পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

বুধবার, ১ নভেম্বর, ২০১৭

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

বিপদজাহাজ : একটি গদ্যচিত্র


বিপদজাহাজের পিছন বরাবর গঙ্গার জলের ওপর রক্তবর্ণ চাঁদ। জল জুড়ে ফেলে আসা আলো। আলো ফেলে আসার। আলো চলে যাওয়ার। চলে গেলেই নদী ভুলে যাবে। বিপদজাহাজ, খরস্রোতা আর পিছলঘাটের গল্পস্বল্প। ভুলে গেলে চলে যাওয়া যাবে যাতে মনে পড়লেই ফিরে আসা যায়।

ও চলে যাচ্ছিলো। অনেকদিন বাদে ফিরে এসে অনেকটা অপেক্ষার পর ও হঠাৎ করে আবার চলে যাচ্ছিলো। বন্ধুরা যেসব ওয়েলকাম পার্টি দেবে বলেছিল সেগুলো এবার ফেয়ারওয়েল পার্টি হয়ে উঠছিল। ওয়েলকাম আর ফেয়ারওয়েল শব্দদুটো কোলাকুলি করে জলে ভেসে যাচ্ছিলো। ভেসে যাচ্ছিলো তবে ওর সঙ্গে যাচ্ছিলো না। ও একাই চলে যাচ্ছিলো। ওর চোখে হেমন্তের বিকেল-আলো একঘাট জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সেই আলো মিইয়ে এলে ব্রিজ রক্ষাকারী বিপদজাহাজের দিকবদল হচ্ছিল। কিন্তু জাহাজের পিছন-আকাশের রক্তপিতল চাঁদটা রয়ে যাচ্ছিলো ঠায়। তার কোনও প্রয়োজন নেই পেট্রলিং করার। মানুষের  
পৃথিবীর ব্যাপারে সে উদাসীন।

ও আর ওর বন্ধু আফসোস করছিল সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায়। বিপদজাহাজ আর রক্তপিতল চাঁদের ছবি তোলা হচ্ছিল না। যেমন বন্ধুত্বের ছবি তোলা যায় না। এ গদ্যচিত্রই একমাত্র ভরসা। ভরসা চলে যাওয়ার। থেকে যাওয়ার। যতক্ষণ না ছোটবেলা থেকে দেখে আসা পরিবর্তনশীল এই ঘাট-শহরের বিপদজাহাজ অন্তর্হিত হচ্ছে সত্যিকারের বিপদে। বিপদের আশঙ্কায় কেটে যাওয়া একটা জীবন যতদিন না নেমে আসছে খরস্রোতা বিপদের বাস্তবতায়। ততদিন ধরে ও চলে যেতে চাইছিল। চাইছিল কি?

সেদিন দুপুরবেলা ঘাটে চুপটি করে বসে থাকার সময় হঠাৎ একটা বল এসে পড়ল জলে। তারপর পাশের গঙ্গা-তীরবর্তী মাঠ থেকে নেমে এলো বাচ্চার দল। লাফ দিয়ে সাঁতার কেটে তুলে আনল বলটা। কিন্তু বেলা গড়িয়ে গিয়েছিল। কয়েকজন এই সুযোগে দুপুরের স্নানটা সেরে নিল। কয়েক মুহূর্তে খেলার গল্পটা কিভাবে স্নানের গল্প হয়ে গেল তার প্রত্যক্ষদর্শী রইল ঘাটে চুপটি করে বসে থাকা ও আর জলের ওপর ভেসে থাকা ঐ বলটা। খেলা শেষ এবেলার মতো। ও ঘাট থেকে উঠে পড়লো।


দিনের বেলা রক্তবংশজাত চাঁদখানা ছাড়া বিপদজাহাজকে কেমন আলতো লাগে। মিহি। মরা মরা। দিকবদল করছে না। জলের ওপর নিরীক্ষণ ক্ষীণ হয়ে আসছে যেন। ও ঘাটে বসে বসে ভাবছিল কারা বাস করে ঐ বিপদজাহাজের ভেতর। দিন থেকে রাত, রাত থেকে দিন। তারা কি তাকিয়ে থাকে কোনও কোনও সন্ধ্যার ঐ রক্তপিতল চাঁদটার দিকে? কেউ কি দেখছে ওকে এখন, ঐ জাহাজ-ধাতুর ওপার থেকে? কেউ কি দেখে নিচ্ছে ওর চলে যাওয়া? কেউ কি দেখবে ওর ফিরে আসা? বিপদজাহাজের ধাতু কিম্বা চাঁদের রক্তবিহ্বলতা—কেউই মানুষের পৃথিবী নিয়ে চিন্তিত নয়। এই গদ্যচিত্র হয়ত জলে ভেসে যাওয়া বল কিম্বা ফেয়ারওয়েল আর ওয়েলকাম শব্দের মতো কোলাকুলি করে ওকে বিদায় জানালো। লেখা ছাড়া আর কেই বা বিদায় জানায়? কেই বা ফিরে আসতে মনে করিয়ে দেয়? গদ্যচিত্র মনে করিয়ে দেয় যাতে চলে যাওয়া যায়। গদ্যচিত্র মনে পড়িয়ে দেয় যাতে ফিরে আসা যায়।        

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন