পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

শুক্রবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৭

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

কালিমাটি অনলাইন / ৪৪


১৪২৩ শেষ হলো, শুরু হলো ১৪২৪। আবার একটা নতুন বছর। নতুন বছরের প্রথম দিনে আমরা কাছে থাকা আপনজনের সাথে মুখোমুখি দেখা হতেই উচ্চারণ করেছি ‘শুভ নববর্ষ’। তারপর বয়স ও সম্মানের বিচারে জুড়ে দিয়েছি শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা, প্রীতি, স্নেহ, ভালোবাসা ইত্যাদি। যাদের সাথে মুখোমুখি দেখা হয়নি এবং যারা কাছে আদৌ থাকে না, তাদেরকে ‘শুভ নববর্ষ’র সঙ্গে যাবতীয় অনুষঙ্গ পাঠিয়েছি ফোন, হোয়াটস অ্যাপ, মেসেঞ্জার, ট্যুইটর, ফেসবুক, স্কাইপ এবং আরও  অনেক অনেক প্রযুক্তিগত কৌশলের মাধ্যমে। বেশ কিছুদিন আগে অবশ্য এতসব কিছু আমাদের জীবনে ছিল না আমরা চিঠি লিখতাম তখন। চিঠি লেখার জন্য ব্যবহার  করতাম ডাকঘর থেকে কিনে আনা পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটার এবং এনভেলাপ বা খাম। সেই শুভেচ্ছাপত্র লেখা হলে তা আমরা ফেলে আসতাম ডাকবাক্সে। যাকে চিঠি লিখতাম, সে যেমন প্রতীক্ষায় থাকত কবে তার হাতে প্রত্যাশিত চিঠিটি এসে পৌঁছবে, ঠিক তেমনি আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়  থাকতাম কবে সেই প্রেরিত চিঠির প্রাপ্তিসংবাদ বহন করে আনবে প্রাপকের লেখা চিঠি। আজ আমাদের সাধারণ জীবনচর্যায় এই চিঠি লেখার গুরুত্ব ও প্রয়োজন প্রায় হারিয়ে গেছে বললেই চলে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের জীবন যাপনের গতি ও দ্রুতি অন্য এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, উন্নততর প্রযুক্তির কারণে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে আমাদের জীবনযাপনে ও মননে  মানুষের  সভ্যতার ইতিহাসে এ এক অনন্য উল্লেখযোগ্য অধ্যায় কিন্তু সেকথার আলোচনা আপাতত থাক বরং আমরা ফিরে আসি নতুন বছরের প্রসঙ্গে নতুন বছরের প্রথম দিন শুরুর আগের দিনে আমি ফেসবুকে আমার বন্ধুদের উদ্দেশ্যে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছিলাম – ‘নতুন বছর নতুন জীবন নতুন স্বপ্ন নতুন পৃথিবী ঠিক পরের দিন আমার এক ফেসবুকবন্ধু প্রতিশুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছেন যে, আপনি যে সব কিছু নতুন লিখেছেন, তা কি ঠিক? আমাদের জীবনে  সবই তো পুরনো, নতুন কিছু তো নেই! আমার বন্ধুর কথাটা আপাতদৃষ্টিতে সত্যিই  অস্বীকার করা যায় না পুরনো বছর শেষ হলে প্রাকৃতিক নিয়মে নতুন বছর শুরু হয় ঠিকই, কিন্তু পুরনো বছরের শেষ দিনটির সঙ্গে নতুন বছরের প্রথম দিনটির সত্যিই কি কোনো পার্থক্য আমাদের প্রতিদিনের  জীবনযাত্রায় লক্ষ্য করা যায়? আর যদি কিছু লক্ষ্য করা যায়ও, তার জন্য আমাদের খুব বেশি উল্লসিত হওয়া কি উচিৎ! কেননা আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক গ্রেট শিব্রাম চক্কোত্তি মশাই তো বলেই গেছেন, তিনি সারা জীবন অনেক পরিশ্রম করার পর উপলব্ধি করেছেন যে,  নতুন বছরের জন্য অহেতুক উল্লাসের কোনো মানে হয় না, কেননা নতুন বছরের আয়ু শুধুমাত্র একটি বছর! আর সেই গুরুবাক্য স্মরণ করে আমরাও শুধুমাত্র একটি   দিন ‘নববর্ষ’ পালন করি এবং ঠিক তার পরদিন থেকেই জড়িয়ে পড়ি আরও অনেক কর্মকান্ডে।  বিশেষত প্রতিটি নতুন বছরের প্রথম মাসেই যে বাঙালির জীবনে নববর্ষ উৎসবের পাশাপাশি আছে আর একটি উৎসব, রবীন্দ্রজন্মোৎসব!   এবং এভাবেই বছরের প্রতিটি মাসেই আছে আরও অনেক অনেক উৎসব, যা আমাদের জীবনে বয়ে আনে নতুন নতুন স্বাদ, ভাবনা, উপলব্ধি ও আনন্দ।  আর তাই আমরা প্রতি নিয়তই নতুন নতুন ভাবে বেঁচে থাকি, নতুন নতুন সৃজনে তরতাজা থাকি।

কালিমাটি অনলাইন ব্লগজিনের সব লেখক, শিল্পী, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই নতুন বছরের শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সবাই সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

দূরভাষ যোগাযোগ :           
08789040217 / 09835544675
                                                         
অথবা সরাসরি ডাকযোগে যোগাযোগ :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India


<<<< কথনবিশ্ব >>>>


অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

‘যেযালসেহরা’ বা বাংলা প্রবাদের রাজনীতি সমাজনীতি





বহুদিন ধরে ভাবি প্রবাদ বা সুভাষিতর রাজনৈতিক বা সমাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে ভাবার অবকাশ কম নয়। দ্রাবিড়ভূমিতে থিরুভাল্লুভারের লেখা থিরুক্কুরাল থেকে আসা অনেক সুভাষিতই সব কটি  রাজনৈতিক দলের দিগ্‌দর্শক হিসেবে কাজ করে। উত্তর ভারতে সে রসদের ভাঁড়ার ছিল তুলসীদাসের রামচরিত মানস। আমাদের এখানেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ কতকটা  সুভাষিতর যোগানদার। বাকির কিছুটা আসে ভারতচন্দ্র থেকে। তার পরে আছেন আমাদের গেঁয়ো অনামা, অজানা দার্শনিকরা। তাঁদের যোগান দেওয়া প্রবচনগুলি স্বাভাবিক কারণেই অনেক বেশি সেকিউলার। একটা বাংলা প্রবাদ ধরা যাক যার  উৎস রামায়ণ কাহিনী — ‘যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’। অর্থাৎ স্বর্ণলঙ্কায় গেলেই সবাই রামত্ব হারান। শাসকের বিচ্যুতিকে বৈধ করার ক্ষেত্রে এই প্রবাদটির মত কার্যকর প্রকৌশল বোধহয় আর দুটি নেই। সব চেয়ে সুবিধে হলো এই বৈধীকরণ আসে শাসকের উদ্যোগ ছাড়াই, শাসিতের কাছ থেকে, স্বতঃ। কেন বলি।

আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন কংগ্রেস আমলে, যথা নেহরুর সময়কার নির্দেশনা / অনুজ্ঞার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনীতির (ইংরেজিতে ‘কম্যাণ্ড পলিটি, তথা ‘কম্যাণ্ড পলিটিক্স’-এর) সাধারণ পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের একক-প্রাধান্যশীল-দল ব্যবস্থা থেকে দাবি-রাজনীতির তথা ‘ডিম্যান্ড পলিটিক্স’-এর লক্ষণাক্রান্ত  কংগ্রেস-ও, কংগ্রেস-আর, ম্যয় কংগ্রেস-আইএর সময়কার  রাজনীতি থেকে জনতা আমল, ন্যাশন্যাল ফ্রণ্ট, ইউনাইটেড ফ্রণ্ট, এনডিএ ১/২/৩, ইউপিএ ১ ও ২ আমলে নানা স্ক্যাণ্ডাল, স্ক্যাম, ঘোটালা, কেলেংকারি আমাদের রাজনীতিকে বর্ণিল করেছে। হরিদাস মুন্দ্রা, ধর্মতেজা ও জয়ন্তিয়া শিপিং কোম্পানি, বোফর্স হাউইট্‌জার,  কার্গিল কফিন কেলেংকারি থেকে শুরু করে কোলগেট হয়ে টুজি স্পেকট্রাম অবধি একমাত্র বোফর্স ছাড়া আর কোনো স্ক্যাণ্ডাল, স্ক্যাম, ঘোটালা, কেলেংকারি যে কেন্দ্রে সরকারকে টেনে নামায়নি তার কারণ হয়তো এই যে ‘যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’ নামক বাংলা প্রবাদের অধঃশায়ী মনোভাবের অখিল ভারতীয়ত্ব। রাজীবকেও নামাতো না যদি সেই সময়ে দুই সংখ্যার মুদ্রাস্ফীতি না হতো। আর কে না জানে ভারতবর্ষে দুর্নীতি-সহিষ্ণুতার তুলনায়  মুদ্রাস্ফীতি-সহিষ্ণুতা অনেক কম, যতই কেন তা অর্থনৈতিক বিবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হোক।  

আর এই একই কারণেই বোধহয় উত্তর ভারতে উত্তর প্রদেশে মুলায়মের ও পরে তাঁর জাত শত্রু মায়াবতীর জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন স্ক্যাম, পরে মায়াবতীর তাজ করিডর স্ক্যাম, পূর্ব ভারতে লালুর গোখাদ্য, দক্ষিণ ভারতে জয়লক্ষীর শাড়িধুতি, ইত্যাদি অজস্র স্ক্যাণ্ডাল, স্ক্যাম, ঘোটালা, কেলেংকারি তাঁদের আসন টলাতে পারেনি। অথবা বিভিন্ন কারণ সন্নিপাতে তাঁরা সরে গেলেও অন্যতর উপায়ে ফিরে এসেছেন। আমাদের বঙ্গভূমিতেও হলধর পটলের নামাঙ্কিত ভূষিমাল, সঞ্চিতা, সঞ্চয়নী, ওভারল্যান্ড, ভিখু পাসোয়ান, মণীষা মুখার্জিকে নিয়ে নানা সত্যিমিথ্যে ঘোটালা থেকে শুরু ক’রে শ্রীরামকৃষ্ণপত্নী, দেবর্ষি ইত্যাদির নামাঙ্কিত সারদা, নারদা স্ক্যাণ্ডাল, স্ক্যাম, ঘোটালা, কেলেংকারি হয়ে টেট ইত্যাকার স্ক্যাণ্ডাল, স্ক্যাম, ঘোটালা, কেলেংকারি সেই সময়কার ক্ষমতাসীন দলের আসন টলাতে পারেনি একের পর এক ইলেকশনে। খুব সম্প্রতি নারদাতে ক্ষমতাসীন দলের ত্রয়োদশ অশ্বারোহীকে যতই টান মারুক  সিবিআই,  শিক্ষিত উচ্চবর্গীয়  বাঙালি হাতের কাছে ইলিশের বাটি, বিয়ারের বোতল অথবা হুইস্কি/ভদকার পেগ টেনে নিয়ে বলে ‘জমে গেছে’। আর যুগযুগান্তর ধরে উচ্চবর্গের অন্যায় শাসন, শোষণ, ব্যভিচার, অনাচার, চুরি-জোচ্চুরি দেখে দেখে গা-সওয়া নিম্নবর্গ তার সাঙ্কেতিক মন্ত্র বলে যেযালসেহরা 

দেখুন, বামফ্রণ্ট-কে রাজক্ষমতা থেকে শত্রুদের সরাতে লেগেছে ঘোটালা নয়, সিঙ্গুর, রিজোয়ান, নন্দীগ্রাম ইত্যাদি প্রশ্নে ভুল ইস্যু-ম্যানেজমেণ্ট। এর মানে একটাই। ‘যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’ নামক প্রবাদ ভোটারদের আণ্ডশাসকদের অজস্র স্ক্যাণ্ডাল, স্ক্যাম, ঘোটালা, কেলেংকারি  সম্পর্কে ক্ষমাস্নিগ্ধতা অটুট রেখেছে।

কিন্তু ‘যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’ প্রবাদটির মধ্যে বিভিন্ন শাসকদের স্ক্যাণ্ডাল, স্ক্যাম, ঘোটালা, কেলেংকারি ছাড়াও আরেকটা ব্যাপার আছে। সেটা হলো কেন বা কী কী কারণে বিভিন্ন দেশে শাসক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয় পরে সেগুলো রাখতে পারে না, কিম্বা আরো  সিরিয়াস কথা হলো চায় না। এক কথায় কেন দলগুলি ক্ষমতায় আসার পর ‘পলিসি ডেলিভারি’ করতে  পারে না বা চায় না। ফলে লঙ্কায় যাওয়া মাত্তর রাবণ হয়ে যায়। আর জনগণও এ ব্যাপারে শাসকদের চাপ দিতে চায় না।  ফ্র্যাঙ্ক ক্যানিংহ্যাম তাঁর ডেমোক্রেটিক থিওরি অ্যাণ্ড  সোশ্যালিজম  বইতে শাসক-শাসিতের এবম্প্রকার  ঔদাসীন্য বা চ্যুতিকে ব্যাখ্যা করতে দুটি ধারণার আমদানি  করেছেন। প্রথম এবং মুখ্যটি হলো  স্বতঃরফা/স্বয়মাপোষ বা ‘autocompromising’, আর দ্বিতীয় ও গৌণটি হলো বিনটিকিটে চড়ন তথা ফিরিভোগ বা  ‘freeriding’

আমরা প্রথমটাকে নিয়ে ভাবিত। এটায় ক্যানিংহ্যাম বলছেন যে, রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন কীভাবে  বিভিন্ন প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলের কার্যলক্ষ্য তাদের মূলস্রোতের অনুসারীদের প্রথম পছন্দের সঙ্গে মেলাতে পারে না। প্রত্যেক দলের নীতিপ্রণেতারাই ভয় পায় যে যদি না দল প্ল্যাটফর্মের মধ্যিখানটাকে রূপায়নের জন্য আঁকড়ে ধরে তবে অন্যান্য দলগুলিও এই স্ট্র্যাটেজিই নেবে, আর পরবর্তী নির্বাচনে এর ফায়দা কুড়োবে। ফলে কোনো দেশের সমগ্র রাজনৈতিক বর্ণালীর সম্পূর্ণ  ডাইনে, মধ্যিখানে, বা একেবারে বাঁয়ে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক দল দক্ষিণী- র‍্যাডিক্যাল, বাম-র‍্যাডিক্যাল বিভিন্ন ইস্তেহার বা প্ল্যাটফর্ম নিয়ে নির্বাচনে নামে। কিন্তু জেতার পর মধ্যপন্থী হয়ে যায়। কারণ তাদের ভয় হলো এই মধ্যিখানটাতেই সব চেয়ে বেশি  সমর্থক, আর তারা একে না ধরলে অন্যরা ধরবে। 
তাছাড়া সব দলই ভয় পায় যাতে ফ্রিরাইডাররা সরকারি দাক্ষিণ্যের সুযোগ না নিয়ে চলে যায়। এর ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে সেটি হলো যেই নির্বাচনে জিতুক না কেন সেটা কারুর প্রথম পছন্দের প্ল্যাটফর্মে হবে না। নিজেদের সদস্যদের প্রাথমিক নীতিমান, মূল্যবোধ, পছন্দ বা লক্ষ্যের প্রতিফলন ঘটায় এমন প্ল্যাটফর্ম অনুসরণ করার চেয়ে প্রত্যেক দলই অনিশ্চয়তার মধ্যে আগাম আপোষ করে বসবে। এই সমস্যাটা কতকটা গেমতত্ত্বের ‘কয়েদির উভয়সঙ্কট’-এর মতো।  সেখানে পরস্পর সংযোগহীন দুই কয়েদি, একে অন্যের  প্রতি অবিশ্বাসের কারণেই সরকারি উকিলের কাছে কৃত অপরাধ কবুল বা না কবুল করার ব্যাপারে খুব সীমিত বিকল্প পায়।


ফ্র্যাঙ্ক ক্যানিংহ্যাম দেখিয়েছেন এই  স্বতঃরফা / স্বয়ংআপোষ বা ‘autocompromising’  সব চেয়ে বেশি প্রবল কোনো দ্বি-দলীয় ব্যবস্থায়। কারণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর এদের যে দ্বৈত প্রভাব থাকে তার ফলেই এদের উপর ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ থাকে কম। ফলে যেযালসেহরা’-র আক্ষেপে তারা অংশগ্রহণ না করে ‘freerider’ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলির দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিপ্রবণতা বাড়াতে গেলে আর তাদের স্বতঃরফা / স্বয়মাপোষ কমাতে গেলে বহুদলীয় ব্যবস্থাই শ্রেয়, কারণ ছোট ছোট দলগুলির উপর ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ আর তাদের লঙ্কার রাবণ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কম। এত কথা এলো ওই একটি প্রবাদ থেকে, যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণপ্রবাদগুলি সামাজিক রাজনৈতিক জ্ঞানের স্বর্ণখনি। নয়? 


গ্রন্থসূত্র



1.   Frank Cunningham, Democratic Theory and Socialism (Cambridge: Cambridge University Press, 1987), pp. 62-33       




অদ্বয় চৌধুরী

ফ্রম জেমস বন্ড, উইথ ইডিওলজি




চতুর্থ পর্ব

জেমস বন্ড এবং ‘য়্যুবারমেন্স’

 The cruelty of victory is the pinnacle of life’s jubilation”
 —Friedrich Nietzsche, “Homer on Competition” in On the Genealogy of Morality

জয়, আনন্দ। জয়, দুঃখ। সাধারণত জয় ও আনন্দকে একই বন্ধনীতে রাখা হয়। কিন্তু, উলটো পিঠে, জয় দুঃখেরও জন্মদাতা। আনন্দ বিজয়ীর, দুঃখ বিজিতের। এখানেই জয় তার নির্মম দাঁত-নখ বার করে, নৃশংস হয়ে ওঠে। তবে জয় যতই নিষ্ঠুর ও নির্দয় হোক, জীবনের উল্লাস-শিখরে বয়ে নিয়ে যায় এই জয়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কোন উদ্দিষ্টকে আদায় করাই হচ্ছে জয়।


কিন্তু কোনো কিছুকে ‘আদায় করার ক্ষমতাই’ কি সর্ব বৃহৎ গুণ? না। ‘আদায় করা’ থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা। এই মানসিকতার মাধ্যমে মানুষ হয় শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংযমী। নীৎশের মতে প্রাচীন গ্রীকদের প্রভূত উন্নতি ও প্রতিপত্তির উৎসমুখ ছিল তাদের রাষ্ট্রীয় চেতনা যার ভিত্তি ছিল “the finest Hellenic principle, competition”জীবন ও সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার সূত্রে নীৎশে উপরে উল্লিখিত উক্তিটি করেন: The cruelty of victory is the pinnacle of life’s jubilation” আসলে, প্রতিযোগিতা জীবন-যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে যায়। বিপরীত ভাবে, জীবন-যাপনও এক প্রতিযোগিতায়, যুদ্ধে পর্যবসিত হয়। এবং, প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট গুণসম্পন্ন, সর্বোচ্চ শক্তিমান ব্যক্তি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়। সেই ব্যক্তি তখন অন্য দুর্বল মানুষদের রক্ষাকর্তা নিযুক্ত হয়।


এখন, প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নীৎশের এই ভাবনাচিন্তাকে এক রূপরেখায় মাধ্যমে আকার প্রদানের চেষ্টা হলে এক সুপারহিরোর, সুপারম্যানের অবয়ব উঠে আসেএই সুপারহিরো নিরন্তর নিজের ভালো গুণগুলিকে আরও শানিত করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। স্বাভাবিক ভাবেই সে সর্বোচ্চ শক্তিমান, সর্বোৎকৃষ্ট মানসিকতা সম্পন্ন এক ব্যক্তি। সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সে স্বভাবত জয়ী নির্বাচিত হয়। এবং এই জয়লাভের মাধ্যমেই সে পরম তৃপ্তির আস্বাদ নেয়এও ব্যক্তিপুজোরই আর এক রূপ— এক অতিমানবের কল্পনা। এ এক এলিটিস্ট কল্পনা। গোষ্ঠীর তুলনায় ব্যক্তি বড়— এই মতাদর্শের বুর্জোয়া উপাসনা। ব্যক্তিই দুর্বলের, প্রান্তিক বা অন্ত্যজদের রক্ষাকর্তা— সভ্যতার রক্ষাকর্তা। এবং উদ্ধারকর্তাও।

নীৎশের চিন্তার অনুমিতি টানা হলে যে সুপারহিরোর অবয়ব পাওয়া যাবে তার বাস্তব রূপ কেমন? সেই অতিমানবীয় সাধারণ মানুষটি কেমন? উত্তরটা সহজ: প্রায় হুবহু ইয়ান ফ্লেমিং সৃষ্ট স্পাই জেমস বন্ডজেমস বন্ড হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতাসম্পন্ন সুপারহিরোর আধুনিক সংস্করণ: “a man of war… peace was killing him”বন্ডের কাছে গুপ্তচর বৃত্তি এক দুরূহ প্রতিযোগিতা, এক জটিল খেলা— আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পাওয়ার পলিটিক্স-এর মতোই জটিল, অদমনীয় এবং অতিআবশ্যক। ‘দ্য স্পাই হু লাভড মি’ গল্পে ভিভিয়েন মিশেলকে বন্ড গুপ্তচর বৃত্তির জটিল চরিত্র ব্যক্ত করে:




“It’s nothing but a complicated game, really. But then so’s international politics, diplomacy— all the trappings of nationalism and the power complex that goes on between countries. Nobody will stop playing the game. It’s like the hunting instinct.”

গুপ্তচর বৃত্তির, এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির, এই ক্রীড়াসুলভ বৈশিষ্ট্যের সমান্তরাল রূপক হিসাবে বন্ডের প্রতিটি গল্পে বিভিন্ন খেলার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়: ব্যাকার‍্যাক্ট, ক্যানাস্তা, ব্রিজ, সলিটেয়ার, গল্ফ, স্কিইং, ব্ল্যাকজ্যাক, রুলেট, ঘোড়-দৌড়, জাপানী রেসলিং, টেনিস, দাবা ইত্যাদি। খেলা নিছক খেলা নয় এখানে, বরং এর ব্যবহার অন্য ইঙ্গিত বহন করে: খেলা যুদ্ধের প্রতীক। প্রতিটি দেশের মধ্যে অবিশ্রান্ত ভাবে চলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধ। ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ে কূটনৈতিক যুদ্ধ পৌঁছেছিল এক অন্য মাত্রায়, উচ্চতম শিখরে। কোনো একটি দেশের জাতীয় চরিত্রের প্রতিফলন ঘটে খেলার প্রকারভেদে, চরিত্রে। যেমন রুশরা দাবা খেলায়, অর্থাৎ নিখুঁত পরিকল্পনায়, পারঙ্গম। ফ্রম রাশিয়া, উইথ লাভ গল্পে ক্রন্সটীন, ‘উইজার্ড অফ আইস’, একজন তুখোড় দাবাড়ু এবং গুপ্ত বাহিনীর গুপ্ত কার্যকলাপের পরিকল্পনাকারী। তার কাছে মানুষ সাধারণ বোড়ে। তাদের টোপ হিসাবে রেখে ছক করা যায়। তার কাছে এক একটি পরিকল্পনা এক একটি ‘গ্যাম্বিট’। উলটো দিকে, ব্রিটিশরা স্বভাবত ‘গ্যাম্বলার’— ক্যাসিনোতে, যুদ্ধের ময়দানেও।

এহেন ‘গ্যাম্বলার’ ব্রিটিশ এজেন্ট বন্ডের গল্পে গ্যাম্বলিং-এর অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। ‘গ্যাম্বলার’ বন্ড অনেকাংশেই নীৎশের জরাথুস্ট্র হয়ে ওঠে। বিপদ নিয়ে জুয়া খেলা— জীবনের সাথে জুয়া খেলা নিয়ে তাদের বক্তব্য একই:

“The devotion of the greatest is to encounter risk and danger and play dice with death” [‘Thus Spoke Zarathustra’]

এই জুয়া খেলার ধৃষ্টতার মাধ্যমেই বন্ড ‘গ্রেটেস্ট’ ব্যক্তি, সর্বোৎকৃষ্ট মানুষের তকমা আদায় করে। সে এক অতিমানব। অতএব, বন্ডের কাছে জয় ধরা দেয় স্বাভাবিক পদ্ধতি মেনেই। কারণ তার জয় পূর্ব-নির্ধারিত— ‘প্রিডেস্টাইন্ড’। বন্ডের সমস্ত অতিমানবীয় ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ তার অপরাজেয় স্বভাবকে ঘিরেই গড়ে ওঠে। তাই, তার কাছে এই পূর্ব-নির্ধারিত জয় অতি-আবশ্যিক। এই ছকের সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে বন্ডকে ঘিরে থাকা সুপারহিরোর আবরণ খুলে যাবে। ‘ক্যাসিনো রয়াল’ গল্পে বন্ড যখন সাময়িকভাবে ব্যাকার‍্যাক্ট খেলায় নিজে হারতে চলেছে বলে ধরে নেয় তখন তার অদ্ভুত ছটফটানি দেখা যায়:

Bond sat silent and frozen with defeat. . . . What now? . . . Back to the telephone call to London, and then tomorrow the plane home, the taxi up to Regent’s Park, the walk up the stairs and along the corridor, and M’s cold face across the table, his forced sympathy, his “better luck next time” and, of course, there couldn’t be one, not another chance like this.

এই যন্ত্রণা ভয় থেকে আসে, দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয়। একজন বিজিত ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার ভয়, ‘সুপারম্যান’ বা নীতশের ভাষায় ‘য়্যুবারমেন্স’ থেকে ‘কমনম্যান’-এ নেমে আসার দুশ্চিন্তা:

His desolation reflects the shocking realization that he is after all not one of the elect, but bound for damnation; or, in Nietzschean terms: not an Übermensch but merely human-all-too-human.” [Ishay Landa. ‘James Bond: A Nietzschean for the Cold War’]

তবে, সমস্ত খেলাতেই ‘প্রিডেস্টাইন্ড’ জয় বন্ডের হাত ধরেই থাকে ঠিকঅবশেষে বন্ড ‘য়্যুবারমেন্স’ হিসাবে ঠিক জয়ী হয়। এই ‘প্রিডেস্টাইন্ড’ জয়লাভের ধারা গল্পের ন্যারেটিভ স্ট্রাকচারকেও এক ‘ক্রীড়াসুলভ’ ছকে বেঁধে ফেলে। সবকিছু, সমস্ত চাল, পরিকল্পনা, ফলাফল ইত্যাদি সেখানে ‘প্রিডেস্টাইন্ড’।

বন্ডের গল্পের ক্রীড়াসুলভ গাঁথুনি উম্বার্তো একো’র দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল। [“Narrative Structures in Fleming”, The Role of the Reader’] একো’র যুক্তি অনুযায়ী বন্ডের গল্পগুলি নির্দিষ্ট কতগুলি নিয়ম, ধরা-বাঁধা ছকের ভিত্তিতে তৈরি। পাঠকরা আগে থেকেই জেনে ফেলে ওই নিয়ম, ছক; এমনকি অন্তিম ফলাফলও। তাহলে তাদের কাছে অজানা কী থাকে? অজানা থাকে একটি বিশেষ বিষয়: কী ভাবে, কোন পদ্ধতিতে খেলাটি ধাপে ধাপে এগোয় সেইটা। তারা শুধু প্যাঁচগুলোকে পরতে পরতে খুলতে দেখে। এবং, একো’র মতে শুধুমাত্র গল্পের গাঁথুনি নয়, গোটা গল্পটাই একটি ‘খেলা’, এক প্রতিযোগিতা, ‘প্লে সিচুয়েশন্স’-এর সিরিজ। এই গেম-লাইক গঠন এক রকমের ন্যারেটিভ সেলফ-কনসাসনেস-এ পৌঁছে যায় ফ্রম রাশিয়া, উইথ লাভ গল্পে। এখানে বন্ডের তুর্কী-সহযোগী ডার্কো কেরিম বন্ডকে বলে:

“But I was not brought up to ‘be a sport’...This is not a game to me. It is a business. For you it is different. You are a gambler.”

বাস্তবে বন্ড ও তার ইডিওলজির পূর্ব-নির্ধারিত অনিবার্য জয়ের প্রক্রিয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতা থাকাটা কিন্তু স্বাভাবিক। এমনকি সমগ্র গল্পটার ‘প্রিডেস্টাইন্ড’ ছকেও তা স্বাভাবিক। কেরিম কিছুটা চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দেয় সেই সীমাবদ্ধতা:

“This is a billiard table. An easy, flat, green billiard table. And you have hit your white ball and it is travelling easily and quietly towards the red. The pocket is alongside. Fatally, inevitably, you are going to hit the red and the red is going into the pocket. It is the law of the billiard table, the law of the billiard room. But, outside the orbit of these things, a jet pilot has fainted and his plane is diving straight at that billiard room, or a gas main is about to explode, or lightning is about to strike. And the building collapses on top of you and on top of the billiard table. Then what has happened to that white ball that could not miss the red ball, and to the red ball that could not miss the pocket? The white ball could not miss according to the laws of the billiard table. But the laws of the billiard table are not the only laws, and the loss governing the progress of this train, and of you to your destiny, are also not the only laws in this particular game.”


এবং, এই গল্পে অন্তত, চেনা নিয়ম বা পূর্ব-নির্ধারিত ছকের বাইরেও অন্য কোনো নিয়ম বা ছকের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। অন্য সমস্ত গল্পে বন্ড ও প্রধান খলনায়কের মধ্যে কোনো না কোনো খেলার দৃশ্য থাকে। এখানে নেই। এখানে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে ক্ষমতা কায়েমের কোন ভয়ঙ্কর পরিকল্পনাও নেই খলনায়কের। সব থেকে বড় ব্যাপার, গল্পের শেষে বন্ডের 'সম্ভবত' মৃত্যু ঘটে। এই মৃত্যু, ‘য়্যুবারমেন্স’-এর মৃত্যু, অন্য গল্পের সমস্ত পরিচিত ধাঁচের থেকে এই গল্পকে একদম আলাদা এক মাত্রা দেয়।
বন্ডের গল্পে ‘খেলা’র উপস্থিতি, ‘খেলা’র প্রদর্শনের, অন্য এক মাত্রাও আছে— অন্য মাহাত্ম্য, অন্য উদ্দেশ্য। এখানে ‘খেলা’ সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার প্রকাশ ঘটায়। জাতীয় চরিত্র তুলে ধরে। আবার ভোগ-বিলাস আর অবসর-বিনোদনের বুর্জোয়া নীতিকেও প্রতিষ্ঠা করে— একই সঙ্গে, হাত ধরাধরি করে। বন্ড যেসব খেলায় অংশ নেয়, ঠিক যেমন যে মদ সে খায় এবং যে গাড়ি সে চালায়, সেগুলো বিনোদনের প্রকৃষ্ট প্রতীক। সেই খেলাগুলি সাধারণ স্কুলের খেলা নয়, সেগুলি রাজকীয় অভিজাতদের খেলাও নয়। এমনকি সেগুলি শ্রমিক শ্রেণীর বা প্রলেতারিয়েতদের ফুটবল খেলাও নয়। সেই সমস্ত খেলাগুলো সবকটাই ‘কনজিউমার স্পোর্টস’— গল্ফ, স্কিইং, ক্যাসিনো গ্যাম্বলিং ইত্যাদি। এই খেলাগুলির সঙ্গে কোনো বনেদিয়ানা যুক্ত নেই, কোনো শ্রেণী-তাৎপর্যও যুক্ত নেই। এগুলি শুধুমাত্র ধনী মানুষদের খেলা, অবসরকালীন বিনোদনমূলক খেলা। বৃহত্তর ক্যাপিটাল কনজিউমারিস্ট ছাঁচের একটি ক্ষুদ্র অংশ এই ‘খেলা’। এই ‘খেলা’ ভোগবাদের বুর্জোয়া নীতিকে প্রতিষ্ঠা করার এক হাতিয়ার, এবং জেমস বন্ড হল বুর্জোয়াতন্ত্রের ‘খেলোয়াড়’।


গ্রন্থসূত্র:
1)  Ian Fleming. ‘From Russia, with Love’. Dilip Kumar Basu. ed. Worldview. 2001.
2)  Friedrich Nietzsche, “Homer on Competition,” in ‘On the Genealogy of Morality’ (New York: Cambridge University Press, 2000).
3)   Ian Fleming. ‘The Spy Who Loved Me’. Pan Books. London, 1967.
4)   Friedrich Nietzsche. ‘Thus Spoke Zarathustra’.
5)   Ian Fleming. ‘Casino Royale’. Hodder and Stoughton. London, 1988).
6)   Ishay Landa. ‘James Bond: A Nietzschean for the Cold War’.

7)   Umberto Eco. “Narrative Structures in Fleming”. ‘The Role of the Reader’. Indiana University Press. Bloomington, 1979.

সুনীতি দেবনাথ

বাবা আলাউদ্দিন খাঁ




আমাদের দেশ ভারত হচ্ছে সঙ্গীতের দেশ এদেশের রাজা-মহারাজা, নবাব-বাদশা -সুলতানগণ তাঁদের দরবারে প্রতিষ্ঠিত সুগায়কদের সম্মানিত আসনে বসিয়ে কোন প্রাচীনকাল থেকে সঙ্গীতজ্ঞ সঙ্গীতকে শ্রদ্ধা, সমাদর সম্মান দেখিয়েছেন উচ্চাঙ্গসংগীতের অন্যতম অভিধা তাই দরবারী সঙ্গীত আরো আগে বৈদিক সভ্যতায় সঙ্গীতের প্রাধান্য ছিল বেদের ওম্ ধ্বনি থেকে সৃষ্ট সপ্ত স্বর গড়ে তুলেছে ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী সঙ্গীতের সুবিশাল জগৎ আর বেদের তৃতীয় সামবেদ তো সঙ্গীতের সমাহার ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত গড়ে উঠেছে সঙ্গীত, নৃত্য আর যন্ত্রসঙ্গীতের সমবায়ে উত্তর দক্ষিণ ভারত ভেদে তা আবার হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কর্ণাটকী সঙ্গীত এই দুটি ভাগে বিভক্ত এই বিভাজনের কারণ গায়ন শৈলী, অনুশীলন পদ্ধতি অন্যান্য কারণ সমাজের উচ্চকোটির মানুষের জন্য এই অভিজাত সঙ্গীত শৈলীর পাশাপাশি প্রাকৃতজনের সৃষ্ট উপজীব্য সঙ্গীতধারা প্রকৃতির মতো স্বতোৎসারিতভাবে মাটির ঘ্রাণে, জলের তরঙ্গে, বাতাসের হিল্লোলে, মনের আনন্দ বেদনায় গড়ে উঠেছে মাঠে-ঘাটে-বাটে আর তা লোকগীতি আউল-বাউল-সুফি ইত্যাদি নানা কিছু নিয়ে প্রাকৃত জনের সুর লহরী সারা দেশের অন্তর ছুঁয়ে প্রবাহিত

বাবা আলাউদ্দিন খাঁ জীবনের প্রারম্ভে লোক জীবনের বাউল, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়ার  প্রান্তরে পরিভ্রমণ করে বয়স দশ পেরোবার আগেই সুরের টানে ঘর ছেড়েছিলেন এরপর কত শ্রম-সাধনা, কত অভিজ্ঞতা আর নানা গুরুসঙ্গ এত কিছুর পর একদিন ভারতের সঙ্গীত জগতে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রে পরিণত হতে পারলেন অবিশ্বাস্য কাহিনী মনে হয় তাঁর জীবন সাধনাকে। 


সঙ্গীতে ত্রিপুরা রাজ্যের সুনাম সেই রাজন্য আমল থেকে রাজন্য শাসিত আমলে রাজারা সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন বটে, অন্দরমহলে রাণী রাজকন্যা, দাসদাসী সকলেই যেন সুর তরঙ্গে আন্দোলিত হতেন ত্রিপুরার অরণ্য-প্রান্তর, মাঠ-ঘাট সর্বত্রই সঙ্গীতের সুর মূর্ছনা আন্দোলিত হয় এমনি একটা প্রেক্ষিতে আলাউদ্দিন ত্রিপুরার মাটিতে সেপ্টেম্বর ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ   করেন ত্রিপুরার ভূমিপুত্র তিনি ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসন, ত্রিপুরা এখনকার মতো ছোট্ট রাজ্য নয় সে সময় বর্তমান বাংলাদেশের শ্রীহট্ট, কুমিল্লা ইত্যাদি নিয়ে স্বাধীন ত্রিপুরা বলে খ্যাত ছিল এই স্বাধীন ত্রিপুরার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান তিনি তাঁর পিতা সবদার খাঁ, সাধু খাঁ নামে যাঁর পরিচিতি ছিল আলাউদ্দিনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নাম ছিল আফতাবউদ্দিন খাঁ আলাউদ্দিনের জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সীমানায় পড়েছে শৈশবে বাবা বড়ভাইয়ের কাছে তাঁর সঙ্গীত শিক্ষার শুরু শৈশবের সেই মুুক্ত দিনগুলিতে গ্রামের মাঠ ঘাট, বিলের পার, নদীঘাট, সবুজ শ্যামল বনানীর পাশে ঘুরে বেড়াতেন তিনি আর তাঁর সমগ্র সত্তায় বাউল, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়ার সুর মত্ত আলোড়ন তুলত সঙ্গীতের তাড়নায় স্বগৃহের সীমানায় ছটফট করত তাঁর বালক মন পাখির মত ডানা মেলে সঙ্গীতের মহাগগনে উড়াল দিতে চাইত তাঁর মন আর তাই একদিন আপনজন আপন পরিচিত দুনিয়া ছেড়ে অনির্দিষ্ট জগতে পাড়ি দিলেন কারও মতে তখন তাঁর বয়স আট বছর, কারও মতে দশ বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি প্রথম একটা যাত্রাদলে যোগ দিলেন উনিশ শতকের যে সময়ে তিনি যেমন যাত্রাদলে যোগ দিলেন তা ছিল আদি অকৃত্রিম বাংলা যাত্রাপালা এবং বাঙালির সম্পদ পরবর্তীকালের শান্তিগোপালের বিশ্ব খ্যাত বিবর্তিত পালার সঙ্গে এগুলোর রাতদিন তফাৎ যাক এই অভিজ্ঞতা বাংলার ট্রাডিশনাল লোকগীতিতে তাঁকে সমৃদ্ধ করল তবে সঙ্গীত মহাসমুদ্রের কলকল্লোলে উতলা আলাউদ্দিন যাত্রাপালার নিরালার ছোট নদীর কুলকুল ধ্বনিতে তৃপ্ত থাকতে পারেন কি করে?


কিছুদিন পর তিনি কলকাতা চলে গেলেন আলাউদ্দিনের জীবনের প্রথম চল্লিশটা বছর এক অদ্ভুত অতৃপ্তিসঞ্জাত রহস্যময়তা আর রোমাঞ্চতায় ঘিরে ছিল সঙ্গীত সন্ধানী তাঁর উড়ুউড়ু মন তৃপ্তি পাচ্ছিল না তাই ছুট্ কেবল ছুট্ কলকাতা এসে তিনি গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুলো গোপালের শিষ্যত্ব নিলেন গোপাল কৃষ্ণ পরম স্নেহে পনেরো বছরের আলাউদ্দিনকে শিষ্য রূপে গ্রহণ করলেন তিনি ধ্রুপদ, ধামার খেয়ালে অত্যন্ত পরিশীলিত সুদক্ষ গুরু ছিলেন তাঁর পরিকল্পনা ছিল বারো বছরে আলাউদ্দিনকে শিক্ষা দিয়ে পাকাপোক্ত করে দেবেন গোপাল কৃষ্ণ তবলা, পাখোয়াজ এবং কণ্ঠসঙ্গীতের প্রাথমিক মৌল শিক্ষা দিলেন যন্ত্রসঙ্গীত শিক্ষার প্রতি আলাউদ্দিনের অত্যন্ত আগ্রহ ছিল কিন্তু হঠাৎ করে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে গুরু গোপাল কৃষ্ণের মৃত্যু হল

গুরুর মৃত্যুর পর আলাউদ্দিন কলকাতার বিখ্যাত স্টার থিয়েটারের সঙ্গীত পরিচালক অমৃত লাল দত্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন অমৃতলাল দত্ত ওরপে হাবু দত্ত স্বামী বিবেকানন্দের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন তিনি আলাউদ্দিনকে স্টার থিয়েটারের বাদকদলে নিযুক্ত করলেন ব্যাণ্ড বাদক হিসেবে পাশাপাশি গুরুর কাছে সঙ্গীত শিক্ষা চলতে থাকে এর পাশাপাশি গোয়া থেকে আগত ব্যান্ডমাস্টার মি.লোবোর নিকট পাশ্চাত্য ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতে বেহালা বাদনও শিখতে লাগলেন কলকাতা থাকাকালে বাংলা মঞ্চের অর্কেষ্ট্রার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন


কয়েকবছর পরে বিশ বছর বয়সে মুক্তাগাছিয়ার (বর্তমান বাংলাদেশ) জমিদার জগৎ কিশোর আচার্যের বাড়িতে কনসার্টে সরোদবাদন শুনলেন স্বনামধন্য ওস্তাদ আহমেদ আলি খাঁ ছিলেন সেই মহফিলের আশ্চর্য সরোদবাদক এই অভিজ্ঞতা আলাউদ্দিনকে চমকে দিল, দিওয়ানা করে দিল এর আগে আলাউদ্দিন আহমেদ আলি খাঁ সাহেবের সরোদবাদন শুনেননি আহমেদ আলি খাঁর গুরু ছিলেন আসগর আলি খাঁ সাহেব আসগর আলি খাঁ ওস্তাদ আমজাদ আলি খাঁয়ের পিতার ঠাকুর্দার ভাই সে হিসেবে আমজাদ আলি খাঁয়ের ঠাকুর্দা
ওস্তাদ আহমেদ আলি খাঁয়ের সরোদবাদনে আত্মহারা আলাউদ্দিন বারবার তাঁর কাছে সরোদবাদন শিক্ষার জন্য অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন
ওস্তাদ আহমেদ আলি খাঁ বাংলার দিনাজপুরের এক রাজদরবারের সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন পাঁচবছরে নিজের সবটুকু দিয়ে আলাউদ্দিন সরোদবাদন শিখলেন পরবর্তীতে গুরুর সঙ্গে রামপুর যেতে হল এবং শিক্ষায় তাঁর একনিষ্ঠতায় একটুও চিড় ধরল না শিষ্যের একাগ্রতা পারদর্শিতা দেখে গুরু বুঝলেন এবার তাঁর উপযুক্ত শিষ্যের 'গাঁড়া বন্ধন'এর সময় হয়েছে গাঁড়া বন্ধন মানে গুরু-শিষ্যের অবিচ্ছেদ্য আজীবন সম্পর্কের এক পবিত্র বন্ধন ক্রিয়া আলাউদ্দিন রামপুর নবাব দরবারের সুবিখ্যাত সুদক্ষ বীণাবাদক ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁর বীণাবাদনের নৈপুণ্যের কথা শুনে বীণাবাদনের প্রতি আকৃষ্ট হন ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁ ছিলেন কিংবদন্তী সঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের সাক্ষাৎ শিষ্যদের অন্যতম একজনের শিষ্য ছিলেন শিষ্যের মনোভাব বুঝতে পেরে আহমেদ আলী খাঁ সাহেব আলাউদ্দিনকে ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁয়ের হাতে সঁপে দিলেন আলাউদ্দিন খাঁ ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁয়ের সম্মতিক্রমে তাঁর সঙ্গীতজ্ঞ শিষ্যমণ্ডলীতে সামিল হলেন এবং ওয়াজির আলী খাঁয়ের কাছে তানসেনের নিজস্ব সঙ্গীত ঘরানা অর্থাৎ ' Tansen School Of Music ' সেনিয়া ঘরানায় বীণাবাদন শেখেন ইতিমধ্যে আলাউদ্দিন রামপুর স্টেট ব্যাণ্ডে বেহালাবাদক হিসেবে যোগদান করেছিলেন তিনি শাস্ত্রীয় ধ্রপদ, ধামার, হোরি এসবও শিখে নিলেন যাতে করে নানাপ্রকার বাদ্যযন্ত্র যেমন সুরশৃঙ্গার, সেরনিয়াবাত রবাবে এসবও বাজাতে পারেন এসব বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা তিনি ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁয়ের কাছেই পেয়েছিলেন
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব কিছুকাল পরে মধ্যপ্রদেশের মাইহার স্টেটের রাজসভার সঙ্গীতশিল্পী রূপে যোগদান করেন


"মাইহার যাবার আগে মহারাজ বীর বিক্রম মাণিক্যের ত্রিপুরা রাজ দরবারে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব সম্মানিত রাজ শিল্পী ছিলেন আধুনিক সাঙ্গিতিক আতিথ্যের সঙ্গে ওস্তাদ আলাউদ্দিন ঠাকুর অনিল কৃষ্ণের নাম সগৌরবে উচ্চারিত হয় লণ্ডন এলবার্ট হলে খাঁ সাহেব প্রথম আন্তর্জাতিক সম্বর্ধনা পাওয়ার পর মহারাজা বীর বিক্রমের স্মৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, " আমার অন্নদাতা পিতাকে শতকোটি প্রণাম— "ত্রিপুরার বিখ্যাত রবীন্দ্র গবেষক শ্রীবিকচ চৌধুরী বলেন
মাইহার স্টেটের রাজা ব্রিজনাথ সিং পরম শ্রদ্ধায় তাঁকে রাজসভার সকল সঙ্গীতজ্ঞদের পুরোভাগে স্থান দিলেন তিনি হলেন রাজসভার সঙ্গীতশিল্পীদের গুরু তখন থেকেই আলাউদ্দিন মাইহারের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন এসময় তিনি ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, হোরি, টপ্পা, ঠুংরি এসব ক্ল্যাসিক্যাল কণ্ঠসঙ্গীতের শিক্ষাদান করছিলেন কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি নানাপ্রকার যন্ত্রসঙ্গীতের শিক্ষাও দিয়ে যাচ্ছিলেনএতদিনের শিক্ষার্থী এবার সুদক্ষ শিক্ষাগুরু সেনিয়া ঘরানার বীণা, রবাব, সরোদ, সেতার, বেহালা, সুরবাহার এসব যন্ত্রসঙ্গীতের সুনিপুণ গুরু এখন তিনি অসামান্য সঙ্গীত প্রতিভা তাঁকে অনন্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল বিপুল খ্যাতি অর্জন করলেন তিনি

রাজদরবারের সঙ্গীতগুরু হিসেবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মাইহার ঘরানাকে  সম্পূর্ণরূপে গড়ে তুললেন মাইহার ঘরানা প্রকৃতপক্ষে উনিশ শতকের সৃষ্ট সম্পদ কিন্তু বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের নিরলস সাধনা প্রয়াসে তাঁর সমকালে এই ঘরানা বিপুল বৈভবে পরিপুষ্টির হয়ে বিকশিত হল, প্রতিষ্ঠা পেল তাঁর অবদান এতোখানি মৌলিক ছিল যে জন্য অনেক সময় তাঁকে এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় তখন এমন একটা দ্রুতগতির বিবর্তনের কাল চলছিল ধ্রুপদী যন্ত্রসঙ্গীতের জগতে খাঁ সাহেব একাধারে একনিষ্ঠ বীণাবাদক ধ্রুপদাঙ্গের শিল্পী ছিলেন তা সত্ত্বেও তিনি বীণা, সুরবাহার ( bass sitar) সুরশৃঙ্গার ( bass sarod) এসবকে অনেক ক্লাসিক্যাল যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পেরেছেন তাঁর এই কৃতিত্ব চিরস্মরণীয়


১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে নিজের বাসভবন ' মদিনা ভবন '- আলাউদ্দিন দরিদ্র সহায়সম্বলহীন সঙ্গীতপ্রেমী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করেন কালক্রমে এই শিক্ষাকেন্দ্র তাঁর বাসভবনকেই একটি সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তরিত করল প্রাচ্য পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে সুসজ্জিত এক অভিনব অর্কেষ্ট্রা গড়ে তুললেন এই অর্কেষ্ট্রা পরবর্তী সময়ে ' মাইহার ব্যাণ্ড ' বা ' মাইহার বাদ্যবৃন্দ ' নামে পরিচিতি লাভ করল
সঙ্গীতের জন্য আলাউদ্দিন বাল্যকালে স্বজন স্বগৃহ ত্যাগ করে পরিব্রাজকের মত সঙ্গীত তীর্থে তীর্থে দিওয়ানা হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন  প্রতিভা, একনিষ্ঠতা, পরিশ্রম অধ্যবসায়ে দুহাত ভরে কুড়িয়েছেন সঙ্গীতের মণিরত্নাদি তাঁর চরিত্রের মহৎ গুণ ছিল নিরভমানিতা কিন্তু সঙ্গীতনিষ্ঠা তাঁর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল তাঁর অন্নদাতা মাইহাররাজ ব্রিজনাথ সিং যখন তাঁর শিষ্য, সে সময় রাজার হাতুড়ি দিয়ে তবলায় সুর বাঁধার সময় রাজার সামান্য ত্রুটির জন্য রাজার দিকে হাতুড়ি ছুঁড়ে মারেন অমায়িক সহজ সরল হলেও আলাউদ্দিন সঙ্গীত শিক্ষায় শিষ্যের সামান্যতম অবহেলা মানতে পারতেন না এমনি ছিল তাঁর সঙ্গীত প্রেম!
আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের সমগ্র সঙ্গীত জীবনের সঙ্গে তিনটি মৌলনীতি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থেকে তাঁকে পরিচালিত করেছিল,নিয়ন্ত্রিত করেছিল আর এই তিনটি নীতি হচ্ছে) প্রকৃত সঙ্গীত জ্ঞান অর্জনের জন্য আত্মার সীমাহীন অন্বেষণ, ) লব্ধ জ্ঞানের বিশুদ্ধতা রক্ষা সর্বোচ্চ স্তরে উন্নয়নের জন্য নিয়ত পরিচর্যা করা এবং ) তিনি যেসব শিষ্য বা শাগরিদদের উপযুক্ত মনে করবেন তাঁদের বিস্তৃত পরিসরে নিবিড় তালিম দেওয়া সারাটা জীবন এই নীতিমালাকে তিনি সত্য মেনেছেন এবং পালন করেছেন বংশ পরম্পরায় তিনি সঙ্গীতবিদ্যার উত্তরাধিকার পাননি, অধ্যবসায়, শ্রম নিষ্ঠা দ্বারা তা অর্জন করেছেন তাঁর জীবনই তাঁর অর্জিত শিল্পের বিষয়ে প্রামাণ্য সত্য, আর বিশ্বস্ত আন্তরিক সীমাহীন পরীক্ষা - নিরীক্ষার প্রামাণ্য ক্ষেত্রও বটে তাঁর সঙ্গীত সাধনার ক্ষেত্র আজীবন ব্যাপ্ত আর সঙ্গীত সাধনায় পরীক্ষা -নিরীক্ষা ছিল তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন নিয়ত সঙ্গীত নিয়ে এমনিতরো পরীক্ষা - নিরীক্ষা তাঁকে সঙ্গীতের সত্তার সান্নিধ্যে নিয়ে গেছে, নব নব সৃষ্টির আলোকোজ্জ্বল জগতে তাঁকে উত্তীর্ণ করেছে সম্ভবত নিজ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর মনে সংকীর্ণ নিম্নমানের শিক্ষাদানের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল সেজন্যই নিজে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষাগুরুর বিমূর্ত প্রতীক হতে পেরেছেন আর এখানেই তিনি অসামান্য
বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের শিষ্যমণ্ডলীতে তাই বিশ্ববন্দিত শিল্পীরাই ছিলেন তাঁর পুত্র ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ, কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী ( রোশনারা খানম্), পণ্ডিত তিমির বরণ, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, মাইহারের মহারাজা ব্রিজনাথ সিং, পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ, পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জি, শরণরাণী, পণ্ডিত যতীন ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য, আলাউদ্দিনের ভ্রাতুষ্পুত্র ওস্তাদ বাহাদুর খান আরও ছিলেন আলাউদ্দিনের নাতি - নাতনীরাআশিস খান, শুভো শঙ্কর ( পণ্ডিত রবিশঙ্কর অন্নপূর্ণা দেবীর পুত্র), ধ্যানেশ খান, আমিনা পেরেরা, প্রাণেশ খান এবং অমরেশ খান


নীতিগতভাবেই আলাউদ্দিন সঙ্গীতগুরু হিসেবে কোনদিনই শিষ্যদের কাছ থেকে নগদ অর্থ বা কোন উপহার সামগ্রী গ্রহণ করেননি বরং শিক্ষাদানকালে শিষ্যদের সমস্ত ভরণপোষণের দায়দায়িত্ব নিজে বহন করেছেন এই বিষয়টা প্রাচীন ভারতের গুরুকুল প্রথাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আরো মনে হয় বাবা আলাউদ্দিন সঙ্গীত শিক্ষার জন্য সারাটি জীবন যে সংগ্রাম করে গেছেন, সেই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতাতেই যেন সঙ্গীত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য স্নেহময় হাতে ছত্রছায়া ধারণ করে থেকেছেন

সরোদে কনসার্ট বাদন করলেও আলাউদ্দিন দক্ষতা সহ নানাপ্রকার বাদ্যযন্ত্র বাজাতে সক্ষম ছিলেন তাঁর মধ্যে যে মহান ক্ষমতা ছিল তার বলে অর্জিত বিদ্যাকে অবলীলাক্রমে অধ্যাপনার কাজে ব্যবহার করতে পেরেছেন বাদ্যযন্ত্র তারযন্ত্রের যে জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন তা সাবলীলভাবে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পরিশীলিতভাবে তুলে দিতে পেরেছিলেন

আলাউদ্দিন পুত্র আলী আকবর খানকে সরোদ শিক্ষা দেন, কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী তাঁর কাছে সুরবাহার শেখেন শিষ্য রবিশঙ্কর নিখিল ব্যানার্জি সেতার বাদন শেখেন, যতীন ভট্টাচার্য ছিলেন সরোদ বাদক, রবিন ঘোষ বেহালা বাদক, ব্রিজনাথ সিং পান্নলাল ঘোষ বাজাতেন বাঁশের বাঁশি পুত্রকন্যা শিষ্যমণ্ডলী নিয়ে এভাবেই গড়ে ওঠে তাঁর মাইহার ব্যাণ্ড তাঁর সযত্নে লালিত পালিত পূর্ণাবয়বে সুগঠিত মাইহার ঘরানার দুই শিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্কর ( জামাতা) পুত্র আলি আকবর খান স্বদেশ সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব দরবারের খ্যাতিমান দুই মহাজ্যোতিষ্ক ভারতাত্মার মর্মবাণী শিল্গৈশ্বর্য এই দুই বিরল প্রতিভাধর শিল্পী উন্মুখ বিশ্ববাসীর সামনে উজাড় করে তুলে দিয়েছেন স্বদেশ -বিদেশে তাঁদের শিল্প ঘরানার প্রতি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের তালিমের ব্যবস্থা করেছেন সারা পৃথিবীর শিল্প বোদ্ধা রসিক সমাজ আজো কৌতূহলী বিস্মিত এই সঙ্গীত ঘরানা সম্পর্কে


উল্লেখ্য বিশ্ব দরবারে ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পের বিশেষ করে যন্ত্রশিল্পের উপস্থাপনার কাজটি কিন্তু বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব করে গেছেন 1935- 36সাল নাগাদ ভারতের কিংবদন্তী নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের নৃত্যদলে যোগ দিয়ে আলাউদ্দিন আন্তর্জাতিক সফরে বের হন নিঃসন্দেহে উদয়শঙ্করের ব্যালে ট্রুপের কেন্দ্রীয়  আকর্ষণ ছিলেন আলাউদ্দিন অন্যভাবে বলা যায় বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের শিল্পসম্ভারের প্রথম বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন হল এভাবে পরবর্তীকালে উদয়শঙ্করের সঙ্গে আলমোড়ায় তাঁর ' ইণ্ডিয়া কালচারাল সেন্টারে 'আলাউদ্দিনের সক্রিয় যোগাযোগ গড়ে ওঠে প্রকৃতপক্ষে হিমালয়ের উত্তরাখণ্ডের সিমলাতে, আলমোড়া থেকে তিন মাইলা দূরে ছিল সেন্টারটি সেখানে কথাকলি শেখাতেন শঙ্করণ নাম্বুদ্রি, ভারতনাট্যম কননপ্পা পিল্লাই, মণিপুরী নৃত্য শেখাতেন আম্বি সিংহ আর এসব রথী মহারথীদের সঙ্গে সঙ্গীত শিক্ষাদানে ছিলেন বাবা আলাউদ্দিন এই কেন্দ্রে প্রথিতযশা বিপুল সংখ্যক নৃত্য সঙ্গীত শিক্ষার্থীর সমাবেশ ঘটে এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন গুরু দত্ত, শান্তি বর্ধন, সিমকি, অমলা, সত্যবতী, রমেন্দ্র শর্মা, রুমা গুহঠাকুরতা, জোহরা সেহগাল, প্রভাত গাঙ্গুলি,আজরা, লক্ষ্মীশঙ্কর, শান্তা গান্ধী প্রমুখেরা এছাড়া রবিশঙ্কর আর উদয়শঙ্করের ভাই রাজেন্দ্র দেবেন্দ্র শিক্ষার্থী হিসেবে ছিলেন কিন্তু চার বছর পরে অর্থাভাবে এমন একটি কেন্দ্র বন্ধ হলে ভারতের নৃত্য সঙ্গীত জগতের বিপুল ক্ষতি হল বলা যায়

আনুমানিক ১৮৮৮ সালে আলাউদ্দিন মদন মঞ্জরীকে বিবাহ করেন তাঁদের জ্যেষ্ঠ  পুত্র আলি আকবর খান, তিন কন্যা শারিজা, জাহানারা রোশেনারাঅল্পবয়সে শারিজার মৃত্যু হয় জাহানারার বিবাহিত জীবনে তাঁর পরিবার সঙ্গীত চর্চায় বাধাপ্রদান করে দুঃখিত আলাউদ্দিন রোশেনারাকে সঙ্গীতের তালিম না দেবার সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু  একদিন ঘরে ফিরে দেখলেন পুত্র আলী আকবর রোশেনারাকে অত্যন্ত নিপুনতায় কোন কিছু শেখাচ্ছেন কন্যার সঙ্গীত প্রতিভা নৈপুন্য দেখে হতভম্ব আলাউদ্দিন পূর্ব সিদ্ধান্ত বাতিল করলেন এরপর অত্যন্ত যত্ন নিয়েই তিনি কন্যাকে কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি সেতার, সুরবাহারের তালিম দেন পরবর্তীকালে রোশেনারার বিবাহ হয় আলাউদ্দিনের আরেক প্রতিভাশালী কিংবদন্তী তুল্য শিষ্য বিশ্বখ্যাত সেতার শিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করের সাথে জন্মের পর মাইহার রাজ ব্রিজকুমার সিং রোশেনারার নাম দেন অন্নপূর্ণা, রবিশঙ্করের সাথে বিয়ের পর তিনি অন্নপূর্ণা নামেই পরিচিতি লাভ করেন আলাউদ্দিনের এই কন্যা শিষ্যা ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত জগতে অনন্যসাধারণ প্রতিভা প্রদর্শন করেন আর সুরবাহার বাদনে তাঁর কৃতিত্ব সর্বজনমান্য কিন্তু রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং তিনি বোম্বেতে বাস করতে শুরু করেন এরপর কোনও পাবলিক অনুষ্ঠানে যোগ দেননি শুধু সঙ্গীত শিক্ষা প্রদান করেন বংশীবাদক হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, নিখিল ব্যানার্জির মত শিষ্যকে তিনি সঙ্গীত শিক্ষা দিয়েছেন

আলাউদ্দিন দেশের রবিতীর্থ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎকারে যান অল্প বয়সের ছোট বড় এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার অবশ্যই স্মরণীয় ঘটনা শান্তিনিকেতনে ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ সেখানকার প্রথিতযশা ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজকে সঙ্গীতে নিবেদিতপ্রাণ এই মহান সঙ্গীতশিল্পীর একটি প্রতিমূর্তি নির্মাণের কথা বলেন রামকিঙ্কর বেইজ আরেক মূর্তিমান প্রতিভা নিউদিল্লিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে স্থাপিত তাঁর নির্মিত ' যক্ষিণী ' মূর্তিটি যেন সাক্ষ্য দেয় রামকিঙ্করের প্রতিভা কতখানি ঠিকানা কোথায় আর শান্তিনিকেতনে তো তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজস্র


জন্মগ্রাম থেকে একদা সঙ্গীতের যে তৃষ্ণায় আলাউদ্দিন দৌড় শুরু করেন সে দৌড় সমগ্র জীবন ব্যাপী ছিল একসময় দৌড়টা থামল মাইহারে থামল বলা যায় কিভাবে? এরপর তো মাজাঘষা, অণ্বেষণ, বিতরণ সঙ্গীত জগতে নবতর সৃষ্টির আরেক দৌড় রাগ রাগিণীর বিশাল জগতে বিচরণ করে নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা তাঁকে পেয়ে বসল প্রতিভার সুউচ্চ মিনারে অধিষ্ঠিত থেকে একের পর এক রাগ সৃষ্টি করতে লাগলেন তিনি রাগ মদনমঞ্জরী ( পত্নীর নামে), প্রভাকলি, ভগবতী, হেমন্ত, সরস্বতী, শোভাবতী, মাধবিশ্রী, হেমভৈরব, মাধবগিরি, হেমবেহাগ, মাঞ্জ খাম্বাজ এসব তাঁর সৃষ্টি তাঁর সৃষ্ট ' মাইহার ব্যাণ্ড ' বা ' মাইহার বাদ্যবৃন্দ ' ভারতের প্রথম অর্কেষ্ট্রা সুর সম্পর্কিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন বলে সুরের চলাচলের পরিসর বা রেঞ্জ সম্পর্কে সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তাই সরোদ, সেতার, সুরবাহার, সুরশৃঙ্গার, সেনিয়া রবাবচন্দ্র সারঙ, সেতার, ব্যাঞ্জো, নলতরঙ্গ যন্ত্র সঙ্গীতের এসব তারযন্ত্র বা অন্যান্য যন্ত্রের শব্দগুণকে সমুন্নত পরিসরে অনায়াসে নিয়ে যেতে পারতেন
১৯৫৫ সালে আলাউদ্দিন 'মাইহার কলেজ অফ মিউজিক' স্থাপন করে জীবনের যাত্রাপথে আরেকটি মাইল স্টোন প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৫৯ সালে তিনি কলকাতায়  সর্বশেষ জনসমক্ষে মঞ্চ পরিবেশনা করেন ১৯৬১ সাল থেকে কণ্ঠসঙ্গীত বা যন্ত্রসঙ্গীত সবকিছুর জনসমক্ষে মঞ্চপরিবেশনা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করেন এক সুদীর্ঘ আলোকোজ্জ্বল ব্যতিক্রমী সূষ্টির জীবন পশ্চাতে রেখে, বাবা আলাউদ্দিন খাঁ অবশেষে থামলেন তাঁর চলা চিরতরে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হল
ব্যক্তি হিসেবে আলাউদ্দিন একজন নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান,সাথে সাথে মাইহারের মা সারদা শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত মহান শিল্পী তাঁর বাসভবনে হিন্দুর দেবদেবীর চিত্র মূর্তি সুসজ্জিত ছিল প্রকৃতপক্ষে তিনি আগাপাশতলা ধর্মনিরপেক্ষ শিল্পের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মহান মানুষ ছিলেনএই প্রমাণ মেলে ফিল্ম ডিভিশনের ডকুমেন্টারী ফিল্ম 'বাবা'তে
বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের সঙ্গীতের কিছু রেকর্ড করা হয়েছিল সেসব রেকর্ডের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডগুলি হচ্ছে ' অল ইণ্ডিয়া রেডিও ' কৃত রেকর্ডগুলি ১৯৬০-৬১ সালের মধ্যে এসব রেকর্ড করা হয়বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের জীবদ্দশায়ই দেশের নানা সম্মানে তাঁকে সম্মানিত করা হয় ১৯৫২ সালে তিনি ' সঙ্গীত নাটক একাডেমি ' পুরস্কার পান ১৯৫৪ সালে ' সঙ্গীত নাটক একাডেমি '  তাঁকে সারা জীবনের অবদানের জন্য ' লাইফ টাইম ফেলোশিপ ' প্রদান করে ভারত সরকার প্রদত্ত ভারতীয় নাগরিকদের জন্য তৃতীয় উচ্চতম রাষ্ট্রীয় সম্মান ' পদ্মভূষণ ' ১৯৫৮ সালে এবং দ্বিতীয় উচ্চতম রাষ্ট্রীয় সম্মান ' 'পদ্মবিভূষণ ' ১৯৭১ সালে দেওয়া হয়
এসব সম্মান প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয় অবশ্য শিল্পী আলাউদ্দিন সম্ভবত আরো বেশি আনন্দিত হয়েছিলেন আপামর ভারতবাসীর ভালবাসা পেয়ে