ষষ্ঠ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫৫

শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

কার রামায়ণ ? কোন রামায়ণ ? রামায়ণী ঐতিহ্য




অল্প কিছুদিন আগে সংবাদপত্রে বেরোল যে সঙ্ঘপরিবার রামায়ণের সংশোধনের জন্য পণ্ডিতসভা ডেকেছেন। কারণ রামায়ণে রামচরিত্রের মধ্যে যে সব খাদ কিম্বা গাদ ঢুকেছে সেগুলিকে বাদ দিয়ে তাঁরা এক নিখাদ, নিষ্কলঙ্ক রামের নির্মাণচান। এ হলো রামায়ণের একধরনের বিশুদ্ধীকরণ বা  ‘sanitization’  সঙ্ঘপরিবারের মূল টার্গেট অবশ্যই উত্তরকাণ্ড’, কারণ সেখানেই রামের মুখে কিছু অপ্রত্যাশিত কথা আছে। আর তথ্য প্রমাণও আছে যে উত্তরকাণ্ড বাল্মীকির নয়, পরে সংযোজিত হয়েছিল। মহাকাব্যের সংশোধনের চেষ্টা আগেও যে হয়নি তা নয়। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের ইতিহাসের অভাব পূর্ণ করতে, আকারগত ও পাঠগত মাপকাঠি, আর বিষয়গত মাপকাঠির মাধ্যমে মহাভারতের অন্তঃশাঁসটা খুঁজে বের করে এক সংস্কৃত মহাভারতের সনাক্তীকরণ চেয়েছিলেন যেটি ভারতের ইতিহাসের কাজ করবে। কিন্তু কথনবিশ্বের সূত্রে কাজল সেনের সঙ্গে আমার বাংলা প্রবাদের রাজনৈতিক অষ্টধাতু নিয়ে খেপাটে লেখায় একটি রামায়ণী উৎসের প্রবাদের ব্যাপারে ফোনালাপের সূত্রে বলেছিলাম আমাদের সব্বার জানা ও মানা বাল্মীকি রামায়ণ-ও নির্মাণের চেয়েও বেশি; বাকিগুলোর তো কথাই নেই। শুনে  উনি খুশি হলেন। তাতে ভাবলাম আপাততঃ একটু রামায়ণ নিয়েই কথা বলা যাক! বাংলায় রামনবমী নিয়ে মারামারির পরবর্তী বিপজ্জনক সময়ে রামায়ণী কথা একটু রিস্কি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ভারতবর্ষের যাহা সাধনা, যাহা আরাধনা, যাহা  সংকল্প, তাহার ইতিহাস’, তার সম্পর্কে একটু বলাই যায়।


বাল্মীকির রামায়ণ-এর হৃদয়েই আছে নির্মাণ। ভারতবেত্তা ওরিয়েন্টালিস্ট পণ্ডিতদের মতে বাল্মীকি রামায়ণের মূল কাহিনী লেখা হয়েছিলো মোটামুটি খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দীতে। গরিষ্ঠাংশ ভারতবেত্তা ওরিয়েন্টালিস্ট পণ্ডিতদের মতেই  বাল্মীকি রামায়ণের মূল কাহিনী লেখা হয়েছিলো মোটামুটি খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দীতে, তবে তার পরবর্তী অংশগুলির লিখনকাল খ্রীঃ অঃ দ্বিতীয় শতক। রামায়ণের আদিভাগ নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করার আগেই প্রথম শতাব্দী শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতপ্রেমী  ভারততাত্ত্বিক এ. এল. ব্যাশাম মনে করেন রামায়ণের মধ্যে মহাভারতের প্রাচীন বৈশিষ্ট্যগুলির পরিমাণ এত কম যে তার থেকে এই ধারণা আসে যে দুটির মধ্যে রামায়ণ-ই পরবর্তী। (আমি কাশীদাসী  মহাভারত-এর বা ভারত পাঁচালী-র কথা বলছি না, তার  উদ্যোগপর্বে  তো গোটা রামায়ণ -ই কাশীরাম লিখে দিয়েছেন, ফলে বাংলা রামায়ণ-এর তিনি লেখক বলা চলে, কলম না পিছলোলেও !!!) ঋগ্বেদের রচনা আর বুদ্ধের যুগের মধ্যেকার চার পাঁচশো বছরের ইতিহাস লিখতে বসে ব্যাশাম দেখাচ্ছেন রামচন্দ্রর পরবর্তী খ্যাতি যতই হোক, এই সময়কার সাহিত্য তাঁকে আর তাঁর পিতা দশরথকে উপেক্ষা করেছে। যার থেকে মনে হয় যে উভয়েই ছিলেন নগণ্য রাজা, যাঁদের বীর্যবত্তা ও কীর্তিকলাপ অকস্মাৎ বা আকস্মিকভাবে স্মৃত হয়ে পরবর্তী চারণ কবিদের লেখায় পল্লবিত হতে হতে খ্রিস্টীয় অব্দ শুরুর নাগাদ তার চূড়ান্ত চেহারা পরিগ্রহ করে। ব্যাশাম আরো বলেন জাতকের গল্পগুলি ঐতিহাসিক না হলেও তারা উত্তর ভারতের যে সব পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনা করে তাতে করে এদের খ্রিস্টীয় যুগের শুরুর বেশ কিছু আগের মনে হয়। আর থেরাবাদা বৌদ্ধদের দ্বারা রচিত জাতকে যে কাহিনী সংরক্ষিত  আছে তার  মধ্যে সীতাহরণ ও রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধের কোনো উল্লেখ না থাকায় মনে হয় বাল্মীকি দুটি ঐতিহ্যকে, কাহিনীকে মিলিয়েছেন। প্রথমটাতে আছে অন্যায়ভাবে নির্বাসিত ন্যায়পরায়ণ রাজার কথা, আর দ্বিতীয়টাতে অনার্যদের দ্বারা অপহৃতা আর্যদুহিতাকে উদ্ধার করতে স্বর্ণলঙ্কা বিজয়ের কথা।    


এই বাল্মীকির রামায়ণ -কেও তার এই ‘stitching’ বা সেলাইয়ের ব্যাপারে আপত্তি না করেও সকলে  ভারতভূমিতেও তার কাহিনীশেষটি, বা মাঝখানের কিছু গল্প বা অন্ততঃ গল্প বলার ধরনটিকে প্রাচীনকালেও মানেননি। আর তাদের  একটিকে মান্যতা দিয়েছেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশাই, সীতার বনবাস  নামে ভবভূতির উত্তর রামচরিত-এর অনুবাদ করে। সীতার বনবাস-ও একটা নির্মাণ। ভূমিকায় বিদ্যাসাগর মশায় বলছেন— ‘এই পুস্তকের প্রথম ও দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের অধিকাংশ ভবভূতির উত্তর রামচরিত হইতে পরিগৃহীত; অবশিষ্ট পরিচ্ছেদসকল পুস্তকবিশেষ হইতে পরিগৃহীত নহে, রামায়ণের উত্তর কাণ্ড অবলম্বনপূর্বক সঙ্কলিত হইয়াছে। উত্তর রামচরিত-এ প্রথমে অগ্নিপরীক্ষা এবং পরে দ্বিতীয় বনবাসের পর অশ্বমেধযজ্ঞের পরবর্তীকালে সীতা আবার পরিগৃহীতা হয়ে আসার পর সভাস্থলে পুনর্বার অগ্নিপরীক্ষা দিতে অনুরুদ্ধ হয়ে বাল্মীকি রামায়ণের মত পৃথিবীকে বিবরম্ দাতুমর্হসিলে তার ফাটলে প্রবেশ করেননি, সভাস্থলেই গতচেতনা হইয়া, প্রচণ্ডবাতাহতলতার ন্যায়, ভূতলে পতিতা হইলেনসে জ্ঞান আর ফেরেনি।

 এর থেকে কি এই অনুমান করা যাবে যে বাল্মীকি রামায়ণকে রামায়ণের ‘ur-text’ ‘iconic text’-এর মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে অনেকের আপত্তি ছিল? যাবে, কারণ অনেক পণ্ডিত মনে করেন বৌদ্ধদের রামায়ণ দশরথ জাতক বাল্মীকির রামায়ণের চেয়ে পুরনো; আর অন্যরা মনে করেন মহাভারতের মধ্যে লেখা রামের মোদ্দা গল্পটা (যার কথা আমি একটু উপরে কাশীদাসী মহাভারতের অন্তর্গত রামকথার  প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি) বাল্মীকির রামায়ণ কথনের পূর্ববর্তী হতে পারে (যে কথাও ব্যাশামের বয়ানে উল্লেখ করেছি)। তাঁদের যুক্তি হলো দশরথ জাতকে বোধিসত্ব তাঁর পাঁচশো জন্মের একটিতে রাম হয়ে জন্মান, আর পিতা দশরথের অনুরোধে বোন সীতা আর ভাই লক্ষ্মণকে নিয়ে অরণ্যে স্বেচ্ছানির্বাসনে যান। রামায়ণের মূল কাহিনীর আদিলেখ যে বহু পন্ডিতের মতে খ্রীঃ অঃ প্রথম শতাব্দী তা আগেই বলেছি। আর বুদ্ধদেবের জন্ম আনুমানিক খ্রীঃ পূঃ ৪০০।

কোন রামায়ণ? কার রামায়ণ?

বুঝতেই পারছেন বহু রামায়ণ নিয়ে লিখছি। কিন্তু বহু রামায়ণ নিয়ে লিখলেই কথনের হাইরার্কি’-র প্রশ্ন উঠবেই উঠবে, তত্ত্বের ক্ষেত্রে, আদর্শতাত্ত্বিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। উঠবে নয় সার! উঠেছে, মাঠে ময়দানেও। স্বভাবতঃই তার কথাও লিখবো। কিন্তু সেখানে তো পশ্চিমি অথবা পশ্চিমের ওরিয়েণ্টালিজ্‌মের দ্বারা প্রভাবিত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ভারতপ্রেমীদের লড়াই। এ লড়াইয়ে জেতা, জিত, শহীদ সবই একাকার! ফলে একটু মুখ বদলাই, একজনের নামে, যাকে প্রতাপান্বিতরাও আজকাল বাঙালিয়ানার অর্থ বোঝাতে কোটকরছেন। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার গিয়ানয়ারগিয়ে তিনি লিখছেন, তার পরে রামায়ণ-মহাভারতের যে-সকল পাঠ এদেশে প্রচলিত আমাদের দেশের সঙ্গে তাদের অনেক প্রভেদ। যে যে স্থানে এদের পাঠান্তর তার সমস্তই যে অশুদ্ধ, এমন কথা জোর করে বলা যায় না।  এখানকার রামায়ণে রাম সীতা ভাই-বোন সেই ভাই বোনে বিবাহ হয়েছিল। একজন ওলন্দাজ পণ্ডিতের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন এই কাহিনীটাই প্রাচীন, পরবর্তীকাল এই কথাটিকে চাপা দিয়েছে।

নাম বলবো? না থাক! পাঠক সত্যিকার বাঙালি হলে এই গদ্য কে লিখেছেন নাম বলা তার পক্ষে অপমানজনক। তবে এই বাল্মীকিকে পেরিয়ে এক বৃহৎ ঐতিহ্য থেকে বহু রামায়ণের ভাবনার জমি রবীন্দ্রনাথের মাথায় যে তৈরি হয়েই ছিল তার কিছু আভাস আছে তাঁর অন্য লেখাতেও। সাহিত্যের  একটা জন্‌রা হিসেবে ‘epic of art’ এবং epic of growth’-এর মধ্যে যে পার্থক্য তার থেকে একটু অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের রামায়ণী কথা-ভূমিকাতে তিনি এক জায়গায় বলেছেন: কালিদাসের শকুন্তলা কুমারসম্ভবে বিশেষভাবে কালিদাসের নিপুণ হস্তের পরিচয় পাই কিন্তু রামায়ণ মহাভারতকে মনে হয় যেন জাহ্নবী ও হিমাচলের ন্যায় তাহারা ভারতেরই, ব্যাস বাল্মীকি উপলক্ষ মাত্র। বস্তুত ব্যাস বাল্মীকি ত কাহারো নাম ছিল না। ও ত একটা উদ্দেশে নামকরণ মাত্র। এত বড় বৃহৎ দুটি গ্রন্থ, আমাদের সমস্ত ভারতবর্ষ জোড়া দুইটি কাব্য তাহাদের নিজের রচয়িতা কবিদের নাম হারাইয়া বসিয়া আছে, কবি আপন কাব্যের এতই অন্তরালে পড়িয়া গেছে    

ফলে কোন্ রামায়ণ বা কার রামায়ণকে প্রামাণ্য ভাববো সে বিষয়ে বিভ্রান্ত আলোচনার আগে জানা দরকার যে পণ্ডিতরা রামায়ণ রচনার দুটি ধারার উল্লেখ করেন। একটি হলো রামকথাবা রামের গল্প। আরেকটি রাম কাব্যবা বিশেষ কোনো কবিরযেমন বাল্মীকি, কম্পন বা কৃত্তিবাসরচিত রামের  টেক্সট। যদিও পরোক্তগুলিকেও রামায়ণ লোকায়ত ভাষায় রামায়ণ বলা হয়, যেমন কম্পনরামায়নম্, তবুও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের শরীরে এই রামায়ণ কথাটা অনেক সময়েই লেগে থাকে না। যেমন, ইরামাবতারম্ বা তামিল কবি কম্বনের দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত রামায়ণ; তুলসীদাসের রামচরিতমানস, থাই রামায়ণ রামাকিয়েন  ইত্যাদি।


রামকথার অনেকগুলিই যে রামায়ণের ঐতিহ্যকে বাল্মীকির পরের এমনকি আগের আগের কাহিনীর উল্লেখ করে, তার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত সম্ভবতঃ ষোড়শ শতাব্দীতে ছাপা অধ্যাত্ম রামায়ণে একটি আকর্ষক কাহিনী বনবাসের সময় রামচন্দ্র যখন সীতাকে নিতে রাজি হচ্ছিলেন না তখন সীতা প্রথমে অনেক পত্নীসুলভ অনুনয়, তর্ক  করলেন, স্বামীর নির্বাসনে স্ত্রীর কর্তব্য, ধর্ম ইত্যাদি। কিন্তু রাম তা সত্ত্বেও গোঁ ধরে থাকায় রাগে আগুন হয়ে সীতা বললেন ‘অসংখ্য রামায়ণ এর আগে লেখা হয়েছে! আপনি একটার কথাও জানেন, যেখানে সীতা রামের সঙ্গে বনগমন করেননি?’ এর পর রাম এই যুক্তিকে অলঙ্ঘ্য মনে করলেন ও নিরস্ত হলেন।১০

কোন্ রামায়ণ? কোন্ সীতা?   

