পঞ্চম বর্ষ / নবম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫১

শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৭

শুভলক্ষ্মী ঘোষ

চুল


-মালতী, এই তোমায় আমি শেষবারের মতো বলে দিলাম, এমন অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা করে আমায় আর কক্ষনো খেতে দেবে না। পরিষ্কার করে কাজ করতে পারলে কর, না পারলে ছেড়ে দাও, অনেক হয়েছে। শর্মিলা ডাইনিং টেবলে বসে ঝাঁজিয়ে উঠলেন।
-কী বলতিছো গো দিদি! ... আমি! এদ্দিনে তুমি আমারে এই চিনলে! আমি কি একবেলার তরেও তোমায় অযত্নি করে খেতে দিছি?  
-এতদিন দাও নি, কিন্তু এখন দিচ্ছ, আর দিচ্ছ বলেই তোমাকে সাবধান করা হচ্ছে। আমি গত কয়েকমাস ধরে স্পষ্ট লক্ষ্য করছি যে প্রায় প্রতিদিন আমার খাবারে চুল পড়ে থাকে! ... এ কী ধরনের কথা!    
-বিশ্বেস যাও গো দিদি, আমি কোনোদিন অমন ধারা অনাজ্যি কাজ করি নে কো। সক্কালবেলা বাসি কাপড় চোপড় ছাড়ি, পোস্কার ধোয়া কাপড়ে আমি পেত্থম তোমার বাড়ি রান্নার কাজে লাগি, মিছে কথা কমু নি। আর এই দেখো না দেখো, কোনোকালে আমারে চুল খুলে তোমার রান্না করতি দেখিছ?... আচ্ছা, বেশ কথা, কৈ? কোথায় চুল পেয়িছ? কোন রান্নাডায়? এগবার দেখাও আমারে! 
-আস্পদ্দা তো কম না, তোকে দেখাব বলে আমি কি ওই চুল হাতে ধরে বসে রয়েছি? ভাবছিস কী বলত? আমি মিথ্যে বলছি, নাকি ওই চুল আমার?... আশ্চর্য কথা!
  
শর্মিলা হাত মুখ ধুয়ে গজ গজ করতে করতে শোয়ার ঘরে এসে বসলেন, আজ কাল একটু জোরে কথা বললেই হাঁফ ধরে, দম রাখতে পারেন না। খাটে বসতে বসতে দেওয়ালে টানানো ছবিগুলোর দিকে শর্মিলার চোখ পড়ে গেল। বিয়ের পর প্রথম স্টুডিয়োতে গিয়ে কত্তা গিন্নির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তোলা  ছবি, কুলু–মানালির ছবি, বছর দুই আগে রিট্যায়ারমেন্টের দিন স্কুল থেকে ফেয়ার ওয়েলে সম্বর্ধনা দেওয়ার ছবি, ওনাকে কী সুন্দরই না দেখতে লাগছে সব ছবিগুলোতে! আর ওই যে মাথার এক ঢাল চুল... যেমন লম্বা, তেমন  চুলের গোছ... সে চুল যে’ই দেখতো, প্রশংসা না করে পারত না। কলেজ খোঁপা, বেড়া বিনুনি, কলা বিনুনি, ফ্রেঞ্চ রোল... কত রকম ভাবেই না চুল বেঁধে শর্মিলা ক্লাস নিতে যেতেন। তা এই এক ঢাল চুল নিয়ে সারাটা জীবন যে বাবা-মা, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়-বন্ধু, সবাইকে নিজে হাতে রেঁধে বেড়ে খাইয়ে এসেছেন... কই, বলুক দেখি, তার করা রান্নায় কেউ কোনোদিন চুল পেয়েছে কিনা? মালতী তো সবে বছর দুই হলো কাজে এসেছে। না না, এগুলো আসলে হলো গিয়ে যুগের হাওয়া, বাজে অজুহাত,  একটু যে গুছিয়ে, চুল বেঁধে, ধীর-স্থির,‌ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে রান্না করবে, শান্ত ভাবে পরিবেশন করবে, আজকালকার মেয়েদের সে ধৈর্য, সে মানসিকতাই নেই।   
    
এই তো, গত সপ্তাহে বন্ধু অনিন্দিতা গল্প করতে এলেন নিজের মেয়েকে নিয়ে, সাথে মেয়ের হাতে বানানো এক বয়াম তিল আর নারকোলের নাড়ু। খেতে গিয়ে শর্মিলা আবিষ্কার করলেন মিষ্টিগুলোর প্রত্যেকটায় চুল। এটা  দেখার পরও সে মিষ্টি কি আর মুখে তোলা যায়? তারপর, গত পরশুদিন সন্ধ্যেবেলা, সিদ্ধার্থ আর রুমকি একগাদা পদ রান্না করে এনে বিজয়ার প্রণাম সেরে গেল। পরের দিন দুপুরে খেতে বসে শর্মিলা স্পষ্ট দেখতে পেলেন ঐ রান্না করা চিংড়ির মালাইকারিতে এক হাত লম্বা চুল পড়ে আছে।... ছিঃ! আর সেইদিন, রবিবার, ঢাকুরিয়ার মনিপিসির বাড়ি ওনার নাতনীর মুখে ভাতের নেমন্তন্নে, বউমা পোলাও খানা পাতে বেড়ে দেওয়ার পর সবেমাত্র প্রথম গ্রাসটা মুখে তুলতে যাবেন... ব্যাস, আবার সেই চুল। খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়তে হলো সাথে সাথে! অসহ্য!      

একরাশ বিরক্তি নিয়ে শর্মিলা জরুরী টা ফাইল, কিছু কাগজপত্র, পাসবই নিজের ব্যাগে গুছিয়ে নিলেন। তৈরি হয়ে এখুনি বেরতে হবে। আজ অনেকগুলো কাজ, ব্যাঙ্কে যাওয়া রয়েছে, সেখান থেকে পোস্ট অফিস, তারপর অ্যাপয়েন্টমেন্ট

ড্রেসিং টেবিলে ঝোলানো কাঁচা-পাকা ঝাঁকড়া মতোন ছোট চুলের উইগখানা  মাথায় পরে আয়নায় নিজের ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়া চেহারাটায় একবার চোখ বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে ভাইব্রেশন মোডে রাখা শর্মিলা মোবাইল ফোনটা ব্যাগের মধ্যে বেজে উঠল। বার করে দেখলেন, রিমাইন্ডার অ্যালার্ট -  ‘ওয়ান থার্টি পি.এম., ডঃ ভাদুড়ি’স চেম্বার, কেমোথেরাপি, থার্ড সাইকেল’।         



4 কমেন্টস্: