পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

শনিবার, ২৫ জুন, ২০১৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>


কালিমাটি অনলাইন / ৩৬ 




একে একে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন আমাদের প্রিয়জন ও আত্মজনেরা। একটু একটু করে খালি হয়ে যাচ্ছে সাহিত্য-কলা-সংস্কৃতির আঙিনা। ক্রমশই শূন্য হয়ে যাচ্ছে আমাদের ভাব-ভাবনা-ভালোবাসার ঠেক ও ঠিকানা। আমরা নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছি প্রতিদিন।

সমীরদা। সাহিত্যিক সমীর রায়চৌধুরী দিন কয়েক আগে এভাবেই আমাদের একা ফেলে রেখে অনেক অনেক দূরে চলে গেলেন। আর কোনোদিন দেখা হবে না তাঁর সঙ্গে। আর কোনো কথাও হবে না। নতুন নতুন লেখায় সমৃদ্ধ ও ধনী হবে না বাংলাসাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্য। তাঁর সম্পাদনায় আর প্রকাশিত হবে না ‘হাওয়া ৪৯’।

প্রয়াণের দিন কয়েক আগেও সমীরদার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল দূরভাষে। আমি তখন ছিলাম ব্যাঙ্গালোরে। ‘কালিমাটি অনলাইন’এ প্রকাশিত ঝুরোগল্পের প্রথম সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ‘সৃষ্টিসুখ’ প্রকাশনা থেকে ২০১৫ কলকাতা বইমেলায় সমীরদার লেখা ভূমিকা সেই সংকলনের সম্পদ। এছাড়া তাঁর লেখা ১০টি ঝুরোগল্পও ছিল।  আগামী ২০১৭ বইমেলায় ঝুরোগল্প দ্বিতীয় সংকলন প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। সমীরদা্র তখনও পর্যন্ত না-লেখা আরও ১০টি ঝুরোগল্প সংকলিত হবার কথা ছিল এই  সংকলনে। আর সেই ঝুরোগল্প সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল আমাদের। না, আর কোনোদিনই সেই ঝুরোগল্পগুলো জন্মলাভ করবে না, যা তাঁর মনের গভীরে ভ্রূণাকারে ছিল। আরও আলোচনা হয়েছিল সমীরদার সঙ্গে মুদ্রিত ‘কালিমাটি’ পত্রিকা ১০৩ সংখ্যার বিষয়ে। এই সংখ্যার বিষয় অতিপ্রাকৃত। সমীরদা একটি ব্যক্তিগত গদ্য লেখার জন্য যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা সম্পূর্ণ করে ফেলেছিলেন। আমাদের ‘দুর্ভাগ্য’, অতিপ্রাকৃত বিষয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনার আর কোনোদিন নাগাল পাওয়া যাবে না। এছাড়া সমীরদার নতুন এক সৃষ্টি-পরিকল্পনা থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম আমরা। সমীরদা ও  আমার মস্তিষ্কপ্রসূত বাংলা গদ্যসাহিত্যের নতুন আঙ্গিক ও ভাবনার ফসল ঝুরোগল্পের সূচনার পর আমি কিছুদিন হলো লেখা শুরু করেছিলাম বাংলা কবিতাসাহিত্যের নতুন আঙ্গিক ও ভাবনায় ঝুরোকবিতা। এখনও পর্যন্ত আর কোনো কবির ঝুরোকবিতা কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কিনা, আমার জানা নেই। সমীরদা ও ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার সম্পাদক আমাকে অনুরোধ করলেন, আগামী শারদ সংখ্যার জন্য ১০টি ঝুরোকবিতা পাঠাতে। সেইসঙ্গে সমীরদা জানালেন, তিনিও পত্রিকার জন্য ১০টি ঝুরোকবিতা লিখবেন। না, লেখা আর হলো না। সমীরদার বড় তাড়া ছিল চলে যাবার। ঝুরোকবিতা আর তাই লেখা হলো না সময়ের নিতান্ত স্বল্পতায়। সমীরদা  যখন ভীষণ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, আমাদের একান্ত আপনজন বেলাবৌদি, যাঁর স্নেহ ও ভালোবাসায় স্নিগ্ধ ও আপ্লুত হয়েছি, সেই বেলাবৌদি জানালেন, সমীরদা বারবার বলেছিলেন, কাজলকে লেখা পাঠাতে হবে, আমাকে লিখতে হবে। বৌদি সমীরদাকে বলেছিলেন, তুমি তো কলম ধরে লিখতে পারবে না, তুমি বরং মুখে মুখে বলে যাও, আমি লিখে নিচ্ছি। না, সেটাও সম্ভব হয়নি। শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যা থাবা বাড়িয়েছিল তাঁর মনেরও ওপর।  

সমীরদা সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তির আলোচনা ও মূল্যায়ন এর আগেও  হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। তিনি ছিলেন আমাদের সাহিত্য-অভিভাবক। তাঁর জীবনকালে ‘কালিমাটি’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিল ‘সমীর রায়চৌধুরী সংখ্যা’। আরও দু’ একটি পত্রিকাও। এবার খুব স্বাভাবিক ভাবেই আরও অনেক পত্রিকাও উদ্যোগ নেবে। তাঁর সাহিত্যসৃজন আরও আরও পাঠক-পাঠিকার কাছে নিশ্চিত পৌঁছে যাবে।

সম্পাদকীয় লিখতে বসেছি। তাই বিস্তৃত লেখার অবকাশ নেই। শুধু নম্র শ্রদ্ধায় সমীরদাকে স্মরণ করি এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই আমাদের প্রাণের ভালোবাসা।  

   
   
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India

      

<<<< কথনবিশ্ব >>>>


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

দাবির পথ দেখিয়েছে সুইজারল্যাণ্ড






এই কদিন হলো (৫ই জুন) সুইটজারল্যাণ্ডে একটি রেফারেণ্ডাম তথা গণভোট অনুষ্ঠিত হলো, যার প্রস্তাব ছিল এই যে, দেশের সব লোক কাজ করুক না করুক  মাসে ‘মাইনে’, থুড়ি, স্টাইপেণ্ড পাবে। সরকারীভাবে পরিমাণ নির্দিষ্ট করে না দেওয়া হলেও যেটি বিবেচনার মধ্যে ছিল সেটি হলো বড়রা পাবে আড়াই থেকে তিন হাজার সুইস ডলার, আর বাচ্চারা ৬২৫ ফ্রাঁ। এই স্টাইপেণ্ড আসলে এক নিঃশর্ত মৌলিক বেতন ‘unconditional basic income’, যেটি বিরাজমান জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির পরিবর্ত। এই মৌলিক বেতন ব্যাপারটা বর্তমান দুনিয়ার এক ‘গরম’ টপিক। কারণ অনেকেই এখন এক কমকাজের ভবিষ্যতের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। তবে পৃথিবীর ধনাঢ্যতম দেশগুলির অন্যতম হিসেবে সুইটজারল্যাণ্ডেই প্রথম এটি গণভোটের বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পেল। যাঁরা এই স্টাইপেণ্ডের প্রবক্তা তাঁরা বলেছেন যে এটা সুইসদের একটি শোভন জীবিকার সঙ্গে সার্বজনিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেবে। প্রস্তাবের বিরোধীরা বলেছেন ‘automatic income’ কর্মস্পৃহার অনুদ্দীপক আর করবর্ধক। সরকারও বলেছিল যে এর ফলে দেশের অর্থনীতির উপর চাপ বাড়বে আর দক্ষ শ্রমিকদের অভাব ঘটিয়ে ব্যবসায়কে বিদেশে পাড়ি দিতে উৎসাহ দেবে। তাছাড়া এই স্টাইপেণ্ড জাতীয় দারিদ্র্যসীমার ঠিক উপরে। এসব গতের কথা সবাই জানে। এগুলো আঁতের কথা নয়।



গণভোটের ফলে অবশ্য দেখা গেছে যে প্রায় ৭৭% সুইস নাগরিক এই গণভোটের প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, আর ২৩%-এর কিছু বেশি এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই গণভোটের ফল যাই হোক, নিঃশর্ত মৌলিক বেতনের ব্যাপারটা সারা পৃথিবীতে একটি হট টপিক রয়েই যাচ্ছে। কারণ সারা পৃথিবীর নেতারা একদিকে বিশ্বে সম্পদের অসাম্য, আরেক দিকে ভবিষ্যতে যন্ত্র যে পৃথিবীর বৃহৎ সংখ্যক মানুষকে কর্মচ্যুত করতে পারে, সেটা নিয়ে ভাবছেন। সেই কারণে এপ্রিলে  সুইটজারল্যাণ্ডে লসান-এর সিটি কাউন্সিল প্রায় এই প্রস্তাব পাশ করে দিয়েছিল। আর অন্যান্য কিছু দেশেও যেমন ক্যানাডার অণ্টারিওতে, ফিনল্যাণ্ডে আর নেদারল্যাণ্ডস-এ এটাকে নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা হচ্ছে। সিলিকন ভ্যালির কিছু ধনীও ব্যাপারটায় বেশ আকৃষ্ট। Y Combinator-এর প্রেসিডেন্ট Sam Altman এর ব্যাপারটা সীমিতভাবে শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। আর প্রাক্তন গ্রিক অর্থমন্ত্রী  Yanis Varoufakis বলেছেন যে পৃথিবীর ধনাঢ্যতম দেশগুলির অন্যতম হিসেবে  সুইটজারল্যাণ্ডে এই আইডিয়াটা টেস্ট করার সুবর্ণ সুযোগ ছিল। হলো না সেটা আপশোষ!



প্রস্তাবটির গুণ ছিল এই যে যারা কাজ না করেও এই টাকা পাবে তারা বাকি সময় অন্নচিন্তা চমৎকারা থেকে রেহাই পেয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারবে। সাতাত্তর শতাংশ লোক এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন আর তেইশ শতাংশ পক্ষে। প্রশ্ন এই নয় যে যে বেশি শতাংশ লোক এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিলেন। যাঁরা বিপক্ষে ভোট দিলেন তাঁরা নিশ্চয়ই সকলে সমাজের উচ্চ বর্গের লোক নন, আর তাঁরা নিশ্চয়ই কোনো একই কারণে বা যুক্তিতে ভোট দেননি। যাঁরা পক্ষে ভোট দিলেন তাঁরাও নিশ্চয়ই সকলে সমাজের নিম্নবর্গের লোক নন,  আর নিশ্চয়ই কোনো একই কারণে ভোটও দেননি প্রশ্ন এটাও নয় যে এই ভোটে একটা কথা বেরিয়েও এলো, যে ওই দেশের অন্ততঃ তেইশ ভাগ মানুষ এই ব্যবস্থাকে কাম্য মনে করেন, আর তাঁরা সকলে সমাজের নিম্নবর্গের লোকও ননগোটা প্রস্তাবের পূর্বানুমান হয়তো দুটি, আর দুটিই মার্ক্স নামক এক বদ্ বুড়ো অনেক আগে বলে গিয়েছিলেন। মার্ক্স বলেছিলেন, প্রযুক্তি এখন (মানে তাঁর সময়ে) যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তাতে সব মানুষকে আট ঘণ্টা (বা তার বেশি) কাজ করতে হওয়ার কথা নয়। বেশি যে করতে হয় তার কারণ প্রযুক্তির মালিকানা ব্যক্তিমানুষের হাতে, তার মালিকানা সামাজিক নয়। ফলে উদ্বৃত্তর আহরণ ও আত্মসাৎকরণ চলতেই থাকেপ্রস্তাবের দ্বিতীয় পূর্বানুমানটিও মার্ক্স-অনুমত। সেটি হলো মানুষের অবসরকালীন সৃজনশীলতা সম্পর্কিত। জর্মান ইডিওলজি বইতে মার্ক্স বলেছিলেন সাম্যবাদী সমাজে দিনগত পাপক্ষয় থেকে, তার দাসত্ব থেকে মুক্ত মানুষ কোনো বিশেষ পেশায় নিরত থাকার থেকে আসা স্বরূপচ্যুতি থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের পূর্ণতার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিয়াকলাপে নিরত হবে। যেমন কেউ আজ যে কাল করছে, তার থেকে আলাদা কিছু করবে কাল। সকালে শিকার করা, দুপুরে মাছ ধরা, সন্ধ্যায় গোচর্যা করা, ডিনারের পর সমালোচনা করা এই মানুষের কোনো ঐকান্তিক ক্রিয়াকলাপের এলাকা থাকবে না। (In communist society, where nobody has one exclusive sphere of activity but each can become accomplished in any branch he wishes, society regulates the general production and thus makes it possible for me to do one thing today and another tomorrow, to hunt in the morning, fish in the afternoon, rear cattle in the evening, criticise after dinner, just as I have a mind, without ever becoming hunter, fisherman, herdsman or critic) সে কিন্তু কখনও কেবল শিকারী, জালিক, গোপালক, কিম্বা সমালোচক হয়ে উঠবে না। সে চাষ করবে ‘চাষী’ না হয়ে, গান গাইবে ‘গায়ক’ না হয়ে, খেলবে ‘খেলোয়াড়’ না হয়ে। খণ্ডমানুষ বা ‘species of man’-থেকে সত্যিকার বাঁচন্ত / জীবন্ত মানুষ বা ‘real living individuals’-দের তফাৎ কোথায়? সে স্ববিভক্ত নয়। পুঁজিবাদী সমাজে ‘divided, man's own deed becomes an alienpower opposed to him, which enslaves him instead of being controlled by him. For as soon as thedistribution of labour comes into being, each man has a particular, exclusive sphere of activity, which isforced upon him and from which he cannot escape. He is a hunter, a fisherman, a herdsman, or a criticalcritic, and must remain so if he does not want to lose his means of livelihoodএর থেকে মুক্তি সমাজ বদলে আসতে পারে, কিন্তু তার সহায়ক প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তির জোরেই লসান, অন্টারিও, ফিনল্যাণ্ড, নেদারল্যাণ্ডস এমনকি সিলিকন ভ্যালিও মানুষকে ‘কাজ’ থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছে।



তার মানে কি মুক্ত মানুষ ‘’-চিহ্ন বিবর্জিত কাজ করবে না? পুঁজিবাদী অর্থনীতিতেও নৃতত্ত্ব থেকে যে কটি অমূল্য ধারণা এসেছে, তা একটি হলো ‘leisure preference’ তার অনুষঙ্গটাও আজব। নৃতত্ত্ববিদরা দেখেছেন একই অরণ্যে বসবাসকারী দুই জনজাতির একটি কঠোর, আদিম কৃষিকার্যে অন্নের নিশ্চয়তা আনতে সারা বছর ঘাম ঝরায়। অথচ পাশেই অপর এক জনজাতি তাদের দেখেও তা না শিখে শিকার, চয়ন, খনন, সন্ধান (hunting, gathering, foraging) ইত্যাদির মাধমে খাদ্যের অনিশ্চিত বন্দোবস্তে তুষ্ট থাকে। প্রথমোক্তদের থেকে দ্বিতীয়োক্তরা অনেক বেশি আঁকায়, হস্তশিল্পে, গানে, নাচে, এককথায় সংস্কৃতিচর্চায় সময় কাটায়।



কেউ হয়তো এই অকর্তব্যের আহ্বানে বহু মানুষ সাড়া দিলে তার মধ্যে বিপদের সঙ্কেত খুঁজবেন। হয়তো H. G. Wells-এরTime Machine বইতে বলা সেই Eloi আর Morlock-দের কথা মনে করিয়ে দেবেন। তা দিন। কিন্তু আজ যখন উন্নত প্রযুক্তি আর উন্নত পুঁজিবাদ বিভিন্ন দেশের হাতে অতুল সম্পদ এনে দিচ্ছে, যখন কর্মহীন বিবৃদ্ধি (jobless growth) গ্রোথ সারা পৃথিবীর নেতাদের দৈনিক মাথাব্যথা, যখন পৃথিবীর কিছু মানুষ দুনিয়ার অধিকাংশ সম্পদ হাতে নিতে ব্যগ্র, যখন ‘precaritat’-দের বাড়বৃদ্ধি নতুন গণ আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যখন Friedrich Hayek-এর দ্বারা ধিক্কৃত জনকল্যাণবাদী ‘nanny state’ সরে যাওয়ার পরে নয়া-উদারনীতি এক Dean Baker কথিত Conservative Nanny State তৈরি করেছে, যার উদ্দেশ্যই কী করে ধনীদের আরো ধনী করা যায়, যার ফলে  আমরা ২০১৪ সালে ওই সুইজারল্যাণ্ডেই World Economic Forum-এর মীটিঙের সময় OxfamInternational  Working for the Few নামক প্রতিবেদনে জানিয়ে দিচ্ছে যে—

·        পৃথিবীর মাত্র এক শতাংশ মানুষ পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ সম্পদের মালিক
·        পৃথিবীর ধনাঢ্যতম এক শতাংশ মানুষের সমগ্র সম্পদ ১১০ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার নিচের অর্ধেকের সমগ্র সম্পদের ৬৫ গুণ বেশি
·        বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার নিচের অর্ধেকের সমগ্র সম্পদের পরিমাণ পৃথিবীর ৮৫ জন লোকের সমগ্র সম্পদের সমান
·        পৃথিবীর প্রতি দশজন মানুষের মধ্যে সাত জন এমন দেশে থাকে যেখানে গত তিরিশ বছরে অর্থনৈতিক অসাম্য প্রভূত বৃদ্ধি পেয়েছে
·        পৃথিবীর ধনাঢ্যতম এক শতাংশ মানুষের সমগ্র সম্পদ তথ্য মিলেছে এমন ২৬টি দেশের মধ্যে ২৪টিতে জাতীয় আয়ে তাদের ভাগ ক্রমাগত বাড়িয়েছে
·        আমেরিকাতেই ২০০৯ সাল থেকে অর্থসঙ্কটের পরবর্তী বিবৃদ্ধির ৯৫ শতাংশ পকেটে পুরেছে ধনাঢ্যতম এক শতাংশ মানুষ আর নিচের নব্বই শতাংশ ক্রমাগত আরো গরিব হয়েছে—



   তখন নিঃশর্ত মৌলিক বেতন চাই প্রত্যেকটি মানুষের জন্য, প্রত্যেকটি শিশুর জন্যে, ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে’ আর ‘তার মুখে খবর পেলুম: সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক’। এটা আর কিছু নয় যে ভূপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হলো সে তার ‘নোশনাল’  ভাগ, ‘ন্যাশনাল’ হিসেবে নয়, গ্লোব্যাল নাগরিক হিসেবে। সেই ঠিক করবে কী কাজের কাজী হবে সে। আর কেউ নয়। গোটা পৃথিবী বিক্কিরি হয়ে যাবে! মাজাকি! 



অদ্বয় চৌধুরী

‘ইক্যুয়াস’: এক দুর্বোধ্য ল্যাবিরিন্থ




সার্ত্রের ‘নো এক্সিট’। গার্সাঁ আর এস্তেল বদ্ধ ঘরে, এক আবেগঘন পরিস্থিতে, একে-অপরের ঘনিষ্ঠ হতে প্রবলভাবে উদ্যত। কিন্তু ঘনিষ্ঠ হতে পারে না কারণ সেখানে তৃতীয় একজন ব্যক্তির উপস্থিতি রয়েছে — ইনে। ইনে সব দেখছে। ইনের দৃষ্টি অতিক্রম করে তাদের পক্ষে মিলিত হওয়া সম্ভব না। এবার, ধরা যাক, ইনের বদলে সেখানে রয়েছে একটি ঘোড়া — অবলা জীব। তাকেও কি গার্সাঁ আর এস্তেল ভয় পাবে? মানুষ কখনো ঘোড়াকে ভয় পেয়েছে? নাকি, মানুষ নিজেকেই ভয় পেয়ে এসেছে? অথবা সমাজকে? সমাজের একাধিক অদৃশ্য চোখ জোড়াকে? এই অদৃশ্য বিষদৃষ্টির ছায়ায় মানুষ নিস্তেজ হয়ে পড়ে, বিহ্বল, বিমূঢ় হয়ে যায়। হ্যাঁ, মানুষ ভয় পায় সমাজকে। সমাজের উপরিভাগে বিস্তৃত সুন্দর, সুদৃশ্য, মখমলি পর্দার আড়াল থেকে বিভিন্ন আকারের, বিভিন্ন রূপের, বিভিন্ন ধরণের যে তীব্র হানাদারী দৃষ্টি বর্শার তীক্ষ্ণ ফলার মতো নিয়ত, ক্রমাগত মানুষের মনের একেবারে কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত ঢুকে যায় সেই দৃষ্টিকে ভয় পায়। মানুষ ঘোড়াকেও ভয় পায়। যদি সেই ঘোড়া হয়ে ওঠে সেই সমস্ত অদৃশ্য চোখের প্রতিনিধি। মানুষের আর্কেটাইপাল প্রতিনিধি হিসাবে অ্যালানও ভয় পায়। অ্যালান স্ট্র্যাং, পিটার শ্যাফার-এর লেখা জটিল ও বিখ্যাত নাটক ‘ইক্যুয়াস’-এর সতেরো বছর বয়সী প্রোটাগনিষ্ট। তার ভয় আছে ঘোড়ার প্রতি, ইক্যুয়াস-এর প্রতি। অথবা ভক্তি আছে। অথবা মনের জটিল ও দুর্বোধ্য ল্যাবিরিন্থ-এ ঘুরে বেরানো গভীর কোন বোধ। একইরকম আবেগঘন পরিস্থিতিতে অ্যালান চিৎকার করে বলে ওঠে, “He was there. Through the door. The door was shut, but he was there! . . . He’d seen everything. I could hear him. He was laughing. . . Mocking!. . . Mocking!জিল ম্যাসন, তার সমস্ত ইন্দ্রিয়গত ও শারীরিক সৌন্দর্য ও মাদকতা সমেত অ্যালানের চোখের সামনে থেকে সরে যায়। ইক্যুয়াস-এর রুক্ষ অবয়ব জিলের কোমল নারী শরীরের স্থলাভিষিক্ত হয়:
. . . When I touched her, I felt Him. Under me. . . His side, waiting for my hand. . . His flanks. . . I refused Him. I looked. I looked right at her . . . and I couldn’t do it. When I shut my eyes, I saw him at once. The streaks on his belly. . . [With more desperation.] I couldn’t feel her flesh at all! I wanted the foam off his neck. His sweaty hide. Not flesh. Hide! Horse-hide! . . . Then I couldn’t even kiss her.

এ যেন হেটেরোনরমাটিভ সিস্টেম-এর বিরুদ্ধে এক যাত্রা! এই যাত্রা অবশ্যই আমাদের সমাজ-স্বীকৃত তথাকথিত নরমাল জেন্ডার সিস্টেম-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। অথবা প্রশ্ন। তবে এই যাত্রা আদতে বোধহয় এক তীর্থযাত্রা! হেটেরোনরমাটিভ সিস্টেম-এর বিরুদ্ধে অ্যালান ও ইক্যুয়াসের কামজ সম্পর্ক শুধুমাত্র কোন বায়োলজিক্যাল ফেনোমেনন নয়। এর পিছনে রয়েছে গভীর ধর্মবোধ। সেই ধর্মবোধও আবার স্বাভাবিক ও স্বীকৃত বোধ নয়। সেখানেও অ্যালান ছাঁচ-ভাঙা বিদ্রোহী। আসলে, ‘ইক্যুয়াস’ নাটকটি আশিরনখর প্রতিষ্ঠান-বিরোধী। ডায়ালেক্টিক্স-এর চরম উদাহরণও বটে। আমার, এবং আপনারও, দৈনন্দিন টুকিটাকির মধ্যেই পারস্পরিক দ্বন্দ্বের যে চোরাস্রোত, যে চোরাস্রোত নিয়ত বহমান, তার নাটকীয় চরিত্রায়ন ও উপস্থাপনা হল এই অ্যালান চরিত্রটি, এই নাটকটি। এ হল বাইনারি সিস্টেম-এর বিভিন্ন বিপরীত মেরুবিন্দুর নাটকীয় দ্বন্দ্বের প্রকাশ: ‘ধর্ম’ ও ‘বিজ্ঞান’; ‘কল্পনা’ ও ‘বাস্তব’; ‘স্বাভাবিকতা’ ও ‘অস্বাভাবিকতা’; ‘রাষ্ট্র’ ও ‘ব্যক্তি’; ‘দর্শক’ ও ‘দ্রষ্টব্য’; ‘আমি সত্তা’ ও ‘অপর সত্তা’; ‘অ্যাপোলোনিয়ান’ ও ‘ডায়োনিশিয়ান’ ডিকোটমি। নিরন্তর দ্বন্দ্বের এই প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি প্রকট করে তোলে সেন্টার স্টেজ-এর চৌকোণা বক্সিং রিং। এই রিং-এর ভিতরেই নাটকের মূল ঘটনা গুলো ঘটতে থাকে একে একে। কখনো বর্তমানে, কখনো অতীতে। টাইম এবং স্পেস-এর দৃঢ় ও স্থায়ী কাঠামোকে দুমড়ে মুচড়ে এক একটি ইমেজ ভেসে ওঠে চেতনার স্রোতে, স্ট্রীম অফ কনশাসনেস-এ। মনের অলিন্দে বিভিন্ন ঘটনার ক্রমাগত নতমস্তকে যাতায়াতের মধ্যে থেকে স্থির ও ঋজু হয়ে উঠে দাঁড়ায় একটি প্রশ্ন। সেই সর্বজনীন ও শাশ্বত প্রশ্ন: জীবনের চরম ও পরম উদ্দেশ্য কি? আপনি কেন বেঁচে আছেন? আমিই বা কি কারণে বেঁচে আছি? অ্যালান স্ট্র্যাং-এর জীবনের উদ্দেশ্য কি? আর, ডক্টর ডাইসার্টের? প্রথম দৃশ্যেই ডক্টর ডাইসার্ট — একজন মনোবিদ, এবং সেই অর্থে বিজ্ঞানী — এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে নিজের মনের মানচিত্র নিরূপণের চেষ্টা করে:
. . . I keep thinking about the horse! Not the boy: the horse, and what it may be trying to do. I keep seeing that huge head kissing him with its chained mouth. Nudging through the metal some desire absolutely irrelevant to filling its belly or propagating its own kind. What desire could that be? . . . You see, I’m wearing that horse’s head myself. That’s the feeling. All reined up in old language and old assumptions, straining to jump clean-hoofed on to a whole new track of being I only suspect is there.
All reined up in old language and old assumptions, straining to jump clean-hoofed on to a whole new track of being ...— এখানে ডাক্তারের ভাষা অশ্বারোহণ-সম্বন্ধীয়, ভঙ্গী চিকিৎসকের, কিন্তু চিন্তা অন্টোলজিকাল, আর রূপক কিয়ের্কেগার্দ-এর ‘লিপ অফ ফেইথ’-এর প্রতি ইঙ্গিত করে। কিন্তু এই ‘লিপ’-ই সেই সনাতনী প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম সেই সম্বন্ধে কিছু সন্দেহও বাঙময় হয়ে ওঠে—
. . . a whole new track of being I only suspect is there. I can’t see it, because my educated, average head is being held at the wrong angle. I can’t jump because the bit forbids it, and my own basic force— my horse-power, if you like— is too little.

এই একই এগজিস্টেনশিয়াল অনিশ্চয়তা অ্যালানের মধ্যেও শিকড় গাড়ে — বোধহয় তার মধ্যে আরও গভীর সেই শিকড়ের প্রসারণ। এবং এই অস্থিরতার মাধ্যমে অ্যালান ও ডাইসার্ট হয়ে ওঠে একে অপরের প্রতিরূপ — স্বাধীনতা হরণকারী শৃঙ্খলজালে বাঁধা সমাজ-ব্যবস্থার যমজ সন্তান। ওরা দু’জনে একই পথ ধরে এগিয়ে চলে কোন এক অদৃশ্য আলোর খোঁজে। অদৃশ্য আলোর আশায়। তবে ওদের এই পরিক্রমা চলে ওদের নিজস্ব ঢঙে, নিজস্ব রঙে। ডাক্তারের পদ্ধতি যদি অ্যাপোলোনিয়ান হয় — যুক্তি ও তর্কের ইঁট দিয়ে বাঁধানো সুশৃঙ্খল রাস্তা, অ্যালানের পদ্ধতিকে ডায়োনিশিয়ান বলা যেতেই পারে। আবেগপ্রবণ। প্রবৃত্তিনির্ভর। ফলতঃ, এক সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্ম হয় তার হাত ধরে। কিন্তু আত্মবিশ্লেষণী যুক্তিশীল ডাক্তার নিজের ব্যর্থতা সম্পর্কে নিঃসন্দিহান। সে নিশ্চিত যে সে মুক্তি পাবে না। বিপরীতে, অ্যালান পেয়েছে। এবং পেয়েছে বলেই আজ সে সমাজের চোখে ‘অস্বাভাবিক’। ডাক্তার, যে নিজে একই অন্বেষণে অগ্রগামী অথচ নিশ্চিত অসফল, তার কাজই হল সফল অ্যালানকে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলা। এ এক অদ্ভুত প্যারাডক্স! কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে ডায়োনিশিয়ান অ্যালান পেরেছে, কিন্তু অ্যাপোলোনিয়ান ডাক্তার পারবে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর ডাক্তারের বক্তব্যেই প্রকট— ‘I can’t see it, because my educated, average head is being held at the wrong angle.’ ইডিওলজিকাল স্টেট অ্যাপারেটাস-এর অন্যতম অ্যাপারেটাস, তথা শিক্ষাব্যবস্থায়, ডাইসার্ট শিক্ষিত। এই শিক্ষা, অথবা দীক্ষা, তাকে সামাজিক লক্ষ্মণরেখায় আবদ্ধ রাখে। তার সত্তার প্রতিটি মজ্জা সংক্রামিত— বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং বীর্যহীনতার জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত। অ্যালানের ক্ষেত্রে জ্ঞানমূলক শিক্ষাযন্ত্র, যা কিনা আদর্শগত শিক্ষার ছদ্মনাম, সক্রিয় ছিল না। বরং, ইডিওলজিকাল স্টেট অ্যাপারেটাস-এর অন্য অ্যাপারেটাসগুলো সক্রিয় ছিল একেবারে ছোট বেলা থেকেই: পরিবার, ধর্মীয় শিক্ষা। নিজেকে নিপীড়িত মানুষদের একজন, বা সোশিয়ালিস্ট হিসাবে দাবি করা ফ্রাঙ্ক স্ট্র্যাং— অ্যালানের বাবা— নিজে কিন্তু একজন সার্বভৌম শাসক! ফ্লবেয়ার-এর ‘মাদাম বোভারি’ উপন্যাসের মসিঁয়ে হোমাই-এর মতো সেও ধর্মকে স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার পরিপন্থী হিসাবে গণ্য করেতার স্ত্রীর অতিরিক্ত ধর্মবিশ্বাস এবং ছেলের মনে সেই বিশ্বাসের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া ফ্রাঙ্কের একক কর্তৃত্বপূর্ণ শাসন-ব্যবস্থার প্রতি আঘাত-স্বরূপ। এবং, সেই কারণেই ফ্রাঙ্কের মতে ধর্ম হয়ে ওঠে অ্যালানের যাবতীয় স্খলনের একমাত্র অনুঘটক:
A boy spends night after night having this stuff read into him: an innocent man tortured to death— thorns driven into his head— nails into his hands— a spear jammed through his ribs. . . . Bloody religion— it’s our only real problem in this house.

যদিও ফ্রাঙ্ক নিজে সিনেমা হল-এ গিয়ে তথাকথিত নিষিদ্ধ পর্নোগ্রাফিক সিনেমা দেখে, কিন্তু অ্যালানের ক্ষেত্রে ফ্রাঙ্কের চাপানো অনুশাসন নেমে আসে টেলিভিশন দেখার উপরে নিষেধাজ্ঞা রূপে। টেলিভিশন বিভিন্ন অর্থহীন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুধুমাত্র ক্যাপিটালিস্ট প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। কোন ব্যক্তিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে। ধ্বংস করে। ঠিক একইভাবে, বাস্তবে, ফ্রাঙ্কের যুক্তিহীন, অনমনীয় ও একপেশে কঠোর অনুশাসনের কারণে অ্যালানও ক্রমশ মানসিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যায়, ধ্বংস হয়ে যায়। উলটো দিকে অতিরিক্ত ধর্মপরায়ণা ডোরা স্ট্র্যাং, তার চাপিয়ে দেওয়া অন্ধ ধর্মনীতি সহ, ইডিওলজিকাল স্টেট অ্যাপারেটাস-এর মন্ত্র জপ করে নিরন্তর: God sees you, Alan. God’s got eyes everywhereঅ্যালান ক্রমশ মর্গের মৃতদেহ হয়ে ওঠে যাকে অনুক্ষণ কাটা-ছেঁড়া করা হয়। অ্যালান ক্রমশ এক দ্রষ্টব্যে পরিণত হয়। তার বাবা-মা হয়ে ওঠে মিশেল ফুকো’র পাওয়ার ডিসকোর্স-এর প্যানপটিকন-এর রক্ষী। জাক লাকাঁ’র সাইকোঅ্যানালিসিস তত্ত্বের ‘The Other’ (বড় হাতের ‘O), বা ‘বড় অপর’ সত্তা। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতিয়ার। অথবা, স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র।

শাসনযন্ত্রে নিষ্পেষিত, অতন্দ্র প্রহরায় হাঁপিয়ে ওঠা, বৃহৎ সত্তার দ্বারা আবৃত অ্যালানের সত্তাও বিচ্ছিন্ন, একাকী এবং বীর্যহীন হয়ে পড়ে, এলোমেলো হয়ে পড়ে। ডাইসার্টের সত্তার মতোই। তার সামনের প্রতিটা দরজা একে একে বন্ধ হতে থাকে আর সে ক্রমশ বন্দী হতে থাকে। ছাঁচ-বন্দী। এক সময় তার ঘাড়ের উপরে চেপে বসা আঁধারকে অগ্রাহ্য করে অ্যালান তার নিজস্ব ‘আমি’ সত্তার খোঁজে যাত্রা করে। এই যাত্রা মেটাফিজিকাল, এবং ইম্যাজিনারি। রাতের অন্ধকারে, সবার অজান্তে, নিয়মের রক্তচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে সে আলোর খোঁজে যাত্রা করে ইক্যুয়াসের উপর ভর করে। ছ’ বছর বয়সে সে প্রথম পরিচিত হয় ইক্যুয়াসের সাথে — তার অসীম শক্তি, অফুরন্ত তেজ আর স্বাধীনচেতা মানসিকতার সাথে। যা কিছু থেকে অ্যালান নিজে বঞ্চিত তা সবই ইক্যুয়াসের মধ্যে আছে। অ্যালান শক্তিহীন, দুর্বল, ভীতু। এবং অনুশাসিত। তাকে সেইদিনও জোর করে ইক্যুয়াসের পিঠ থেকে নামিয়ে আনা হয়। অনেকটা তার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো যীশু খ্রীষ্টের ছবির মতোই ছিল অ্যালান— “loaded down with chains, and the centurions were really laying on the stripes”ওর বাবা ঐ ছবিটি ছিঁড়ে ফেলে। তার জায়গায়, পরে কিছুটা বাধ্য হয়ে, ইক্যুয়াসের ছবি টাঙানো হয়: “a beautiful white one, looking over a gate…staring straight at you”ইক্যুয়াসের এই ছবিটি, অথবা তার সামগ্রিক প্রতিচ্ছবিটিই, অ্যালানের কাছে এক ‘আয়নাতে’ পরিণত হয়। আর অ্যালান নিজে হয়ে ওঠে এক শিশু— অপরিণত, অসম্পূর্ণ, অক্ষম। জাক লাকাঁ’র ‘মিরর স্টেজ’ তত্ত্বের ‘মিরর’ এবং ‘শিশু’ হয়ে ওঠে ইক্যুয়াস এবং অ্যালান।

একটি শিশু। বাইরের অবাক করা পৃথিবী আর সেই পৃথিবীর আরও অবাক করে দেওয়া এক একটি জিনিস দেখছে, চিনছে, উপলব্ধি করছে। তখনো তার শারীরবৃত্তীয় গঠনপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। যন্ত্রাংশগুলি পুরো মাত্রায় সচল হয়নি। বা, বলা যায়, যন্ত্রাংশগুলি সম্পূর্ণরূপে নিজের আয়ত্তাধীন হয়নি, নিজের মস্তিষ্কের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দ্বারা চালিত হতে শুরু করেনি। সে অন্যের ইচ্ছায় কাজ করে। এই সময়ে, কোন এক দিন, সেই শিশুটি তার মা’য়ের কোলে চেপে আয়নার সামনে হাজির হয়। জীবনে সেই প্রথম সে তার ‘আমি’ কে দেখে, চেনে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রথমবার উপলব্ধি করে। এই অভিজ্ঞতাটি ক্ষণস্থায়ীত্বকে ছাপিয়ে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। তার কল্পনা-শৃঙ্খলে নিজের চিত্রটি— তার ‘আমি’ সত্তার চিত্রটি— স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে যায়। এখানে আয়নায় যে প্রতিবিম্বটি ওই শিশু দেখে সেটি হল ‘other’, বা ‘ছোট অপর’ (ছোট হাতের ‘o’)এই ‘ছোট অপর’ হল ‘আমি’ সত্তার কাল্পনিক প্রতিরূপ। শিশুটির মনে এই প্রতিরূপটি কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে শিশুটির মতো শারীরিক গঠনমূলক অসম্পূর্ণতার দোষে দুষ্ট হিসাবে ধরা দেয় না। এবং ফলতঃ সে পরাধীন নয়। সে এক পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। এই সম্পূর্ণ, এবং তার ফলে স্বাধীন প্রতিরূপটি ওই শিশুটির মনে নিজের সম্পূর্ণ ও স্বাধীন ভবিষ্যৎ সত্তার আগাম আভাস রূপে হাজির হয়। সে বুঝতে পারে সেও ওই ইমেজটির মতো পরিপূর্ণ ও স্বাধীন হয়ে উঠবে। এই ‘ছোট অপরের’ সাথে ‘আমি’ সত্তার আত্তীকরণ সম্ভব। এই আত্তীকরণ ঘটে। কিন্তু ওই আয়নায় শিশুটির মা’য়ের যে প্রতিফলন শিশুটি দেখে তা হল ‘Other’— ‘বড় অপর’ সত্তা। এই ‘বড় অপর’ সত্তার সাথে ‘আমি’ বা ‘ছোট অপরের’ আত্তীকরণ কোনদিনই সম্ভব না। বরং, ‘বড় অপর’ সত্তা শিশুটির মনে খানিক ভয় জাগিয়ে তোলে। উদ্বেগের জন্ম দেয়। অ্যালানের কাছে ইক্যুয়াসের প্রতিকৃতিটি হয়ে ওঠে ‘আমি’ সত্তার প্রতিরূপ— ‘ছোট অপরতার বাবা-মা ‘বড় অপর’। অ্যালান ইক্যুয়াসের মধ্যে নিজের স্বাধীন ভবিষ্যৎ সত্তার হদিশ পায়। তার অপূর্ণতার পূর্ণতাপ্রাপ্তির মাধ্যম হচ্ছে ইক্যুয়াস। কাউবয়-এর মতো সেও যখন ইক্যুয়াসের সাথে ‘এক’ হবে তখন তাদের সবাই ভয় পাবে: “No one ever says to cowboys ‘Receive my meaning’! They wouldn’t dare.অ্যালানের মানস কল্পনায় ঘোড়া ও তার উপরে সওয়ারী মানুষ ‘একত্রীভূত’ হলে ঈশ্বর হিসাবে পরিগণিত হয়। ঠিক যেমন— সে তার মা’য়ের কাছে শুনেছিল— ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’-এর পেগান মানুষরা প্রথম খ্রীশ্চিয়ান ক্যাভালরির ঘোড়ার পিঠে সওয়ার মানুষদের দেখে তাদের ঈশ্বর ভেবেছিল।

এই ভাবেই অ্যালান ও ইক্যুয়াস এক হয়ে ওঠে। এবং, ইক্যুয়াস ও ঈশ্বর এক হয়ে ওঠে। অ্যালানের কাছে আস্তাবল হয়ে ওঠে ‘টেম্পল’, ‘হোলি অফ হোলিজ’। ইক্যুয়াসকে, যে ইক্যুয়াস “was born in the straw”, লাস্ট সাপার হিসাবে চিনির ঢেলা দেয় অ্যালান এবং তার পরে মন্ত্রের মতো জপ করতে থাকে “Take my sins. Eat them for my sakeকিন্তু এখানেও এক অদ্ভুত প্যারাডক্স আছে। অ্যালানের কল্পনার ঈশ্বর সেই ঈশ্বর নয় যে সকলের আরোগ্য কামনা করে এবং পাপীদের ক্ষমা করে। এই ঈশ্বর ‘Songs of Experience’- এর ঈশ্বর— বলশালী, তেজীয়ান, কঠোর বিচারক, শত্রু ধ্বংসকারী, নেমেসিস। এই ঈশ্বর অ্যালানের পরিপূরক। দুর্বল অ্যালান, শক্তিমান ঈশ্বর। একইভাবে ইক্যুয়াসও হল বুক অফ জোব-এর প্রবল পরাক্রমী ঘোড়া:
Hast thou given the horse strength? Hast thou clothed
     
        his neck with thunder? . . .
He swalloweth the ground with fierceness and
         rage . . .
He saith among the trumpets, Ha, ha      [Job 39:19-25].
ইক্যুয়াস ‘হোয়াইট হর্স ইন রিভিলেশন’-এর ঘোড়ায় পরিণত হয়— ‘He that sat upon him was called Faithful and True. His eyes were as flames of fire.’ মাঝরাতে, শুদ্ধ মনে, শুচিবস্ত্র ত্যাগ করে, ধর্মাচারের মতো সে সত্তানুসন্ধান করে; অথবা, সত্যানুসন্ধান। এই সন্ধান সংঘটিত হয় ইক্যুয়াসকে জয় করার মাধ্যমে, তার সাথে একাত্ম হওয়ার মাধ্যমে। সে ইক্যুয়াসের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। ঈশ্বরের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়:
The King rides out on Equus, mightiest of horses. . . . His neck comes out of my body. It lifts in the dark. Equus, my Godslave! . . . Now the King commands you. Tonight, we ride against them all.
[He whips Nugget]
And Equus the Mighty rose against all!
His enemies scatter, his enemies fall! . . .
. . .

Feel me on you! On you! On you! On you!
I want to be in you!
I want to BE you forever and ever!—
Equus, I love you!
Now!—
Bear me away!
Make us One Person!
     [He rides Equus frantically.]
One Person! One Person! One Person! One Person!
[He rises up on the horse’s back, and calls like a trumpet.]
Ha-Ha! . . . Ha-HA! . . . Ha-HA!
[The trumpet turns to great cries.]
HA-HA! HA-HA! HA-HA! HA-HAH! HA!
HA. . . HAAAAA!
[He twists like a flame. Silence . . . Slowly, the boy drops off the horse’s back.]
AMEN!

অ্যালানও, তার কল্পনার ঈশ্বরের মতোই, শত্রু দমন করতে চায়। ভেঙ্গে দিতে চায় সমস্ত শিকল। ধ্বংস করতে চায় দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র, ক্ষমতার প্যানপটিকন, ‘বড় অপর’ সত্তার অধীনতা।

কিন্তু এখানেই সবথেকে বড় প্রশ্নটির জন্ম হয় যা আমাদের বোধকে আত্মসমীক্ষার অণুবীক্ষণের নীচে ফেলে বিচার করতে বাধ্য করে। অন্য কোন সত্তায় নিজেকে বিলীন করে দিয়ে, অন্য কোন সত্তার সাথে আত্তীকরণের মাধ্যমে নিজ সত্তার স্বাধীনতা লাভ কি কখনো সম্ভব? অন্য সত্তায় বিলীন হয়ে গেলে স্বকীয় সত্তার কোন অস্তিত্বই কি থাকে আর? তখন সেই অন্য সত্তাটিই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ শক্তিমান, সর্বগ্রাসী, এক সন্ত্রাসের প্রতিরূপ। তাই আগল ভাঙার হাতিয়ার, বাঁধন পেরোনোর বাহন ইক্যুয়াসও অ্যালানের কাছে সন্ত্রাসে পরিণত হয়। ইক্যুয়াসের সামনে জিল-এর সাথে শারীরিক মিলনের মতো স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় আচরণ করতেও ব্যর্থ হয় অ্যালান। ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে সে ক্ষমা চায় ইক্যুয়াসের কাছে:
ALAN: . . . [To the silence: terrified.] Friend. . . Equus the Kind. . . The Merciful! . . . Forgive me! . . . It wasn’t me. Not really me. Me! . . . Forgive me! . . . Take me back again! Please! . . . PLEASE!
[He kneels on the downstage lip of the square, still facing the door, huddling in fear.]
    I’ll never do it again. I swear. . . I swear! . . . [In a moan.] Please!!! . . .
কিন্তু ইক্যুয়াস তাকে ক্ষমা করে না। মুক্তি দেয় না। বরং, দখলনামা ঘোষণা করে— ‘Mine! . . . You’re mine! . . . I am yours and you are mine!’ এখনেই, ঠিক এই মুহূর্তে, ইক্যুয়াস নিজেই হয়ে ওঠে একটি প্রতিষ্ঠান। রূপান্তরিত হয় ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণকারী রাষ্ট্রযন্ত্রে, ক্ষমতাসীন শক্তিতে। ঠিক এই মুহূর্তেই ইক্যুয়াস ‘ছোট অপর’ সত্তা থেকে রূপান্তরিত হয় ‘বড় অপর’ সত্তায়:
    ALAN: … Then I see his eyes. They are rolling!
[NUGGET begins to advance slowly, with relentless hooves, down the central tunnel.]
    ‘I see you. I see you. Always! Everywhere! Forever!’
    DYSART: Kiss anyone and I will see?
    ALAN [to DYSART.]: Yes!
    DYSART: Lie with anyone and I will see?
    ALAN [to DYSART]: Yes!
DYSART: And you will fail! Forever and ever you will fail! You will see ME— and you will FAIL!
. . .
The Lord thy God is a Jealous God. He sees you. He sees you forever and ever, Alan. He sees you! . . . He sees you!
    . . .
ALAN [in terror]: Eyes! . . . White eyes— never closed! Eyes like flames — coming — coming! . . . God seest! God seest! . . . NO! . . . 
প্যানপটিকনের অদৃশ্য রক্তচক্ষু থেকে প্রাণপণে মুক্তি চায় অ্যালান। ভাঙতে চায় সমস্ত ছাঁচ, বাঁধন। এমনকি ইক্যুয়াসের আলিঙ্গন থেকেও স্বাধীনতা চায় সে। ঈশ্বরের দৃষ্টি থেকেও। শিকলের মর্মর শব্দ ছাপিয়ে ভেসে ওঠে অ্যালানের জেহাদ:
    ALAN: No more. No more, Equus.
[He gets up. He goes to the bench. He takes up the invisible pick. He moves slowly upstage towards NUGGET, concealing the weapon behind his naked back, in the growing darkness. He stretches out his hand and fondles NUGGET’s mask.]
[Gently.] Equus . . . Noble Equus. . . Faithful and True. . . God-slave. . . Thou – God – Seest – NOTHING!
[He stabs out NUGGET’s eyes. The horse stamps in agony. A great screaming begins to fill the theatre, growing ever louder. ALAN dashes at the other two horses and blinds them too, stabbing over the rails. . . Relentlessly, as this happens, three more horses appear in cones of light: not naturalistic animals like the first three, but dreadful creatures out of nightmare. Their eyes flare – their nostrils flare – their mouths flare. They are archetypal images – judging, punishing, pitiless. . . As they trample at him, the boy leaps desperately at them, jumping high and naked in the dark, slashing at their heads with arms upraised . . .]
    ALAN: Find me! . . . Find me! . . . Find me! . . .
    KILL ME! . . . KILL ME! . . .

উপরের অদৃশ্য অথচ বর্তমান চোখগুলো সদা-সর্বদা আমাদের পর্যবেক্ষণ করেএবং নিয়মভঙ্গের শাস্তিস্বরূপ গারদে নিক্ষেপ করে। অথবা পাগলা গারদে। অ্যালান তাদেরকে, তাদের ছোট্ট এক প্রতিরূপকে ধ্বংস করে। নিজে হাতে। ধ্বংস করে পরাধীনতাকে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে। এই ধ্বংসকার্যটি অ্যালানের বাস্তব-জীবনে সংঘটিত, কিন্তু মুক্তিলাভ কি বাস্তবে ঘটে? এই মুক্তিলাভ এক ইলিউশান নয় তো? বাস্তবে সে সাময়িক ভাবে পরাধীনতাকে পরাজিত করে, অধীনতার একটি নির্দিষ্ট হাতিয়ারকে অন্ধ করে দেয়, কিন্তু আদতে তার মুক্তি আসে কল্পনায়। যে পরাধীনতাকে অ্যালান ধ্বংস করে তা পরাধীনতার এক প্রতীক মাত্র। বাস্তবে অ্যালান গ্রেপ্তার হয়। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিদানের প্রক্রিয়া চালু হয়। সে রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাস-এর বলি হয়। এই ব্যবস্থারই অঙ্গ হিসাবে তাকে ডাইসার্টের কাছে পাঠানো হয় তার ‘অস্বাভাবিকতাকে’ মুছে ফেলে তাকে ‘স্বাভাবিক’ করে তুলতে। তাকে ছাঁচবদ্ধ করতে। তার ওই চোখটাকে— যে চোখে সে কল্পনার জাল বোনে, যে কল্পনার জগতে সে একদিন ইক্যুয়াসের মাধ্যমে, ঈশ্বরের হাত ধরে, নিজের স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছিল— সেই চোখটাকে উপড়ে ফেলাই হল ডাইসার্টের কাজ। সেই চোখে স্বাধীনতার নেশা লেগে আছে। তাই সেই চোখ ‘অস্বাভাবিক’— ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকর:
DYSART: The Normal is the good smile in a child’s eyes— all right. It is also the dead stare in a million adults. It both sustains and kills— like a God. It is the Ordinary made beautiful; it is also the Average made lethal. The Normal is the indispensable, murderous God of Health, and I am his priest. My tools are very delicate. My compassion is honest. I have honestly assisted children in this room. I have talked away terror and relieved many agonies. But also— beyond question— I have cut from them parts of individuality repugnant to this God, in both his aspects. Parts sacred to rarer and more wonderful Gods.

ডাইসার্ট নিজেও তার এই পরাধীনতা থেকে মনেপ্রাণে মুক্তি চায়। কিন্তু, তার ‘প্যাশন’ নেই— অ্যালানের মতো। সে ভয় পায়— ধরা পরে যাওয়ার ভয়। অ্যালানের মতো বিদ্রোহীদের চোখ উপড়ে নেওয়ার, তাদের কল্পনাময় জগতটাকে কেড়ে নেওয়ার এই সামাজিক কর্তব্য-কর্ম নিয়ে তার নিজের সন্দেহ, হতাশা, যন্ত্রণা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। দুঃস্বপ্নেও এই ভয় তাকে তাড়া করে:
DYSART: . . . Of course, I redouble my efforts to look professional— cutting and snipping for all I’m worth: mainly because I know that if ever those two assistants so much as glimpse my distress— and the implied doubt that this repetitive and smelly work is doing any social good at all— I will be the next across the stone.

এক্ষেত্রে ডাইসার্ট সম্পূর্ণ রূপে সফল হয় নিজের সামাজিক কর্তব্যে। সে হত্যা করে অ্যালানের ‘অস্বাভাবিকতাকে’, তার কল্পনাকে, তার স্বাধীনতাকে। হত্যা করে অ্যালানের স্বকীয় সত্তাকে। অ্যালান এবার এক ভূতে পরিণত হবে— ‘a ghost’! একটি আর্কেটাইপাল ভূত। যে ভূতের অস্তিত্বের স্পন্দন টাইম এবং স্পেস-এর বেড়াজাল টপকে আমাকে, আপনাকে, এমনকি সমগ্র মানবজাতিকে ছুঁয়ে, অজগরের মতো পেঁচিয়ে, আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, নিজের মধ্যে আত্তীভূত করে নিয়েছে। এই ভূত চলমান, কিন্তু মৃত। স্বাভাবিক, কিন্তু প্রশ্নহীন, কল্পনাহীন, বীর্যহীন। এবং আবেগহীন।




ঋণ স্বীকার: আন্তর্জাল ও গ্রন্থ

1.  Equus. Peter Shaffer.
3.  Some reflections on the Ego. Jacques Lacan
4.  “The Mirror Stage as Formative of the Function of the I.” Literary Theory: An Anthology. Ed. Julie Rivkin and Michael Ryan.

(এই প্রবন্ধটি ‘অপ্রচলিত’ নামক একটি পত্রিকায় বেশ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত  হয়েছিল। নাট্যকার পিটার শ্যাফারের মৃত্যু উপলক্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে 'কালিমাটি অনলাইন' ব্লগজিনে পুনঃপ্রকাশিত হলো)  


শিবাংশু দে

শরীরী গান্ধার কর্ণাটরাগিনী



"না উড়ে থেমেছো পাখি, সমস্তটা ওড়ো
কীভাবে উড়ছো তুমি, কীরকম বন্ধ হয়ে আছো
এভাবে পালকে ওড়ো
নানান আকারে একবার..."

(হাজারদুয়ার - স্বদেশ সেন)




রাতের বেলা সুর যেন একটু অন্যভাবে কাছে আসে নৈঃশব্দ্যের ফ্রেমে বাঁধানো থাকে সোনার রেখায় ফুলকারির আঁকিবুকি মনে পড়ে কি শংকর জয়কিশনের স্প্যানিশে অমোঘ স্ট্রোকের পেলব মায়া! ধানি সারেগামাপা... ধা পা... রাজ  কাপুর নেমে যান স্টুডিয়োতে সাজানো চাঁদজাগা ছায়াময় গাছগাছালির আঙিনায় হ্যামকটিকে দুলিয়ে দিয়ে... নার্গিস তাঁর দীর্ঘনাসা সুষুপ্তিময় চোখের জাদুতে বেঁধে রাখেন শহর-গ্রাম-মাঠ-ময়দান-মফঃসলে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ গ্রস্ত মুগ্ধ চোখের  মানুষজন মান্না আর লতা ধর্মব্যাধের মতো নির্লিপ্ত সততায় শিকার করে চলেন তাদের হৃদয় "ইয়েহ রাত ভিগি ভিগি, ইয়েহ মস্ত ফিজায়েঁ... উঠা ধীরে ধীরে  উওহ চাঁদ প্যারা প্যারা... কিঁউ আগ সে লগাকে গুমসুম হ্যাঁয় চাঁদনি, তুনে ভি নহি দেখা মৌসম কা ইয়েহ ইশারা..." অদ্বিতীয় শৈলেন্দ্র! কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে  জেগে থাকে রাগ কিরওয়ানির মাদক আশ্লেষ অলীক জেনেও কী অনিবার্য অভিঘাত সেই সুরের! তোমার কাছে বর মাগি...

"ইয়েহ রাত ভীগি ভীগি" : https://www.youtube.com/watch?v=WNPAABBkk7M

(২)  

দক্ষিণদেশের সুর কিরওয়ানি শাস্ত্রীয় অর্থে কিরওয়ানি এখনও 'হিন্দুস্তানি রাগ' নয়, অন্ততঃ পন্ডিত ভাতখন্ডে' তালিকা অনুযায়ী তাই হিন্দুস্তানি মতে কিরওয়ানির কোনও নিজস্ব ঠাট নেই যেহেতু হিন্দুস্তানি রাগের শিল্পী শ্রোতাদের কাছে কিরওয়ানি অভূতপূর্ব গ্রহণযোগ্যতা লোকপ্রিয়তা অর্জন করেছে, সম্প্রতি কিরওয়ানিকে একটা নিজস্ব ঠাট হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস লক্ষ্য করেছি এহ বাহ্য, মানুষের হৃদয়ের কাছে পৌঁছোনো' সঙ্গীতের লক্ষ্য, সেই যুক্তিতে এই রাগ আদি ঠাটভিত্তিক রাগবিশ্লেষণের এলাকার মধ্যে না এসেও উত্তরভারতের হিন্দুস্তানি ঘরানার শ্রোতা শিল্পীদের রুচিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে হিন্দুস্তানি রাগের সুরসাম্রাজ্যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেকে সম্পূর্ণ অঙ্গের রাগ, আরোহ অবরোহে আটটি করে স্বর, কিন্তু জাদু ধরা আছে সব শুদ্ধস্বরের পটভূমিতে চকিতে স্পর্শ করা কোমল গান্ধার আর কোমল ধৈবতের নেশায় তার মেজাজে ধরা থাকে শৃঙ্গার, বিষাদ আর নির্ভুল শরীরী আবেগ ব্রাহ্মণ থেকে চন্ডাল কারও নিস্তার নেই সেই সম্মোহনে



"শোলা থা জল চুকা হুঁ", মেহদি হসন, : https://www.youtube.com/watch?v=H9ns-cT-xOM
মনে পড়ে, মেহদি হাসান সাহেবের 'শোলা থা জল বুঝা হুঁ, দওয়ায়েঁ মুঝে দো...' অথবা গুলাম আলি সাহেবের সম্ভবতঃ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (আমার মতে) 'পারা পারা হুয়া পয়রাহেঁ জান' জনসমাদরে পিছিয়ে থাকে না আলি সাহেবের 'অ্যায় হুস্ন বেপরোয়াহ তুঝে, শবনম কহুঁ, শোলা কহুঁ...'

"পারা পারা হুয়া পয়রাহঁন জাঁ", গুলাম আলি : https://www.youtube.com/watch?v=p7_zp7NdQOA



(৩)

কিরওয়ানি রাগটি বেশ জনপ্রিয়, বিশেষ করে যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে এই রাগটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বাল্যকালে পণ্ডিত রবিশংকর পরিচালিত একটি বৃন্দবাদনের অংশ হিসেবে একটা তরানার মাধ্যমে এই পরিবেশনার সহশিল্পীরা ছিলেন ষাটের দশকে পণ্ডিতজীর প্রধান শিষ্য অনুসারীরা পরবর্তীকালে তাঁরা  ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্তম্ভ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন পণ্ডিত শিবকুমার, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ, পণ্ডিত কার্তিককুমার, পণ্ডিত এল সুব্রামনিয়ন, পণ্ডিত কমলেশ মৈত্র, উস্তাদ আল্লারাখা, উস্তাদ সুলতান খান এবং লক্ষ্মীশংকর টুকরো টুকরো করে পরিবেশিত চতুরঙ্গ, ধমার, কজরি, দেহাতি, নাদেরদানি ইত্যাদি মূলতঃ বিদেশী শ্রোতাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য সারঙ্গি, বেহালা, সেতার, বাঁশি, মৃদঙ্গম, তবলা' সঙ্গে কণ্ঠ সঙ্গীত পণ্ডিত রবিশংকরের একটি অতি জনপ্রিয় কম্পোজিশন



শিবকুমার শর্মা: https://www.youtube.com/watch?v=KpHGjO_Kqq0

বড় করে গাওয়া বা বাজানো যায় না বলে কোনও অনুষ্ঠানেই মূল পরিবেশনা হিসেবে তা'কে আমরা শুনতে পাই না পিলু, কাফি, খমাজ, ভৈরবীর মতো সে একটু দেরিতে আসে অধিকাংশ সময়েই ঠুমরি দাদরার জামা গায়ে কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখেছি, দের আই, দুরুস্ত আই পুরিয়া ধনশ্রী বা বাগেশ্রী' পর দশ-পনেরো মিনিটের একটি পেশকশ, দিল তরর হো জাতি হ্যাঁয় মুম্বাইর বিখ্যাত হৃদয়েশ সঙ্গীত সমারোহ অনুষ্ঠানে শুনেছিলুম পন্ডিত রাজন-সাজন ভীমপলাশির পর  চ্যালেঞ্জ নিয়ে ধানী গেয়েছিলেন, কারণ পর পর এই দু'টি রাগ নিজস্ব সূক্ষ্ম স্বকীয়তা বজায় রেখে এক আসরে গাওয়া অতি দুরূহ মন ভরেছিলো নিশ্চয়, কিন্তু ছোঁয়ার একটু বাকি থেকে গিয়েছিলো সেটা পূর্ণ হয়ে গেলো পরবর্তী শিল্পী পন্ডিত শিবকুমার শর্মা যখন মূল নিবেদন চন্দ্রকোষের পর বড় করে কিরওয়ানি বাজাতে শুরু করলেন সঙ্গতে উস্তাদ জাকির হুসেন কিরওয়ানি' লিল্টিং মেলোডির সঙ্গে লয় ছন্দকে কীভাবে সীবনহীন মিলিয়ে দেওয়া যায় তার ক্ল্যাসিক নমুনা শুনলুম সেদিন পন্ডিত শিবকুমারের সন্তুরে কিরওয়ানির রেকর্ডটি এক কথায় অসামান্য মধুরেণ সমাপয়েৎ কা'কে বলে তখন বুঝতে পারলুম কর্মক্লান্ত দিনের মহতী আয়োজনকে হয়তো ধরে রাখে মিয়াঁ কি তোড়ি, য়মন কল্যাণ বা রাগেশ্রী বা দরবারী কিন্তু তা'কে সাঙ্গ করে শিশিরের শব্দের মতো শান্তি নিয়ে সব ভীরু পায়ে আসা শ্যামলী মেয়েদের মতো রাগরাগিণীর দল সন্ধ্যা হয়ে নেমে আসে পন্ডিতজীর জন্য ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত স্ট্যান্ডিং অভেশন  আমার জন্য ছিলো ভিলে পার্লে স্টেশনে রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত বসে বোরিভিলি লোক্যালের অপেক্ষা, মনে মনে নিরন্তর আক্ষেপহীন গুনগুন কিরওয়ানির চক্করে পরদিন ভোর সাড়ে ছটায় পন্ডিত উলহাস কসলকারের অনুষ্ঠান আর যেতে পারিনি আর এই সেদিনের কথা ভুবনেশ্বরে রাজারানি সঙ্গীত উৎসবে সরোদে গোয়ালিয়র ঘরের বর্তমান দীপধারক দুই ভাই অমান আর আয়ান আলি খান বাজালেন এই রাগটি সুর মেলাবার সময়ই ধরা পড়ে গেলো কী বাজাতে চাইছেন তাঁরা বেমিশাল সুরের দাপটে রাগ কিরওয়ানি প্রায় মধ্যরাতের বসন্ত আকাশের নিচে একটা অন্যরকম অভিঘাত নিয়ে এসেছিলো   

আমজদ আলি খান : https://www.youtube.com/watch?v=H9ns-cT-xOM 



(৪)

নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় : https://www.youtube.com/watch?v=CzsM8toCq9k

হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া : https://www.youtube.com/watch?v=n6m22khe8Mg

পন্ডিত শিবকুমার, পন্ডিত হরিপ্রসাদ, পন্ডিত বিশ্বমোহন, পন্ডিত রনু মজুমদার, পন্ডিত তরুণ ভট্টাচার্য, পন্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ, যাঁদের বাজানো কিরওয়ানি সামনে  বসে শুনেছি তা ছাড়াও মহামহিম দিকপালদের মধ্যে স্বয়ং উস্তাদ আলি আকবর, পন্ডিত নিখিল বন্দোপাধ্যায়, উস্তাদ আমজাদ আলি, উস্তাদ শাহিদ পরভেজ, উস্তাদ আব্দুল হালিম জাফর, পন্ডিত ব্রিজভূষণ কাবড়া, পন্ডিত রামনারায়ণ, পন্ডিত ভি জি যোগ, বিদুষী শিশিরকণা ধরচৌধুরী, বিদুষী এন রাজম এবং এক অদ্বিতীয় পন্ডিত রবিশংকর, তাঁদের বাজনা রেকর্ডে শুনেছি এছাড়া পন্ডিত এল সুব্রামনিয়ান আর উস্তাদ রইস খানের যুগলবন্দিটিও স্মর্তব্য তার পেশকারিতে কর্ণাটকি শৈলি সেনী ঘরানার গায়কী অঙ্গের মেলমিলাপের নৈপুণ্যে পন্ডিত রবিশংকরের দুই শিষ্য কার্তিক শেষাদ্রি আর অনুষ্কাশংকরও রাগ কিরওয়ানি' রূপায়নে নিজেদের ঘরানার ছাপ রেখেছেন প্রত্যেকেই নিজস্ব ধরনে অনন্য এবং এই অনুপম রাগটির সম্পূর্ণ  মজা সযত্নে আদায় করে রাগটির মর্যাদা রক্ষা করেছেন



আলি আকবর খান: https://www.youtube.com/watch?v=om3qC-T3a3U

রাশিদ খান : https://www.youtube.com/watch?v=ehB9j0gcMAk

শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীতে আমার প্রিয় শিল্পীদের মধ্যে উস্তাদ রাশিদ খানের গাওয়া রাগ কিরওয়ানি নিঃসন্দেহে সব চেয়ে বেশি মজাতে পেরেছে আমাকে 'তোরে বিনা মেরে চ্যয়েন নহি, ব্রিজ কে নন্দলালা...' এক কথায় লাজবাব অফতাব-- মৌসিকি উস্তাদ ফৈয়াজ খান একবার বলেছিলেন, রাগ কো উতনা হি ফ্যয়্লাও জব তক উসকা চেহরা সাফ না হো উসকে বাদ অওর নহি রাশিদের এই নিবেদনটি নিশ্চয় ওঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি নয়, কিন্তু রাগ কিরওয়ানির আসল চেহারাটি ধরেছেন নির্ভুল রামপুর সহসওয়ান ঘরানার আরেক দিকপাল উস্তাদ মুস্তাক হুসেন খানের পুত্র উস্তাদ গুলাম হুসেন খানের গাওয়া রাগ কিরওয়ানির রেকর্ড রয়েছে তবে তিনি মেজাজে অ্যাকাডেমিক, আকুতিতে রাশিদকে ছুঁতে পারেননি উস্তাদ মশকুর  আলি খানের গাওয়া রাগ কিরওয়ানি পরিবেশন শুনেছিলুম কিশোর বয়সে, এখনও কানে লেগে আছে তাঁকে ছাড়া কিরানা ঘরের আর কারো কণ্ঠে রাগ কিরওয়ানি আমি শুনিনি শুনিনি আগ্রা বা জয়পুর ঘরের কোনও মুখ্য প্রতিনিধির কণ্ঠেও চিরকাল গ্রামবাসী হয়ে থাকার ফলশ্রুতি হয়তো!

অশ্বিনী ভিদে দেশপাণ্ডে : https://www.youtube.com/watch?v=mGBixJOXAH8



(৫)

"ফিরিয়া যদি সে আসে", সুকুমার মিত্র : https://www.youtube.com/watch?
v=Z3oQsS0eqEs



বাংলাগানে রাগ কিরওয়ানির ছায়া বেশ কম অবাক লাগে, এত জনপ্রিয় সুর হওয়া সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের কোনও গান কিরওয়ানি অঙ্গে বাঁধা হয়নি সম্ভবতঃ এই রাগটি সেই সময়ে স্বীকৃত প্রধান হিন্দুস্তানি রাগগুলির তালিকায় ছিলো না পিলু, কাফি, খমাজ, যোগিয়া ভিত্তিক সুরে গান তো অসংখ্য, এমনকি গারাতে বাঁধা রবীন্দ্রসঙ্গীতও আছে, কিন্তু কিরওয়ানিতে নেই তাই লঘু মেজাজের সুর বলে অবহেলিত, এমনটি ভাবার কোনও কারণ নেই বোধ হয়  তাঁর গানে যদিও  কিছু কর্ণাটকি রাগাশ্রয়ী সুর নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানে কিরওয়ানির স্থান হয়নি হয়তো সেই সময় সে 'ঘরেও নহে, পারেও নহে' গোছের অবস্থানে ছিলো, নয়তো কবিকে হয়তো এই রাগটি কেউ গেয়ে বাজিয়ে শোনায়নি বাংলাগানে সুরের বৈচিত্র্য পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যপ্তির বিচারে নজরুলের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বিশেষতঃ রাগাশ্রিত সুরভিত্তিক কম্পোজিশন নজরুলের প্যাশন ছিলো কিন্তু নজরুলের গানেও আমার অতি প্রিয় 'ফিরিয়া যদি সে আসে, আমারে খোঁজে ঝরা গোলাবে' গজলটি ছাড়া চিহ্নিত রাগ কিরওয়ানি আর শুনিনি তবে নিবেদিত সিদ্ধ নজরুলগীতি শিল্পী সুকুমার মিত্র মশায় একটা অনবদ্য কম্পোজিশন করেছিলেন কিরওয়ানিতে, 'যমুনা কি বলতে পারে কতোবার কেঁদেছে রাধা....' গেয়েছিলেন শ্রীমতী শিপ্রা বসু একেবারে মণিকাঞ্চন যোগ আরেকটি মণিকাঞ্চন ছিলো ছোটকত্তা আর কিশোরের যুগলবন্দি 'একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে'... মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন

"যমুনা কি বলতে পারে", শিপ্রা বসু : https://www.youtube.com/watch?v=-DLhjQ-8b5s
"একদিন পাখি উড়ে", কিশোরকুমার : https://www.youtube.com/watch?
v=RQIfpDiS_Cw



(৬)

এবার বলি রাগ কিরওয়ানিতে বাংলায় আমার প্রিয়তম রচনা শ্রদ্ধেয় রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া 'আমার মধু বনের ফুল, না ফুটিতে অবেলাতে ঝরিতে আকুল' আমার কাছে যে লাইভ রেকর্ডিংটি রয়েছে সেখানে স্বয়ং রাধাকান্ত রয়েছেন সঙ্গতে ঢিমে দাদরায় শুরু হয়ে তা আস্থাইতে যখন ফিরে আসছে দ্বিগুন লয়ে রাধাকান্তের তেরেকেটের মিহিন জালির কাজ, সঙ্গে রামকুমারের কণ্ঠসম্পদ খাজুরাহোর ভাস্করদের ছেনির মতো মসৃণ, দীপ্ত দৈবী মহিমায় ঋদ্ধ রামকুমার গানের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ছদ্ম ভর্ত্সনায় অনুজপ্রতিম রাধাকান্তের বাদননৈপুণ্যের ব্যাজস্তুতি করে চলেছেন বৈঠকী বাংলাগানের একটা পর্যায় সৃষ্টি হয়ে যায় এভাবে

(৭)



"ইয়াদ জায়েঁ", মহম্মদ রফি : https://www.youtube.com/watch?v=-DLhjQ-8b5s
"আঁখো সে জো উতরি হ্যাঁয় দিলমেঁ, আশা ভোঁসলে : https://www.youtube.com/watch?v=qitBaM3Ly8s

ভারতবর্ষে সঙ্গীতের সর্বস্বীকৃত জনপ্রিয় ধারা, হিন্দি ছায়াছবির সঙ্গে সম্পৃক্ত সুরের আয়োজনগুলি বাংলায় রাগ কিরওয়ানির বহুল ব্যবহার তেমন চোখে না পড়লেও হিন্দি ছবিতে বিভিন্ন সিদ্ধ সঙ্গীতকার বার বার এই সুরটিকে আশ্রয় করে বহু কালজয়ী গান আমাদের উপহার দিয়েছেন শংকর জয়কিশন এই সুরটি নিয়ে প্রায় অবসেসড ছিলেন প্রথমে যে গানটির কথা লিখেছি, সেটি ছাড়াও মনে পড়ছে কিশোরের কণ্ঠে 'গীত গাতা হুঁ ম্যঁয়, গুনগুনাতা হুঁ ম্যঁয়' বা রফিসাহেবের কণ্ঠে 'ইয়াদ জায়ে বীতে দিনোঁ কি' অথবা 'ম্যঁয় কভি কবি বন জাঁউ, তেরে প্যার মেঁ কবিতা' ছাড়াও 'লাভ ম্যারেজ' ছবিতে তিনি উপহার দিয়েছিলেন লতার কণ্ঠে 'কহে ঝুম ঝুম রাত ইয়ে সুহানি, পিয়া হওলে সে ছেড়ো দুবারা...'  এই রাগটি নিয়ে সুরের আরেক জাদুকর পাগল ছিলেন তিনি ওমকার প্রসাদ নৈয়র, ওরফে পি নৈয়র যদিও সবাই তাঁকে রাগ পিলুর প্রতি সমর্পিত বলেই বেশি জানতেন, কিন্তু কিরওয়ানিতে তাঁর কয়েকটি রচনার কথা ভাবা যাক রফিসাহেবের কণ্ঠে 'পুকারতা চলা হুঁ ম্যঁয়', 'ম্যঁয় প্যার কা রাহি হুঁ', আশার কণ্ঠে 'আঁখো সে উতরি জো দিলমেঁ, তসবির হ্যাঁয় এক অনজান কি' ছোটকত্তাও   পিছিয়ে ছিলেন না 'আনেওয়ালা পল, জানেওয়ালা হ্যাঁয়', 'মেরি ভিগি ভিগি সি পলকোঁ মেঁ রহ গই', 'রিমঝিম গিরে শাওন', 'তুম বিন জাঁউ কঁহা' এছাড়া আরো দু'টি গানের গানের উল্লেখ তো করতেই হয় শচীনকত্তার 'দুখি মন মেরে' এবং রবির 'ইয়ে রাতেঁ ইয়ে মৌসম নদী কা কিনারা, ইয়ে চঞ্চল হওয়া'...

 "রিমঝিম গিরে শাওন", কিশোরকুমার: https://www.youtube.com/watch?v=kg3gLQBVd18
"ইয়েহ রাতেঁ ইয়েহ মৌসম", কিশোর-আশা, https://www.youtube.com/watch?v=4np5V2wTXwE



(৮)

এক একটা বিশেষ সুর যখন রাগের মর্যাদা পায়, তখন তার একটা মূর্তিগত অস্তিত্ত্বও সৃষ্টি হয় তাদের দৃশ্যরূপ নিয়ে ভারতশিল্পে 'রাগমালা চিত্রে' পৃথক জঁরও কল্পিত হয়েছে শুধু শ্রাব্য থাকছে না সে আর, দৃশ্যরূপ নিয়ে স্বচ্ছন্দে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে যারা দেখতে পায়, তারা দেখে দিলীপ রায়ের ভাষায় 'ওরা হাসে আর বলে হায়রে মধুর স্বপন, বলে কৃষ্ণ কাহিনী কল্পনা কবিকথন আমি জানি, তাই মানি, আমি অন্তরে তার বাঁশরি শুনেছি তাই আমি তারে মানি' ধূর্জটিপ্রসাদ রবিশংকরের পরিবেশনা শুনে যে রকম বলেছিলেন, '...এতো স্পষ্ট, যেন মনে হয় রাগিণীর পটভূমি থেকে বেরিয়ে এসে চোখের সামনে দাঁড়ালো এই বেরিয়ে এসে দাঁড়ানো আধুনিক আর্টের একটি প্রধান লক্ষণ এতে একটু পশ্চিমী আমেজ থাকে নিশ্চয়ই... তাঁর বাজনা শুনলে আমার পূর্ব বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে সঙ্গীত মনের অন্য স্তরের ভাষা সাহিত্য ছাড়া অন্য, তবু ভাষা...'

রবিশংকর : https://www.youtube.com/watch?v=yff0Zgg5e_g



(৯)

'আর যা বলে বলুক অন্য লোক
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ...'

আমি একজন নিতান্ত ইতর শ্রোতা, কিন্তু এই ভাষাটি বোঝার সন্ধান যখন করি তখন আমাদের রাগরাগিণীগুলি এভাবেই মূর্ত হয়ে আমাকে অনেক কথা বলতে থাকে কিছু বুঝি, বেশিটাই বুঝি না তবু অকুলীন রাগ কিরওয়ানির সুর বহু দিগ্গজ সঙ্গীতস্রষ্টার মতো আমার কাছেও ময়নাপাড়ার কৃষ্ণা মেয়েটির মতো অমোঘ আবেদন নিয়ে হাজির হয় তাই কৈফিয়ৎ দেবার একটা দায় থেকেই যায়, সবার জন্য

"...যে বলয় তাকে দিতে চাই
তার অধীনতা দিয়ে গড়া হোক, কর্পূর জ্বলুক অশোক
দুধের বাটির পাশে, গলা রুপো থেকে তৈরি হোক
বাল্যের শিশির আর ঘুম গান, ঘুমে ঢলে পড়া কথা"

(উৎপলকুমার বসু