এই সব রামায়ণ সব সময় বাল্মীকির টেক্সট-কে মেনে চলে না, বা পাত্তা দেয় না। ফলে অনেক সময়েই গল্পের গরু গাছে ওঠে। যেমন অনেক রামকথায় সীতা রাবণের একার অথবা রাবণ ও মন্দোদরীর  কন্যা। বাল্মীকির নামেই অদ্ভুত রামায়ণ নামে যে রামায়ণ প্রচলিত আছে তার সঙ্গে মূলরামায়ণের মূল প্রভেদের মধ্যে একটি হলো সীতা রাবণ ও মন্দোদরীর কন্যা। বাল্মীকির নামেই প্রচলিত আছে আনন্দ রামায়ণ তথা মনোহর আনন্দ রামায়ণ, যদিও  ‘formal’ বা ‘textual’, এবং  ‘substantive’  সমালোচনা অনুযায়ী এটি অনেক পরের রচনা, এমনকি অধ্যাত্ম  রামায়ণের ও পরের, চতুর্দশ শতাব্দীর টেক্সট। শিব ও পার্বতীর কথোপকথনের আকারে লেখা এর ১০৯ সর্গ অথবা অধ্যায়ের ১২,৩০৩ বিধৃত শ্লোকে যে সব নতুন কাহিনী আছে তাদের মধ্যে একটি হলো সীতা ছিলেন রাজা পদ্মাক্ষের কন্যা। রাবণ তাঁর সতীত্বহানি করতে উদ্যত হলে তিনি অগ্নিতে আত্মাহুতি দেন আর পরজন্মে সীতা হিসেবে পুনরাবির্ভূতা হয়ে রাবণের ধ্বংস ঘটান।

রামে গৌড়া, পি. কে. রাজশেখরা, এবং এস.বাসবাইয়া এক দলিত কবির দ্বারা গীত রামের শ্রুতিকথা নথিবদ্ধ করেছেন যেখানে রাভুলা (রাবণ) সীতার পিতা। পত্নী মন্দোদরীর সঙ্গে সন্তান লাভের জন্য কঠোর তপস্যার পর যোগীবেশে শিবের দেওয়া মায়া আমের শিবকে প্রতিশ্রুত শাঁস মন্দোদরীকে দিয়ে নিজে আঁটি চোষার পরিবর্তে নিজেই শাঁস খেয়ে নিয়ে গর্ভবান হন, আর দশ মাস পূর্ণ হবার পর স্ফীতোদর অবস্থায় হেঁচে ফেলে কন্যাকে বের করে দেন। প্রসঙ্গতঃ কন্নড় ভাষায় সীতা মানে হাঁচা। হেঁচে জন্ম দেবার কারণে রাভুলা সন্তানকে সীতা নামে দেন।১১ আবার  Mayilirāvanaņ তথা Peacock Rāvaņa নামের যে তামিল লোককথা ১২ এখনও তামিলনাদের দক্ষিণী জেলাগুলিতে নিয়মিত অভিনীত হওয়া ছাড়াও কেরলে Pātāļa Rāvaņa নামে চালু আছে, তার সঙ্গেই তামিলনাদে আরেকটি লোককথা সীতাকে রাবণের কন্যা ভাবে, জন্ম মুহূর্তেই যার ছক বা কোষ্ঠী দেখে রাবণ জেনেছিলেন এর হাতেই লঙ্কার ধ্বংস হবে। ফলে একটা ঝুড়িতে ভরে শিশুকন্যাকে সাগরে  ফেলে দেন। তাকে কুড়িয়ে পেয়ে মিথিলাধিপতি জনক মানুষ করেন। এক তামিল গবেষক দেখিয়েছেন যে কন্নড়ে একটি জৈন গদ্যলেখায় আর তেলুগুর এক লোক কথায় এই একই কথা আছে।১৩  

 এই জন্যই বোধ হয় রামানুজন দেখিয়েছিলেন প্রতি রামের জন্য একটি রামায়ণ আছে, আর তাদের একটিতে ছিল কীভাবে রামের হাত থেকে গলে পড়া  পাতালপ্রবিষ্ট একটি অঙ্গুরীয়ের খোঁজে হনুমান পাতালে গিয়ে তার খোঁজ করলে সেখানকার ভূতরাজ তাঁকে হাজার হাজার অঙ্গুরীয়ের মধ্যে থেকে  বেছে নিতে বলেন। কারণ এক রামের অবতারত্ব শেষ হবার সময় এলে এই অঙ্গুরীয় তাঁর হাত থেকে পড়ে যায়। ভূতরাজ হনুমানকে বলেন ফিরে গিয়ে দেখো তোমার রামের অবতারত্বও সমাপ্ত। রামানুজন নিজে দেখিয়েছেন কীভাবে বাল্মীকি আর  কম্পনের রামায়ণে অহল্যার গল্প আর তাতে প্রতিফলিত রামের রূপ একটু  আলাদা। জৈন রামায়ণগুলি রাবণকে নরখাদক রাক্ষস ভাবতে রাজি নয়। বরং দুর্বল বানররা কী করে মহাবল রাক্ষসবীরদের নিধন করলো; রাবণের মত মহান  জৈন যোগ্য বা গুণীরা কি করে রক্তপ নরখাদক হবেন; কুম্ভকর্ণ কিভাবে কানে গরম তেল ঢাললেও আর হাতির পেষণের সঙ্গে যুদ্ধভেরী আর শঙ্খের আওয়াজের মধ্যেও ছমাস ঘুমোয়;— বাল্মীকির এইসব অতিশয়োক্তি আর ভুল দূর করে আসল রামায়ণের জন্য রাজা শ্রেণিকের দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়ে মহর্ষি গৌতমের বয়ানে বিমলসূরী যে পৌমাচারিয়া  তথা পদ্মাচরিত লিখেছেন তা রাবণের খোলনলচে বদলে দিয়েছে। রাবণ সেখানে জৈন ঐতিহ্যের তেষট্টি নেতার (শলাকাপুরুষ) একজন। রামও এখানে বিবর্তিত, উন্নত, জৈন সত্তা। ফলে তিনি রাবণ বা রাক্ষসকুলকে হত্যা করেন না। লক্ষ্মণকেই এই কাজ করতে হয়। ফলে লক্ষ্মণ নরকে যান আর রাম মুক্তি তথা কৈবল্য প্রাপ্ত হন। বানরসেনারারাও আসলে দিব্য বিধ্যাধর।১৪ কে বলে রাবণকে নায়ক করে মাইকেল মধুসুদন দত্ত প্রথম ট্রাডিশন ভেঙেছেন?  

 এরপর মেয়ে কবিদের লেখা রামায়ণের কথা নাই বা তুললাম। চন্দ্রাবতীর রামায়ণ তো আদতে  সীতায়ণ, সীতাই কাব্যের কেন্দ্রমণি।  আর সেখানেও সীতা রাবণ আর মন্দোদরীর কন্যা। সেখানে ‘মেঘে তত নাইকো পানি সীতার চক্ষে যত জল’, ‘কার্ত্তিক মাসেতে দিন রে ছোট হইল বেলা’-র অনুষঙ্গে আমাদেরো কাঁদিয়ে ভাসিয়ে দেয় (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, পঞ্চম ভাগ, তৃতীয় ও ত্রয়োবিংশতি পংক্তি)। অবাক কাণ্ড তামিল লোককথার মতো এখানেও সীতা রাবণ আর মন্দোদরীর কন্যা, আর এখানেও রাবণের প্রতি সীতার আকর্ষণের কান ভাঙানির কারণেই রামকে দিয়ে সীতাকে নির্বাসন দেওয়া হোলো। নবনীতা দেবসেনের চন্দ্রাবতী রামায়ণ আর মেয়েদের রামায়ণ গান নিয়ে অনবদ্য উপন্যাস আর প্রবন্ধগুলিতে মানবীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে যে যে সীতায়ণী কথা এনেছেন তার কথা বারান্তরে বলবো। আমার সুহৃৎ শ্রীমতী রোকেয়া রায় তাঁর দল নিয়ে এ নিয়ে অপূর্ব নাটক করেছেন। তার কথাও।

কিন্তু আপাততঃ বাল্মীকিকে ‘নমি আমি কবিগুরু তব পদাম্বুজে’ ব’লে জানাই রামায়ণী ঐতিহ্যের উপর সঙ্ঘী স্থূলহস্তাবলেপ মানবো না। চন্দ্রাবতী তাঁর অসম্পূর্ণ রামায়ণ শেষ করেছেন বড় সুন্দর। তাই দিয়েই শেষ করি
‘পরের কথা কানে লইলে গো নিজের সর্বনাশ। 
চন্দ্রাবতী কহে রামের গো বুদ্ধি হইল নাশ।’             
                                                              গোবুদ্ধি আর কাকে বলে! 



গ্রন্থসূত্রঃ

১। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণচরিত্র, বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড (কলকাতা: সাহিত্য সংসদ১৪১১/ ২০০৪), তৃতীয় থেকে একাদশ পরিচ্ছেদ, পৃঃ ৩৫৬-৭৪।  
২। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ভূমিকা’, যেখানে ও যার, দীনেশচন্দ্র সেন, রামায়ণী  কথা, নবম সংস্করণ,  (কলিকাতা: গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যাণ্ড সন্স, ১৯০৩), পৃঃ ৪-৫, যেখানে পাওয়া http://dli.serc.iisc.ernet.in, bub_man_0cf21c54b2312121d29b70cbcb1a9cb3, ২২শে অগাস্ট ২০১৮।
৩। A. A. MacDonnell রামায়ণ -এর রচনাকাল আরেকটু আগে স্থির করেছিলেন, খ্রীঃ পূঃ ৫০০ সাল  নাগাদ (A History of Sanscrit Literature (London: 1905)তবে  A. D. Pusalker (Studies in the Epics and Puranas, Bombay: Bharatiya Vidya Bhawan, 1963), Morris Winternitz, A History of Indian Literature, trans. S. Ketkar, 2d ed. Calcutta: University of Calcutta, 1959), V. Pisani and L. P. Mishra, Le Letterature dell’India, Milan: Sansoni, 1970, pp. 89-90): ‘Aśvaghosha presupposes Valmiki, and the former belongs to the time of Kaniska, that is at the beginning of the second century after Christ, so that it is appropriate to conclude that Rāmāyaņa was composed, at the very latest, in the first century of the common era’. Cristiano Grottanelli, Kings and Prophets: Monarchic Power, Inspired Leadership and Sacred Text in Biblical Narrative (New York: Oxford University Press, 1999), p. 27
৪। A. L. Basham, Wonder that Was India (Calcutta: Fontana Books in association with Rupa & Co., 1967), pp. 40-41, 89, 414-17. 
৫। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ভূমিকা, সীতার বনবাস, পৃঃ নেই। 
৬। তত্রত্য, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃঃ ১২০-২২। 
৭। Frank Reynolds, ‘Ramayana, Rama Jataka, and A Comparative Study of Hindu and Buddhist Traditions’, যত্র Paula Richman (ed.) ‘Many Ramayanas: The Diversity of a Narrative Tradition in South Asia (Berkeley: University of California Press, 2001), 50-63
৮। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাভাযাত্রীর পত্র, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ১২৫তম রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ, দশম খণ্ড, পৃঃ ৫১৪।  
৯। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ভূমিকা’, দীনেশচন্দ্র সেন, রামায়ণী কথা, ২-৩।  
১০। A. K. Ramanujan, ‘Three Hundred Rāmāyaņas: Five Examples and Three Thoughts’, in  Many Ramayanas, p. 33.   
১১।Ibid, pp. 35-6.
১২। Mayilirāvanaņ caņţai nāţakam (Madras: Rattina Nayakar Sons, 1969)।   
১৩। যত্র A. Pandurangam, ‘Rāmāyaņa Versions in Tamil’, Journal of Tamil Studies, 21 (1982): 67, fn. 67যত্র সংকলিত Two Tamil Folktales: The Story of King Matanakāma, The Story of Peacock Rāvaņa, trans. Kamil Zvelebil (Delhi: Motilal Banarsidass ; Paris : UNESCO, 1987), p. 221.
১৪। A. K. Ramanujan, ‘Three Hundred Rāmāyaņas’, pp. 22-35.


 
   


       


   

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন