পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

মঙ্গলবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

কালিমাটি অনলাইন /
   

‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিন আপনাদের সবার সহযোগিতায় ও ভালোবাসায় মোটামুটি নিয়মিত ভাবেই প্রকাশ করতে পারছি। খুবই কম সময় সীমায় ইতিমধ্যে ৩৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হলো। আমাদের এই ব্লগজিনে আমরা যে বিভাগগুলি প্রতি সংখ্যায় পরিবেশন করছি, আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, প্রতিটি বিভাগেই একদিকে যেমন বৈচিত্র্যের ব্যাপারটা আছে, তেমন অন্যদিকে আছে নতুনত্বের অন্বেষণ। সাহিত্যে এবং জীবনচর্চায় যা নিয়মিত চলে আসছে – গতানুগতিক ও একঘেয়ে – আমরা তা বহন করে চলতে উৎসাহী নই আদৌ। বরং আমাদের প্রতিদিনের খোঁজ নতুনতর সাহিত্য ও জীবনচর্যা। আসলে আমাদের ভৌতিক জীবন যেমন বিজ্ঞান ও অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, আমাদের মনোগত জীবন তেমনই নিয়ন্ত্রিত হয় শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কলা ইত্যাদির দ্বারা। এবং সেখানে কোনো থেমে থাকার ব্যাপার নেই, সব কিছুই চলমান ও গতিশীল। নিত্য নতুন প্রবাহের জোয়ারভাঁটা। প্রতিদিন খনন উৎসব

এই সংখ্যা থেকে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস ‘তাহার নামটি’। যাঁরা এর আগে অলোকপর্ণার গল্প পড়েছেন, তাঁরা জানেন তার কলম কতটা শক্তিশালী। বয়সে নিতান্ত তরুণ অলোকপর্ণা তার লেখায় এগিয়ে চলেছে সম সময়কে অতিক্রম করে। তার লেখা উপন্যাসে আপনারা সেই হদিশ পাবেন।

আপনারা সবাই অবহিত আছেন যে, ‘কালিমাটি’ পত্রিকা বাংলা গল্পে একটি নতুন ফরম্যাটের সূচনা করেছে, যার নামকরণ করা হয়েছে ‘ঝুরোগল্প’। বিশ্ব সাহিত্যে অন্য কোনো ভাষায় এর আগে এই ফরম্যাটের উদাহরণ আছে কিনা, আমাদের জানা নেই, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে যে এই প্রথম, এ ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, অনেকেই ‘অণুগল্প’কে ‘ঝুরোগল্প’ মনে করে ব্যাপারটা গুলিয়ে ফেলেন; কিন্তু ‘অণুগল্প’ ও ‘ঝুরোগল্প’র মধ্যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিরাট পার্থক্য আছে। ব্লগজিনের এই সংখ্যায় ‘কালিমাটির ঝুরোগল্প’র ৪৫তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এটা আমাদের কাছে একটা বিরাট অভিজ্ঞতা। আর সেইসঙ্গে আমাদের এই নিয়মিত ঝুরোগল্প চর্চায় আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন  আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম, এমনকি এই শতাব্দীর তরুণতর প্রজন্ম এটা আমাদের কাছে বিরাট প্রাপ্তি। এবং  শুধুমাত্র ভারতের কথাশিল্পীরাই নয়, বরং বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী কথাশিল্পীরাও এগিয়ে এসেছেন ঝুরোগল্প নির্মাণের যজ্ঞে।

সেইসঙ্গে আরও অন্যান্য বিভাগ – কবিতার কালিমাটি, কথনবিশ্ব, প্রতিবেশী সাহিত্য, চারানা আটানা, ছবিঘর – প্রতি সংখ্যাতেই সৃজন করে চলেছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির নতুন নতুন দিক ও মাত্রা। ইদানীং বাংলা সাহিত্যে রম্য রচনার ধারাটি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। রম্য রচনার নামে যৎকিঞ্চিত যা রচিত হচ্ছিল, তার মধ্যে নতুনত্ব কিছু আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এই বিষম পরিস্থিতিতে কালিমাটি অনলাইনের জন্য কলম ধরেছেন অমিতাভ প্রামাণিক তাঁর ‘চারানা আটানা’য়। আপনারা সবাই  জানেন যে, অমিতাভ তাঁর অনন্য প্রতিভায় কীভাবে পুনঃপ্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছেন এই  লুপ্তপ্রায় সাহিত্যের ধারাটিতে। ঠিক একইভাবে অক্লান্ত শ্রম ও নিষ্ঠায় প্রতিটি সংখ্যায় প্রতিবেশী সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন জয়া চৌধুরী। আর ‘কথনবিশ্ব’ বিভাগে অত্যন্ত চিন্তাশীল, বিচক্ষণ ও প্রতিভাবান প্রবন্ধ-নিবন্ধকাররা যেভাবে বিভিন্ন আলোচিত, স্বল্পালোচিত ও অনালোচিত বিষয়ে মননশীল ও গভীর লেখাগুলি আপনাদের কাছে নিবেদন করছেন, তা অনন্য চিন্তা ভাবনার সাক্ষ্য বহন করে। আর ঠিক একইভাবে ছবিঘর বিভাগে শিল্পীরা তাঁদের আলোকচিত্র ও অঙ্কনচিত্রে সৃজন করে চলেছেন অনবদ্য শিল্পের সম্ভার। এবং এ সবই সম্ভব হয়েছে আপনাদের একান্ত সহযোগিতায় ও ভালোবাসায়।
    
‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনের প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের কাছে আবার আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনারা অনুগ্রহ করে প্রকাশিত লেখা ও ছবি সম্পর্কে আপনাদের অভিমত ব্লগজিনের ‘কমেন্টবক্সে’ লিপিবদ্ধ করবেন। প্রতিটি লেখা ও ছবির নিচে ‘কমেন্টবক্স’ আছে।

সবাইকে শারদ শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাই।         
     
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
0657-2757506 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India

      

<<<< কথনবিশ্ব >>>>


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

মাপ




দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরমার ঝুলিতে বাইশ জোয়ান তেইশ জোয়ান’-এর গল্পটা বোধ হয় সব বাঙালির পড়া বা শোনা। সেই যে কে বড় তার প্রতিযোগিতা শেষে বাইশ জোয়ান তেইশ জোয়ান, তাদের দাঁতনের সুপুরিগাছ, বটগাছ,‌ তাদেরকে সব সমেত ট্যাঁকে ভরে ফেলা রাখাল আর রাখালকে তার গরুর পাল সমেত ঠোঁটে তুলে নেওয়া পাখিকে, ছাদে বিকালে প্রসাধনরতা রাজকন্যার চোখে পড়া ছোট ছোট কুটিতে নামিয়ে এনেছিল এইগল্প! এর থেকেই প্রথম আমার মাপের ব্যাপারটা ছোটবেলায় মাথায় আসে। মাপের ব্যাপারটা সেখানে গেড়ে বসে ছাত্রজীবনে শখে (ক্লাস এইট থেকে সারা জীবন অধীতব্য বিষয় হিসেবে ইতিহাস না থাকায় প্রচুর পড়তে বাধ্য হয়েছি) Edwardes এবং Garrett-এর লেখা মুঘল শাসনের উপর বইটি পড়েতার ‘Mughal Architecture and Arts’ অধ্যায়ে আকবরের ফতেপুর সিক্রি থেকে শুরু করে জাহাঙ্গিরের পেইণ্টিং বিষয়ে জ্ঞান, শাহজাহানের তাজমহল সহ বিবিধ স্থাপত্য আরো নানান ক্ষেত্রে মুঘল বাদশাহদের জ্ঞান, কুশলতা, উৎসাহ, অবদান ইত্যাদি ব্যাখ্যানের পর তাঁরা এক ফরাসি লেডি Marechale-এর একটি মন্তব্য পুনঃধ্বনিত করেছিলেন লেখকদ্বয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি অভিজাতদের  এক দুর্নামগ্রস্ত সদস্যের সম্পর্কে উচ্চারিতসেই অসাধারণ মন্তব্যটি হলো, ‘Depend upon it Sir, God thinks twice before damning a man of that quality’ 


এই মাপের ব্যাপারটা আমার মাথায় আবার ঢোকে বছর পঁচিশ-তিরিশ আগে শ্রী সত্য সাঁইকে ঘিরে বিতর্কের সময়। সাঁই-এর ঐন্দ্রজালিক কাজকারবারের বিরুদ্ধে অন্ধ্রপ্রদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চ্যালেঞ্জ জানানোর পর এবং তাঁকে পরীক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানানোর পর সত্য সাঁই সদম্ভ উক্তি করেছিলেন, ‘অ্যাণ্টলোগ্ গডলোগকো টেস্ট ক্যায়সে করেগা?’ স্বভাবতঃই আমার সহানুভূতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দিকেই ছিল কিন্তু তাঁর ওই অনধিকারী মন্তব্যটি মাপের  ব্যাপারটা আমার মাথায় পুঁতে বসিয়ে দিয়েছিলসত্যিই তো আমরা যারা অ্যাণ্টলোগ্’, তারা এই সব অতিমানবদের কোন মাপ দিয়ে মাপব? রিচার্ড বি. ফেইন্‌ম্যান এঁদের বলেছিলেন মনস্টার মাইন্ড্‌স তিনি নিশ্চয় ঠাট্টাই করছেন মিঃ  ফেইনম্যানামের অসামান্য আত্মজীবনী ধাঁচের বেস্টসেলার রম্যরচনায়! সারা   বই জুড়ে তিনি একথা বলেছেন আইনস্টাইন, নিয়েল্‌স বোহ্‌র, এনরিকো ফের্মি ইত্যাকার মণীষী পদার্থবিদ্‌দের প্রসঙ্গে। সেই ফেইন্‌ম্যান যিনি নিজে গণ্য ছিলেন সমকালে আইনস্টাইনের পর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্‌ হিসেবে, অথচ রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে চারটি অসমাপ্ত কাজ ছাত্র/সহগবেষকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন, যাদের প্রত্যেকে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিল! মানে,  প্রত্যক্ষভাবে একটি আর পরোক্ষভাবে চারটি নোবেল প্রাইজের উৎস, সমকালের শ্রেষ্ঠ তালাভাঙার মানুষ, আত্মপরিচয় গোপন ক’রে ব্রাজিলের নাম করা সাম্বা ব্যাণ্ডের ফেরেইরা বাদক কিছু মানুষের মাপের হদিশ না পেয়ে তাঁদের বলছেন মনস্টার মাইন্ড্‌স ব্যাপারটা বুঝুন!

রবীন্দ্রনাথ, যাঁকে বুঝুক বা না বুঝুক, না আওড়ালে বাঙালির ভাত হজম হয় না, তিনি আবার এই মাপের ব্যাপারটাকে স্বভাবতঃই দুই ভাবে দেখেছেন। একদিকে তাঁর কাছে মহামানুষ একযন্ত্র, একটা মাপঅণুবীক্ষণ যন্ত্রে ছোট জিনিকে বড়  দেখায়, এখানে বড় জিনিকে ছোট দেখায়, ফলে আমাদের যত ছোট আমরা তার চেয়ে বেশি ক্ষুদ্র লাগে আরেকদিকে একটা অন্য মাপের কথা রবীন্দ্রনাথ  বলেছিলেনমহাপুরুষদের অভিঘাতের সম্পর্কে, ‘মহাপুরুষদের মাপতে হয় তাঁদের ব্যর্থতা দিয়ে কিন্তু বহু মানুষ আছেন যাঁরা ধর্মীয় অর্থে এমনকি সেকিউলার অর্থেও মহাপুরুষনন হয়তো, কিন্তু বিশাল মাপের মানুষ। আমি মেধার সংকীর্ণ অর্থেই বলছি আর ধরছি কেবল তাঁদের কয়েকজনের পড়াশোনার পরিধি, এপারে ওপারে!  

রাসেল তাঁর একটা বইতে জেমস মিলের উপর অধ্যায়ে তাঁর ব্যক্তিত্বকে পরিস্ফুট করার জন্য একটি সিচুয়েশনের কথা বলেছেন, যেখানে চোদ্দ বছর বয়সে জন  স্টুয়ার্ট মিলের এক বছরের জন্য বিদেশে যাবার প্রাক্বালে জেমস তাঁকে কিছু উপদেশ দিচ্ছেন। রাসেল এটার সঙ্গে তুলনা করেছেন সদৃশ কোনো পরিস্থিতিতে পলোনিয়াসের বাগ্‌বিন্যাসের সঙ্গে। কোথায়, তা বাহুল্যবোধে বলে দ্যাননি। আমিও বলছি না। এর আগে অবশ্য জনের পড়াশোনা তেমন হয়নিআট বছর থেকেই নিজের পড়া  ছাড়াও গোটা আস্টেক ভাইবোনেদের প্রত্যেককে পড়াতে হতো। তারা পড়া না পারলে খাওয়া বাদ দেওয়াও নাকি বাদ যেত না। ফলে পুরো ইলিয়াড, অডিসি, ইস্কিলাস, সফোক্লিস এবং ইউরিপিডিস, সব ল্যাটিন লেখক, বেশ খানিকটা ইতিহাস, খুব খুঁটিয়ে রোম্যান শাসনতন্ত্র, এসব ছাড়া এগারোর শেষ পর্যন্ত বেশি কিছু পড়তে পারেননি মিল। বারো বছরের আগে খুব বেশি হলে বীজগণিত, জ্যামিতি, ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস আর উচ্চতর গণিতের বেশ খান কয়েক এলাকা। এতে  অবশ্য ভাবা ঠিক হবে না যে জন জীবন থেকে একেবারেই ফানবলতে কিছু পাননি। আত্মজীবনীতে নিজেই বলেছেন এক্সপেরিমেণ্ট্যাল সায়েন্স থেকে তিনি একশো মজা লুটতেন। কেবল তাত্ত্বিক অর্থে অবশ্য, প্র্যাক্‌টিক্যাল দিক থেকে নয়। সেই সময় কেবল অন্যদের এক্সপেরিমেণ্ট পড়ে, এমনকি তাঁদের সেটা করতেও না দেখে তিনি যে কী পরিমাণ ফাঁকি দিয়েছেন বা তাতে পড়েছেন সেই দুঃখ তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত যায়নি। তবে ওই দোষের একটু ক্ষতিপুরণও হয়েছিল। বারোতে শুরু করলেন লজিক পড়া। সে বিষয়ে অ্যারিস্টটলের যৎসামান্যও যা বলার ছিল সেটা সেরেস্কুলমেন’-দের (জানেন নিশ্চয়, Anselm of Canterbury, Peter Abelard, Alexander of Hales, Albertus Magnus, Duns Scotus, William of Ockam, Bonaventure থেকে St. Thomas Aquinas)অ্যাকোইনাসের Summa Theologicae, Summa Contra Gentiles, এবং St Augustine-এর De libero arbitrio-তো যদ্দূর মনে হয় পড়েই ছিলেন। না হলে জানবেন কী করে কীভাবে  ক্রিস্টিয়ানিটির মাধ্যমে প্লেটোবাদবা(Platonism) আর অ্যারিস্টটলবাদ (Aristotelianism) ইয়োরোপে অনুপ্রবেশ করল? এটা তো আমাদের সময়কার রাষ্ট্রদর্শনের হরে-নরে-পড়ে ছাত্ররাও জানতেন) এছাড়া বিনোদনও তো ছি! বাবার সঙ্গে Bagshot Heath-এ বেড়ানোর সময় গল্প হতো syllogistic logic, মানে এককথায় ন্যায় কেন ফালতু নয় আর তা আমাদের যুক্তিকে সত্যিকারের সুসংবদ্ধ চেহারা দিতে সাহায্য করে!

রাসেল বলছেন এই উপদেশের ঠিকঠাক কথাগুলো কোথাও লিপিবদ্ধ না থাকলেও সেটা ছিল মোটামুটি এইরকম, সেটা আবার আমার যা তা অনুবাদে— জন: এই মুহূর্ত পর্যন্ত, এই সত্য স্মরণ রেখে যে নিজের মেধা বা গুণাবলীর সম্পর্কে অত্যধিক উচ্চ ধারণা এক শোচনীয় দোষ, আমি সতর্কভাবে তোমার থেকে লুকিয়ে রেখেছি কী পরিমাণে তোমার বোদ্ধিক অর্জনগুলি তোমার বয়সের অধিকাংশ ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে। এখন, অবশ্য, তোমার কল্যাণের কারণে তোমার জন্য আমি যে বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তার ফলে এটা নিশ্চিৎ যে আমার থেকে না হলেও তুমি এই তথ্য অন্যদের থেকে জেনে যাবে; কেউ কেউ হয়তো এতই অবিবেচক হবে যে তোমাকে এর জন্য সাধুবাদ দেবে, এবং তোমার মাথার মধ্যে এই ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দেবে যে তুমি অলোকসামান্য ক্ষমতা ধরো। বস্তুতঃ যা কিছুই তুমি অন্যদের থেকে বেশি জানো কোনোভাবেই তোমার অন্তঃস্থ কোনো গুণের কারণ হিসেবে ধর্তব্য হতে পারে না, এর কারণ কেবল সেই অসামান্য সুযোগ যা তোমার ভাগ্যে পড়েছে, আমার মতো একজন পিতা পাওয়া,  যিনি তোমাকে পড়াতে কেবল সমর্থ নন, তার জন্য প্রয়োজনীয় ঝামেলা নিতে এবং সময় দিতে ইচ্ছুক। তুমি যে অন্য বহু কম ভাগ্যবান ছেলের চেয়ে বেশি জানো এটা কোনো প্রশংসার ব্যাপারই নয়; বরং তুমি না জানলে লজ্জার ব্যাপার হতো।



এটা কেবল পড়ার মাপ, বাপ ছেলের। এপারে — শুনেছি রাজা রামমোহন রায় বাল্যবয়সেই আরবী, ফার্সি, সংস্কৃতর সঙ্গেই বেশি বয়সে ইংরেজি ছাড়াও গ্রিক, হিব্রু, আর ল্যাটিন শিখেছিলেন। মকরন্দ পরাঞ্জপে লিখছেন তিনি অন্ততঃ ১০টি ভাষা জানতেন। স্বগ্রামে বাংলা আর ফার্সি শেখার পর তাঁকে নবম বর্ষে পাটনায় পাঠানো হয় আরবী শিখতে। তিন চার বছরের মধ্যে আরবী আর ফার্সি ভাষা সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে তিনি কেবল পারস্য আর আরবের তাবৎ কবি আর দার্শনিকদের পড়ে ফেলেন (এঁদের মধ্যে সুফিরা বেদান্ত ও যোগের সঙ্গে তাঁদের সাদৃশ্যের কারণে তাঁকে আকৃষ্ট করেন) তাই নয়, আরবীতে অ্যারিস্টটল ও ইউক্লিড পুরো পড়ে ফেলেন! মৌলভীদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নামেন। বারো বছরে বারাণসীতে গিয়ে সংস্কৃত পাঠ শুরু করেন, আর ১৬ বছর পর্যন্ত হিন্দু শাস্ত্র ও দর্শন পাঠ শেষ করে, বেদান্ত ও উপনিষদের পাঠ আত্মস্থ করে এক দৃঢ় একেশ্বরবাদী হয়ে ওঠেন। আর ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নামেন।

এর পরে বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু আবার হিন্দুদের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক কেতাব লিখে বাবা রামকান্ত রায়ের বিরাগভাজন হন, আর তার ফলে গৃহত্যাগ করে দেশ দেশান্তরে ঘুরতে ঘুরতে তিব্বতে যান বৌদ্ধ ধর্মের পুঁথিপত্র পড়ে তার সম্পর্কে জানতে। সেখানে একেশ্বরবাদ প্রচার করতে গিয়ে প্রায় মৃত্যুমুখে পড়েন, কিন্তু এক তিব্বতী মহিলার দয়ায় প্রাণ নিয়ে ফিরে আসেন। আবার বাড়ি আর সন্তপ্ত বাবার কাছে ফিরে রামমোহন ইংরিজি শিক্ষায় ব্রতী হন! সন ১৮০০ থেকে ১৮১৩ তিনি বিভিন্ন সরকারি পদে কাজ করে পরে সেরেস্তাদার হন, আর দশ বছর রামগড়, ভাগলপুর, আর রংপুরে কোম্পানির দেওয়ান হন। John Duncan Martin Derrett লিখেছেন রংপুরে থাকার সময় তিনি হরিহরানন্দ নামে এক তান্ত্রিক সাধুর কাছে ‘modern tantric works’ পড়েন। এই সময়ে তিনি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তর্কাতর্কি করা ছাড়াও বেশ কিছু কেতাব লিখেছিলেন ফার্সিতে। আর বেদান্তের কিছু অংশ অনুবাদ করেছিলেন। তাদের অস্তিত্ব নেই তবে এই সময়ে রংপুরে তাঁর সর্বৈব বিরুদ্ধে লেখা আর ১৮৩৮ সালে (মানে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মসালে) কলকাতায় প্রকাশিত একটি জ্ঞানাঞ্জন নামের একটি বইয়ে তার উল্লেখ আছে। ১৮০৪ সালেই তাঁর লেখা ফার্সি বই Tuhfat’ ul Muhwahiddin তাঁরওই ভাষায় জ্ঞান ছাড়াও সুফি দর্শনের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক বৈদান্তিক দর্শনের অসাধারণ সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ভারতবর্ষে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলির একটি হিসেবে বিবেচিত হয়


আমি রামমোহনকে প্রচলিত অর্থে মহাপুরুষ ধরি না। ১৮১৪ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে কলকাতায় ধর্মপ্রচার করার সময় তিনি জমিদার পিতার সাহায্য ছাড়াই বিত্তশালী ব্যক্তি। আর তাঁর ধনোপার্জনের পথ সম্পর্কে বিতর্ক আছে। Martin Derrett তাঁর ‘A Juridical  Fabrication of Early British Empire’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘Indeed the sources of his wealth are known to have  been various, but we cannot accuse him of any particular degreeof corruption in office, notwithstanding the habits of the time.’ কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি কীরকম? ১৭৭২ বা ৭৪-এ রামমোহনের জন্মের সময় ভূমি  ব্যবস্থায় পরীক্ষা নিরীক্ষা  চলছিল। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। রামমোহন যখন প্রথমে কোম্পানির কলেক্টর Thomas Woodforde অধীনে Writing Service-এ মুনশির চাকুরিতে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে পদত্যাগ করার পর, রামগড়, ভাগলপুর, আর রংপুরে অন্য এক সিভিলিয়ান অফিসার John Digby-র অধীনে সেরেস্তাদার বা দেওয়ান হিসেবে কাজ করছেন, ঠিক সেই সময়েই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলবৎ বা কায়েম হচ্ছে! আর এই সময় রামমোহন ইতিমধ্যেই সিভিলিয়ান অফিসারদের দেওয়া সুদের কারবারে বেশ জমজমাট! ১৯৯৭-তে Andrew Ramsey-কে ৭,৫০০ টাকা, ১৮০২ সালে Woodforde-কেই ৫,০০০ টাকা ধার দেওয়ার দলিল আছে। কোম্পানির কাগজ ও শেয়ার কেনাবেচা চলছে তার সঙ্গে, সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে যে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছেন কোম্পানির কাজে, অর্থাৎ নিজের নামে কোম্পানির কাগজ কিনছেন। এর সঙ্গে ১৭৯৯ সালে গোবিন্দপুরে এবং রামেশ্বরপুরে দুটি তালুক ছাড়াও কয়েকবছর পরে আরো চারটি তালুক কিনেছেন। এগুলি তাঁকে প্রায় ১২,০০০ টাকার মুনাফা যুগিয়েছে।১০ নিজের দপ্তরের অভিজ্ঞতা ও আভ্যন্তরিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নতুন আইনজ্ঞানহীন পুরনো জমিদারদের সম্পত্তি লাটে ওঠার সময় আগে ভাগে খবর পেয়ে কম দামে কিনছেন ‘monied purchasers of estates sold during the upheavals surrounding the Permanent Settlement’১১ Martin Derrett ঠিকই বলেছেন একে ঠিক কোনো বিশেষ মাত্রার দুর্নীতিবলা যাবে না, এই সময়কার অভ্যাস যাই থাক’, কিন্তু একেবারে ঋষিসুলভও বোধহয় নয়! বহু জায়গায় এসব বেশ চুনকাম করে লেখাও আছে।১২ তবে আরেকটি খবর একটু বোধহয় গোলমেলে। ১৭৯৬-৯৭ সালে উইলিয়াম কেরী এবং তন্ত্রগুরু হরিহরানন্দ বিদ্যাবাগীশের সঙ্গে তিনি যে মহানির্বাণ তন্ত্র নামে এক প্রাচীন (?) ধর্মীয় গ্রন্থ আবিষ্কার (?) করেন যার ‘এক সত্য ঈশ্বর’ বিষয়ক তত্ত্ব বাদে তার হিন্দু আইন বিষয়ক ধারাগুলি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সংক্রান্ত সম্পত্তি বিতর্কে ইংরিজি আদালতগুলিতে ব্যবহৃত হতো, আর কিছু অর্থাগমেরও সুযোগ করে দিয়েছিল, অন্ততঃ যতদিন না ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটরা এর প্রামাণিকতা নিয়ে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েন, আর হিন্দু আইনের উৎস হিসেবে এর ব্যাখ্যানের জন্য পণ্ডিতদের উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেন! আশ্চর্যজনকভাবে আদি ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক প্রকাশিত ও একেবারে অপ্রথাগত ধরনের তন্ত্রটির প্রামাণ্যতা নিয়ে আর রামমোহনের সঙ্গে তার যোগ নিয়ে   সন্দেহ তন্ত্রশাস্ত্রের উপর গবেষণাতেও রয়েছে!১৩

কিন্তু ইতিমধ্যে বেশ কিছু অর্থাগম হয়েছে, আর কুসীদের আয়ের সঙ্গে নতুন কেনা জমিদারিগুলির আয় যোগ করে ১৮১৪ সালে কলকাতায় গ্রামীণ সম্পত্তিভোগী নতুন নাগরিক ভদ্রলোকশ্রেণির সদস্য হিসেবে নিজের আসল কাজ ধর্মসংস্কারে মন দিয়েছেনতাঁর আত্মীয়সভা (১৮২৮) প্রতিষ্ঠা, ব্রাহ্মধর্ম সৃষ্টিও সতীদাহ নিবারণের মতো সমাজ সংস্কারের দিন সমাগত 




তো, বছর বিয়াল্লিশ আগে আমার এক রামমোহন-ভক্ত অল্পশিক্ষিত বৈবাহিক আত্মীয়কে এসব বলায় তিনি তো ভীষণ চটে গেলেন! বললেন, তাহলে তুমি নিজে রামমোহন রামমোহন কর কেন! তুমি তো আর বেহ্ম নও (আমি ইতিমধ্যেই  আবার রাগজনকভাবে ব্রাহ্মণ কিনা)! আমি বলেছিলাম, ওই মাপের জন্যে! যে বিশাল মাথায় দশটা ভাষার ও তাদের প্রধান সাংস্কৃতিক সম্পদগুলি সম্বন্ধে জ্ঞান; কোম্পানির আইনও কোম্পানির আমলে নতুন ব্যবসায়ের সুযোগ সুবিধার জ্ঞান, শেয়ার বিক্রি, জমির ফাটকাবাজি, মহাজনী কারবার, বেদান্ত, উপনিষদ, নতুন ধর্ম সংস্কার তথা ব্রাহ্মধর্ম সৃষ্টি, অসীম সংস্কৃত জ্ঞান আর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আমলে আইনন্ত্রের বদলগুলির জ্ঞানের ভিত্তিতে একটা গোটাগুটি তন্ত্র নির্মাণের ক্ষমতা, সতীদাহ নিবারণের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রকে নিয়োজিত করার সাহস ও দূরদর্শিতা সব ঢোকে; তার সঙ্গে থাকে ১৭ বছর বয়সে, মানে আজকালকার প্লাস টু পড়া বয়সে, একা তিব্বতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একেশ্বরবাদ প্রচার করার সাহস, তাকে আমি বলি ফেইনম্যানের কথায় মনস্টার মাইন্ড্‌, যার জন্যে আভূমি প্রণত হওয়া যায় তার সঙ্গে যদি যোগ করি নিজের বাবার সম্পত্তি বিকিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁকে ও তাকে উদ্ধার না করার মানসিক দৃঢ়তা, আর একা একটা  পাঁঠার পুরো মাংস খেয়ে ওঠার মতো সক্ষম, জৈবনিক ক্ষুধা তাহলে  যে মাপ তৈরি হয়, সেটা ওই রবীন্দ্রনাথের বলা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ধরনের মহামানুষ, যার ফলে তাঁকে Vincent Smith বলেছেন, ‘the greatest creative personality of the nineteenth century India’!১৪ আমি তাঁর ‘মাপ’-ই মাপি, আর দেখি যে তিনি ওই দক্ষিণারঞ্জনের রাজকন্যের চেয়েও অনেক বড়; অনেক অনেক বাইশ জোয়ান তেইশ জোয়ান, রাখাল, রাজকন্যে দিয়ে তাঁকে তোয়ের করেছেন সেই একমেবাদ্বিতীয়, যিনি এঁকে এঁর শত দোষ সত্ত্বেও অভিশাপ দিতে ভয় পাবেন!
 
গ্রন্থসূত্র ও টীকা


1.   Stephen Meredyth Edwardes & Herbert Leonard Offley Garrett-এর Mughal Rule In India (New Delhi: Atlantic Publishers, 1995), p. 350.
2.   Richard Feynman, Surely You Are Not Joking Mr. Feynman (London: Unwin Paperbacks, 1986), 77-80.
3.   Bertrand Russell, Legitimacy Versus Industrialism 1814-1848 (London: Unwin, 1935/1965), p.103.
4.   Makarand R. Paranjape, Making India, Colonialism, National Culture and the Afterlife of Indian English Authority (New Delhi: Springer, 2013), p. 37.  
5.   J. C. Ghosh (ed.), The English Works of Raja Ram Mohan Roy (Calcutta: Oriental Press, 1885), pp. iv-v.
6.   Cromwell Crawford, ‘Raja Ram Mohan Roy’s Attitude toward Christians and Christianity’, in Arvind Sharma (ed.),Neo-Hindu Views of Christianity (Leiden, the Netherlands; New York: E. J. Brill, 1988), p. 16.
7.  John Duncan Martin Derrett,Essays in Classical and Modern Hindu Law, Vol. 2, Consequences of the Intellectual Exchange with the Foreign Powers (The Nether lands: Leiden Brill 1977), p. 169.
8.  Brajendranath Bandyopadhyay, Ramamohana Râya, Sahitya-sadhaka caritamala, Vol. l, no.l6  5th edn., (Calcutta,Bangiya Sahitya Parishad), 1960, p. 18, 21; and  Selections from official letters and documents relating to the life of Raja Rammohun Roy, ed. by R. Chandra, and J.K. Majumdar, 1935, p. xxxiv, xxxvi. 
9.   He employed himself in dealing with Company’s name … or buy Company’s papers in his own name’, Selections from official letters and documents, p. xxxvii.
10. Ramamohana Râya,p. 19; Selections from official letters and documents, p. xxxv, and xxxix.
11.  Barbara D. Metcalf, Thomas R. Metcalf, A Concise History of Modern India, Third Edition (Cambridge [England]; New York: Cambridge University Press, 2012),p. 88.
12. Poonam Upadhyaya, Social, Political, Economic and Educational Ideas or Raja Rammohun Roy (New Delhi: Mittal Publications, 1990), p. 113-14; Krishna Dutta, Calcutta: A Cultural and Literary History (Oxford: Signal Books, 2003).
13. See Hugh B. Urban, Tantra: Sex, Secrecy, Politics and Power in the Study of Religion (New Delhi:  Motilal Banarsidass, 2008), pp. 63-72.
14. Vincent A Smith, The Oxford History Of India, ed. Percival Spear, 3d. edition,  (Oxford: Clarendon Press, 1958), p. 733.





শিবাংশু দে

একজন ফেরারি পুরিয়াকল্যাণ




সরস্বতী ছিল একটি নদীর নাম তার পর নামটি ঘিরে একজন দেবীকে কল্পনা করা হলো তারও পরে কোনও একদিন বৌদ্ধ তন্ত্রের দুর্গম দেবতা শেষে বাঙালির বসন্ত পঞ্চমীতে সন্ত ভালেন্তিনের নারী অবতার আধুনিকতম ভিজ্যুয়ালটি শুক্লা, শুভ্রা, মহাশ্বেতা, বীণাবাদিকা এক কোমল তরুণী বটতলার ক্যালেন্ডারে শাদা শাড়ি, শাদা ব্লাউজ, ক্ষীণতটী, গোলাপি পদ্মাসনা শিবাকাশির ক্যালেন্ডারে সবুজ শাড়ি, মেরুন ব্লাউজ, পূর্ণ দেহিনী, গুরু নিতম্বিনী এক দ্রাবিড় সুন্দরী কিন্তু শ্যামলা মেয়েদের দেশে য়্যাপারথেইডের প্রতীক হয়ে এই দেবীমূর্তির কল্পনাটি পৌরাণিক যুগ থেকে পাব্লিক বেশ খেলো শাদা নাকি জ্ঞানের রং, শান্তির প্রতীক, স্বস্তির ধারক যাদের গায়ের চামড়া শাদা, তাদের নাকি এসব থাকে, যেমন আমাদের গৌরী দেবীটি 


এহেন দেবীমূর্তির কল্পনা যাঁরা করেছিলেন, ধরে নিই  প্রাক পৌরাণিক যুগের আর্যরা, তাঁরা কিন্তু দেবতাদের পোশা আশাক বিষয়ে বেশ সাম্যবাদী ছিলেন  পুরুষ বা নারী দেবতার আবরণ কিন্তু অধোবাসেই সীমাবদ্ধ থাকত উত্তরীয়ের কল্পনা পরবর্তী কালের নাগরিক রাষ্ট্রের সময় এলেও, দেবতামূর্তির কল্পনায় তার কোনও ভূমিকা ছিল না আর যদি সমান্তরাল ভাবে চলা প্রকৃতিপূজা সেই ধারার কল্পিত দেবীদের কথা ভাবি, তবে তো দেখব, বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না, মা আমার তাই দিগ্বসন, এই তত্ত্ব দুতিন হাজার বছর ধরে চলেছে তাই যখন  সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রে দেবীর অ্যানাটমির নিবিড় প্রশংসা আবৃত্তি রে ছাত্রছাত্রীরা  অঞ্জলি দেয়, তখন জ্ঞানের দেবী (যদি কেউ থেকে থাকেন, মিনার্ভা?) হয়তো নিভৃতে পুলকিত হন জীবনে এখনও পর্যন্ত যত সরস্বতীর রূপকল্প দেখেছি, ক্ষীণ, প্রায় অপ্রকাশ্য নীবিবন্ধে প্রতীকী বসন ব্যতিরেকে কোনও আবরণ কখনও দেখিনি থাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর মন্দিরে (একাদশ শতক) আর মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরে (পঞ্চদশ শতক) সরস্বতীর মূর্তি খুব যত্ন সহকারে দেখেছি রক্ষণশীল দ্রাবিড় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ তীর্থেও আর্য সভ্যতার নন্দনতত্ত্বকে অবিকল অনুসরণ করা  হয়েছে


আচ্ছা, ব্রাহ্মণ মানে কি হিন্দু জাতির অংশ একটি গোষ্ঠী? হয়তো না, অন্তত  যখন ব্রাহ্মণ শব্দ বা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল, তখন হিন্দু নামে ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠী তো ছিল না! তখন সারস্বত সাধনা যে সব মানুষের জীবনচর্যা ছিল তারা সবাই ছিল ব্রাহ্মণ সেভাবে কি পান্ধারপুরের জন্ম নেওয়া সেই মুসলমান সারস্বত সাধকটিকে ব্রাহ্মণ বলা যায়? জানি, এই প্রশ্নের উত্তরে এদেশে সংখ্যায়  স্বল্প হলেও কয়েকটি মুষ্টিবদ্ধ হাত এগিয়ে বলবে না তিনি দুশো বছর আগে  য়মেন থেকে আসা সুলেমানি বোহরাদের বংশধর তিনি তো ভারতীয়ই নন এই  সব হাত শুধু হুসেনের প্রতি আঘাত হানতে আসে না তারা ভান্ডারকরের নামাঙ্কিত জাদুঘর ভাঙচুর করে, মীরা নায়ারের সিনেমা সেটে আগুন লাগায় ইতিহাস বই পুড়িয়ে ফেলে ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেবার ছেলেখেলায় মেতে থাকে হুসেনের ছবি ছিঁড়ে ফেলে হাজার বছর আগের তুর্কি দস্যুদের প্রতি বদলা নিতে চায় মেরুদন্ডহীন সরকারের সঙ্গে আমাদের মতো নপুং দেশবাসী শুধু  খবরকাগজে পড়ি, টিভিতে দেখি আর মকবুল ফিদা হুসেন নামক ভারতীয় গরিমাটি কাতারের নাগরিক হয়ে যান সাতাশি বছর বয়সে



খুব স্বাভাবিকভাবেই হুসেনকে বলা হতো ভারতের পিকাসো ১৯৭১ সালের সাও পাওলো বিয়েনালে পিকাসোর সঙ্গে একযোগে আমন্ত্রিত হবার আগে থেকেই এই তুলনার গৌরবটি তাঁর প্রতি প্রযুক্ত হতো পিকাসোর দুর্দম শৈল্পিক আবেগের  স্বদেশী প্রতিচ্ছবি হুসেনের কাজের মধ্যে আমরা দেখতে পাই ছাড়া আমাদের দেশে ছবির জগতে হুসেনের সঙ্গে তুলনা করা যায় গানের জগতে ভীমসেনের হুসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জে জে আর্ট স্কুলে, কিন্তু তা নিতান্তই প্রারম্ভিক আসল শিক্ষা প্রতি বর্গফুটে চার আনা পারিশ্রমিকের হিসেবে সিনেমার পোস্টার আঁকা থেকে শুরু হয় জীবনের এই পর্বেই তিনি বুঝতে পারেন ছবি মানে ভিজ্যুয়াল, ছবি মানে আগের চোখের পরীক্ষায় পাস করা, ছবি মানে আমি যা দেখতে চাই কিন্তু দেখতে  পাই না, ছবি মানে কল্পনার শেষ ঘোড়া যাতে আমি বাজি ধরতে চাই, ছবি মানে এক ধরনের ইল্যুশন যাকে বেদান্ত খুঁজেছিল এই সব অধরা মাধুরীকে (লিট্যারলি!) ধরতে লাগে অসম্ভব প্যাশন, অন্তর্লীন আকুলতা এই প্যাশন পুঁথিপত্রে নেই, স্কুল কলেজে নেই, সভাপর্বে বা স্ফটিকস্তম্ভে নেই; আছে শুধু নিজের শিল্পের  প্রতি তীব্র আকর্ষণের মধ্যে, জৈব লিবিডোর সীমা বিচূর্ণ করে, সর্বনাশের শেষ দেখতে চাওয়ার মধ্যে যাকে কোনও মধ্যবিত্ত মননে বাঁধা যায় না, একেবারে তৃণমূলস্তরে প্রকৃতিসঞ্জাত আবেগের ফলশ্রুতি এইসব সিদ্ধি একালে যা আমরা পেয়েছি হুসেন ভীমসেনের দাক্ষিণ্যে এই সব সৃষ্টির মৌল লক্ষণ হচ্ছে এর সারল্য, ভনিতাবিহীন সৃজনশীল শ্রমের কারুকার্য, যা চোখের কাছে, কানের কাছে, সহস্রার মূলাধারের কাছে আমাদের পার্থিব অস্তিত্বকে আঘাত রে সেই সব অশ্রুত  অব্যক্ত সার্থকতার কাছে পৌঁছে দেবে; যখন কোনও মধ্যবিত্ত বুজরুকি না করেও  বলতে পারব, রূপসাগরে ডুব দিয়েছি, অরূপরতন আশা করি হুসেন  ভারতবাসীর গর্ব আর ভারতীয় গণতন্ত্রের লজ্জা


উৎকেন্দ্রিকতার বিচারে হুসেন সালভাদোর দালিকেও মাৎ করে দেবেন নিজের উৎপাদিত ফসল, শ্রমের মূল্যের নিরিখ তিনি এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষমযেখানে সব চেয়ে সেয়ানা বেনিয়াও মাথা ঝুঁকিয়ে সেই দাম চুকিয়ে দেবে বলা হয়, তাঁর ছবির আর্থিক মূল্য যদি গুণতে বসা হয়, তবে তা আফ্রিকার অনেক ছোট রাষ্ট্রের জিডিপি থেকে বেশি হবে তিনি আগে শ্রমিক, পরে শিল্পী প্রথমে  আর্টিজান, পরে আর্টিস্ট তাঁর প্রিয় প্রগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপ সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছিল দেশভাগের হিংস্র দাঙ্গা আর জাতিদ্রোহের প্রতিবাদে চিত্রকরদের একত্র করতে তাঁদের স্বরচিত ব্যাকরণের শর্ত ভেঙে ফেলেছিল তদানীন্তন কলাকৈবল্যবাদী শৌখিন মজদুরির ভঙ্গুর মডেলটিকে বাংলা ঘরানার মার্জনা, লালিত্য তাঁর জন্য নয়  মাটিতে ক্যানভাস ফেলে নিচের দিকে তাকিয়ে ছবি আঁকতেন কব্জির কোন জোরে সব বিশাল পটে স্থানিকতা, বর্ণিকতা, আলোছায়ার ফ্ল্যাট বিভঙ্গকে লম্বা তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে নথিবদ্ধ করতেন, বিস্ময়ে মাথা নত করা ছাড়া কিছু করার নেই  তাঁর তুলি যেন ভীনসেনের গমক তান, হলক উৎসার, চাবুকের মতো কানে, ক্যানভাসে আছড়ে পড়ে মানুষের ছবি আঁকার আদি প্রয়াস রেখাভিত্তিক ড্রইং থেকে শুরু হয়েছিল, তাই হুসেন মানেন ড্রইংই ছবির মেরুদন্ড তাঁর সমসাময়িক সব বড় শিল্পীরা রেখার ড্রইং আঁকতে দ্বিধাবোধ করতেন হয়তো ভাবতেন,  রেখাভিত্তিক তেলরঙের  ছবির মধ্যে যথেষ্ট সফিস্টিকেশন আনা যাবে না কিন্তু শ্রমজীবী শিল্পী হুসেন মনে করতেন, আদিম ইতরযানী রেখাপ্রধান ছবির ভাষাই  মানুষের কাছে সব থেকে সহজে পৌঁছে যায় ঠিক রকম ভাবতেন ভীমসেনও চিরদিন অপ্রয়োজনীয় তানকারির চমক থেকে সযত্নে নিজেকে নিরস্ত করে রেখেছিলেন ম্লেচ্ছ হুসেন আর ব্রাহ্মণ ভীমসেন ছিলেন আবহমানকালের ভারতীয়  ইতরবর্গীয় নান্দনিকতার প্রতিভূ কমরেড ইন আর্মস হুসেনের আঁকা দেবী মূর্তির কল্পনা হিন্দুত্বপন্থীদের হিংস্র করে তোলে আবার তাঁর ছবিতে (মীনাক্ষী) ব্যবহার  করা একটি গানের বাণী কট্টরপন্থী মুল্লাদের প্রবল বিরোধিতার শিকার হয় মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক, এই সব প্রতিক্রিয়া বস্তুতঃ হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে  ইতরবর্গীয়দের প্রতি ব্রাহ্মণ্যবাদীদের চিরকালীন আক্রমণাত্মক রণনীতির অঙ্গ  ইতিহাস বলছে, ভারতবর্ষে সমন্বয়ের ঐতিহ্যকে নিম্নবর্গের সংখ্যাগুরু মানুষজনই ধরে রেখেছে চিরকাল ব্রাহ্মণ্য বা মুল্লাবাদী সংস্কৃতির উৎসমুখেই থাকে বিভাজনের বিষক্রিয়া হুসেনকেও এই বিষ ধারণ করতে হয়েছিল দীর্ঘদিন

প্রচুর নিরেস ছবিও এঁকেছেন হুসেন ছবি নিয়ে অকারণ বাণিজ্য করেছেন যা কিছু করেছেন তার মধ্যে সতত অল্পবিস্তর শক ভ্যালু আরোপ করেছেন মানুষকে  চমকে দিয়ে শিশুর মতো উপভোগ করেছেন যাবতীয় ভারতীয় দর্শন পুরাণশাস্ত্রে অগাধ বিদ্যা অর্জন করেছিলেন বস্তুত তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি সব ভারতীয় পুরাণের মিথস্ক্রিয়ার ফসল কিন্তু তিনি জন্মসূত্রে মুসলিম সরস্বতীর লজ্জা নিবারণএর  দায়িত্ব তাঁর জন্মগত কর্তব্য তিনি কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মতো স্বপ্নে দিগম্বরী  দেবীমূর্তি দর্শন করার অধিকারী নন তাঁর জন্য এরকম কল্পনা করাও পাপ তিনি তো ব্রাহ্মণ নন, হিন্দু নন এই সব ধৃষ্টতা যদি করে ফেলেন তবে তাঁর  বিচার করবে কয়েকজন দুর্বৃত্ত, যাদের শিল্প শব্দটি বানান করার যোগ্যতা নেই  তারা চোখ পাকিয়ে, কোমরে হাত দিয়ে বলবে, আঁকো তো দেখি পয়গম্বরের ছবি, আঁকো দেখি মা ফতিমাকে নির্বসন করে!’ আমরা বিশ্রুত উদার, অত্যন্ত সহিষ্ণু,  অহিংস্র সভ্য জনতা শুধু ছবিগুলো ছিঁড়েই ছেড়ে দিলাম নয়তো...! মজার কথা,  এই জাতীয় প্রতিক্রিয়া শুধু চন্দন মিত্র বা বাল ঠাকরে জাতীয় লোকেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না সতীশ গুজরালের মতো একজন শ্রদ্ধেয়, মূর্ধণ্য শিল্পীও এই রকম কথা বলেছিলেন কী শুধু শিল্পী উষ্মা, না পেশাগত ঈর্ষা? কে বলবে?  যদিও সতীশ, হুসেনের দেশত্যাগ'কে জাতীয় লজ্জা আখ্যা দিয়েছিলেন এবং  ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে হুসেনের অবদান'কে চূড়ান্ত প্রশংসার সঙ্গে স্মরণও করেছিলেন

হুসেন স্বেচ্ছায় ফেরারি হন কিন্তু বুকের ভিতর রাত্রিদিন জেগে থাকে ভারতবর্ষ  কখনও অভিযোগ করেন না তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে সতত বলেন, তিনি স্বেচ্ছায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে দেশ থেকে দূরে রয়েছেন চলে যাবার আগের দিন বোম্বাইয়ের কুলফি ফালুদা খেতে চান মহার্ঘ সাহেবি আইসক্রিম প্রত্যাখ্যান করেন নিজের সৃষ্টির পঙ্কিল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কোনও জবাবদিহি করার প্রয়োজন বোধ করেননি কারণ তিনি জানতেন, এই সব নির্বোধের সংখ্যা তাঁর গুণগ্রাহীদের  তুলনায় নগণ্য হুসেন এবং ভীমসেন চিরকালীন ভারতীয় সাব অল্টার্ন সংস্কৃতি চেতনার যুগের পুরোধা ব্রাহ্মণ্য ছুঁতমার্গের বিরুদ্ধে প্রাংশু প্রতিবাদ

আগামী ১৭ই সেপ্টেম্বর তাঁর একশো একতম জন্মদিন একশো পেরোনো মানে তো  একেবারে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া ভাবা যায় না, হুসেন কী ইতিহাস হয়ে গেছেন? তিনি তো অনুরাগীদের মনে এখনও সমান সতেজ, সবুজ, চঞ্চল নেহাৎ সমাপতনই বলতে হবে, এই লেখাটি লেখার সময় ভীমসেনের পুরিয়া কল্যাণ শুনছিলাম ক্রমাগত গানটি আমাকে ট্রিগার করছিল নানা চিন্তায় সেই পুরনো, হাজারবার শোনা বন্দিশ, বহুত দিন বিতে, অজহুঁ আয়ো... 

ফেরারি আর ফিরবে না