পঞ্চম বর্ষ / দশম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫২

শনিবার, ২৫ জুন, ২০১৬

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

দাবির পথ দেখিয়েছে সুইজারল্যাণ্ড






এই কদিন হলো (৫ই জুন) সুইটজারল্যাণ্ডে একটি রেফারেণ্ডাম তথা গণভোট অনুষ্ঠিত হলো, যার প্রস্তাব ছিল এই যে, দেশের সব লোক কাজ করুক না করুক  মাসে ‘মাইনে’, থুড়ি, স্টাইপেণ্ড পাবে। সরকারীভাবে পরিমাণ নির্দিষ্ট করে না দেওয়া হলেও যেটি বিবেচনার মধ্যে ছিল সেটি হলো বড়রা পাবে আড়াই থেকে তিন হাজার সুইস ডলার, আর বাচ্চারা ৬২৫ ফ্রাঁ। এই স্টাইপেণ্ড আসলে এক নিঃশর্ত মৌলিক বেতন ‘unconditional basic income’, যেটি বিরাজমান জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির পরিবর্ত। এই মৌলিক বেতন ব্যাপারটা বর্তমান দুনিয়ার এক ‘গরম’ টপিক। কারণ অনেকেই এখন এক কমকাজের ভবিষ্যতের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। তবে পৃথিবীর ধনাঢ্যতম দেশগুলির অন্যতম হিসেবে সুইটজারল্যাণ্ডেই প্রথম এটি গণভোটের বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পেল। যাঁরা এই স্টাইপেণ্ডের প্রবক্তা তাঁরা বলেছেন যে এটা সুইসদের একটি শোভন জীবিকার সঙ্গে সার্বজনিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেবে। প্রস্তাবের বিরোধীরা বলেছেন ‘automatic income’ কর্মস্পৃহার অনুদ্দীপক আর করবর্ধক। সরকারও বলেছিল যে এর ফলে দেশের অর্থনীতির উপর চাপ বাড়বে আর দক্ষ শ্রমিকদের অভাব ঘটিয়ে ব্যবসায়কে বিদেশে পাড়ি দিতে উৎসাহ দেবে। তাছাড়া এই স্টাইপেণ্ড জাতীয় দারিদ্র্যসীমার ঠিক উপরে। এসব গতের কথা সবাই জানে। এগুলো আঁতের কথা নয়।



গণভোটের ফলে অবশ্য দেখা গেছে যে প্রায় ৭৭% সুইস নাগরিক এই গণভোটের প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, আর ২৩%-এর কিছু বেশি এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই গণভোটের ফল যাই হোক, নিঃশর্ত মৌলিক বেতনের ব্যাপারটা সারা পৃথিবীতে একটি হট টপিক রয়েই যাচ্ছে। কারণ সারা পৃথিবীর নেতারা একদিকে বিশ্বে সম্পদের অসাম্য, আরেক দিকে ভবিষ্যতে যন্ত্র যে পৃথিবীর বৃহৎ সংখ্যক মানুষকে কর্মচ্যুত করতে পারে, সেটা নিয়ে ভাবছেন। সেই কারণে এপ্রিলে  সুইটজারল্যাণ্ডে লসান-এর সিটি কাউন্সিল প্রায় এই প্রস্তাব পাশ করে দিয়েছিল। আর অন্যান্য কিছু দেশেও যেমন ক্যানাডার অণ্টারিওতে, ফিনল্যাণ্ডে আর নেদারল্যাণ্ডস-এ এটাকে নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা হচ্ছে। সিলিকন ভ্যালির কিছু ধনীও ব্যাপারটায় বেশ আকৃষ্ট। Y Combinator-এর প্রেসিডেন্ট Sam Altman এর ব্যাপারটা সীমিতভাবে শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। আর প্রাক্তন গ্রিক অর্থমন্ত্রী  Yanis Varoufakis বলেছেন যে পৃথিবীর ধনাঢ্যতম দেশগুলির অন্যতম হিসেবে  সুইটজারল্যাণ্ডে এই আইডিয়াটা টেস্ট করার সুবর্ণ সুযোগ ছিল। হলো না সেটা আপশোষ!



প্রস্তাবটির গুণ ছিল এই যে যারা কাজ না করেও এই টাকা পাবে তারা বাকি সময় অন্নচিন্তা চমৎকারা থেকে রেহাই পেয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারবে। সাতাত্তর শতাংশ লোক এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন আর তেইশ শতাংশ পক্ষে। প্রশ্ন এই নয় যে যে বেশি শতাংশ লোক এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিলেন। যাঁরা বিপক্ষে ভোট দিলেন তাঁরা নিশ্চয়ই সকলে সমাজের উচ্চ বর্গের লোক নন, আর তাঁরা নিশ্চয়ই কোনো একই কারণে বা যুক্তিতে ভোট দেননি। যাঁরা পক্ষে ভোট দিলেন তাঁরাও নিশ্চয়ই সকলে সমাজের নিম্নবর্গের লোক নন,  আর নিশ্চয়ই কোনো একই কারণে ভোটও দেননি প্রশ্ন এটাও নয় যে এই ভোটে একটা কথা বেরিয়েও এলো, যে ওই দেশের অন্ততঃ তেইশ ভাগ মানুষ এই ব্যবস্থাকে কাম্য মনে করেন, আর তাঁরা সকলে সমাজের নিম্নবর্গের লোকও ননগোটা প্রস্তাবের পূর্বানুমান হয়তো দুটি, আর দুটিই মার্ক্স নামক এক বদ্ বুড়ো অনেক আগে বলে গিয়েছিলেন। মার্ক্স বলেছিলেন, প্রযুক্তি এখন (মানে তাঁর সময়ে) যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তাতে সব মানুষকে আট ঘণ্টা (বা তার বেশি) কাজ করতে হওয়ার কথা নয়। বেশি যে করতে হয় তার কারণ প্রযুক্তির মালিকানা ব্যক্তিমানুষের হাতে, তার মালিকানা সামাজিক নয়। ফলে উদ্বৃত্তর আহরণ ও আত্মসাৎকরণ চলতেই থাকেপ্রস্তাবের দ্বিতীয় পূর্বানুমানটিও মার্ক্স-অনুমত। সেটি হলো মানুষের অবসরকালীন সৃজনশীলতা সম্পর্কিত। জর্মান ইডিওলজি বইতে মার্ক্স বলেছিলেন সাম্যবাদী সমাজে দিনগত পাপক্ষয় থেকে, তার দাসত্ব থেকে মুক্ত মানুষ কোনো বিশেষ পেশায় নিরত থাকার থেকে আসা স্বরূপচ্যুতি থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের পূর্ণতার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিয়াকলাপে নিরত হবে। যেমন কেউ আজ যে কাল করছে, তার থেকে আলাদা কিছু করবে কাল। সকালে শিকার করা, দুপুরে মাছ ধরা, সন্ধ্যায় গোচর্যা করা, ডিনারের পর সমালোচনা করা এই মানুষের কোনো ঐকান্তিক ক্রিয়াকলাপের এলাকা থাকবে না। (In communist society, where nobody has one exclusive sphere of activity but each can become accomplished in any branch he wishes, society regulates the general production and thus makes it possible for me to do one thing today and another tomorrow, to hunt in the morning, fish in the afternoon, rear cattle in the evening, criticise after dinner, just as I have a mind, without ever becoming hunter, fisherman, herdsman or critic) সে কিন্তু কখনও কেবল শিকারী, জালিক, গোপালক, কিম্বা সমালোচক হয়ে উঠবে না। সে চাষ করবে ‘চাষী’ না হয়ে, গান গাইবে ‘গায়ক’ না হয়ে, খেলবে ‘খেলোয়াড়’ না হয়ে। খণ্ডমানুষ বা ‘species of man’-থেকে সত্যিকার বাঁচন্ত / জীবন্ত মানুষ বা ‘real living individuals’-দের তফাৎ কোথায়? সে স্ববিভক্ত নয়। পুঁজিবাদী সমাজে ‘divided, man's own deed becomes an alienpower opposed to him, which enslaves him instead of being controlled by him. For as soon as thedistribution of labour comes into being, each man has a particular, exclusive sphere of activity, which isforced upon him and from which he cannot escape. He is a hunter, a fisherman, a herdsman, or a criticalcritic, and must remain so if he does not want to lose his means of livelihoodএর থেকে মুক্তি সমাজ বদলে আসতে পারে, কিন্তু তার সহায়ক প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তির জোরেই লসান, অন্টারিও, ফিনল্যাণ্ড, নেদারল্যাণ্ডস এমনকি সিলিকন ভ্যালিও মানুষকে ‘কাজ’ থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছে।



তার মানে কি মুক্ত মানুষ ‘’-চিহ্ন বিবর্জিত কাজ করবে না? পুঁজিবাদী অর্থনীতিতেও নৃতত্ত্ব থেকে যে কটি অমূল্য ধারণা এসেছে, তা একটি হলো ‘leisure preference’ তার অনুষঙ্গটাও আজব। নৃতত্ত্ববিদরা দেখেছেন একই অরণ্যে বসবাসকারী দুই জনজাতির একটি কঠোর, আদিম কৃষিকার্যে অন্নের নিশ্চয়তা আনতে সারা বছর ঘাম ঝরায়। অথচ পাশেই অপর এক জনজাতি তাদের দেখেও তা না শিখে শিকার, চয়ন, খনন, সন্ধান (hunting, gathering, foraging) ইত্যাদির মাধমে খাদ্যের অনিশ্চিত বন্দোবস্তে তুষ্ট থাকে। প্রথমোক্তদের থেকে দ্বিতীয়োক্তরা অনেক বেশি আঁকায়, হস্তশিল্পে, গানে, নাচে, এককথায় সংস্কৃতিচর্চায় সময় কাটায়।



কেউ হয়তো এই অকর্তব্যের আহ্বানে বহু মানুষ সাড়া দিলে তার মধ্যে বিপদের সঙ্কেত খুঁজবেন। হয়তো H. G. Wells-এরTime Machine বইতে বলা সেই Eloi আর Morlock-দের কথা মনে করিয়ে দেবেন। তা দিন। কিন্তু আজ যখন উন্নত প্রযুক্তি আর উন্নত পুঁজিবাদ বিভিন্ন দেশের হাতে অতুল সম্পদ এনে দিচ্ছে, যখন কর্মহীন বিবৃদ্ধি (jobless growth) গ্রোথ সারা পৃথিবীর নেতাদের দৈনিক মাথাব্যথা, যখন পৃথিবীর কিছু মানুষ দুনিয়ার অধিকাংশ সম্পদ হাতে নিতে ব্যগ্র, যখন ‘precaritat’-দের বাড়বৃদ্ধি নতুন গণ আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যখন Friedrich Hayek-এর দ্বারা ধিক্কৃত জনকল্যাণবাদী ‘nanny state’ সরে যাওয়ার পরে নয়া-উদারনীতি এক Dean Baker কথিত Conservative Nanny State তৈরি করেছে, যার উদ্দেশ্যই কী করে ধনীদের আরো ধনী করা যায়, যার ফলে  আমরা ২০১৪ সালে ওই সুইজারল্যাণ্ডেই World Economic Forum-এর মীটিঙের সময় OxfamInternational  Working for the Few নামক প্রতিবেদনে জানিয়ে দিচ্ছে যে—

·        পৃথিবীর মাত্র এক শতাংশ মানুষ পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ সম্পদের মালিক
·        পৃথিবীর ধনাঢ্যতম এক শতাংশ মানুষের সমগ্র সম্পদ ১১০ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার নিচের অর্ধেকের সমগ্র সম্পদের ৬৫ গুণ বেশি
·        বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার নিচের অর্ধেকের সমগ্র সম্পদের পরিমাণ পৃথিবীর ৮৫ জন লোকের সমগ্র সম্পদের সমান
·        পৃথিবীর প্রতি দশজন মানুষের মধ্যে সাত জন এমন দেশে থাকে যেখানে গত তিরিশ বছরে অর্থনৈতিক অসাম্য প্রভূত বৃদ্ধি পেয়েছে
·        পৃথিবীর ধনাঢ্যতম এক শতাংশ মানুষের সমগ্র সম্পদ তথ্য মিলেছে এমন ২৬টি দেশের মধ্যে ২৪টিতে জাতীয় আয়ে তাদের ভাগ ক্রমাগত বাড়িয়েছে
·        আমেরিকাতেই ২০০৯ সাল থেকে অর্থসঙ্কটের পরবর্তী বিবৃদ্ধির ৯৫ শতাংশ পকেটে পুরেছে ধনাঢ্যতম এক শতাংশ মানুষ আর নিচের নব্বই শতাংশ ক্রমাগত আরো গরিব হয়েছে—



   তখন নিঃশর্ত মৌলিক বেতন চাই প্রত্যেকটি মানুষের জন্য, প্রত্যেকটি শিশুর জন্যে, ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে’ আর ‘তার মুখে খবর পেলুম: সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক’। এটা আর কিছু নয় যে ভূপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হলো সে তার ‘নোশনাল’  ভাগ, ‘ন্যাশনাল’ হিসেবে নয়, গ্লোব্যাল নাগরিক হিসেবে। সেই ঠিক করবে কী কাজের কাজী হবে সে। আর কেউ নয়। গোটা পৃথিবী বিক্কিরি হয়ে যাবে! মাজাকি! 



0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন