পঞ্চম বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫০

বুধবার, ১ নভেম্বর, ২০১৭

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ

আধো আলোছায়াতে


কিছুই গুছিয়ে রাখিনি আজ। না আমাকে... না তোমার প্রিয় কিছু কথা... না তার সঙ্গের ইমোটিকন…
কেন? কী হয়েছে? রাগ আমার উপর না অভিমান!
বললাম, সেরকম!
না, দেখে নাও বাবা। এখানে আউটডোরে দিন কয়েকের শ্যুটিংস্পট আমার। দেখে নাও তুমি...
না। ভাল্লাগছে না এখন।
সেই যখন আমি অনেকটা ছোট আর তুমি হিজিবিজি কাটছিলে বাড়ির পাশে বড় রাস্তার উপরে, মা জানতে পারলে বকে দিত খুব... সুউউউ... আবার ধুলো ঘাঁটছো রাস্তার উপর বসে! উফ্ এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারি না! এত দুষ্টুমি বুদ্ধি মাথায় ঘোরে সবসময়...
কথা বলবো না কিন্তু! যখন খেলতাম আমি কোনো মফস্বলে আর তুমি ঘটি হারানো কলকাতায়। স্থির হয়ে বসে কথা বলো। না হলে চলে যাব ঠিক...

এত দুষ্টু ছিলে যে বিছানা বালিশের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সব্বাইকে ব্যস্ত করে তুলতে। আমি হাত ধরে ঠিক আড়াল থেকে বার করে আনতাম। তারপর...
ইস্ এলোমেলো করে দিলে তো বিছানাটা! একদমই বালিশের আড়ালে লুকোতাম না। কীভাবে খুঁজে বার করতে আমাকে? আমি তো...
তারপর তুমি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে একছুট্টে গিয়ে লুকিয়ে পড়তে জামাকাপড়ের আলমারিতে...
হে ভগবান! ওর মাথায় জল ঢালো... আমি ওয়ার্ডরোব দেখে কি করব!
আলমারির কাছ থেকেও যখন মাখন মাখন গন্ধটা বেরিয়ে এসে নাকে লাগতো,  অয়ন নামটা কতবার যে লিখেছি এই নাক দিয়েই গুনে বলতে পারো সু? সে জেগে থাকে মাখন গন্ধে সর্বক্ষণ। আলমারির দরজা হঠাৎ খুলে দিলে তুমি চোখ বন্ধ করে ফেলে ভাবতে আমি দেখতে পাইনি...
ওরকম ভীতু আমি কখনও ছিলামই না! কিন্তু কেন সব ওলটপালট করে যাচ্ছো? থামাবে এসব?
হ্যাঁ! ভয়ে বন্ধ করে ফেলতে তো সরবতি লেবুর মতো চোখ দুটো। ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারা করতে লুকিয়ে আছো, এটা যেন বলে না দিই কাউকে...
তাই বুঝি! তখন কী করতে? বলে দিতে নিশ্চয়ই সব বিশ্বাসঘাতক!
সু... আমাকে বিশ্বাসঘাতক বললে! গালি দিলে আমাকে!
কেউ যদি বিশ্বাস করে কাউকে কিছু বলতে মানা করে আর সে বলে দেয়, তাকে আর কী বলবো? যেমন কাজ তেমন উপাধি। গালি কোথায় দিলাম! আচ্ছা, বিশ্বাসঘাতকের কথায় রাগ হলো! তিন সরি বলছি। রাগ করে না বাবু প্লিজ! ব্যালকনিতে গেলে কেন!

তারপর তোমাকে আমি নিয়ে যেতাম রূপসা নদীর ধারে। সেখানে অনেক লুচিপাতার গাছ। আমি এনে দিতাম রান্না করবে বলে। যখন রান্না করতে, তাতেও মাখনের গন্ধ...
মিথ্যে কথা। আমাদের বাড়ির কাছে কোনো নদী নেই। অনেক দূরে বঙ্গোপসাগর। নদী কোথায় পেতে?
এই তো আমাদের ছোটবেলার রূপসা নদী। এখনও বইছে... তোমার নদী ছিল না! মিথ্যে বললে সু? গার্ডেনরিচ থেকে মস্ত মস্ত মোটা পাইপ হয়ে প্রতি বাড়ির টাইমকলে বয়ে চলেছে  কবেকার গঙ্গার জল... বালতি থেকে জল ছিটিয়ে একই রূপসায় স্নান করি তো! কিচ্ছু মনে থাকে না তোমার...
উফ্ ভগবান! আমি মিথ্যেবাদীও হলাম এখন! একে নিয়ে কী করি! পড়ে আছি ৩৫৭ কিলোমিটার দূরে আর ইনি আমার সঙ্গে ভালো করে কথা না বলে বিছানা আলমারি ব্যালকনি বাথরুম দেখিয়ে চলেছেন!
তুমি তো দুষ্টু মেয়ে আবার কমলাভোগের মতো মিষ্টি, খুব জেদিও। ভাঙা খেলনারও খুব জেদ থাকে তুমি কি জানো সু? মাকড়সার মতো তাড়া করে ফেরে না-পারাগুলো। এখনকার পনেরো বছরের ছেলেরা ফ্রি ওয়াইফাই পেয়ে পড়া ফেলে গেম খেলে, মলে আড্ডা জমায়। বাড়ির অসুস্থ রুগীর ভার নিয়েছি আমি এই বয়স থেকেই...
কই কখনো বলোনি তো আগে! না, মানতেই হবে। খুব রেসপন্সিবল তুমি। আমার চেয়েও।
জানো, ছোটবেলায় কত সুন্দর সুন্দর সব খেলনা যেগুলো আমাকে আনন্দ দিতো, খুশি রাখতো, রাগ হলে সেগুলোই কীভাবে যে নষ্ট হয়ে যেত নিজেই জানি না।


সে কারণেই তো বলি, রাগ ভালো নয় সু... তুমি জেদ দেখালে আমারও জেদ বাড়ে। যেমন এখন। আমি ৩৫৭ কিলোমিটার দূরে! কী করছি! কাজ না অন্য কিছু! এইজন্য অগোছালো তুমি! তাই আমি তোমার কাছে নেই ? বলো সু...? উত্তর করো? এক... দুই... তিন... সেকেন্ড গুনছি, দশ মিনিটের মধ্যে চুল আঁচড়ে হাসিমুখে এসে কথা বলো। না হলে খেয়েই ফেলবো হাড়গোড়শুদ্ধু বিনা জলে...  চার... পাঁচ...

1 কমেন্টস্: