব্যতিক্রম ন'ন। তাঁরও কিছু প্রকট মুদ্রালক্ষণ রয়েছে। এটা সর্বজানিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর তাঁকে সেদেশের সরকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য। উড়োজাহাজে যাবার সময় তিনি আকাশ থেকে পদ্মানদী দেখে ভাববিহ্বল হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেন। সহযাত্রী সত্যজিৎ তাঁকে সম্বৃত করেন। কিন্তু সেদেশে পৌঁছে সেখানের তৎকালীন ভূমিগত বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে তিনি অচিরেই প্রথমে নিরাশ ও পরে মোহমুক্ত হবার প্রয়াস করেন। কিন্তু কখনও হতে পারেননি। তাঁর তক্ষশীলা ও মগধ পরস্পর ঘেঁটে গিয়েছিলচিরকালের মতো। তিনি কার মুদ্রা বহন করেন, শেষ পর্যন্ত ঠাহর করে উঠতে পারেননি। আমাদের জন্য সেটাই প্রাপ্তি। ট্রিলজি ছবিগুলি সম্বন্ধে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, যোগসূত্র এই তিনটার মধ্যে একই মাত্র। সেটা হচ্ছে দুই বাংলার মিলন। দুইডা বাংলারে আমি মিলাইতে চাইছি। দুইডারে আমি ভালোবাসি হেইডা কমু গিয়া মিঞা, এবং আমি আজীবন কইয়া যামু, যখন মৃত্যু পর্যন্ত আমি কইয়া যামু। আমি পরোয়াই (করিনা), আমার পয়সার পরোয়াই (নাই)। I can fight that out. ঋত্বিক ঘটক can do that out here and in Dhaka. আমারে কে মারব লাথি, মারুক গা যাক। বইয়া গ্যাছে গিয়া


এই ছবিগুলি তাঁর কীর্তির মাইলফলক, তারা কোনও না কোনও ভাবে ছিন্নমূল, মাতৃবিযুক্ত সন্তানের বিষাদবেদনায় ধূসর। যে দেশ তিনি ছেড়ে এসেছিলেন তাকে কখনই মৃণ্ময় ভেবে সান্ত্বনা পাননি, তা চিরকাল অত্যন্ত প্রকটভাবে তাঁর কাছে চিন্ম হয়ে থেকে গেছে। তাঁর দেশমাতৃকার সঙ্গে তাঁর নাড়ি সম্ভবত পঞ্চাশ বছর ধরেই  কেউ ছিন্ন করতে পারেনি। তিনি যতদূরে যেতে চেয়েছেন তত বেশি নাড়িতে টান লেগেছে এবং তিনি ব্যথাকাতর হয়ে পড়েছেন। তাঁর ব্যক্তিজীবন, শিল্পীজীবন, রাজনীতি, উৎকেন্দ্রিকতা, কেউই তাঁকে এই বেদনা থেকে মুক্ত করার উপযুক্ত শুশ্রূষা দিতে পারেনি।

আবার অন্যদিকও আছে। এই তিনটি ছবি নিয়ে নিছক আবেগের ঊর্ধে গিয়ে তাঁর বিশ্লেষণটিও প্রণিধানে রাখা প্রয়োজন।  

“...‘মেঘে ঢাকা তারা was complete my... in my subconcious affair. কোমল গান্ধার was a very concious affair. আমার এই মহিলার সঙ্গে বিবাহ  ব্যাপারটা তার সঙ্গে প্রচণ্ড ভাবে জড়িত। আর সুবর্ণরেখা is a very serious  work. ওখানে খাটতে হয়েছে, হ্যাঁ, মানসিকভাবে.... a work behind. দৈহিকভাবে খাটার ব্যাপার নয়, মানসিকভাবে প্রচণ্ড খাটতে হয়েছে এবং এটাকে আমাকে দাঁড় করাতে হয়েছে। কদ্দূর দাঁড়িয়েছে সে আমি জানিনা, কিন্তু মিঞা কথা হইত্যাছে, যে খাটছি আমি অথচ এ কথাও বারবার বলছেন, ...বাংলার ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি। আজও পারিনা। আর ঐ তিনটে ছবিতে(মেঘে ঢাকা তারা, কোমলগান্ধার, সুবর্ণরেখা) আমি ও-কথাই বলতে চেয়েছি। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও হয়ে গেলো একটা trilogy  

এই মুদ্রাদোষটি থেকে তিনি সচেতন বা অবচেতনে কখনও রেহাই পেতে চাননি। তাই আমৃত্যু সেটি তাঁর হৃদয়লগ্ন হয়ে থেকে গিয়েছিলএকজন শিল্পীর ক্ষেত্রে একে সীমাবদ্ধতার চিহ্ন হিসেবে গণ্য করা যায়। যদিও ঋত্বিক আজীবন দেশভাগের যন্ত্রণা  থেকে সৃজনশীলতার ক্যাথার্সিস খুঁজেছেন। সেটি সত্যজিৎও স্বীকার করেছিলেন।


...Film is not made, film is built. ঋত্বিক এই উক্তিটি ধার করেছিলেন  আইজেনস্টাইনের থেকে। তিনি যে সত্যজিতের মতো হলিউডি মডেলে বিশ্বাস করেন না এবং তাঁর রচনার সঙ্গে রুশ ক্ল্যাসিক ছবিগুলি মেলে তা স্বয়ং সত্যজিৎই বলে গেছেন, তাই তা জজেও মানে। তাঁর ছবি করার উৎস এবং অনুপ্রেরণা হিসেবে ঋত্বিক বলেছিলেন, ...আইজেনস্টাইন না-থাকলে আমরা কাজ-কম্মর ও শিখতাম না।  উনি আমাদের বাবা। আমাদের পিতা। তাঁর লেখা, তাঁর thesis এবং তাঁর ছবি -এগুলো ছোটবেলায় আমাদেরকে পাগল করেছিল। এবং তখন ওগুলো আসত না। বহু কষ্টে লুকিয়ে-লুকিয়ে নিয়ে আসা হতোএই আইজেনস্টাইন... সত্যজিৎ রায়কেও  আপনারা জিজ্ঞেস করতে পারেন,  he will admit, that, he is the father of  us. এর পরে তিনি নাম নিয়েছিলেন পুডোভকিন, কোজিনেৎসভ বা তারকোভস্কির। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর ভিতরের অ্যানার্কিস্ট মুগ্ধ হয়েছিল আরেকজনের প্রভাবে। অবাক হবার মতো কিছু নেই যদি তাঁর কাছে বুনুয়েল  শ্রেষ্ঠতার শিরোপা দখল করে নেন। যে স্ফুর্তির সঙ্গে তিনি বুনুয়েলের শিল্পকে বরণ করে নিয়েছিলেন, তাঁর থেকে এর জুড়ি আমরা আর পাইনি।

আমার মতে বর্তমান চিত্র-পরিচালকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন লুইস বুনুয়েল। তাঁর  চার-পাঁচটি ছবি আমি দেখেছি। ছবিগুলি আমাকে একেবারে পাগল করে দিয়েছে। বুনুয়েল-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিশৃঙ্খলা এবং তার মধ্যে দিয়ে আমাদের একটা ছন্দে পৌঁছে দেওয়া। তিনি আমাদের মতো সাধারণ পরিচালকদের ভঙ্গিতে গুছিয়ে শট তোলেন না বা গুছিয়ে গল্প সাজান না। মনে হবে যেন তিনি পরম অবহেলায় ছবি তুলেছেন অথচ প্রায়শ এক-একটি মারাত্মক মুহূর্তে তিনি আমাদের নিয়ে যান যা  রীতিমতো স্তম্ভিত করে দেয়। ...ওঁর থেকে বড় ছবির শিল্পী আমার মতে কেউ নেই বর্তমানে”

স্ববিরোধের অন্য নাম ঋত্বিক। হয়তো সেটা বিরোধিতাই নয়। দ্বান্দ্বিকতা ও ভারতীয় ঐতিহ্যমুখী ব্যক্তিমানসের বিবর্তনে ইতিহাস, ঐতিহ্য বা মিথস্ক্রিয়ার ভূমিকা, ব্যক্তি তথা সমষ্টির সৃজনশীলতার প্রক্রিয়ায় তার প্রতিফলন এবং এ প্রসঙ্গে ইয়ুং সাহেবের তত্ত্ব অনায়াসে মিলেমিশে গেছে। তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করছেন, ...ইয়ুং-এর সঙ্গে মার্ক্স-এর কোনো বিরোধ নেই, দু'জনে দুই জগৎ নিয়ে কারবার করেছেন। দুটো  প্রচণ্ডভাবে পরিপূরক। আমার ছবিতে ইয়ুং-এর যে-ব্যাপারটা প্রচণ্ডভাবে আসে, সেটা হলো ঐ mother complex. আমাকে আমার এক বন্ধু বলেছিল, তোকে মায়ে খেয়েছে। আমার সব ছবিতে ঐ মা এসে পড়ে - তা মায়ে খেয়েছে কেন? এই যুক্তি তক্কো গপ্প’ ছবির entire ছৌ নাচটার raison d'etre হচ্ছে মা -  mother complex.  এখানে ঐ মেয়েটাকে, শাঁওলিকে তার সঙ্গে equate করো, জ্ঞানেশ বলছে নাচো, তোমরা নাচো, তোমরা না নাচলে কিছু হবে না। এটা সম্পূর্ণ Jungian, তিতাস- ছেলেটা স্বপ্ন দেখে মা-কে ভগবতী রূপে, এই mother complex একটা basic point.  উত্তর আধুনিক পরিপ্রেক্ষিত ও ভারতীয় শিল্পবোধের নিরিখে এই উক্তির ব্যাখ্যা আজকের গুণগ্রাহীর বিচারে অনেক সহজবোধ্য হয়ে গেছে।  তিনি বহুবার ওয়াজেদ আলি সাহেবের ট্র্যাডিশন বিষয়ক অতি পরিচিত পরিভাষাটি উল্লেখ করেছেন তাঁর আলাপচারিতায়। বছর পঞ্চাশেক আগে যা নিশ্চিতভাবেই স্ববিরোধের সূচক ছিল, কিন্তু  আজ স্বপ্রতিষ্ঠ।


আইজেনস্টাইন বা বুনুয়েল, অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি যাকেই গ্রহণ করুন না কেন, আবেগপ্রবণতাপিছুটান তাঁকে সতত আচ্ছন্ন করে রাখতো। বস্তুত তাঁর রচনার  বিরুদ্ধে আমাদের যে প্রধান অভিযোগ, সেটাও তো তাই। আবেগের বশে মেলোড্রামার আধিক্য। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজে কী বলেন একবার দেখে নেওয়া যাক।

...আসলে ছবি করার সময় অন্য কোনো শক্তি ঢোকে। তার প্রথমে থাকে আবেগ,  আবেগই চালিত করে। সমস্ত ব্যাপারটা আবেগ থেকে আসে। যার আছে, তার আছে, যার নেই, তার নেই। এ হলো ভেতর থেকে উৎসারিত। যে কোনো শিল্পকর্ম সম্পর্কে  এ কথা খাটে। লোকে গ্রহণ করুক অথবা না করুক। যে-দিন থেকে দর্শকরা screen ছিঁড়ে দিল, সেদিন থেকে চুল পাকতে শুরু হলো”।
 
অতএব ঋত্বিক সচেতনভাবেই আবেগকে চালিকা শক্তি হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছেন। আমরা যারা সিনেমার মূল্যায়ণে য়ুরোপীয় নন্দনতত্ত্বের ধ্যানধারণার প্রতি অধিক বিশ্বস্ত, তাদের মন্ত্র, আবেগ ভৃত্য হিসেবে উত্তম হলেও প্রভু হিসেবে তার ভূমিকা নৈব নৈব চ। আবেগের বন্ধহীন প্রকাশ মানে মেলোড্রামার স্থূলতাপরিভাষা হিসেবে মেলোড্রামা শব্দটির মূল নিশ শতকের ফরাসি গীতিনাট্য, মূলত অপেরার  পরিবেশনার সঙ্গে জড়িত। যেহেতু প্রসেনিয়াম থিয়েটার বা ছায়াছবি দুইই আমাদের ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, তাই এই শব্দটিকে আমরা অতিনাটকের আখ্যা দিতে ব্যবহার করি। এই অতি নাটকের উপাদান কী কী হতে পারে?

১. সমাপতনের ঘনঘটার প্রতি অধিক নির্ভরতা।
২. যে কোনো মানুষী সংবেদ প্রকাশ করার সময় মন্দ্রসপ্তকের প্রতি ভরসা না রেখে  তারসপ্তকের প্রতি অধিক বিশ্বস্ত হয়ে পড়া।
৩. নীতিকথা প্রতিষ্ঠা করার অদম্য উৎসাহে পরিবেশনার সূক্ষ্মতর দিকগুলির প্রতি উদাসীন থাকা।
এই লক্ষণগুলি পরিহার করার প্রতি অতিরিক্ত মনোনিবেশ করার প্রয়োজনীয়তা আমরা পশ্চিম থেকে শিখেছি। যেহেতু সিনেমা একটি সম্পূর্ণ পশ্চিমী মাধ্যম, তাই দীর্ঘদিন আমরা বিশ্বাস করেছি যে পশ্চিমের তৈরি করা (বিশেষত হলিউডের) ভালো সিনেমার মডেলটিই আমাদের অনুসরন করা উচিৎ। ঋত্বিক এই মডেলটির প্রামাণ্যতা  অনেকাংশেই স্বীকার করেননি, তাই মারি সিটনকে তিনি  প্রভাবিত করতে পারেন না।


একটা কথা ঋত্বিক বারবার বলতেনContent প্রথমে আসে। রবীন্দ্রনাথ একটা কথা বলে গিয়েছিলেন যে আগে সত্যনিষ্ঠ হতে হয়, তার পর সৌন্দর্যনিষ্ঠ। কথাগুলোর মানে আপনারা ভালোভাবে বুঝে দেখবেন। Form-টা কিছু না, ওটা আকার মাত্রএই শর্তটির অনুপালন সবচেয়ে অধিক নিষ্ঠায় করা হয় এপিক শিল্পে। এপিক শব্দটি  ঋত্বিকের লেখায় বহুবার এসেছে। আমাদের দেশে যাবতীয় সৃজনশীল সৃষ্টির মূল উৎস দুটি। রামায়ণ ও মহাভারত। মেলোড্রামা নামক শব্দটি সৃষ্টি হবার বহু হাজার বছর  আগেই আমাদের শিল্প ও নন্দনশাস্ত্রে এই তথাকথিত মেলোড্রামার লক্ষণগুলি খুবই প্রকট। যে কোনও এপিক শিল্পে আমরা এই অতিবাদের প্রতি নির্ভরতা অতি  প্রকটভাবে পাই। এই অতিবাদের লক্ষণগুলি উপরে লিখেছি। সত্যনিষ্ঠাকে সবার উপরে  স্থান দিতে গেলে যাবতীয় শিল্পনির্মাণের ভিত্তি হবে নৈতিকতার দৃঢ় মাটি। শিল্পকে লোকশিক্ষের প্রধান বাহন করতেই এপিকের প্রয়োজন সব চেয়ে বেশি অনুভূত হয়।  তাই স্বাভাবিক ভাবেই য়ুরোপে গ্রিকযুগ থেকে রনেশাঁস যুগের শেষ পর্যন্ত এবং আমাদের দেশে পুরাণযুগ থেকে ইংরেজ আসা পর্যন্ত, যে কোনও শিল্প সৃষ্টির অন্তসলিল উদ্দেশ্য ছিল, রামকৃষ্ণ পরমহংসের ভাষায় লোকশিক্ষেশুধু শিল্প সৃষ্টির জন্যেই শিল্প  সৃষ্টি এই ধারণাটিকে আমাদের দেশে কখনও মূলস্রোতে আসতে দেওয়া হয়নি। Art for art's sake আমাদের দেশে চিরকালই অজানা ব্যাপার। যে কোনও শিল্পপ্রচেষ্টার প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য থেকেছে বৃহত্তর মানবসমাজের কাছে কোনও কল্যাণকর বার্তা পৌঁছে দেওয়া। এ জন্যই আমাদের দেশে ব্যক্তির জীবনে সমষ্টির ভূমিকা এতো প্রকট। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ নামক ধারণাটি আমাদের কাছে স্বার্থপর অসামাজিকতার নামান্তর ছিলঋত্বিকের পূর্ববঙ্গীয় শিকড় ও বামপন্থার জল তাঁকে এপিক ভারতীয়ত্ব, অর্থাৎ ব্যক্তিমানসের রূপায়ণে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মিথস্ক্রিয়ার অমোঘ ভূমিকার প্রতি চিরকাল বিশ্বস্ত রেখেছে। ভারতশিল্পের মূল্যায়ণফ্রয়েড সাহেবের  সরলরৈখিক, ব্যক্তিভিত্তিক, একমুখী বিশ্লেষণ থেকে করা সমীচীন নয়। তাই ইয়ুংসাহেবের ব্যাখ্যা আমাদের এপিক মূল্যবোধের অনেক কাছাকাছি এবং ঋত্বিকের কাজে আমরা এর পরিচয় পাই। শুধু চরিত্র রূপায়ণের ক্ষেত্রেই নয়, যাবতীয় অন্যতর ট্রিটমেন্টের ক্ষেত্রেও ঋত্বিক হয়তো য়ুরোপীয় ও মার্কিন মানদন্ডে অতিরিক্ত উচ্চকিত ছিলেন। যদিও সত্যজিৎ এই সব মানদন্ডের প্রতি চিরকাল বিশ্বস্ত রয়ে গিয়েছিলেন। অপুর সংসার শেষ করার সময়  তিনি বিভূতিভূষণের ভারতীয় পাঁচালির মতে সমে ফিরে আসার প্রক্রিয়াটিকে গ্রহণ  করেননি। তাকে য়ুরোপীয় যুক্তিপরম্পরায় সরলরেখায় অগ্রসর পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন। এই নিয়ে ঋত্বিক তো আপত্তি করবেনই।

আইজেনস্টাইনের শিষ্য হিসেবে ঋত্বিক alienation from the narratives-এ আস্থা রাখেন। তাঁর নীতিবোধ, যা কেতাবি শিল্পবোধের থেকে অনেক প্রখর, সেখানে তিনি আপোসে বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতে, আমি শিল্পী হিসেবে involvement'এ বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি যে চারপাশের মানুষের জীবনের সাথে নাড়ির যোগ রেখে ছবি করতে হয়। তা না-হলে ছবি করার কোন মানে হয় না... তাই আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিল্পীর কর্তব্য এবং প্রয়োজন এই involvementসেই সাথে audienceকে  alienate করব ...আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো it is not an  imaginary story, বা আমি আপনাকে স্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে  আপনাকে hammer করে বোঝাবো যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই thesis-টা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর জন্যই আমি আপনাকে alienate করব প্রতি মুহূর্তে


যখন শিল্পী বলছেন যে তিনি দর্শককে ধাক্কা দিতে চাইছেন বা hammer করতে  চাইছেন, তার মানে তিনি তাদের আখ্যানের আরামদায়ী গৃহকোণ থেকে বার করে রোদজলবৃষ্টিঝড়ের নিষ্ঠুর নিসর্গের মধ্যে ফেলে দিতে চাইছেন। তিনি এটা বোঝাতে চাইছেন এই বিপর্যয় বা বিড়ম্বনা একটি গল্পের চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এ তোমার পাপ, এ আমার পাপ। তুমি হল থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেকে এই দায়িত্ব থেকে মুক্ত করতে পারো না। আমাদের দেশের যে নীতিশাস্ত্র, সেখানে এই তাড়নাটিকে শাশ্বত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এমন কি এক জীবনে এই পাপ থেকে মুক্ত হতে না পারলে পরজন্মে তোমাকে এটা বহন করে বেড়াতে হবে। অঙ্ক মেলাবার জন্য  ‘পরজন্ম বা জন্মান্তর নামক এক্স ফ্যাক্টরকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই  পাপ আসলে কী? একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে তুমি যখন এক জন্মে তোমার প্রতি সমাজ-সংসারের  প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছো না, তখন তোমাকে আরও জন্ম নিতে হবে এই প্রত্যাশা পূরণের জন্য। বুদ্ধজাতকের গল্পের কথা ভাবুন, পরে যেটাকে সনাতন ধর্মেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে গীতা, ভাগবতে। সেখানে আমরা দেখি সমাপতনের কী চূড়ান্ত ঘনঘটা। কেউ যদি অন্যায় ভাবে একটি মৃগবধ করে তবে পরজন্মে তাকে মৃগ হয়ে জন্মগ্রহণ করে নিহত হতে হবে। এই চক্রবৎ পরিবর্তন্তে বা  সেই বিমল মিত্রের উপমায় যমুনাকি তীর বার বার ফিরে ফিরে আসবে এটাই  ভারতীয় নীতিশাস্ত্রের ঐতিহ্য। ভারতীয় নন্দনশাস্ত্র তৈরিই হয়েছিল এই নীতিশাস্ত্রকে ধাক্কা মেরে বা hammer করে মানুষের মনে স্থাপন করার জন্য। এই ধাক্কা মেরে ইম্প্যাক্ট তৈরি করাই তো মেলোড্রামার উদ্দেশ্য, যা আমরা বারম্বার বিভিন্ন এপিকের মধ্যে পাইঋত্বিক তো সেই কাজই করেছেন। ব্যক্তির ক্ষয়রোগ ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা সমগ্র সমাজের ক্ষয়রোগের অংশ। দর্শকও তার থেকে অব্যাহতি পাবে না। নীতিশাস্ত্র তো এই কথাই বলে। এই রোগের জীবাণু দ্যাবাপৃথিবীতে একভাবে প্রভাবী হয়ে রয়েছে

তাঁর সঙ্গে ছবি করার ক্র্যাফট বা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তিনি বলেনপদ্ধতি-টদ্ধতি বুঝি না মশাই, আমার কাছে আজও প্রমথেশ বড়ুয়া ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ  চিত্রপরিচালক এই উক্তির যাথার্থ্য প্রমাণ করতে তিনি অবশ্যই অনেক উদাহরণ দেবেন। এই জায়গাটিতেই ঋত্বিক তাঁর সমকালীন আরেক প্রত্যক্ষভাবে চিহ্নিত রাজনীতি সচেতন স্রষ্টার থেকে আলাদা হয়ে যান। মৃণাল সেন কখনও এভাবে তাঁর  মুগ্ধতা জানানোর প্রয়াস করবেন না।

শিল্প ও রাজনীতির, পড়ুন সমাজতন্ত্রের, পারস্পরিক টানাপড়েন বিষয়ে তাঁর মতামত চিরকালই পি সি জোশির লাইন মেনে চলেছে। তাই নির্দ্বিধায় তিনি বলে ফেলেন, রাজনীতি সম্পর্কিত হওয়া মানে, শিল্পী-টিল্পি নয়, যে-কোনো মানুষকে এই সমাজে,   এই শ্রেণীসমাজে, রাজনীতি সম্বন্ধে সম্পৃক্ত হয়ে থাকতে হয়। এটা শিল্পী শুধু নয়, সব্বায়েরই হওয়া উচিত। তবে তাই বলে slogan mongering শিল্পীর কাজ নয়। এই cheap slogan দিয়ে শিল্পী হয় না, শিল্পীকে কাজ করতে হয় মানুষের গভীরে। রাজনীতিকরা কাজ করে ওপরতলায় - মানে চেঁচামেচি, হট্টগোল, cheap slogan, একটা short slogan, এই সব। শিল্পী এইগুলো করলে, আমি মনে করি, সেটা শিল্প আর থাকে না 



ইশকুলের পড়ার বইয়ে আমাদের শেখানো হয়, মানুষ সামাজিক প্রাণী। এই সমাজটা  যে প্রকৃতপক্ষে কী, সে বিষয়ে কিন্তু বিশদ কিছু ব্যাখ্যা সে পর্যায়ে অধরাই থেকে যায়। এই তোতাপর্বের সীমানা পেরোলেই মানুষ অনুভব করতে শুরু করে তার রাজনৈতিক অস্তির নিয়ত রক্তক্ষরণের বেদনা। একজন বিবেকী মানুষ কোনোভাবেই তখন আমি পলিটিকস করি না গোছের শান্তিকল্যাণে আশ্রয় নিতে পারে না। সাধারণ মানুষই যা পারে না, শিল্পী কী করে পারবে? তার অনুভূতি, সংবেদনা, বিস্ময়বোধ অনেক বেশি প্রখর। স্বাভাবিকভাবেই স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান না থাকলে সে অসহায়। এমনিতেই সে সৃষ্টিশীলতার দোলাচলে পর্যুদস্ত, তার উপর যদি বাস্তব মাটির খুঁটিটাও নড়বড়ে হয়ে যায়, তবে তো সূর্যাস্তের অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কোনো গতি নেই। সঠিকভাবে পারিপার্শ্বিক ও সমাজ-সংসারের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে  পারলেই শিল্পী তার টার্গেট গ্রাহক সঙ্ঘটিকে খুঁজে নিতে পারে। ঋত্বিকের সৃজনশীলতার শিকড় তাঁর সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে ছিলএই সময়ের ধর্ম ও তাঁর শিল্পের চরিত্রকে ব্যাখ্যা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, এখন আমরা কীসের মধ্যে দিয়ে pass করছি? Neo-colonialism, absolutely neo-colonialism. এটা আমি ছবিতে বলিনি। এ কথাগুলো বলতে গেলে আমার ছবি রাজনীতি হয়ে দাঁড়াত, ছবি হতো না। আমি in human terms  ব্যাপারটা ছবিতে বলার চেষ্টা  করেছি তিতাস করার সময় তাই তাঁর কাছে অদ্বৈত মল্লবর্মণকে অধিক গ্রহণীয়  মনে হয়েছিলো যদিও প্রথম থেকেই তাঁর মনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনার ভিত্তিতে ছবি করার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রখরভাবে। কিন্তু মানিক'কে তাঁর খুবতীক্ষ্ণ মনে হতো। সেলুলয়েডে ধরার পক্ষে বড্ডো জটিল।

শিল্পীদের সময়ের প্রহরী বলা হয়। তাঁরা ভবিষ্যত সময়ের রূপরেখা বহু আগেই অনুভব করতে পারেন। শিল্পীর ইনসটিংক্ট তাঁকে নিজের সময়ের আগে এগিয়ে দেয়। ঋত্বিকের অনুভবে বেশ কয়েক দশক আগেই তাঁর স্বদেশভূমির রাজনৈতিক অবস্থার ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের চমকে দেয়। অবহেলিত, বহুনিন্দিত এই ধীমান মাতাল এবং পাগল যে কথাগুলি বলে গিয়েছেন, যেন ডেলফির দৈববাণীর মতো তা আজ  আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
...এখন আমার নিজের ধারণা দুটো রাস্তা পরিষ্কার - হয় straight Fascism,  আর নইলে Leninist পথে কোনো কিছু। তোমরা যদি ১৯২৯ থেকে ৩৩ সালের জার্মানির  দিকে তাকিয়ে দেখো তো দেখবে যে, এই যে এখানে ১৫-১৬ বছর থেকে ২০-২৫ বছরের ছেলেরা বাঁদরামি করে বেড়াচ্ছে, এটা যেন তারই প্রতিরূপ। এরাই SS, এরাই Gestapo এই lumpen-দের থেকেই তৈরি হচ্ছে ভীষণভাবে। গোটা সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে চুরমার হয়ে - দুটো পথ খোলা - হয় Leninist পদ্ধতিতে নিয়ে যাবার একটা ব্যাপার আছে, নইলে clean Fascism হবে। এবং আমার ধারণা within 3, 4 or 5 years এটা হবে - হয় এদিকে, নয় ও-দিকে। এ চলতে পারে না। ছবিতে এ বলার অবকাশ নেই, কেননা আমি জানি এ দেশে leadership বলে কোনো পদার্থ নেই

শেষ দৃশ্যে ক্যামেরা আর কীই বা করতে পারে...? প্যান করে পৃথিবী থেকে আকাশের দিকে চলে যায়। জানা নেই, সেখানেও কোনও দাঁড়াবার জায়গা বাকি আছে কি না!